বাবা, ঘুম থেকে ওঠো ! ওঠোনা !!

78

রিয়াজ হায়দার চৌধুরী

৬ বছরের শিশু বরকতুল আলম বাবাকে হারিয়েছে। সকাল থেকেই প্রাণহীন বাবার পাশেই হাঁটছিল। মা-বোন সহ স্বজন প্রতিবেশীর কান্না- হাহাকারের ভাষা বুঝার বয়স তার নয়। তাই বাবার অন্তিম শয্যা তার কাছে হয়তো প্রাত্যহিক ঘুমের মতই । বাবার দেহে যে আর প্রাণবায়ু নেই, তা বুঝা তো দূরে থাক, শায়িত বাবার চারপাশে এত মানুষের ভিড় কিংবা তার বাবার মুখ সবার শেষবারের মত দর্শনের দৃশ্যও তাকে হয়তোবা ভাবাইনি মোটেও। তবে বিষয়টি অন্য কোন দিনের মত মনে না হলেও অবুঝ এই শিশু ঘটনার আকস্মিকতায় মুষড়ে যায়নি। তার চোখের সামনেই যথারীতি জানাজাও শেষ হলো। জানাজা শেষে দাফনের জন্য অন্তত দু কিলোমিটার দূরে নিয়ে যাওয়া হবে তার বাবাকে।খাটিয়া থেকে তার পিতৃদেহ তোলা হচ্ছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের লাশের গাড়িতে । তখন কি মনে করে যেন অবুঝ শিশুটি বলে উঠলো, ‘বাবা , বাবা। ওঠোনা ! ঘুম থেকে ওঠো !’
অবুঝ শিশুর এমন ডাক কি বিধাতা বুঝেন ! পিতৃবিয়োগের ব্যথা, মনটা যে তখন কেমন করে ওঠে , তা যিনি বাবা হারাননি তার বুঝতে পারার নয়। তার উপর শিশুমন ! শিশু বরকতুল তা বুঝেনি। কিন্তু প্রকৃতির নির্দয় রূপ কিংবা সর্ব নিয়ন্ত্রকের ডাক যে কেউ ফেরাতে পারে না। অবুঝ শিশুকে রেখেই তাই তার ডাকেই চলে যেতে আমাদের খোরশেদকে।
হ্যাঁ, আমাদের খোরশেদ। চট্টগ্রাম নাগরিক উদ্যোগ, যে সংগঠনটির আমি আহ্বায়ক, সে সংগঠনের’ই সমন্বয়কারী। আমার অনুজপ্রতিম। আমাদের পরীক্ষিত বিশ্বস্ত সহকর্মী। আমাদের সংগঠনটির প্রায় সব কিছুতেই আমি তাঁর উপর ছিলাম নির্ভরশীল।
করোনাবিদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী যখন মৃত্যুর উৎসব, লকডাউন-কোয়ারেন্টিন আর আইসোলেশনে যখন জীবন-মৃত্যুর টানাটানি, প্রিয় বাংলাদেশ ও আমাদের শহর চট্টগ্রাম যখন গভীর উদ্বেগে, তখন উদ্বেগময়তাকে রাতের আঁধারে গভীর শোকে পরিণত করলেন খোরশেদ।
নানা সময়ে কত না বকেছি তাঁকে বেখেয়ালি জীবনের জন্য !
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শক্তি ক্ষমতায় গেল ১১ বছর । অথচ দলের কোন পর্যায়েই পদ-পদবির আকাক্সক্ষা না থাকা নিঃস্বার্থ নিবেদিত মাঠের সংগঠক খোরশেদ। সারাদেশের নিবেদিত অসংখ্য প্রগতিশীল কর্মীর মত তাঁরও জীবন উপেক্ষা আর বঞ্চনার ।
ক্ষমতার সুসময়কে ব্যহার করে লোলুপ স্বার্থান্ধরা গড়েছেন টাকার পাহাড়। বেড বালিশ কভারের ভাঁজ আর আলমিরা সিন্দুকের তাক ছাড়িয়ে সুইস ব্যাংকের একাউন্ট শুধু নয়, ইউরোপ-আমেরিকায় অনেকেই কিনেছেন বাড়ি। অথচ তাদের অবদান এই দেশজুড়ে থাকা এই খোরশেদদের মত ছিল না কখনোই !
অথচ আজ তারাই দৃশ্যত সমাজ-সভ্যতার অধিকতর নিয়ন্ত্রক-ক্ষমতাশালী, যারা নিছক প্রগতির শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে কোনদিন ঝুঁকি নেননি, বরং বঙ্গবন্ধুর দল ক্ষমতায় আসার পর পুলিশি পাহারায় কোন হল দখল কিংবা এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোন কার্যালয়ে জাতির পিতার ছবি তোলেন, তাতে ফুলমাল্য দেওয়ার বীরত্বের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জাহির করেন ! আজ তারাই সমাজ নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবের আলোয়, যাদের সেলফিবাজিতে আলোর ঝলকানি ওঠে প্রতিনিয়ত, কিংবা যারা মাঠের আদর্শিক নিবেদিত উত্তরাধিকার না হয়ে নিছক পারিবারিক উত্তরাধিকারের কারণে আজ দাম্ভিক- সর্বগ্রাসী ! তারাই বিত্তশালী কিংবা কথিত চিত্তের দাবিদার হয়েছেন, দলের ক্ষমতাহীন সময়ে কোনরূপ ত্যাগ যাদের ছিল না, বরং এতদিনের টানা ক্ষমতা বলয়ে পুঁজির বিপরীতে নৈমিত্তিক প্রাপ্তি পেয়েছেন, সমানে দিয়ে গেছেন ‘দেবতার কাক্সিক্ষত ভোগ! আর তাদের ধারে কাছে যাওয়ার বাসনা কিংবা দুঃসাহস কোনটাই ছিলনা আমার কিংবা খোরশেদের; আমাদের ।
আর তাই আজ আমি কেবল সহযোদ্ধা খোরশেদকে বিদায় সম্ভাষণ জানাতে চাই নিছক আমাদের ফেলে আশা সব পবিত্র স্মৃতি, মাঠের নিবেদিত নিঃস্বার্থ কাজের স্মরণে।
এ স্মরণের শ্রদ্ধার্ঘ্য শুধু একজন অনুজপ্রতিম খোরশেদের জন্যই নয়, তাঁর মত নিবেদিত বিনয়ী আদর্শিক অসা¤প্রদায়িক দেশের সকল শিল্পী সাংস্কৃতিক কর্মী সংগঠকের জন্য।
আজ এই স্মৃতি আলোচনায় চোখের সামনে ভেসে উঠছে চট্টগ্রাম শহরের অনেক আলোকিত অথচ যোগ্য স্বীকৃতি না পাওয়া প্রয়াত অভিভাবকের ছবি। মনের ভিটেই ভেসে উঠছে বিদায়ী সকল শোকের ব্যঞ্জনা।
মনে হচ্ছে, এইতো সেদিন হারিয়ে গেলেন একেক করে আবৃত্তিজন মৃণাল সরকার, সংগঠক কামাল এ খান, আবৃত্তিকার ও উপস্থাপক মাহবুব হাসান, শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব। কবিয়াল ফণী বড়–য়া, ঢোলক বিনয়বাঁশী জলদাস, ওস্তাদ মিহির নন্দী, শিল্পী প্রবাল চৌধুরী, সঙ্গীত অনুরাগী ভৌত বিজ্ঞানী প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলামকে হারানোর ক্ষত যেন পুনর্বার ব্যথা তুলল আজ । ওস্তাদ নীরদ রঞ্জন বড়–য়া, জগদানন্দ বড়–য়া, শিল্পী আবদুল গফুর হালী, আবৃত্তিকার রণজিৎ রক্ষিত, গণসঙ্গীত শিল্পী অশোক সেন, উদীচির রবিন দা, বোধনের পঞ্চানন চৌধুরী, শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু, শান্তনু বিশ্বাস (এই মুহূর্তে নাম মনে না পড়া অনেকেই) প্রমুখের বিয়োগ ব্যথা আমাদের অনেককেই জর্জরিত করেছে।
কিন্তু যথাযোগ্য মর্যাদা না পাওয়া এইসব শিল্পী সংগঠক অনুরাগী মানুষকে নানাভাবে সম্মাননা জানানো, স্মরণ করার প্রয়াসে আমাদের খোরশেদের ভূমিকা ছিল নিবেদিত নিঃস্বার্থ। যে তরুণ এমন পূর্বসূরিদের শোক স্মরণে ছিল গভীর বেদনায় ব্যথিত অথচ শ্রদ্ধায় বিনম্র, সেই খোরশেদকে আমাদের হারাতে হল তাঁর
অপরিণত বয়সেই , বড় অসময়ে এই বিদায় !
চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিজে শিল্পী না হয়েও শিল্পীদের সম্মান দেওয়া, স্মরণ করা, শিল্পী সমাজের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে স্বতপ্রণোদিত হয়ে অন্যদের সঙ্ঘবদ্ধ করার নিয়মিত চর্চায় পারদর্শিতার কৃতিত্বটুকু তাঁর প্রাপ্য।
জাতির পিতাকে হত্যার দিন, ১৫ আগস্ট , আমাদের জাতীয় শোক দিবসে প্রথাগত স্মরণ অনুষ্ঠানের বাইরে গিয়ে কি করা যায়,একদিন তা জানতে চেয়ে অফিসে আসলেন খোরশেদ।
বললাম, একটি নাগরিক শোক যাত্রা করা যায়। মুখ থেকে কথাটি বের করতে না করতেই তা লুফে নেয়া শুধু নয়, হৃদয়ে ধারণ করে এর প্রস্তুতিতে সর্বোচ্চটুকু করে গেলেন।
শুধু তা’ই নয় বঙ্গবন্ধুর জন্মদিবস,
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার জন্মদিবস, শিশু শেখ রাসেলের জন্মদিনসহ জাতীয় দিবসগুলোকে উৎসবমুখর করতে এই শহরে খোরশেদের প্রচেষ্টার কথা অস্বীকার করার কোন জো নেই কারো। সাংস্কৃতিক কর্মীদের জন্য যখন ডিসি হিলে উৎসব আয়োজন বন্ধ করে দেয়া হলো, তখন বন পুড়ে যাওয়া হরিণীর মতো আর্তনাদ করে উঠলো তাঁর মন। ক্ষোভে ফেটে পড়লো। চট্টগ্রাম টেলিভিশন কেন্দ্রের মান উন্নয়ন নিয়ে চিন্তার কমতি ছিল না তাঁর। সংস্কৃতিকর্মীদের মর্যাদা, নাগরিক সমাজের দাবি-দাওয়া অধিকার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলন থেকে শুরু করে নাগরিক উন্নয়ন আন্দোলনে, এমনকি পেশাজীবীদের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে, অসা¤প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের সংগ্রাম তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে অন্তত গত দুই দশক মাঠে সক্রিয় খোরশেদ। উৎসবে-পার্বণে মেলায় সংগ্রামে সামাজিকতায় শহর থেকে গ্রামে মানুষের সাথে ছিলেন আমাদের খোরশেদ। হয়তো এই কারণে করোনাবিদ্ধ সময়ে সরকারের ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি মানতে অনেকেই যখন ঘর থেকে গেল কদিন ধরে বের হচ্ছেন না , তখনও, এই সামাজিক দূরত্বের বিধিকে দূরে ঠেলে ধর্ম-বর্ণ ও বিভক্তির বিভেদ হটিয়ে অগুনতি স্বজন শুভার্থি ছুটে গেলেন তাঁর শেষ বিদায়ে। এই বিদায় কালে শুনেছি তাঁর জন্য শোকাচ্ছন্ন স্বজন প্রতিবেশীর কান্না। অগুনতি মা-মাসির বুক চাপড়ানো শোক আহাজারি। মা, স্ত্রী, এক শিশু পুত্র এবং এক স্কুল পড়–য়া কন্যা রেখে মৃত্যুবরণ করেন খোরশেদ। তাঁর জানাজা ও দাফনে অসংখ্য মুসল্লি সমবেত হন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মরদেহবাহী গাড়ির পিছু পিছু ছুটে যান। সৃষ্টি হয় এক শোকাবহ পরিস্থিতির। শোক ভেঙে দেয় সামাজিক দূরত্বের বিধি।
আজ সকাল সোয়া আটটার দিকে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর খবরটি মুঠোফোনে জানালেন আমার দীর্ঘকালীন রাজপথের সহযোদ্ধা বন্ধু স্বজন ও চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুমন দেবনাথ । তাঁর ফোনেই আমার ঘুম ভাঙা। বিশ্বাসই হচ্ছিল না ! প্রথমে নিজেই ভাবছিলাম ঘুমে ভুল শুনছি নাতো ! নাকি করোনাবিদ্ধ সময়ে গেল ক’দিনের মতই রাতের নির্ঘুমতা শেষে খানিকটা আগের কাঁচা ঘুমে দুঃস্বপ্নের আঁধারেপ্রবেশ!
একটু ধাতস্থ হবার চেষ্টায় মুঠোফোন ঘাঁটি। দেখি এরও আগে নিজের অজান্তেই কখন যে বেজে ওঠে একসময়কার তুখোড় সাংবাদিক ও কবি প্রদীপ খাস্তগীরের ফোন কল , মিসকল এর তালিকায় ! তাঁর সাথে দফায় দফায় কথা হল। দুঃসংবাদ নিশ্চিত হয়েই ভাবলাম, একী হল !!!
শোবার আগেই ভোর রাতে ফেসবুকে লিখেছি ‘শুভ সকালের প্রতিক্ষা’র কথা। আর এটা কী হলো ! হৃদয়ে কুড়াল মারা এ কেমন সকাল !!
বড় বেশি অস্থির সময়ে যেন অভিমান করে খোরশেদের এই চলে যাওয়া। বন্দর শহরের দক্ষিণ বাকলিয়ার ম্যাচ ফ্যাক্টরি রোডের ঘিঞ্জি কলোনীতে রাতের আঁধারে চোখ বুজে অন্তিম যাত্রার পথে যাওয়া খোরশেদের দিনের আলোতে শেষ ঠাঁই হল চৈতন্য গলির সাড়ে তিন হাত মাটি। এই মাটিতেই সারাটি জীবন এবং জীবনের পরে পিতার কোল খুঁজে নেবে আজকের ৬ বছরের অবুঝ শিশু বরকতুল !

লেখক : সহসভাপতি, বিএফইউজে ও আহ্বায়ক
চট্টগ্রাম নাগরিক উদ্যোগ