বাণিজ্যিক লেনদেনের অনুমোদন পেল প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক

21

দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই বিশেষায়িত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে বাণিজ্যিক লেনদেনের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ালো ৫৮তে। রবিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে তফসিলভুক্ত করার প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে।
জানা গেছে, প্রবাসীদের কল্যাণের লক্ষ্যে ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল চালু হয় প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। বিশেষায়িত ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০১৬ সাল থেকে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে আসার উদ্যোগ শুরু করে ব্যাংকটি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তফসিলভুক্তির জন্য ব্যাংকটির প্রয়োজন ছিল ৪০০ কোটি টাকার মূলধন। শেষ পর্যন্ত ওয়েজ আর্নার্স বোর্ডের জোগান দেওয়া অর্থেই ৪০০ কোটি টাকার মূলধন জোগাড় করেছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। এর মধ্যে মাত্র ২০ কোটি টাকা জোগান দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বর্তমানে ব্যাংকটির মূলধনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২৯ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাব জাবিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এতোদিন তফসিলি ব্যাংক না হওয়ার কারণে আমরা আমানত নিতে পারতাম না। এখন থেকে অন্যান্য ব্যাংকের মতো আমানত সংগ্রহ করতে পারবো। তিনি উল্লেখ করেন, তফসিলি ব্যাংক না হওয়ার কারণে আমরা সেই ভাবে রেমিটেন্স আনতে পারেনি, কিন্তু এখন আমরা পারবো। তার মতে, প্রচলিত ব্যাংকগুলো সঙ্গে প্রতিযোগীতায় টিকতে হলে আমাদের প্রডাক্ট বাড়াতে হবে। সময় লাগলেও আস্তে আস্তে আমরা পুরো ব্যাংকিং শুরু করবো।
জানা গেছে, যাত্রার পর থেকে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক বিদেশ গমনেচ্ছুদের জন্য ‘অভিবাসন ঋণ’ এবং বিদেশ ফেরতদের জন্য ‘পুনর্বাসন ঋণ’ দিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংকটি মোট ২৮ হাজার ৫২২ জন গ্রাহককে ২৯০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে। বর্তমানে ১৫ হাজার ৩৯৫ জন গ্রাহকের কাছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ১২৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ রয়েছে ৭ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৬ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ৫৭টি ব্যাংকই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেশি ছিল। এই সংখ্যা বাড়ানোর অর্থ ব্যাংক খাতকে বিপদে ফেলা। এ জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে তফসিলভুক্ত করা ঠিক হয়নি। তার মতে, তফসিলভুক্ত না করে দেশের যে কোনও বড় একটি বাণিজ্যিকের সঙ্গে চুক্তি করলেও চলতো।-খবর বার্তা সংস্থার

বর্তমানে দেশে সরকারি খাতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাচ্ছে ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ও দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক তফসিলভুক্ত হওয়ায় সরকারি খাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়াল নয়টি। ৪০টি বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি ৯টি বিদেশি ব্যাংক দেশে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর বাইরে রয়েছে বিশেষায়িত গ্রামীণ, আনসার-ভিডিপি, কর্মসংস্থানসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও ৩২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। যারা সীমিত আকারে ব্যাংক ও লিজিং ব্যবসা করছে।
এদিকে আরও তিন নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। ব্যাংক তিনটি হচ্ছে বাংলা ব্যাংক, পিপলস ব্যাংক ও সিটিজেন ব্যাংক লিমিটেড। পুলিশ ব্যাংক নামে আরেকটি ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্যও সরকারের কাছে আবেদন জমা দেওয়া রয়েছে। দেশি-বিদেশি মালিকানায় ‘কোরিয়া-বাংলা’ ব্যাংক নামে আরেকটি ব্যাংকের আবেদন জমা পড়েছে। এ ছাড়াও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ‘সমৃদ্ধির সোপান’ নামে আরেকটি ব্যাংক চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতির আকার অনুযায়ী নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। এ সমীক্ষাটি বাংলাদেশ ব্যাংক করেছিল ২০১০ সালে। যখন সরকার থেকে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ ছিল। ওই সমীক্ষার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই সময় স্পষ্ট করেই বলেছিল ‘দেশে নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত উপেক্ষা করে ২০১২ সালেই বেসরকারি খাতে ৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের লাইন্সেস দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মালিকানায় সীমান্ত ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, নতুন ৯টি ব্যাংক কার্যক্রম শুরুর তিন বছরের মাথায় বেশ কয়েকটি আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের ভারে আক্রান্ত। রয়েছে নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা। ফলে নতুন ব্যাংকগুলো বাজারে এসে মন্দের বোঝা আরও ভারী করেছে।