বাল্যবিবাহ একটি অভিশাপ

তাছলিমা আক্তার

13

মানুষের জৈবিক চাহিদা পূরণ, পরিবার গঠন ও মানসিক প্রশান্তি লাভের প্রধান উপকরণ হচ্ছে বিবাহ। কিন্তু এই বিবাহ অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায় “বাল্যবিবাহ” নামক একটি অপরাধে। পুরো বিশ্ব তথা বাংলাদেশেও প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে বাল্যবিবাহ। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের প্রচলন বেশি। আমাদের দেশের দÐবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের এবং ২১ বছরের নিচে ছেলেদের বিবাহ হলে সেই বিবাহকেই বাল্যবিবাহ বলে। বর্তমান আইন অনুযায়ী, অভিভাবকের অনুমতি থাকার পরেও এই সীমারেখার নীচের বয়সের কোন ছেলে-মেয়ের বিবাহ হলে সেটাই বাল্যবিবাহ এবং আইনত দÐনীয় অপরাধ।
বাল্যবিবাহের প্রচলন প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। বেশিরভাগ সময়ে বাল্যবিবাহে ছেলে মেয়ের মধ্যে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়ে থাকে। বাল্যবিবাহের শিকার তুলনামূলকভাবে মেয়েরা অনেক বেশি হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বাল্যবিবাহ বহুল প্রচলিত।
অশিক্ষা, দারিদ্রতা এবং ধর্মীয় ও সামাজিক চাপ বাল্যবিবাহের প্রধান কারণ। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা বিশ্বজুড়ে বাল্যবিবাহের অন্যতম প্রদান কারণ। সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার ফলে ধর্ষণের মত জঘন্যতম অপরাধ ঘটে থাকে। সামাজিকভাবে ধারণা করা হয় যে, অবিবাহিত নারী কোন নিষিদ্ধ সম্পর্কে জড়িয়ে যেতে পারে কিংবা গোপনে পালিয়ে গিয়ে বিবাহ করতে পারে, যা পরিবারের জন্য লজ্জাজনক। যার ফলে অভিভাবকরা নিজেদের সন্তানকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখতে কম বয়সে বিবাহ দিয়ে দেয়। এছাড়াও দারিদ্রতা ও অশিক্ষার ফলে মানুষ বাল্যবিবাহের খারাপ দিকগুলো জানতে পারে না। ফলে বাল্যবিবাহ প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে। ধর্মীয়ভাবে অনেক দেশে বিবাহের বিভিন্ন আইন ও বয়স প্রচলিত, যা বাল্যবিবাহ রোধে হুমকিস্বরূপ।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকার তিন দেশে ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার ৭০% এর বেশি। এর মধ্যে নাইজারে বাল্যবিবাহের হার সর্বোচ্চ। ২০-২৪ বছর বয়সী নাইজেরীয়ান নারীদের মধ্যে ৭৬% নারী ১৮ বছরের আগে এবং ২৮% নারী ১৫ বছরের আগে বিবাহিত। এই ইউনিসেফের রিপোর্ট ১৯৯৫-২০০৪ সাল পর্যন্ত সংগ্রহীত নমুনার উপর ভিত্তি করে তৈরি।
আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা পপুলেশন কাউন্সিলের পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সকল দেশের মধ্যে বাল্যবিবাহের হারে বাংলাদেশ অবস্থান চতুর্থ। গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৫ বছর বয়সের নিচের মেয়েদের বিয়েকে বিবেচনায় নিলে ভারতের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ইউএনএফপিএ-র রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০০-২০১১ সালের মধ্যে উন্নয়শীল দেশসমূহের ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ৩৪%) তাদের ১৮তম জন্মদিনের পূর্বেই বিবাহিত। ২০১০ সালে এর আনুমানিক সংখ্যা প্রায় ৬৭ মিলিয়ন। প্রায় ১২% নারী ১৫ বছর বয়সের আগে বিবাহিত।বাল্যবিবাহ মেয়েদের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীরা কম বয়সে গর্ভধারণ করার ফলে স্বাস্থ্যগত অনেক সমস্যায় ভুগে থাকে। এর ফলে জন্মদানে জটিলতা সৃষ্টি হয়। গর্ভধারণ ও সন্তানধারণের ঝটিলতা নারী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বাল্যবিবাহ মেয়েদের স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। অল্প বয়সী কম শিক্ষিত বিবাহিত মেয়েদের পরিবারে পারিবারিক সহিংসার হার বেশি। স্বামীর সঙ্গে বয়সের ব্যবধান বেশি হওয়ায় মেয়েদের উপর সহিংসতা সৃষ্টি হয়, যা মেয়েদের মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। ফলশ্রæতিতে, অল্প বয়সী বিবাহিত মেয়েরা আত্মহত্যার চিন্তা করতে বাধ্য হয়।গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে বাল্যবিবাহের হার অনেক কমেছে। চোখে পড়ার মত উন্নতি হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। এক দশক আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাল্যবিবাহের হার ছিল ৫০ শতাংশ, যা কমে হয়েছে ৩০ শতাংশ। ইউনিসেফের সমীক্ষা মতে, সারা বিশ্বে গত কয়েক বছরে বাল্যবিবাহ ১০ শতাংশ কমেছে। তথ্যটি আশাপ্রদ হলেও এখনো বিশ্বের পাঁচজন কিশোরীর মধ্যে একজন ১৮ বছরের পূর্বেই বিয়ে করে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে।
নারীশিক্ষা বাল্যবিবাহ রোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রধান উপায়। নারীশিক্ষার ফলে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানতে পারবে নারীরা। এতে করে নারীরা তাদের পরিবারকেও এ সম্পর্কে অবগত করতে পারবে। বাল্যবিবাহ রোধে সরকারীভাবে বিভিন্ন কর্মসূচী ইতিমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন, বাল্যবিবাহের সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করা, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে কর্মসূচী গ্রহণ, নারীশিক্ষা সমর্থন ও নারীদের অর্থনৈতিকভাবে সাহায্যকরণ বাল্যবিবাহ রোধকল্পে সরকারি কর্মসূচীর মধ্যে অন্যতম। পরিশেষে বলা যায়, বাল্যবিবাহ আমাদের সমাজ তথা দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। আমাদের সকলের উচিত বাল্যবিবাহ রোধে সচেষ্ট থাকা।