বাদশা মিঞা চৌধুরী ও বর্তমান সময়

মোহাম্মদ আলম

25

চট্টগ্রামের ‘স্যার সৈয়দ আহমদ’ খ্যাত আলহাজ্ব মরহুম বাদশা মিঞা চৌধুরীর আজ ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী। মাত্র ৫২ বৎসর বয়সে এই মহৎ মনের অসাধারণ মানুষ ১৯৬৭ সনে ৫ আগস্ট পৃথিবী থেকে অকালে বিদায় নিয়েছিলেন। আমাদের চারপাশে প্রতিদিন কেউ না কেউ পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। জীবনমৃত্যুর এসব শোক স্মৃতি কয়জনের মনে থাকে। স্বজন ছাড়া কে বা মনে রাখে কার কথা। কিন্তু মরহুম বাদশা মিঞা চৌধুরীর অগণিত স্বজন যাদের অনেকে আত্মীয় না হয়েও পরম আত্মীয় স্বজন হারানোর শোক স্মৃতি বুকে ধারণ করে তাকে শ্রদ্ধাভরে মনে রেখেছে। কৃতজ্ঞ চিত্তে মনে রেখেছে তাহার আমরণ সেবা কর্মের কথা। সেজন্য মৃত্যুর প্রায় অর্ধ-শত বছর পরেও মরহুম বাদশা মিঞা চৌধুরী আমাদের সমাজে চির অ¤øান চির ভাস্বর। তিনি আমাদেরকে কি দিয়েছিলেন। কেন আমরা তাকে মৃত্যুর এতকাল পরও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি। এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের বর্তমান প্রজন্মদেরকে ভাবিয়ে দেখা অত্যন্ত প্রয়োজন।
আমাদের মাঝে মানুষের জন্য আন্তরিক ভালবাসা রয়েছে, এমন মানব প্রেমিকের সংখ্যা অতি নগন্য। দুঃখ যন্ত্রণায় পতিত এ সমাজ ভালবাসার বড় মুখাপেক্ষী হয়ে আছে। আমাদের এ দরিদ্র সমাজে রোগীর তুলনায় যেমন সুচিকিৎসক পর্যাপ্ত নয় তেমনি এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রকৃত সমাজ সেবক ও সংস্কারকের সংখ্যা খুবই কম। অথচ সুখী এবং সমৃদ্ধশালী সমাজ গড়তে হলে প্রয়োজন প্রচারবিমুখ নিঃস্বার্থ প্রকৃত সমাজসেবকের। যারা কেবল ভালবেসে সমাজকে দেবে। যা প্রতিদানের কোনরকম আশায় নয়। আমাদের সামনে তেমন একজন সমাজ সেবকের আদর্শ হচ্ছেন মরহুম বাদশা মিঞা চৌধুরী। ১৯১৫ সনে ১০ অক্টোবর চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার সুপ্রসিদ্ধ উত্তর মাদার্শা গ্রামে এক মধ্যবিত্ত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্ম লাভ করেছিলেন। অনেকটা নিজের প্রচেষ্টায় সাফল্যের সাথে এম কম ও এল এল বি ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তিনি সরকারি চাকুরী নিয়ে প্রথম জীবন শুরু করলেও পরে তা ছেড়ে স্বাধীন পেশা হিসেবে বেছে নেন আয়কর উপদেষ্টা। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল যাতে তিনি মানব সেবায় নিরলস ভাবে অংশ নিতে পারেন। তিনি বড় লোক ছিলেন না, তবে বড় মাপের মানুষ ছিলেন। তিনি বিত্তবান কিংবা রাজনীতিবিদ ছিলেন না। যা বর্তমান সময়ে অনেকে সমাজসেবার সোপান বলে মনে করে থাকেন। এ দুটির কোনটি না থাকলে ও সমাজ সেবা এবং সংস্কার করা যায় তা তিনি তাহার বিশাল কর্মযজ্ঞ দিয়ে প্রমাণ রেখে গিয়েছেন। মানুষের জন্য যার হৃদয়ে ছিল প্রচুর ভালবাসা। এর সাথে ছিল আদর্শ শিক্ষা, প্রচন্ড ব্যক্তিত্ব ও সৎ সাহস। যা দিয়ে তিনি সমাজসেবকের শীর্ষ স্থানে পৌঁছতে পেরেছিলেন। যুগে যুগে দেখা গেছে এমন নিঃস্বার্থবান প্রচারবিমুখ মানবপ্রেমিক নিরলস পরিশ্রম করে সমাজের জন্য সেবা কর্মের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার আনন্দ, তৃপ্তি ও স্বার্থকতা খুঁজে পেয়ে থাকেন।
বিশ্ব খ্যাত সমাজসেবিকা নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মাদার তেরেসা ভালবাসার বাণী নিয়ে পৃথিবী ঘুরেছেন। তিনি বলতেন, ‘আমাদের সমাজে অর্থের অভাব নেই। অভাব ভালবাসার।’ অর্থাৎ মানব সেবার জন্য দরকার মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসার। তাহার এই মূল্যবান মন্তব্যের যথার্থতা মরহুম বাদশা মিঞা চৌধুরীর জীবনে আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে তিনি সার্বিক দায়িত্ববোধের প্রতি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। সমাজের বিভিন্ন প্রয়োজনের তাগিদ তাহার হৃদয়কে সর্বদা নাড়া দিত। বিবেককে ভাবিয়ে তুলতো। এ প্রেম ও বিবেকবোধ থেকে তাহার জীবনে সমাজ সেবার মনোভাব সৃষ্টি হয়েছিল। যা ক্রমে মানব সেবাকে তাহার জীবনে ব্রত হিসেবে মনে প্রাণে গ্রহণ করেছিলেন। তাহার স্বল্পায়ু জীবনে তিনি প্রমাণ করে দিতে পেরেছিলেন মানুষ মানুষের জন্য।
ষাট দশকের দিকে সমাজের সকল উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে তিনি অশিক্ষাকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছিলেন। উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত মনীষী শিক্ষা ও সংস্কারের অগ্রদূত মরহুম স্যার সৈয়দ আহমদের আদর্শে বিশ্বাসী ও অনুসারী মরহুম বাদশা মিঞা চৌধুরী সকল উন্নয়নের চাবিকাটি শিক্ষার আলো দিয়ে সমস্ত অন্ধকার ও প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে সমাজসেবায় নেমেছিলেন। এবং আমরণ অন্তরভরা নিরলস প্রচেষ্টা দিয়ে তিনি শিক্ষা সম্প্রসারনে প্রচুর সফল হয়েছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মানুষের প্রতি তার অগাধ ভালবাসা ও শ্রমনিষ্ঠার স্মারক হয়ে আছে-চাদপুর কলেজ প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন, চট্টগ্রাম নাইট কলেজ (বর্তমানে চট্টগ্রাম সরকারী সিটি কলেজ), চট্টগ্রাম আইন কলেজ, চট্টগ্রাম গার্লস কলেজ (বর্তমানে চট্টগ্রাম সরকারী মহিলা কলেজ), কাজেম আলী নাইট স্কুল, (বর্তমানে কাজেম আলী হাই স্কুল এন্ড কলেজ) মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি হাই স্কুল, এম, ই, এস কলেজ, মাদার্শা বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়। তাহার জীবনের সর্বশেষ প্রয়াস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। যা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতা কমিটির আহবায়ক।
ষাটের দশকে সমবায় ও স্কাউট আন্দোলনে তিনি বিরাট ভ‚মিকা পালন করেছিলেন। কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক, ইসলামাবাদ টাউন কো-অপারেটিভ ব্যাংক, পূর্ব পাক সমবায় ব্যাংক, কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার ভ‚মিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রুরাল কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইনকোয়ারী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এবং স্কাউটের আঞ্চলিক কমিশনার হিসেবে তিনি রেখেছিলেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর।
তিনি সমাজ কর্মীদেরকে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে সংগঠিত ও উদ্বুদ্ধ করে সমাজসেবাকে একটি সামাজিক আন্দোলনের পর্যায়ে নেবার চেষ্টা করেছিলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি নিজ গ্রামে মাদার্শা খাদেমুল ইসলাম সমিতি এবং চট্টগ্রামে শহরে মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রেখেছিলেন। চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাজ কল্যাণ ফেডারেশনে ও বলিষ্ঠ ভ‚মিকা পালন করেছিলেন।
শুধু তা নয়। গরিব মেধাবী ছাত্রদেরকে ভাল স্কুল কলেজে ভর্তি করে আর্থীক সহায়তা দান, দরিদ্র শিক্ষিত বেকারদের জন্য চাকুরীর ব্যবস্থা সহ সর্বপ্রকার সামাজিক কল্যাণকর কাজে সর্বদা নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন। মানুষের অশ্রæ আর দুঃখ মুছে হাসি ফুটাতে পারলে তিনি নিজের মধ্যে পরম সুখবোধ করতেন। যার রয়েছে কত স্মৃতি বিজড়িত কাহিনী।
যুগ যুগ ধরে মরহুম বাদশা মিঞা চৌধুরীর মত মানবসেবকদের প্রচেষ্টায় আমাদের চতুর্পাশে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। অজগায়ে পর্যন্ত শিক্ষার হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যে হারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার হার বাড়লো সেই হারে মরহুম বাদশা মিঞা চৌধুরীর মত মানব প্রেমিক সমাজ সেবক বাড়ে নি। আর সে কারণে আমাদের সমাজে অসহায়ত্ব ঘুচেনি। বরং নৈতিকতার অবক্ষয়ে সমাজে বেড়েছে হতাশা, অশান্তি, নিষ্ঠুর বর্বরতা ও নিরাপত্তাহীনতা। যা দূরীকরণে নিঃস্বার্থবান, সৎ, সাহস, আদর্শ ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত সচেতন সমাজসেবক বিশেষজ্ঞ সুচিকিৎসকের ভ‚মিকা পালন করতে পারেন। যারা দেশ ও দেশের মানুষকে অন্তর থেকে ভালবাসেন, তারা বর্তমান সমাজকে চরম এ ব্যাধি থেকে রক্ষা করতে বড় অবদান রাখতে পারেন। স্যার সৈয়দ আহমদ হতে এ যাবৎ যেসব ক্ষণ জন্মা সমাজ সেবক ও সংস্কারক যেভাবে সমাজকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষার জন্য সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টি করেছিলেন। ঠিক একই ভাবে আদর্শ শিক্ষা ও সৎ চরিত্র অর্জনের মাধ্যমে সমাজ হতে সকল অন্যায়, অত্যাচার, দুর্নীতি ও মাদকতার মত চরম ব্যাধি নির্মূলের জন্য সামাজিক আন্দোলন এ-মুহুর্তে অপরিহার্য। তা একমাত্র সম্ভব মানব প্রেমকে নিজের মধ্যে আত্মস্থ করে সংঘবদ্ধ হয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। এর জন্য বড় সহায়ক ও প্রেরণা হতে পারে মরহুম বাদশা মিঞা চৌধুরীর মত নি:স্বার্থ ও প্রচারবিমুখ সমাজসেবকের জীবনী। খুবই প্রয়োজন তাদের জীবনী নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা করা। এবং কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করা তাদের মহৎ কর্মকান্ড। প্রয়াত মরহুম আলহাজ্ব বাদশা মিঞা চৌধুরীর ৫২ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ইহাই আমাদের ঐকান্তিক কামনা হওয়া বাঞ্চনীয়।

লেখক: প্রাবন্ধিক