বিবর্তনে মানুষের মন মানসিকতার পরিবর্তন বদলে গেছে শিক্ষকতা পেশা

লিটন দাশগুপ্ত

16

এমন একটা সময় ছিল বিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করতো দেশের সবচাইতে মেধাবী, জ্ঞানী, সমাজসেবক, উচ্চশিক্ষিত, শিক্ষানুরাগী ইত্যাদি প্রকৃতির মানুষ। বিশেষ করে জমিদার শ্রেণির কিংবা রাজা মহারাজার সন্তানরা বিদ্যালয়ে যোগদান করতেন এমন তথ্যও রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সমাজ সেবার ব্রত নিয়ে, এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়ানো। বৃটিশ শাসন শেষ ও পাকিস্তান শুরুর দিকেও বিভিন্ন বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকের জীবন চরিত বিশ্লেষণ করলে দেখতে পায়, অনেকে সিভিল সার্ভিস ক্যাডারে বা এই জাতীয় সমমান পদে নিয়োগ পেয়েও তা প্রত্যাখ্যান করে ছুটে এসেছেন, অজপাড়া গ্রামের টিন কাঠ বাঁশ দিয়ে নির্মিত সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা দিতে। বিভিন্ন কারনে অকারণে অনেকগুলো বিদ্যালয়ে গিয়েছি। বৃটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত বেশকিছু পুরানো বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নামের তালিকা দেখেছি ও তথ্য নিয়েছি। সেখানে অধিকাংশ শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা রয়েছে তৎকালীন সময়ে ডবল মাস্টার্স ডিগ্রী এবং বিভিন্ন সম্পূরক ডিগ্রী। যে সময়ে নাকি ম্যাট্রিকুলেশন বা এন্ট্রাস পাশ করলে ফুলের মালা দিয়ে রাজপথ পরিভ্রমণ করা হত।
এই সময়ে এই সকল শিক্ষকের শিক্ষকতা পেশায় আসা এবং কর্মজীবনের খবর নিয়ে দেখেছি, তাদের অনেকের সামনে ছিল বড় বড় চাকুরীর হাতছানি। তাছাড়া ব্যক্তি হিসাবে সমাজে তাঁদের অবস্থান ছিল সুউচ্চ মর্যাদার আসনে। কিন্তু কেন যে সামান্য স্কুলের শিক্ষকতা পেশা গ্রহন করেছেন, তা উচ্চ মাত্রার গবেষণার প্রয়োজন পড়েনা, হাল্কা চিন্তা ভাবনা থেকে তথ্য উপাত্ত বেরিয়ে আসে। যেমন- সেই সময় উল্লেখিত শ্রেণির ব্যক্তিবর্গের মনোভাব ছিল, নিজের অর্থবিত্ত যশ খ্যাতির পরিবর্তে আদর্শ সমাজ বির্নিমাণ করা। তারা ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও শিক্ষার প্রতি আন্তরিক। ঐ সময় সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা ছিল আলাদা। সাধারণ মানুষ শিক্ষকদের পছন্দ করতেন, ভালোবাসতেন, শ্রদ্ধা করতেন। হাসির বিষয় হলেও বলতে হচ্ছে, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে শিক্ষক অ্যারিস্টোটলকে সেই সময়ের প্রভাবশালী রাজা বা স¤্রাট হারমিয়াসের বোন পিথিয়াস’কে বিয়ে করার জন্যে সম্রাট নিজেই প্রস্তাব দিয়েছিল, অনুরোধ করেছিল। আর এখনকার সময়ের সম্মানিত শিক্ষকগণ বিয়ের বাজারে বৌ পায়না। আরো বলতে গেলে বলতে হয়, আগেকার দিনে শিক্ষককেরা শিক্ষার্থীকে শাস্তি দিত, আর এখন শিক্ষার্থী শিক্ষককে শাস্তি দিচ্ছে; যা কলেজ ইউনির্ভাসিটিতে অহরহ দেখা যাচ্ছে।
আর এখন যারা শিক্ষকতায় আসে, তাদের একাংশের মধ্যে দেখা যায় হতাশাভাব। অধিকাংশক্ষেত্রে কোন চাকুরী না পেয়ে, চাকুরীজীবনের ‘এক্সপাইরি ডেট’ এর শেষপ্রান্তে এসে শিক্ষকতা পদে যোগদান করে! অনেকটা জীবন জীবিকার প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে শেষ আশ্রয়স্থল হিসাবে শিক্ষকতা পেশা গ্রহন করে। যা আমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু কেন এমন পরিবর্তন? কেন ভালো মেধাবী চাকুরী প্রত্যাশী বা প্রার্থীগণ শিক্ষকতা পেশায় আসেনা? কেন একালে এবং সেকালে এই দুকালে শিক্ষকতা বিষয়ে মানুষের মনোভাবে এত ভিন্নতা বা পরিবর্তন এল, এখন তা দেখার ও ভাবার সময় এসেছে।
সাধারণদৃষ্টিতে দুকালে শিক্ষকতা পেশায় ভিন্নতা বিষয় পর্যালোচনা করলে যা বুঝা যায় তা হচ্ছে, আগেকার সময়ে শিক্ষকদের কথা সমাজের সকলস্তরের মানুষ শুনতো, উপদেশ মেনে চলত। এখন অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে সমাজের নি¤œস্তরের মানুষের কঠিন কথা শুনতে হচ্ছে। আবার ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও রাজনৈতিক প্রভাব আগে ছিলনা, এখন রাজনীতি ছাড়া শিক্ষানীতি অচল। আগেকার সময়ে শিক্ষক ও কর্মকর্তার মধ্যে কোন ধরনের প্রশাসনিক খবরদারি ছিলনা. এখন শিক্ষক কর্মকর্তা মধ্যে অনেকটা চোর পুলিশ বা ইঁদুর বিড়ালের সম্পর্ক। আগেকার সময়ে শিক্ষক ছিল শিক্ষা বা জ্ঞান বিতরণকারী, এখনকার সময়ের শিক্ষক বিভিন্ন রেজিস্টার পরিচালনাকারী। আগে উত্তম ব্যক্তির শিক্ষক হবার প্রেষণা ছিল, সমাজে তাদের চাহিদাও ছিল বেশী, যে কেউ চাইলে শিক্ষকতা পেশায় আসতে পারতো না। এখন চাইলে যে কেউ শিক্ষক হতে পারে।
এই জাতীয় বহুবিধ কারণে দুইকালের শিক্ষকদের মধ্যে তুলনামূলক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। যার প্রেক্ষাপটে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। শিক্ষক শিক্ষার্থী মাঝে মূল উপাদান ‘শিক্ষা’ নিষ্পেষিত হচ্ছে। এখন কথা হচ্ছে কিভাবে এর থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে নেয়া যায়; এখন সময় এসেছে তা ভাবার।
এই বিষয়ে জটিল হলেও সহজভাবে বলা যায়, শিক্ষালয়ে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে বিসিএস (প্রশাসন) নিয়োগ পেয়েও তা বাদ দিয়ে প্রাইমারীতে যোগদান করে; শিক্ষার উদ্দেশ্যে নিজেকে উৎসর্গ করে। যেদিন এমন পরিবেশ সৃষ্টি হবে, সেদিন বুঝতে হবে, শিক্ষা সঠিক পথে চলছে। বিষয়টি অনেকের কাছে হাস্যকর ও অস্বাভাবিক মনে হলেও পূর্বেকার সময়ে এই ধরণের শতশত নজীর বা দৃষ্টান্ত ছিল, যা শুরুতে উল্লেখ করেছি। এখনো অনেক উন্নত বিশ্বে এমন অবস্থা দেখা যায়। তবে এটাও ঠিক বর্তমান সময়ে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা আদৌ সম্ভব নয়, বা সম্ভব কিনা তা গভীরভাবে ভাবার বা গবেষণার বিষয়। তারপরেও বলা যেতে পারে, কেবল বেতনভাতা নয়, বিভিন্নভাবে শিক্ষকের মানমর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যমে কিছুটা হলেও পরিবেশ পরিবর্তন করা যেতে পারে। যাতে করে চলমান শিক্ষা সংকট কিছুটা হলেও দুর হয়।