বানে ভাসছে বিস্তীর্ণ জনপদ

তুষার দেব

45

আষাঢ়ের শেষে সপ্তাহজুড়ে রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়া মৌসুমের প্রথম টানা ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানি শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর চট্টগ্রামে বন্যাই ডেকে আনল। চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলার পাশাপাশি কক্সবাজার এবং তিন পার্বত্য জেলার বাসিন্দারাও স্বল্পমেয়াদী বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। সড়ক-মহাসড়ক থেকে শুরু করে নিঁচু এলাকার বাড়ি-ঘর ও ক্ষেত-খামার সবই তলিয়ে গেছে বানের পানিতে। বানভাসী মানুষের দুর্দশার অন্ত নেই। বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে সাঙ্গু, মাতামুহুরী, হালদাসহ সবকটি নদীর পানি।
এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে গতকাল রবিবার সন্ধ্যা ছয়টার পর পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে মৌসুমী বায়ুর প্রভাবজনিত ভারী বর্ষণের এই ধারা হ্রাস পেতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। তাতে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনাও দেখছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। বানভাসী মানুষের দুর্দশা লাঘবে নগদ টাকা ও চাল বিতরণ করছে জেলা প্রশাসন। ত্রাণ ও পুনর্বাসন খাতে বরাদ্দকৃত নগদ ১০ লাখ টাকা এবং একশ’ ৬৬ টন চাল থেকেই বন্যাদুর্গতদের হাতে এ সহায়তা তুলে দেয়া হচ্ছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা ও সার্বক্ষণিকভাবে তদারকির জন্য খোলা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। জেলা পর্যায়ে খোলা এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ০৩১-৬১১৩৪৫ এবং ০১৭০০-৭১৬৬৯১ নম্বরে যোগাযোগের সুযোগ রাখা হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, গত কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে ১৪ উপজেলাই কমবেশি প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আড়াই লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অর্ধশতাধিক বাড়ি-ঘর সম্পূর্ণ এবং এক হাজারের কিছু বেশি বাড়ি-ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এসব উপজেলায় প্রাথমিকভাবে বরাদ্দকৃত নগদ ১০ লাখ টাকা এবং একশ’ ৬৬ টন চাল গত দু’দিন ধরেই বন্যাদুর্গতদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শনে তিন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে বন্যাদুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। প্রতিটি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের জরুরি ওষুধ ও নিরাপদ পানিসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির পাশাপাশি পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অতিদুর্গত এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র খোলা ও ত্রাণ বিতরণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক তারেক সিদ্দিকী জানান, রবিবার বিকাল তিনটা পর্যন্ত সাঙ্গু নদীর পানি বান্দরবান পয়েন্টে বিপদসীমার একশ’ ৪৭ সেন্টিমিটার এবং দোহাজারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৯৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া, চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনী, মাতামুহুরী, হালদাসহ সবকটি নদীর পানিও বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে টানা সাত দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এসব নদ-নদীর পানি দ্রæত বাড়তে থাকে। এতে বান্দরবান ও চট্টগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলের ৪০ হাজার পরিবার কমবেশি পানিবন্দি হয়ে পড়ে। গতকাল রবিবার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়া এবং বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের বাজালিয়ার বড়দুয়ারা ও লামা সদর হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়। বান্দরবান শহরের আর্মিপাড়া, ইসলামপুর, অফিসার্স ক্লাব, বনানী স’মিল এলাকা, শেরেবাংলা নগর ও সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোর মানুষ শুরুতেই পানিবন্দী হয়ে পড়ে। একইভাবে অব্যাহত ভারী বর্ষণ আর ভারতের ত্রিপুরার ইছামতি ও হালদা নদী বেয়ে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে মহানগরীর পাশাপাশি জেলার হাটহাজারী, বোয়ালখালী, পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী, রাউজান, ফটিকছড়ি ও সীতাকুÐ উপজেলার নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। ভূমিধসে হতাহতের ঘটনাও ঘটে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের গতকাল রবিবার রেকর্ডকৃত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বর্ষা মৌসুমের প্রথম ভারী বর্ষণধারা এক সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রাম বিভাগে থিতু থাকার পর বাঁক বদলে উত্তরবঙ্গের দিকে ধাবিত হয়েছে। তাই রবিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী চব্বিশ ঘন্টায় দেশের সর্বোচ্চ একশ’ ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতও রেকর্ড করা হয়েছে রংপুরের ডিমলায়। একই বিভাগের পার্শ¦বর্তী এলাকা তেঁতুলিয়ায় একশ’ ৪৯ ও সৈয়দপুরে একশ’ সাত মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। তবে, পরিমাণের দিক থেকে তুলনামূলকভাবে কমে এলেও চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকটি অঞ্চলে গতকাল রবিবারও যথারীতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে কুমিল্লায় সর্বোচ্চ একশ’ ৩৩, চট্টগ্রাম সদরে ৭৮, স›দ্বীপে ৫৭, সীতাকুÐে ৯৯, রাঙামাটিতে ৩৩, নোয়াখালীতে ৫০, ফেণীতে ৫১, কক্সবাজারে ৯২ এবং কুতুবদিয়ায় ৯৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে দেশে প্রতিবছরই বেশকিছু এলাকা প্লাবিত হয়। ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি দেশের নদনদী দিয়ে নেমে আসা পানিই বন্যার প্রধান নিয়ামক। তবে, দেশের নদনদী পানির ৯৩ শতাংশই আসে উজানের দেশগুলো অর্থাৎ নেপাল, ভারত এবং কিছুটা ভুটান থেকে। দেশের আভ্যন্তরীণ বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা এবং মেঘনা অববাহিকায় নেমে আসা বৃষ্টিপাতের পরিমণের ওপরই বাংলাদেশে বন্যা হবে কিনা তা নির্ভর করে। সাধারণত জুনের শেষ দিক থেকেই ক্রমাগতভাবে দেশের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং বিপদসীমা অতিক্রমের ফলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের সৃষ্ট বন্যাকেই বড় মাত্রার বন্যা হিসেবে দেখা হয়।