বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম, একদফা এবং এম.এ আজীজ

মোহাম্মদ মহসিন

11

আজ যে মানুষটিকে উপলক্ষ করে- স্মরণ করে লিখতে বসেছি তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম নেতা এমএ আজীজ । দীর্ঘ চার যুগ আগে এ মহান নেতার মৃত্যু ঘটে। ১৯৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি বিপুল ভোটে এম.এন.এ নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে ৪ জানুয়ারি ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে নির্বাচিত এম.এন.এ হিসেবে শপথগ্রহণ, অতঃপর ১০ জানুয়ারি বহদ্দার হাট ও ফটিকছড়িতে জীবনের শেষ জনসভায় ভাষণ প্রদান করেন। ১৯৭১ সালের ১১ জানুয়ারি দিবাগত রাত তিনি ইন্তেকাল করেন। দীর্ঘ চার যুগ আগে এ মহান নেতার মৃত্যু ঘটলেও যুগ পরম্পরায় প্রতি বছরের প্রারম্ভে ১১ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী আসে এবং নীরবে নিভৃত্যে চলে যায়। খবরের কাগজে তাঁকে নিয়ে প্রবন্ধ নিবন্ধ, স্মরণাঞ্জলি কিংবা লেখালেখি তেমন হয় না। দৈনিক আজাদী অথবা দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকায় প্রেস বিজ্ঞপ্তিসহ দু’একটি সংগঠন ঐ দিবস তাঁর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, মোনাজাত ও আলোচনা হয়। গতানুগতিক ধারায় চলতি বছর তাঁর মৃত্যু দিবস তেমনিভাবে পালিত হবে, ব্যতিক্রম হবে না- তা বলাই বাহুল্য। তাঁকে স্মরণ করতে হবে কেন ? দেশের জন্যে তাঁর কীইবা অবদান ? নতুন প্রজন্মের কাছে এ নেতার কর্ম ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক জীবন কেন তুলে ধরতে হবে ? হাজারো প্রশ্ন এসে যায়। আমার মনে হয় কর্ণফুলি, সাঙ্গু, মাতামুহূরী যতদিন বহমান থাকবে এম এ আজীজের মৃত্যুদিবস ততদিন এমনিভাবে পালিত হবে- ব্যতিক্রম হবে না। একজন ব্যক্তি আজীজের জন্ম, বেড়ে উঠা এবং মৃত্যু সমগ্রটাই রাজনৈতিক মোড়কে আবৃত্ত। তাঁর জন্মই রাজনীতির জন্য এবং চট্টলার রাজনীতি তাঁর জন্মের কারণে ধন্য। বিচিত্র গুণ এবং অসাধারণ রাজনৈতিক দুরদর্শিতা, রাজনীতিতে আদর্শগত অনমনীয় আপসহীন কঠোরতা ও দৃঢ়তা তাঁর চরিত্রের অনুকরণীয় দিক। তিনি ১৯৪৯ সালে মওলানা ভাসানী, শামশুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। দৃঢ় আপসহীন মানসিকতার কারণে তিনি জনগণের বিশ্বস্ত নেতা হিসেবে মৃত্যু পূর্ব মুহ‚র্ত পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এর পদে আসীন ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন আওয়ামী লীগের কান্ডারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও নীতির প্রতি অবিচল থেকে এম এ আজীজ চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে আওয়ামী লীগের ঝান্ডাবাহী শিপাহসালার হিসেবে মুজিব আদর্শ প্রচারে নিবেদিত থেকে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের সার্থক পরিণতির সোপান নির্মাণ করে দিয়ে গেছেন। মুক্তির চূড়ান্ত বিজয়ের অনতিকাল পূর্বে এম এ আজীজের তিরোধান, জীবদ্দশায় মুক্তির বিজয় আনন্দে উল্লসিত হতে না পারলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে বাঙালি মুক্তির ত্রাণকর্তা, অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে এতদ্অঞ্চলের মানুষের কাছে তিনি এখনো অনুস্মরণীয়- অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে বিরাজমান। বিশ্বে যত জাতি-গোষ্ঠী কিংবা জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তার মধ্যে বাঙালি এমন এক জাতি, যে জাতির স্বরূপ, বৈশিষ্ট্য বহুবিচিত্র, বহুমাত্রিক। উপনিবেশিক আমলে বহু জাতির মেলামেশার কারণে সৃষ্ট সংমিশ্রণ বাঙালির অস্থিমজ্জায় একাকার। তাই নৃতাত্ত্বিক বিবেচনায় বাঙালি বর্ণশংকর জাতি। বর্ণশংকর এ জাতি চিন্তা-চেতনায়, কর্মে ও মননে স্বাভাবিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন। ভিন্ন পথ এবং মতের মানুষগুলোর মধ্যে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা দুঃসাধ্য। এ জনপদের জনগণের মাঝে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা প্রবলভাবে সৃষ্টি করা এবং এতদ্লক্ষ্যে তাদেরকে উজ্জীবিত করা ঐতিহাসিক বাস্তবতা বিবেচনায় একটি জটিল ও কঠিন কাজ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বহু মত ও আদর্শে সহজাতভাবে বিভাজিত বাঙালি জাতিকে ঐক্যের মহান মন্ত্রে দীক্ষিত করে ইস্পাত কঠিন প্রাচীর রচনার মত সুকঠিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন । এ কাজে তাঁর প্রধান সহচর ছিলেন মরহুম জননেতা এমএ আজীজ । ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, দেশ বিভাগ পূর্ব উপনিবেশিককালীন সময়ে সামন্তবাদী মুৎসুদ্দি এবং তাদের দোষরদের দ্বারা এ ভূখÐের মানুষ যখন বঞ্চিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত তখন থেকেই বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর সহযোগীরা দেশের অধিকার হারা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ব্যাপৃত থেকে আমজনতার নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। যে যাই বলুক বঙ্গবন্ধুর সেই আদর্শ- অধিকার হারা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার মন্ত্রে উজ্জীবিত সহকর্মী হিসেবে অনেকেই থাকতে পারেন, কিন্তু চট্টলার এই ঐতিহাসিক জনপদে জনাব এম এ আজীজই তাঁর যোগ্য ও বিশ^স্ত সহচর ছিলেন তা সন্দেহাতীত। অনেক ত্যাগ তিতীক্ষা, আন্দোলন-সংগ্রাম, কারাভোগ, নির্যাতন ও নিপীড়ন সহ্য করে মুজিব আদর্শ প্রতিষ্ঠার লড়াকু সৈনিক হিসেবে এমএ আজীজ চট্টলার আওয়ামী রাজনীতি আদর্শের বুনিয়াদ রচনার মাধ্যমে মুক্তির যে স্বপ্ন বীজ বপন করে গেছেন এ প্রজন্মের আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীদের জন্য তা অনুপ্রেরণা ও পথচলার দিশা হয়ে থাকবে। বিচ্ছিন্ন মানসিকতা , নানান পথ মতে বিভক্ত মানুষের মধ্যে মুক্তির আকাক্সক্ষা সৃষ্টি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি সফল ও সঠিক বাস্তবায়ন, বাঙালি জাতীর মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ছয় দফার তরণী সঠিক পথে পরিচালিত করার ক্ষেত্রে এম এ আজীজের দিশারীসুলভ ভূমিকা চট্টলার মানুষ যুগ যুগ ধরে স্মরণ রাখবে। হিমাদ্রীর মত অটল , অজেয় দুর্বোধ্য প্রাচীরের ন্যায় অবিচল নীতি আদর্শ এবং অমিত সাহস ও তেজদীপ্ততার কারণে তিনি চট্টল শার্দুল। কোন অপশক্তি ও বিভ্রান্তি তাঁকে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের ধ্যান জ্ঞান থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ছয় দফার তিনি প্রথম সমর্থক এবং তাঁরই সমর্থনে ১৯৬৬ সালে ২৫ ফেব্রুয়ারি লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। এর ফলশ্রæতিতে বঙ্গবন্ধু এবং এমএ আজীজসহ অনেক নেতা-কর্মী গ্রেফতার হন। এম এ আজীজ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন ছয় দফা দিয়ে বাঙালির মুক্তি বিলম্বিত হবে। তাই ১৯৭০ সালে ১৫ মে এমএ আজীজ বললেন ‘ছয় দফা গ্রহণ করা না হলে দেশ বিভক্ত হয়ে যাবে তখন মাত্র এক দফার আন্দোলনই শুরু হবে’। পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এমন বক্তব্য প্রদানের কারণে ১৯৭০ সালের ১৮ জুলাই তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন। এম এ আজীজ সহ অন্যান্য নেতা কর্মীদের মুক্তির দাবি সহকারে ১৯৭০ সালের ২৭ জুলাই ‘আজীজ দিবস’ পালন করা হয়। এমএ আজীজ ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ব্যাপক বিজয় নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং তাঁর এই দুরদর্শি উপলব্ধি থেকে তিনি ১৯৭০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পুনরায় উচ্চারণ করলেন ‘জনগণের প্রদত্ত রায় নস্যাৎ করার চক্রান্ত রুখতে এখন আমাদের এক দফার আন্দোলন শুরু করতে হবে’। রাজনীতির এই ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার দৈববাণী বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের পরবর্তী ঘটনা প্রবাহেরই সাক্ষ্য বহন করে। এমএ আজীজের ১৯৭০ সালের ১৫ মে চট্টগ্রামের পলোগ্রান্ডের জনসভায় বঙ্গবন্ধরু উপস্থিতিতে দেশ বিভাগ ও এক দফার আন্দোলন শুরু করার আশাজাগানীয়া বক্তব্য আর বঙ্গবন্ধুর দেওয়া রেসকোর্স এর ৭ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা বক্তব্য কাকতালীয়ভাবে তাঁদের গোপন পরামর্শের সার্থক বহিঃপ্রকাশই বলা যায়। উক্ত বিবেচনায় এমএ আজীজ বঙ্গবন্ধুর যোগ্য ভাবশিষ্য। শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু অভিধায় অভিষিক্ত হলেও চট্টলার এ জনপদে এমএ আজীজ চট্টল শার্দুল বিশেষণে বিশেষিত। মূলতঃ নীতি আদর্শ, প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক মননশীলতা, দেশপ্রেম, নিঃস্বার্থপরতা, নির্লোভ-নির্মোহতা দেশ মাতৃকার প্রতি চরম ও পরম দায়বদ্ধতা বঙ্গবন্ধুর মত এমএ আজীজও রাজনীতির এক বিশাল মহীরূহ। এম এ আজীজের মত আর একজন ত্যাগী শালীন রাজনৈতিক ব্যক্তির কী জন্ম হবে? যার হাত ধরে চট্টলার আওয়ামী রাজনীতি আরো বেশি পরিশীলিত হয়ে বহুদূর এগিয়ে যাবে। আরো বলা যায়, বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম, এক দফা এবং এমএ আজীজ একই সূত্রে গাঁথা। স্বাধীনতা উত্তরকালে আওয়ামী লীগ ছিল এমএ আজীজের মত প্রকৃত মানুষের সংগঠন। এমএ আজীজের মত ত্যাগী ও নির্লোভ নেতৃত্বের গুণে আওয়ামীলীগ নামের সংগঠনটি এখনো জনপ্রিয়। আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্য স্থানে এমএ আজীজের মত শোভন আন্তরিক মানুষেরা আসীন থাকলে শুধু তাঁর আত্মাই শান্তি পাবে না, জাতিও বিজয় গৌরবে দীপ্ত হবে, এটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি।
লেখক : প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত), ফতেপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়