বিমান নয় বিধ্বস্ত হয়েছে অনেকগুলো স্বপ্ন

তৌহিদুল আলম

57

অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর মিছিল কাঁদাচ্ছে কোটি কোটি প্রাণকে। শোকে পাথর করছে হাজারো স্বজনকে, আহার নিদ্রাহীন করেছে অনেক প্রিয়জনকে। বেসামাল কান্না, অশ্রæসজল চোখ, প্রিয়জনদের আহাজারি বুকফাঁটা আর্তনাত, কোটি কোটি লোকের সমবেদনা কোন কিছুই ফেরাতে পারবেনা তাদের। ত্রিভূবনের আগুনের লেলিহান শিখা নিভে গেছে শেষ হয়েছে উদ্ধার কাজও। কিন্তু মনের আগুন নিভবেনা কোনদিনও স্বজন হারাদের, শেষ হবে না তাদের আহাজারি-আর্তনাদ। জীবন-মৃত্যু কেবল সৃষ্টিকর্তার হাতে এমন বাস্তব সান্তনাটিও শোকার্ত হৃদয় মানছে আপাতত। কেবল বিধ্বস্ত হয়নি একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে অনেকগুলো মানুষের স্বপ্ন, পরিবারের হাসি এবং সন্তান-স্বজনদের আনন্দ।
হানিমুনে কাঠমুন্ডুর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়া নবদম্পতি আঁখি-মিনহাজ। পরিবারের উদ্যোগে গত ২৮ ফেব্রæয়ারি হলুদ আর ৩ মার্চ জাঁকজমকপূর্ণ রিসিপশন হয় তাদের। দুর্ঘটনার পর তাদের মোবাইল ফোন থেকেই দেশে আসে তাদের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরটি।
বিমানে ছিলেন বাংলাদেশে পড়তে আসা মেডিকেল শিক্ষার্থীও। সদ্য ফাইনাল শেষ করা মেডিকেল শিক্ষার্থীরা যাচ্ছিলেন নিজ দেশ নেপালে স্বজন সান্নিধ্যে। নিজ ভুমে পৌঁছান কিন্তু মাটি স্পর্শ করেননি তাদের স্বাভাবিক দেহ। ভাগ্যের এ কি নির্মমতা!
ইউএস বাংলার ফ্লাইটটিতে ছিলেন ব্যবসায়ী কিংবা চাকরিজীবী। কেউ যাচ্ছে একটু অবসর কাটিয়ে আবার কেউবা অবসর কাটাতে। আর তারা যখন শেষ সেলফিটা ফেসবুকে পোস্ট করছিলেন তখনও কি ভাবতে পেরেছিলেন এই যাত্রাই হবে তাদের শেষ যাত্রা ! অপেক্ষায় থাকা প্রিয় মানুষগুলোর সাথে কখনো আর দেখা হবে না- কখনো আর কথা হবে না ! সমুদ্রের তীরে বসে ডুবতে থাকা লাল সূর্য দেখা হবে না ! কি আশ্চার্য ! কিছু ভুল, কিছু ত্রুটি, কিছু প্রাকৃতিক প্রতিক‚লতা কি এমন নির্মমও হতে পারে !
নেপালের কাঠমুন্ডুর বিমান দুর্ঘটনায় এতগুলো তাজা প্রাণের অসময়ে দুনিয়া ত্যাগ করা মানতে পারছি না কোনভাবেই। নিজের মনকে ভয় পাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারছি না কারণ প্রয়োজনের তাগিদে নিজেকেও উড়তে হয় মাঝে মধ্যে। বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ ও ত্রি-ভূবন বিমানবন্দর কর্তপক্ষের পরষ্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন মাধ্যমে। আবার ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের এ বিমানটি গত আড়াই বছর আগে দেশের সৈয়দপুর বিমানবন্দরে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। বিমানটি ১৭ বছরের পুরোনো এমন কথাও সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত-সমালোচিত হচ্ছে। এ ঘটনায় আমরা যাকেই দায়ী করি না কেন ফেরানো কি যাবে বিমানটির সাথে বিধ্বস্ত হওয়া এতগুলো পরিবারের স্বপ্ন, হাসি এবং আনন্দ? দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিতকরণে নানান কমিটি হবে, দায়ীদের শাস্তি হবে, আবার কেউ পারও পাবে-সব কিছুই স্বাভাবিক। কিন্তু দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হওয়া স্বপ্ন-সম্ভাবনাগুলো যারা আলো ছড়াতো সুন্দর আগামী তৈরিতে। তাদের হারানোর শোক কি করে সইবে স্বজনরা ! অস্বাভাবিক মৃত্যুর মিছিল থামাতে এখনই প্রয়োজন কার্যকরি উদ্যোগ গ্রহণ।

লেখক : সাংবাদিক