বালক রবির কবিতা

সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার

31

কবিতার অনন্ত আকাশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের নাম। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তিনি সাফল্যের সাথে বিচরণ করেছেন। তবে তাঁর কাব্যপ্রতিভা বিশ্বসাহিত্যের দরবারকে ভাসিয়ে দিয়েছিলো আলোর বন্যায়। রবী›ন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বের আনাচেকানাচে বাঙালি জাতির নাম-পরিচয় স্বর্ণাক্ষরে উৎকীর্ণ করে গেছেন। তিনি পেয়েছেন বিশ্বকবির মর্যাদা। তিনি আমাদের গর্বের ধন। রবীন্দ্রনাথ নিজেকে কবি হিসেবে ভাবতে স্বচ্ছন্দবোধ করতেন বেশি। তিনি তাঁর জন্মজয়ন্তির একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, আমি শাস্ত্রজ্ঞানী-তত্ত¡জ্ঞানী নই, গুরু বা নেতা নই,আমি কবি মাত্র। বিশ্বকবি রবীনাথের কাব্যপ্রতিভার উন্মেষ ঘটে সাত-আট বছর বয়সে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেমন করে শৈশবে কবিতার ভুবনে প্রবেশ করেছেন সেই বিষয়ে তিনি লিখেছেন তাঁর জীবনস্মৃতি ও ছেলেবেলা নামক গ্রন্থে। বয়সে বছর ছয়েকের বড় একজন ভাগ্নে ছিলো রবীন্দ্রনাথের। নাম জ্যোতিঃ প্রকাশ। তিনিই হলেন রবীন্দ্রনাথের কাব্য চর্চার প্রথম অনুপ্রেরণা দাতা। একদিন জ্যোতিঃপ্রকাশ তার ছোটমামা রবিকে ঘরে ডেকে নিয়ে যান এবং বললেন তোমাকে আজ একটি কবিতা লিখতে হবে। বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করে ভাগ্নের এই আদেশ বালক রবিকে বিচলিত করে তুললো। রবির মধ্যে তখনও কাব্য প্রতিভার লক্ষণ প্রকাশ পায়নি, তা সত্তে¡ও জ্যোতিঃপ্রকাশ কেনো যে মামা রবিকে কবিতা লেখার দায়িত্ব চেপে দিলেন সেই রহস্য আজও অনুদঘাটিত। জ্যোতি প্রথমে রবিকে ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন কেমন করে চৌদ্দ অক্ষর মিলিয়ে কবিতা লিখতে হয় তার রীতি পদ্ধতি। তারপর শ্লেট পেনসিল হাতে দিয়ে পদ্মের ওপর একটি ছোট কবিতা লিখতে বলেন। শিশু বয়সে রামায়ণ- মহাভারত পড়ে শুনে কবির কান পদ্যছন্দে অভ্যস্ত হয়েছিলো, তাই বালক রবির আত্মবিশ্বাস জমে গেলো, তিনি মামার আদেশ রক্ষা করতে পারবেন। প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলক রবি বসে গেলেন কবিতা লিখতে। কবিতা রচনা করে মামার হাতে তুলে দিলেন রবি। জ্যোতিমামা পকৃতি পদ্ম ও ভোমরাকে নিয়ে রচিত কবিতাটি পড়ে চমৎকৃত হলেন।
জ্যোতিঃপ্রকাশের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শুরু হলো কবিতার দীর্ঘ পথে রবীন্দ্রনাথের যাত্রা। বালক রবি তাদের জমিদারি সেরেস্তার কর্মচারীদের কাছ থেকে জোগার করে নিয়েছিলেন একটি নীল কাগজের খাতা। এই খাতায় বালক রবি পেনসিলে অসমান লাইন টেনে বড় বড় কাঁচা অক্ষরে পদ্য লেখা শুরু করলেন। সেরেস্তার লোকজনদের কবি কবিতা রচনা করে শুনাতেন। তারাও আগ্রহ ভরে রবির কবিতা শুনতেন। সেরেস্তার কর্মচারিরাই হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রথম শ্রোতা। তারা কবিতা শুনে রবিকে বাহবা দিতো। এতে রবি হতো আরও প্রাণিত। বালক রবি নিজেকে কবি হিসেবে জাহির করে খুবই আনন্দ পেতেন। এই সময়কার তাঁর একটি কবিতা হচ্ছে লৌকিক ছন্দে রচিত একটি মন্ত্র। বালক রবির একবার খেয়াল চাপলো তাঁর কাঠের সিঙ্গিকে বলি দেবার। কিন্তু বলি দিতে গেলে তো মন্ত্রের দরকার। বালক রবি কাগজ কলম নিয়ে বসে গেলেন একটি মন্ত্র বানানোর জন্যে। তিনটি প্রাচীন প্রচলিত ছড়া থেকে কথা ধার করে বানিয়ে ফেললেন তাঁর ভাষায় সেই মন্ত্র, সিঙ্গিমামা কাটুন/ আন্দিবোসের বাটুন/উলুকুট ঢুলুকুট চ্যামকুড় কুড়/আখরোট বাখরোট খট খট খটাস/ পট পট পটাস।
অল্প কিছুদিন পর বাড়ির গন্ডি ছেড়ে রবির কবি প্রতিভার কথা তার মূল শিক্ষকদের কানেও গিয়ে পৌঁছলো। শিক্ষক সাত কড়ি দত্ত বালক রবিকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। রবির কাব্য প্রতিভা দেখে তিনি হয়েছিলেন আনন্দিত। মাঝে মাঝে শিক্ষক সাত কড়ি দত্ত দু একটি পদ্য লিখে রবিকে নির্দেশ দিতেন তা পূরণ করতে। একবার তিনি রবিকে লিখে দিয়েছিলেন এই দুটি পদ, —রবি করে জ্বালাতন আছিল সবাই/ বরষা ভরসা দিলো আর ভয় নাই, বালক রবি এর সাথে যোগ করেছিলেন, —— মীনগণ হীন হয়ে ছিলো সরোবরে/ এখন তাহারা সুখে জলক্রীড়া করে।
রবীন্দ্রনাথ ফলফলারি বেশি পছন্দ করতেন। শৈশবে তিনি এই বিষয়ে একটি চমৎকার পদ্য লিখেছিলেন এভাবে- আমসত্ত¡ দুধে ফেলি/তথাতে কদলী দলি/সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে/হাপুস হুপুস শব্দ/চারিদিকে নিস্তব্ধ /পিঁপিড়া কাঁদিয়া যায় পাতে।
স্কুলের সুপারেন্টেনডেন্ট গোবিন্দ বাবু রবীন্দ্রনাথকে মাঝে মধ্যে নীতি কবিতা লিখতে বলতেন। তাঁর আদেশে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন সদ্ভাব নামের একটি নীতি কবিতা। শ্রেণীকক্ষে দাঁড়িয়ে বালক কবিকে কবিতাটি শুনাতে হয়েছিলো। দুঃখের বিষয়, কবির সহপাঠীরা কবিতাটি শুনে বাহবা তো দিলোই না বরং তারা বালক কবিকে চুরি করে কবিতা লেখার মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিলো। সেদিন একরাশ দুঃখ নিয়ে কবি বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন। বালক রবি মাঝে মধ্যে ঈশ্বর স্তব রচনা করতেন। পিতৃদেব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথকে খুশি করার জন্যে তিনি এই স্তবগুলো রচনা করতেন। ঈশ্বর স্তবের মধ্যে কনিষ্ঠপুত্র রবির সংসারকষ্ট ও ভবযন্ত্রণার বর্ণনা শুনে পিতৃদেব মনে মনে হাসতেন। এই হাসির অর্থ বোঝার মতো বয়স তখনও রবির হয়নি। একবার বালক রবি গভীর আগ্রহভরে লিখলেন ভারত মাতা নামে একটি দেশের কবিতা। কবিতাটিতে একটি অন্তমিল ছিলো নিকটে শব্দের সাথে শকটে। কবিতাটির বক্তব্যের দিকে বিবেচনা করলে শকট শব্দটির কোনো প্রয়োজনই ছিলো না। এই কবিতাটি বালক রবি খুশিতে গদগদ হয়ে তাঁর খুড়তুতো দাদা গুণেন্দ্রনাথকে পড়ে শুনালেন। শুনেই দাদা অট্টহাস্যে ফেটে পড়েন। এতে বালক রবি নিরুৎসাহিত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কবিতাটি বাতিল করে দেন। পরের বছর রবীন্দ্রনাথ পিতার সাথে হিমালয় অঞ্চলে যান। যাওয়ার পথে তাঁরা কদিনের জন্যে বোলপুরে অবস্থান করেন। সেইসময় বালক রবি একটি বীররসাত্মক কবিতা লিখেছিলেন। কবিতাটির নাম ছিলো পৃথ্বিরাজ পরাজয়। পরবর্তী কালে এই কবিতার প্রভাবে রবীন্দ্রনাথ তাঁর রুদ্রচন্দ্র নামের নাটকটি রচনা করেছিলেন।
বালক রবির প্রথমদিককার উক্ত কবিতাগুলো কোথাও ছাপার অক্ষরে বেরোয়নি। সংকলিত হয়নি কোনো গ্রন্থেও। কবিতাগুলোর পান্ডুলিপি কোত্থেকে কোথায় গেলো রবীন্দ্রনাথ নিজেও জানতেন না। রবীন্দ্রনাথের প্রথম মুদ্রিত কবিতার নাম হচ্ছে ভারত ভূমি। তাঁর বয়স যখন বারো তখন কবিতাটি প্রকাশিত হয়। সাহিত্যিক সম্পাদক বংকিম চন্দ্র তাঁর বঙ্গ দর্শন পত্রিকার দ্বিতীয় বর্ষ মাঘ ১২৮০ সংখ্যায় কবিতাটি প্রকাশ করেন। তবে কী কারণে জানি না, রবীন্দ্রনাথ উক্ত কবিতায় নিজের নাম বা ছদ্মনাম কিছুই ব্যবহার করেননি।