বিমর্ষ বাবর ঝাড়লেন খেদ

29

আদালত চলার সময় ভাবলেশহীন থাকলেও রায় ঘোষণা শেষে খেদ ঝেড়েছেন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় মৃত্যুদন্ড পাওয়া বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণ থেকে তাকে নিয়ে যাওয়ার সময় তখনকার প্রভাবশালী এই প্রতিমন্ত্রী ‘আল্লাহর গজব পড়বে’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
গতকাল বুধবার ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলার রায় ঘোষণা করেন। দুই মামলাতেই সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদন্ডের রায় হয়েছে। খবর বিডিনিউজের
খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদন্ড। এছাড়া এ মামলার আসামি ১১ সরকারি কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে।
গতকাল সকাল সোয়া ১১টায় সব আসামির মধ্যে লুৎফুজ্জামান বাবরকেই প্রথমে নাজিম উদ্দিন রোডের আদালত ভবনের দ্বিতীয় তলার বিশেষ এজলাসে নেওয়া হয়। সাদা শার্ট পরা কিছুটা মলিন চেহারার সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী এজলাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ালেও কিছুক্ষণের মধ্যেই চেয়ারে বসে পড়েন। বাবর এ সময় বরাবরের মতোই বিরক্তির অভিব্যক্তিতে ছিলেন। কপালে নামাজের কালো দাগসহ কুঞ্চিত ভাঁজে এবং চুলে একবার হাত বোলাতে দেখা যায়। রায় পড়া শুরু হলে খুব উৎসাহের সঙ্গে কান উঁচিয়ে তা শুনতে থাকেন বাবর। কিন্তু রায় পড়া শেষ হলে তার চেহারায় বিষন্নতার ছায়া পড়ে।
রায়ের পর বেশ খানিকটা মুষড়ে পড়া বাবর তার আইনজীবী এস এম শাহজাহান, নজরুল ইসলাম, সানাউল্লাহ মিয়ার সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। আইনজীবীদের পক্ষ থেকে এ সময় তাকে আপিলের কথা বলা হয়। একটু পরে এজলাসে উপস্থিত সাংবাদিকরা তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আল্লাহই এসবের বিচার করবে।” হামলার সঙ্গে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ও তার বড় ছেলে তারেক রহমানের বিষয়ে স্বীকারোক্তি নিতে না পারায় এমন সাজা হয়েছে বলে ক্ষোভ ঝাড়েন তিনি।
তিনি বলেন, আমার কাছ থেকে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নাম বের করতে না পারায় আমাকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এজলাস থেকে বের হওয়ার সময় তিনি বলতে থাকেন, “আল্লাহর গজব পড়বে।”
রায়ের পর কাশিমপুর কারাগারে নেওয়ার জন্য আদালতের সামনের রাস্তায় আগের মাইক্রোবাসেই তোলা হয় বাবরকে। আগের মতো মাইক্রোবাসের ডানপাশে চালকের পেছনে বসেন তিনি। নিরাপত্তা প্রহরা ঠিক করার জন্য আসামিদের গাড়িবহর সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষায় থাকলে বাবর ডান হাত দিয়ে কয়েক বার গাড়ির জানালা খুলতে থাকেন।
এসময় গোয়েন্দা পুলিশের এক সহকারী কমিশনার জানালা খোলার কারণ জানতে চাইলে বাবর গলায় হাত দিয়ে বলেন, “আমার কাশির সমস্যা।” সে সময় সাংবাদিকরা গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে পুলিশ তাদের থামিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ জানালা খোলা রাখার পর বাবর নিজেই তা বন্ধ করে দেন।
বিএনপি-জামায়াত শাসনামলের দাপুটে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন লুৎফুজ্জামান বাবর, যাকে র‌্যাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও মনে করা হত। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে প্রায়ই বিভিন্ন মন্তব্যের কারণে সংবাদপত্রের শিরোনাম হতেন তিনি।
১৯৯৬ সালে বিএনপির রাজনীতি যোগ দেওয়ার পর থেকেই দ্রæত তার উত্থান হতে থাকে। খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত বাবর পরবর্তীতে নেত্রকোণা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন, স্থান করে নেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে। ২০০১ সালে আশ্চর্যজনকভাবে লুৎফজ্জামান বাবর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তার সময়ই ২০০৪ সালে চট্টগ্রামে ধরা পড়ে অবৈধ ১০ ট্রাক অস্ত্রের চোরাচালান। পরে এই অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে বাবরের সম্পৃক্ততা থাকার বিষয়টি মামলার শুনানি থেকে বেরিয়ে আসলে তাকে আসামি করা হয়। ওই ঘটনায় অস্ত্র চোরাচালানের মামলায় তাকে মৃত্যুদন্ড এবং অস্ত্র আইনে যাবজ্জীবন কারাদÐ দেওয়া হয়।