বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ উৎসব এ উদ্যোগ অব্যাহত থাক

5

খ্রিস্ট্রিয় বছরের প্রথম দিনে সারা দেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা মেতেছিল এক অন্য রকম উৎসবে। যার নাম বই উৎসব বা বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ উৎসব। বছরের প্রথমদিন বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে শিক্ষক বা অতিথিদের কাছ থেকে নতুন বই হাতে পেয়ে তারা মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিল। বইয়ের গন্ধ নাকে নিয়ে তারা বাড়ি ফিরেছিল। আমরা জানি বর্তমান সরকার দ্বিতীয় বারের মত ক্ষমতা গ্রহণ করে শিক্ষার উন্নয়ন, শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও ঝরেপড়া শিক্ষার্থী রোধ ঠেকাতে ২০১০ সাল থেকেই শুরু করে খ্রিস্ট্রিয় নববর্ষের প্রথম দিনে বিনামূল্যে বই বিতরণ কর্মসূচি। বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়ার মত কয়েককোটি শিক্ষার্থীদের হাতে একই দিনে বই বিতরণ কর্মসূচি সরকারের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করে। ফলে সরকার ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে আসছে বিনামূল্যে বই বিতরণের এই উৎসব। বছরের প্রথম দিনে স্কুলগামী শিশুদের জন্য এর চেয়ে বড় উপহার, বড় আনন্দের বিষয় আর কী হতে পারে! প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিশু-কিশোরই শরিক ছিল এই উৎসবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধান সাফল্যগুলোর একটি হচ্ছে সময়মতো শিশুদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চতুর্থবারের মত আবারও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। আমরা আশা করি, পাঠ্যপুস্তক বিতরণ উৎসবের এই ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ থাকবে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাই পরবর্তী সময়ে শিক্ষাজীবনের ভিত হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে, প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে বুনিয়াদি শিক্ষা যা দুর্বল হলে পরবর্তী শিক্ষাজীবন ভালো হওয়ার কোন সম্ভাবনা থাকে না। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করতে এসে আর্থিক দৈন্যতায় পড়ে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের বেশিদিন বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারে না, ফলে অল্পতেই অনেক শিক্ষার্থী জরেপড়ে। এ অবস্থায় সরকার বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার এ উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটি কাজ। প্রাইমারি স্কুলজীবনে নতুন বই হাতে পাওয়ার আনন্দ-অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই আছে। কিন্তু সে বই হাতে আসতে প্রায়ই অনেক সময় লেগে যেত। কখনো স্কুলে ক্লাস শুরু হয়ে যেত। অপেক্ষার সেই সময়গুলো কতটা অস্বস্তিতে কাটাতে হতো, তা-ও আমাদের অজানা নয়। আজকের শিক্ষার্থীরা সৌভাগ্যবান, বইয়ের জন্য তাদের অপেক্ষার প্রহর কাটাতে হয় না। অভিভাবকদেরও দুঃচিন্তায় পড়তে হয় না যে, তাদের সন্তানদের জন্য আদৌ নতুন বই কিনতে পারবেন কিনা? কিন্তু মনে রাখা চাই, শিশু শিক্ষার শক্ত ভিত তৈরির জন্য শুধু নতুন বই হাতে পাওয়াই যথেষ্ট নয়। আমরা জানি, সা¤প্রতিক বছরগুলোতে শিশুশিক্ষার মানোন্নয়নে অনেক কিছু করা হয়েছে। নতুন নতুন স্কুলভবন তৈরি করা হয়েছে। ক্লাসে ভালো আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতা বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষকরা যাতে পাঠদানে আরো উৎসাহী হন, সে জন্য তাঁদের বেতন-কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। তারপরও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মান নিয়ে বিশেষজ্ঞদের অনেক প্রশ্ন ও আক্ষেপ রয়েছে। বলা হচ্ছে শিক্ষার যে পরীক্ষা পদ্ধতি রয়েছে তা জিপিএ নির্ধারণে কার্যকর ভ‚মিকা রাখলেও মেধাবী এবং মননশীল নাগরিক সৃষ্টি করছে না। আমরা আশা করি, বর্তমার সরকার টানা তৃতীয়বারের মত ধারাবাহিক নতুন যে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে তারা শিক্ষার উন্নয়নে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা প্রদর্শন করবে। শিশুশিক্ষা যতবেশি আনন্দময় হবে, ততবেশি সাফল্য ধরা দেবে সারা দুনিয়ায় এটিই স্বীকৃত। কিন্তু আমাদের শিশুরা যেন সেই শিক্ষা থেকে অনেকটা দূরেই রয়ে গেছে। অনেক স্কুলেই মাঠ নেই, যেগুলোতে মাঠ আছে সেগুলোতেও খেলার উপকরণ নেই, নয়তো সুযোগ থাকে না। বইয়ের বোঝা, কোচিংয়ের শৃঙ্খল শিশুদের মনের আনন্দ অনেকটাই কেড়ে নিচ্ছে। শৈশবেই শিক্ষা হয়ে ওঠে ভীতিকর এক প্রস্তুতি। এ থেকে শিশুদের মুক্ত করতে হবে। তাদের জন্য আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করতে হবে।