বিজয়ের মাসে আমার কিছু কথা

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের তথ্য মতে, বর্তমানে ঝুকিপূর্ণ এ পেশায় বাংলাদেশে কাজ করছেন প্রায় ৩৭ লাখ শ্রমিক। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হওয়া বেশির ভাগ নির্মাণশ্রমিকের কাজের সময়ে থাকে না হেলমেট। গামবুট, বেল্টসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা। মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয় তাদের। সড়কের পাশে নির্মাণাধীন ভবনেও নেয়া হয় না পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা। ফলে সেখান থেকে নির্মাণসামগ্রী পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পথচারীরাও। কিন্তু কেউই পাচ্ছেন না ক্ষতিপূরণ।

কাজি রশিদ উদ্দিন

19

এটি বিজয়ের মাস। পাকিস্তানের অত্যাচার, অবিচারের দিনগুলো থেকে বেরিয়ে এসে আমরা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম দেই। তাই এ সম্বন্ধে সামান্য কিছু কথা বলে পরে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাবো। আমাদের মহান নেতা বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ও অবদানের কথা না বলে বা উল্লেখ না করে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা কল্পনাই করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার দাবির ভিত্তিতেই এবং তার ভিত্তিতে নির্বাচনে শতকরা ৯৫ ভাগ ভোট পেয়েই আমাদের স্বাধীনতা দাবি ও ভিত্তির ম্যান্ডেট রচিত হয়। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব ইংরেজিতে অর্থাৎ অস্ত্রের ভাষায় ৬ দফা দাবির বিরুদ্ধে জওয়াব দিবার হুংকারে কোনও কাজ হয়নি। তাই আজ গভীর শ্রদ্ধাভরে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করছি। গভীর দুঃখের সাথে আজ আমাকে বলতে হচ্ছে আমাদের পবিত্র ধর্ম ইসলামের নামে পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনী আমাদের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ৩০ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যার ও লক্ষ লক্ষ মা বোনের ইজ্জত নষ্ট করে।
এ প্রসঙ্গে আমাদের পরিবারের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষুদ্র অবদানের কথা আজ তুলে ধরতে চাই। যদিও নিজের পরিবারের সংগ্রামের ঢাকঢোল পেটানোর ইচ্ছা কোনও কালেই আমার ছিল না। আমাদের পরিবার সরকারিভাবে একটি শহীদ পরিবার। আমার ছোট ভাই নাম কাজি শহিদ উদ্দিন। চট্টগ্রাম রেলওয়ের একজন কর্মচারি ছিলেন। সে স্বাধীনতা সংগ্রামের গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং ১৯৭১ সালে ৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম রাস্তা থেকে পাকবাহিনী তাকে ধরে নিয়ে যায় ও অমানুষিকভাবে হত্যা করে। সেই থেকে সে আর ফিরে আসে নাই এবং আমরা আর তার মৃতদেহটিও খুঁজে পাই নাই। পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালের প্রথমদিকে আমাকেও পাকবাহিনী ‘মুক্তিবাহিনী’ বলে ধরে নিয়ে যায় এবং কালুরঘাটে নিয়ে গুলি করার কথা বলে। তবে আল্লাহর ইচ্ছায় কিছুক্ষণের পরেই আমাকে ছেড়ে দেয় এবং তাই মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাই। ইতিমধ্যে রেলওয়ের কাছ থেকে লিখিতভাবে জেনে বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন আমার পরিবারকে দুই হাজার টাকার একটি চেক পাঠায় শহীদ পরিবার হিসাবে। সেই থেকে চট্টগ্রাম কমিশনার অফিসে রক্ষিত রেকর্ডে আমরা শহীদ পরিবার হিসাবে সরকারিভাবে গণ্য হতে থাকি। যাক নিজ ব্যক্তিগত অনেক কথা বলে ফেললাম একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আমার আবেগের বশবর্তি হয়ে পরবর্তী আমার বন্ধু হাশেম চৌধুরীর সাহায্যে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাক সেনাদের বিচারের দাবিতে আমি চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে একটি সভা করি। এ সম্বন্ধে আরও অনেক কথা থাকলেও স্থানাভাবে তা উল্লেখ করা গেল না। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে পাক বাহিনীর হাতে ৩০ লক্ষ লোকের হত্যা এবং সেই হত্যার আমাদের পরিবারের একজনের (আমার ছোট ভাই) এর জীবন দান (হত্যা) করায় আমাদের পরিবার গর্বিত। মুষ্টিমেয় কিছুলোক কেন সে পাকিস্তানের পক্ষে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধীতা করেছিল তা আজও আমার বুঝে আসেনা। যা হোক পরবর্তীকালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পূর্ণ তদন্ত করে আমাদের পরিবারকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবার হিসাবে গণ্য করে আমাদের সনদপত্র দেয়। বিজয়ের মাসে এটুকু কথা বলেই আমি অন্য প্রসঙ্গে চলে যাই।
মানব সভ্যতায় শ্রমিকদের অবদান
আমার মনে হয় মানবসভ্যতা মূলত শ্রমিকের কায়িক পরিশ্রম অর্থাৎ শ্রম-ঘামের ইতিহাস। তারাই গড়ে তুলেছেন সব সভ্যতা। এখানে অভিজাত্যদের কতটুকু অবদান আছে। তার প্রশ্ন থেকে যায়। তারা শুধু সুবিধাভোগী শ্রেণি। আর সভ্যতার মানেই শ্রমিকের পাথরচাপা জীবনের শোকগাথা, সুদূর অতীত থেকে বর্তমান সময়েও একই চিত্র বিদ্যমান। সভ্যতা বিনির্মাণে সেকালে ‘দাস’ আর একালে ‘শ্রমিক’ সমার্থক পরিণতিও একই। আমাদের দেশে নানা দুর্ঘটনা আর মৃত্যুর মিছিল এবং নানা অঘটনে বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। দায়িত্বশীল সবার ভাবখানা এমন, চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া যেন কারো কিছু করার নেই।
যেমন চলছে, তেমনি চলবে। এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে মনে হয়, এদেশের মানুষের জীবন সত্যিই মূল্যহীন। কঠিন অভিজ্ঞতায় সাধারণের মনে হতাশার সাথে এক বিশ্বাসও জন্মেছে কোনো ধরনের দুর্ঘটনার কারণ শনাক্ত করে তা দূর করার পদক্ষেপ নেয়া কখনই হয়তো সম্ভব হবে না। দুর্ঘটনা ঘটলে প্রথামাফিক সংবাদপত্রে নতুন উদ্দীপনায় প্রতিবেদন আর কলাম ছাপা হবে । টিভি চ্যানেলগুলো এ বিষয়ে টকশো প্রচার করবে। বিশেষজ্ঞরা মতামত দিতে থাকবেন। তবে তা আমলে নেয়ার কোনো কর্তৃপক্ষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। সরকার সৎউদ্দেশ্যে আইন করলেও তা কেউ মানতে চাইবে না। এটিই এখন দেশের স্বাভাবিক চালচিত্র।
দেশের সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের মতো নির্মাণ শ্রমিক যারা, তাদের জীবন অতি তুচ্চ, মূল্যহীন। খেটে খাওয়া মানুষেরা কে কিভাবে মারা গেলেন তাতে কারো কিছু যেন আসে যায় না। স্থাপত্য শিল্পে শ্রমজীবীদের জীবন এতই মূল্যহীন যে, যা ভাবা যায় না। মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে শ্রমিকের অবদান থাকু না কেন, জীবন বর্নহীন। তাদের কান্না পাথর চাপা পড়াই যেন নিয়তি। অথচ পৃথিবীর তাবৎ স্থাপত্য শিল্পের অন্যতম ‘কাচামাল’ শ্রমিকের শ্রম ঘাম। ইতিহাস সেই সাক্ষ্যই দেয়।
অতি বিস্ময়কর পিরামিডের কথাই ধরা যাক। পৃথবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি মিসরের পিরামিড, ফেরাউন বংশের শাসনামলে এসব পিরামিড নির্মিত হয়েছিল। আধুনিক স্থাপত্যকলার স্থপতিদের কাছে পিরামিডের নির্মাণশৈলী আজো রহস্যাবৃত। পিরামিড প্রযুক্তি এখনো এক রহস্য। কিভাবে, কোন কৌশলে এত উচুতে দানবাকৃতির এক একটি পাথর তোলা হতো, তা বড় প্রশ্ন, ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, পিরামিড নির্মাণে নির্মাণ শ্রমিক ছিল বনি ইসরাইল, তারা ছিল দাস পিরামিড নির্মাণকালে বিরাট বিরাট পাথর ওপরে তোলার সময় চাপা পড়ে জীবন গেছে হাজার হাজার অসহায় বনি ইসরাইলের। তাদের সেই করুণ ইতিহাস অনেকের অজানা। পিরামিডের সৌন্দর্য দেখে দেখে পর্যটক মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
চেয়ে চেয়ে দেখে অপলক নয়নে। সুদূর অতীতের দাস থেকে সমকালীন নির্মাণ শ্রমিকের জীবনের ভেদরেখা টানা সত্যিই কষ্টসাধ্য। তখনো তাদের জীবনে ছিল না কোনো বাকবদল। এখনো একই রকম। কোনো হেরফের নেই। তখনো তাদের জীবনের কোনো মূল্য ছিল না। একালেও নেই, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থা বড়ই করুণ। রাজধানী জুড়ে অন্যান্য বড় বড় শহরে অট্টালিকার পর অট্টালিকা। এসব সুরম্য অট্টালিকায় বসবাস করছেন লাখ লাখ মানুষ। যারা এই ইমারত গড়ে তুলছেন, সেই নির্মাণ শ্রমিকদের জীবন কতটুকু নিরাপদ ? পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি মারা যাচ্ছেন নির্মাণ শ্রমিক। ভবন থেকে পড়ে বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এ বছর ১৪৮ জন নির্মাণশ্রমিক মারা গেছেন। নিহত শ্রমিকদের কতজনের পরিবার ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে ; সে সংখ্যাও একেবারে নগন্য। সরকার আন্তরিক কিন্তু আইনের প্রয়োগ না থাকায় মূল্যহীন হয়ে পড়েছে তাদের জীবন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিআইএলএস) নির্বাহী পরিচালক জাফরুল হাসানের ভাষায়। আমরা শুধু পত্রিকার কাটিং থেকে তথ্য সংগ্রহ করি। সেখানে এ বছর মৃত্যুর সংখ্যা পেয়েছি ১৪৮ জন। কিন্তু বাস্তব চিত্র আরো বেশি। ২০০২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে নিহত হয়েছেন এক হাজার ৬৭৭ জন নির্মাণশ্রমিক। আমরা এ তালিকা তৈরির পর শ্রমিক নেতা ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে জমা দেই ; যাতে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক তার ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পান। (ইত্তেফাক ২৫ নভেম্বর ২০১৯)। তবে শ্রমিকরা অনেক সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা না নিয়েও বহুতল ভবনের ওপরে কাজ করছেন। তার তদারকির কাজে যারা নিয়োজিত, তারা এগুলো দেখেও না দেখার ভান করেন। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হলো আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়া। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, নির্মাণাধীন বেশির ভাগ ভবনে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয় না।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের তথ্য মতে, বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ এ পেশায় বাংলাদেশে কাজ করছেন প্রায় ৩৭ লাখ শ্রমিক। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হওয়া বেশির ভাগ নির্মাণশ্রমিকের কাজের সময়ে থাকে না হেলমেট। গামবুট, বেল্টসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা। মারাত্মক ঝুকি নিয়ে কাজ করতে হয় তাদের। সড়কের পাশে নির্মাণাধীন ভবনেও নেয়া হয় না পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা। ফলে সেখান থেকে নির্মাণসামগ্রী পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পথচারীরাও। কিন্তু কেউই পাচ্ছেন না ক্ষতিপূরণ।
ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ সূত্র জানা যায়, ‘ক্ষতিপূরণ খুব বেশি মানুষ পাচ্ছে না। যারাও বা পাচ্ছেন, অর্থের পরিমাণ খুবই কম। বহু শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ থাকে অজানা। তা হলে তারা কিভাবে ক্ষতিপূরণ পাবেন? আসলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে ভবন নির্মাণের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। শ্রমিকের সচেতন করার কাজও চালিয়ে যেতে হবে। তবে বেশির ভাগ শ্রমিকের মৃত্যুর খবর জানাই যায় না।, সরকার আইনে কড়াকড়ি করলে মালিকরা সচেতন হতেন।
স্থাপত্য শিল্পের সাথে জড়িত বেশির ভাগেরই অভিমত। আইন করে তা মেনে না চলায় ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা ঘটছে। কঠোর ভাবে আইন প্রয়োগ না করা হলে এসব দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। দেশের সার্বিক উন্নয়ন সবার প্রত্যাশা তবে নির্মাণ শ্রমিকদের মানবাধিকার সংরক্ষণে উদ্যোগ নিতে হবে। কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে আইন। তখনই সম্ভভ নির্মাণ শ্রমিকদের জীবনের উপযুক্ত মূল্যায়ন।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট