বিজিবি-বিএসএফ-এর সীমান্ত সন্মেলন সীমান্তে নিষ্ঠুর হত্যা বন্ধে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে হবে

10

গত বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকার পিলখানায় বিজিবি সদর দপ্তরের সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা ও মাদক পাচার বন্ধসহ বেশকিছু এজেন্ডা নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ সম্মেলন শুরু হয়েছে। গতকাল সম্মেলনের যৌথ আলোচনার দলিল স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সীমান্ত সম্মেলন শেষ হয়েছে। যেমনটি আশা করা হয়েছিল, সম্মেলনে এবারও সীমান্তে হত্যার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে এবং যুগান্তকালী বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সিদ্ধান্তগুলো যথাযথ কার্যকর হলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত একটি আইডল সীমান্তে রূপপরিগ্রহ করবে, একইসাথে দুইদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতায় পৌঁছবে। গৃহীত ১৪টি সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমান্ত হত্যা ও অপরাধ বন্ধে নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে, ‘সীমান্তে উভয় দেশের নিরস্ত্র নাগরিক হত্যা/আহত বা মারধরের ঘটনা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তবর্তী এলাকায় যৌথ টহল বাড়ানো, জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি আরো বেগবান করা এবং প্রয়েজনীয় আর্থ-সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণসহ সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছেন।
সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণের পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় নাগরিকদের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমানা আইনের বিধি-বিধান সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সীমান্তে আক্রমণ-হামলার ঘটনাও শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছেন।
সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (সিবিএমপি) বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনের লক্ষ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। উভয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী উপকৃত হবে এমন তাৎক্ষণিক ও দরকারি তথ্য বিশেষ করে অধিকতর তদন্তের জন্য আগ্নেয়াস্ত্র চোরাকারবারিদের ডিজিটাল ফটোগ্রাফ পরস্পরের মধ্যে শেয়ার করতে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছেন’।
বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, প্রতি বছর দুই দেশের সীমান্ত সম্মেলনে হত্যার বিষয়টি আলোচিত হলেও কার্যকর কোনো ভ‚মিকা দেখা যায় না। সীমান্তে সংযত আচরণে ভারতের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশিদের নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেই চলেছে। যুদ্ধাব¯’া ছাড়া বন্ধুভাবাপন্ন দুই দেশের সীমান্তে এ রকম প্রাণহানি অস্বাভাবিক, অমানবিক। গত এক দশকের মধ্যে কেবল ২০১৮ সালে সীমান্তে হত্যার ঘটনা দুই অঙ্কের নিচে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছিল। ওই বছর সরকারি হিসাবে তিনজন হত্যার শিকার হন। ওই সময়ে সীমান্তের পরিবেশও ছিল স্বস্থিদায়ক। অথচ পরের বছরই তা এক লাফে ১৩ গুণ বেড়ে যায়। চলতি বছরও হত্যার ঘটনা কম নয়। অথচ বিভিন্ন সময় ভারতীয় শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার নীতিতে কাজ করা হবে। সীমান্ত হত্যা রোধে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফের হাতে প্রাণঘাতী অস্ত্র দেয়া হবে না বলেও প্রতিশ্রæতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নেই। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনে যুক্তি দেখানো হয় যে, বিএসএফ সদস্যরা সাধারণ নাগরিকের ওপর গুলি ছোড়ে না, অস্ত্রধারী চোরাকারবারিরা দলবেঁধে জোয়ানদের ওপর আক্রমণ করে, তখন তারা আত্মরক্ষার্থে গুলিবর্ষণে বাধ্য হয়। কিন্তু এ যুক্তি ধোপে টেকে না। যারা হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকে চোরাচালানি তা ঠিক কিন্তু তারা সশস্ত্র আক্রমণকারী, তার প্রমাণ নেই। আর সীমান্ত এলাকায় চোরাকারবার নিয়ে সীমান্তের উভয় পাড়েই রয়েছে অসাধু বাণিজ্যের বিস্তার। কিন্তু প্রতিটি ঘটনাতেই নিরস্ত্র বাংলাদেশিরা শুধু নিহত হচ্ছেন। দু’দেশের মধ্যে সমঝোতা এবং এ সম্পর্কিত চুক্তি অনুযায়ী যদি কোনো দেশের নাগরিক অননুমোদিতভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে, তবে তা অনুপ্রবেশ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কথা এবং সেই অনুযায়ী ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের নিয়ম। গুলি করে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করা কেন? যেখানে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, মানুষ পাচার এবং চোরাচালান বন্ধে যৌথ উদ্যোগ ও দুই দেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা ও আস্থা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে দুই দেশ কাজ করছে, সেখানে সীমান্তে গুলি-হত্যা কোনোভাবেই কাক্সিক্ষত নয়।
সীমান্তে যে কোনো অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে অপরাধীদের বিদ্যমান আইনে বিচার হবে এবং এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। এবারের সীমান্ত সম্মেলনে বাংলাদেশ ভারতের কাছে তাদের দৃঢ় মনোভাব ব্যক্ত করলে, উভয় দেশ সীমান্তে হত্যা বন্ধের ব্যাপারে কঠোর এবং আন্তরিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সীমান্তে অব্যাহত হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশ উদ্বিগ্ন এবং অবশ্যই এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে উভয় দেশকে আন্তরিক হতে হবে। এ সম্মেলনের পর আমরা আশা করি, সীমান্তে হত্যার মত নিষ্ঠুর ঘটনা আমাদের আর প্রত্যক্ষ করতে হবেনা।