বিজ্ঞানের যুক্তি না বুঝলে আমাদের সামনে ঘোর অন্ধকার

18

জামাল উদ্দিন

করোনা আমাদেরকে এক ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে। এর থেকে কারো বাঁচার পথ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। করোনা সংক্রমিত হলে তো কথাই নেই, অন্য অসুখেও এখন হাসপাতালে ভর্তি হতে ‘মামার’ জোর দরকার। তবে কি হাসপাতালও এখন গন্ডগোলের রোগীর হ্যাপা এড়াতে চাইছে? এ কি বিজ্ঞানের যুক্তি? না ব্যবসার?
মৃতদেহ যে হাঁচেও না কাশেও না, যাকে চাদরে মুড়ে পোড়ালে সংক্রমণের সম্ভাবনা নেই, তাকেও দাফনে বা সৎকারে বাধা দেওয়া হয়েছে, ফলত, তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কোন এক অচেনা মাঠে। সেখানেও ভিড় করে আসছেন স্থানীয় অধিবাসীরা। এই যে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এত লোক জড় হচ্ছেন, তাও খুব আশ্চর্যের। নেপথ্যে যে কোনও পাকা মাথার খেলা নেই, তাও বলা যাবে না। এই প্রতিবাদী জনগণের একটি কমিউনিটি কিচেন চালাবার উদ্যোগ নেই, এইসব অন্ধতা-অযুক্তি-কুসংস্কারের প্রচারে উদ্যম প্রচুর। করোনা আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিটি আমার এবং আপনারই স্বজন। ওনার প্রতি নির্দয় হবেন না। এই ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার পেছনে তার কোন হাত নেই। তারপরও
এক-একজন করোনা আক্রান্তকে প্রায় গ্রেফতার করবার ভঙ্গিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, এমনই অবস্থা দেখে প্রতিবেশীদেও মনে ভীতির সঞ্চার হচ্ছে। তাঁর বাড়ি ছাড়ার পর, পরিবার-পরিজনকেও বাড়িছাড়া করতে তৎপর প্রতিবেশীরা! বাড়িছাড়া করার ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদেরও। এই দৃশ্যগুলো দেখিয়ে দেয়, অদ্ভুত এক সময় এসেছে। যুক্তি নেই, বিজ্ঞান নেই, তলিয়ে ভাবা নেই, কাÐজ্ঞান শিকেয়, ‘জ্ঞানী’ বাঙালি মধ্যবিত্ত অযুক্তি-অন্ধতা-অবিজ্ঞানের তালে তা তা থৈ থৈ করে চলেছে। তাদের মুখের ঝাল খাচ্ছে বিপুল নিম্নবিত্ত শ্রেণি। আমাদের দেশে এক শ্রেণীর মুর্খ কাঠমোল্লা করোনা নির্মূলে ধর্মের নামে মিথ্যে বয়ান দিয়ে যা করছে, তা যে কোনও ব্যঙ্গচিত্রকে হার মানাবে! তারা বলছে মুসলমান করোনা আক্রান্ত হবে না বলে নানা সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে যাচ্ছে। এছাড়া হাতুড়ে ডাক্তাররা বেসজ ঔষধ গুলঞ্চ-অশ্বগন্ধার খোঁজে তোলপাড় করছে লকডাউনের দেশ। এইসব খেলে নাকি ইমিউনিটি বাড়বে! খরখরে রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে থাকলে হাতে পায়ে লেগে থাকা ভাইরাস মারা যাবে, ইমিউনিটি বাড়বে! জানালা খুলতেও ভয়, এই বুঝি করোনা ঢুকে পড়ে! হোয়াটসঅ্যাপ আর ফেসবুক হয়ে উঠেছে কুসংস্কার-কুযুক্তি আর অবিজ্ঞান প্রচারের মাধ্যম। অকারণে উত্তেজনা ছড়ানোর যন্ত্র। অমুক পাড়ায় করোনা আক্রান্ত পাওয়া গিয়েছে, কি অমুক দোকানের কর্মচারির করোনা সংক্রমণ? সত্যি-মিথ্যে জানার দরকার নেই, চলো এই মুহূর্তেই দিকে-দিকে ছড়িয়ে দাও এই বার্তা। দুশ্চিন্তা-ভয় ছড়ানো ছাড়া আর কিছু কি হবে এতে? ওই রোগী বা সমাজের কোনও উপকার? না। তবু ছড়াতেই হবে। কী যেন এক ধর্ষকামী মানসিকতায় পেয়ে বসেছে এঁদের!
বাজারে ভিড়ের ছবি দেখে মহাচিন্তায় আমরা, দেশের যে কী হবে! অথচ একবারও ভেবে দেখলেন না, এইমাত্র যাঁর থেকে তিনি সব্জি কি মাছ কিনলেন, সেই বিক্রেতা যে আড়ত বা পাইকারি বাজার থেকে তা কিনে এনেছেন সেখানে কেমন ভিড়! স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা যা স্পষ্ট জানালেন, মৃতদেহ কাপড়ের ব্যাগে ভরে যদি দাফন করা কিংবা পোড়ানো হয়, তার থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা শূন্য।
অযুক্তি-কুযুক্তি-অবিজ্ঞান-কুসংস্কারের প্রবাহ রুখতে নিয়মিত বিজ্ঞানের স্বচ্ছ যুক্তি প্রচার করার দরকার। লাগাতার, বার বার। তবেই সচেতনতা বাড়ে মানুষের। তার বদলে শুরু হয়ে গেল ধানকাটা, ছবি তোলার মহৌৎসব। জননেতা কুশলী নটের মতো মুখে ঠিকঠাক আলো মেখে, ক্যামেরার সামনে রেওয়াজ করা অভিনেতার মতো দাঁড়ালেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়ে গেল লকডাউনের মাহাত্ম্য। জননেতার মাহাত্ম্য প্রচার। এই অযুক্তি-কুযুক্তির প্রবাহকে বাধা দেওয়ার কোনও প্রয়াস ঘটেনি। সচেতনতা বাড়ানোর কিছু বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়েছে মাত্র। প্রতিটি মহল্লায়, প্রতি বাড়িতে জনপ্রতিনিধিরা যে যুক্তিবাহী বিজ্ঞান-বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দরকার ছিল এবং এখনও রয়েছে, তার ক্ষুদ্র ভগ্নাংশও হল না। বস্তুত, এলাকায় চোখেই পড়ে না এসব জনপ্রতিনিধিদের।
এ কথা এখনও কেউ স্পষ্ট করে বলছে না, আমাদের করোনা নিয়েই থাকতে হবে আগামী বেশ কিছুদিন। স্বাস্থ্যকর্মী-স্বেচ্ছাসেবকদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে প্রচার করা দরকার, হাতেকলমে শিখিয়ে ফেরা দরকার গুটিকয়েক কথা যা এখন থেকে হবে আমাদের জীবন-যাপনের অঙ্গ। চিকিৎসকরা সোজাসাপ্টা জানালেন প্রতিদিন কারণে-অকারণে দশ-পনেরো বার হাত ধোওয়া উচিত। বাইরে গেলে, জামাকাপড়ের মতোই, মাস্ক অবশ্যই পরতে হবে। বাড়িতে অতিথি এলে কোনও নির্দিষ্ট একটি খোলামেলা ঘরে তাঁর সঙ্গে কথা বলা, এবং তা যেন যতটা সম্ভব কম হয় তা দেখা দরকার। অফিসে সেন্ট্রাল এসি’র মধ্যে কাজ করায় ঝুঁকি আছে, তার বদলে অন্য কোনও ব্যবস্থা ভাবা দরকার। কর্মচারিদের কারোর সর্দি লাগলে, অবিলম্বে তাঁকে ক’দিন ছুটিতে পাঠিয়ে গতিক বোঝা প্রয়োজন। এ ছাড়া নিয়মিত ব্যায়াম করা, ঘুম, চিন্তামুক্ত থাকার জানাচেনা কথাগুলো তো রয়েছেই।
করোনা ভ্যাকসিন কবে বেরুবে, কবে সবাই পাবে তা নিয়ে চিন্তা করার জন্য বিজ্ঞানীরা আছেন, তারা চিন্তা করছেন। প্রাণযাত্রা অব্যাহত রাখতে আমাদের করোনা নিয়ে চলার স্বাস্থ্যবিধি দ্রæত আয়ত্ত করে নেওয়া দরকার। এ কথা মনে রাখা দরকার, ভ্যাকসিন কার্যকর হলেও প্লেগ নিয়ন্ত্রণ ভ্যাকসিনের জন্য হয়নি। হয়েছে ডিডিটি’র ব্যাপক ব্যবহারে র‌্যাট ফ্লি বিনাশ করে, ইঁদুর মেরে ও ঘরবাড়ি ইঁদুরমুক্ত করে।
মধ্যযুগ নাকি খুব অন্ধকার সময়। শিল্প-সংস্কৃতি-বিজ্ঞান সব দিক দিয়েই। এই সময়ে যখন বিজ্ঞান তুঙ্গ স্পর্শ করেছে, বিজ্ঞানের যুক্তি এড়িয়ে যারা অবিজ্ঞান-অন্ধতা-অযুক্তিকে, মধ্যযুগের অন্ধকার সময়কে, হাততালি দিয়ে স্বাগত জানিয়ে, মোমবাতি জ্বালিয়ে পথ করে দিচ্ছে, তারা আর যাই হোক মানুষের বন্ধু হতে পারে না। এরা যেন মানুষকে সেই বলির পাঁঠা বানাতে চাইছে, যে পাশের বন্ধুটির মুÐ ছিন্ন হতে দেখেও দূরে পালানোর চেষ্টা করে না, নিশ্চিন্তে কাঁঠাল পাতা চিবোয় এই বিশ্বাসে যে, প্রভুর দেওয়া কাঁঠাল পাতাই আমায় বাঁচাবে। বিজ্ঞানের যুক্তি না বুঝলে আমাদের সামনে ঘোর অন্ধকার। এবং সেই অন্ধকার কাটানো কারো সাধ্য নেই।
লেখক : গবেষক ও প্রকাশক