বিদ্যালয়ে এসএমসি সদস্যদের ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান জরুরী

লিটন দাশ গুপ্ত

14

স্কুল ম্যানেজিং কমিটি বা স্কুল গভর্নিং বডি যে নামেই বলা হোক না কেন, একই নীতিমালার উপর ভিত্তি করে, একই কার্যপরিধির নিমিত্তে প্রতিটি বিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম যথাযথ পরিচালনার জন্যে, একটি করে কমিটি গঠন করা হয়।
বিদ্যালয় একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। সমাজের সাথে বিদ্যালয়কে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করতে, সরকার প্রদত্ত প্রজ্ঞাপিত নীতিমালা অনুযায়ী, বিভিন্ন ক্যাটাগরীতে ১১জন সদস্য নিয়ে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা হয়। যা সরকারি বেসরকারি সকল ধরণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ধরণের কমিটি গঠন করার কথা বলা আছে। এখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রায় একই ধরণের কমিটি গঠন করা হলেও বিভিন্নক্ষেত্রে, বিশেষ করে কার্যক্ষেত্রে দুই স্তরের বিদ্যালয়ে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। আলোচনা করবো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি বা এসএমসি বিষয় নিয়ে।
আমরা জানি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সুষ্ঠু সুন্দর সুচারুভাবে পরিচালনার জন্যে, প্রত্যেক বিদ্যালয়ে একটি করে পরিচালনা পরিষদ রয়েছে। যা সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত বিভিন্ন নির্দেশনা বা নীতিমালা অনুসরণ করে এই কমিটি গঠিত হয়। গঠন পদ্ধতি অনুসারে কমিটিতে বিভিন্ন ক্যাটাগরীতে অন্তর্ভুক্ত করতে হয় ১১ জন সদস্য যা আগেই বলেছি। আর এই ১১ জন সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটির মধ্যে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদাধিকার বলে নির্বাচিত হন সদস্য সচিব;
ক্যাচমেন্ট এড়িয়া থেকে নির্বাচিত হয় একজন পুরুষ ও একজন মহিলা শিক্ষানুরাগী, যা স্থানীয় সংসদ সদস্য কর্তৃক মনোনীত;
বিদ্যালয়ের জমিদাতা, জমিদাতার অবর্তমানে তাঁর আইনগত উত্তরসুরী;
ভোটের মাধ্যমে দুই জন পুরুষ ও দুই জন মহিলা অভিভাবক সদস্য;
একজন নিকটতম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক;
সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের একজন সহকারি শিক্ষক;
ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার বা পৌর ওয়ার্ড কাউন্সিলর।
বর্তমানে ৩ বছর মেয়াদী এই কমিটি, অনুমোদন হবার পর, অনুমোদিত কমিটির উপর সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য অর্পণ করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা, স্থানীয়ভাবে স্থাবর অস্থাবর সম্পদ সংগ্রহ সংরক্ষণ ও ব্যবহার, বিদ্যালয়ের ভৌত অভৌত অবকাঠামো নির্মাণ বা সংস্কারে তদারকি, বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা আয়োজন, বিদ্যালয় ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, স্থানীয়দের থেকে বিভিন্ন ধরণের তহবিল সংগ্রহ, বিদ্যালয় গমনোপযোগী শিশুদের জরীপ, শিখন শেখানো সামগ্রী তৈরী ও সংগ্রহ, প্রধানশিক্ষকের সাথে যৌথ ব্যাংক একাউন্ট পরিচালনা, দুর্যোগ চলাকালীন সময়ে স্কুল কার্যক্রম অব্যাহত রাখা, শিশু ভর্তি ও শিক্ষার্থী উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ, শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি পরিবীক্ষণ, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিল ভাউচার ও শিক্ষকদের বেতন ভাতা সম্পর্কিত কাগজপত্রে স্বাক্ষর, সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম, বিভিন্ন জাতীয় দিবসসমূহ পালনসহ ইত্যাদি কার্যক্রম। এই ছাড়াও আছে বিভিন্ন সময়ে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার কথা।
সাধারণত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করে সমাজের নিম্ন শ্রেণি থেকে আসা শিশু গুলো। এদের অধিকাংশ কুলি মজুর কামার কুমার জেলে প্রান্তিক চাষী বিভিন্ন শ্রমিক শ্রেণির মানুষের ছেলে মেয়ে। এখানে সবাই সমান মানুষ, আমি কাউকে ছোট করছি না। প্রেক্ষাপট বুঝানোর জন্যে বিষয়টি বলছি।
প্রতি এলাকায় প্রায় ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে সব মাতাপিতা, সন্তানের জন্যে প্রতি মাসে ২০০ টাকা ব্যয় করার মত সামর্থ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়, তারা ছেলে মেয়েকে পার্শ্ববর্তী কিন্ডার গার্টেনে নিয়ে ভর্তি করিয়ে দেয়। এখন কি শহর কি গ্রাম, গজে উঠেছে ব্যাঙের ছাতার মত কিন্ডার গার্টেন! আর উল্লেখিত নিম্ন শ্রেণি পেশার সন্তান, যারা সামর্থ্যহীন অসচেতন, তাদের সন্তান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। তাদের অভিভাবকরা বিভিন্ন উপায়ে নির্বাচিত হয় এসএমসি’র অভিভাবক সদস্য হিসাবে। যার প্রেক্ষাপটে এরা সরকারি নীতিমালা তোয়াক্কা না করে ইচ্ছামত প্রভাব সৃষ্টির চেষ্টা করে থাকে।
নির্বাচিত এই সকল সদস্য তাদের অন্যায় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তৎপর থাকে। তাদের কথা মত চলতে প্রধান শিক্ষককে বাধ্য করে। এই সকল কর্তার (!) ইচ্ছা অনুযায়ী কর্ম না হলে, শিক্ষকদের অপমান করে, এমনকি লাঞ্চিত করে। যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষকদের উপর ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহ প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
অন্যদিকে অভিভাবক সদস্য ছাড়াও বিদ্যোৎসাহী সদস্য এবং জনপ্রতিনিধি সদস্য, তারাও সমাজে জনপ্রিয়তার জন্যে, নিয়ম বহির্ভূত কাজ করতে প্রধানশিক্ষককে বাধ্য করে, চাপ সৃষ্টি করে। যেমন- নীতিমালা অগ্রাহ্য করে উপবৃত্তি প্রদানের চাপ, একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হবার সত্তে¡ও পরবর্তী বা উচ্চ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করে দেয়ার চাপ, স্লিপ পরিকল্পনা বাইরেও কাজ করার চাপ ইত্যাদি ছাড়াও তাদের থেকে আসে আরো বহুমুখী চাপ।
এই সব চাপের কারণে বিদ্যালয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম যেমন ব্যাহত হয়, অন্যদিকে মানসম্মত শিক্ষা অর্জনে প্রতিব›ধকতা সৃষ্টি হয়। যদিও সব বিদ্যালয়ে একই রকম চিত্র নেই। তবে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে এই রকম সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। আর এই সমস্যা থেকে উত্তরণের এক মাত্র পথ হচ্ছে এসএমসি’র নির্বাচিত সদস্যদের আচার আচরণ, নীতিমালা, নিয়ম কানুন, শিক্ষকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন বিষয়ক ইত্যাদি সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ প্রদান। কিংবা আলোচনা সভা, প্রেষণা ভিত্তিক সেমিনার, কর্মশালার মত মতবিনিময় সভার ব্যবস্থা করা যেতে পারে যদি তা ফলপ্রসু হয়।
এখানে সদস্য বা প্রশিক্ষণার্থীদের জন্যে উপযুক্ত সম্মানী বা প্রশিক্ষণ ভাতাসহ তিন চার দিন ব্যাপী প্রশিক্ষণ বা প্রশিক্ষণ অনুরূপ অন্যকোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী। প্রাথমিক শিক্ষা খাতে সরকার বিভিন্ন ভাবে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে।
যা প্রত্যক্ষ অলাভজনক বিনিয়োগ কিন্তু পরোক্ষ ফল সুদূরপ্রসারী। তাই এই বিষয়ে আমার আবেদন থাকবে, এসএমসি গঠনের দুই মাসের মধ্যে এই জাতীয় প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্যে। আর এতে করে পুরো ৩ বছর সফলভাবে এসএমসি’র মেয়াদ সম্পন্ন করতে সমর্থ হবে। একই সাথে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনে নব নির্বাচিত সকল সদস্যগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।