বাংলা ভাষায় শ্রীচৈতন্যপ্রভাব

ড. শ্যামল কান্তি দত্ত

312

শ্রীচৈতন্য (১৪৮৬-১৫৩৩) বাঙালি না ওড়িয়া এ নিয়ে বিতর্ক চলে। কিন্তু বাঙালির সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতিতে সর্বোপরি বাংলা ভাষার জগতে শ্রীচৈতন্যের বিপ্লবী ভূমিকা অবিসংবাদিত। মহাপ্রভুর পিতামহ মৈথিলী ব্রাহ্মণ উপেন্দ্র মিশ্র ১৪৫১ খ্রিষ্টাব্দে কটক জেলার যাজপুর থেকে সিলেটের ঢাকাদক্ষিণ গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। আবার মহাপ্রভুর পিতা জগন্নাথ মিশ্র ১৪৬৬ খ্রিস্টাব্দে সিলেট ছেড়ে সস্ত্রীক চলে যান ভাগীরথী তীরবর্তী নবদ্বীপে। সেখানেই নিমাই-এর জন্ম, বেড়ে ওঠা ও অধ্যাপনা। তবে ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে সন্ন্যাস গ্রহণের পর ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান ভ্রমণ করলেও অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেন উড়িষ্যার পুরী বা নীলাচলে। উড়িষ্যাতেই তাঁর জীবনাবসান; বিশেষতঃ শেষ আঠারো বছর তিনি পুরী ছেড়ে কোথাও যাননি। তবু বৈষ্ণব কবি বলেন, ‘বাঙালির হিয়া অমিয় মথিয়া নিমাই ধরেছে কায়া।’ -বাঙালির জীবনে ও বাংলা ভাষায় চৈতন্য প্রভাবের স্বরূপ ও তাৎপর্য কবির এ উক্তি থেকে সহজেই অনুধাবন করা যায়।
যৌবনে নিমাই নবদ্বীপে টোল খুলে অধ্যাপনা করেন। ব্যাকরণ শাস্ত্রে প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ন্যায়শাস্ত্রের একটি টীকা রচনা করেন বলে জনশ্রুতি থাকলেও আমাদের জানা মতে শ্রীচৈতন্য নিজে কোনো গ্রন্থ রচনা করে যাননি এবং ভক্তদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো শাস্ত্রও তৈরি করেননি। তিনি প্রায়শ সংস্কৃত কবি জয়দেব, মৈথিলি কবি বিদ্যাপতি ও বাঙালি কবি চণ্ডীদাসের পদাবলী শুনতেন:
বিদ্যাপতি জয়দেব চণ্ডীদাসের গীত।
আস্বাদয়ে রামানন্দ স্বরূপ সহিত ॥
চণ্ডীদাস বিদ্যাপতি রায়ের নাটকগীতি
কর্ণামৃত শ্রীগীতগোবিন্দ।
স্বরূপ রামানন্দ সনে মহাপ্রভু রাত্রি দিনে
পায় শুনে পরম আনন্দ ॥ (চৈতন্যচরিতামৃত)
এ থেকে তাঁর ভক্তসমাজে পদাবলী রচনায় ও গানে আধ্যাত্মিক মূল্য আরোপিত হয়। বলা বাহুল্য, পনেরো, ষোল, এমনকি সতেরো শতকেও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বাংলা-উড়িষ্যার আজ যতটা পার্থক্য, ততটা ছিল না। এমনকি ভাষার দিক থেকেও নয়। এর ফলে সাধারণ প্রান্তিক ভক্তসমাজের উদ্দেশ্যে অসংস্কৃত ভাষায় পদাবলী রচনার প্রাচুর্য দেখা দেয়। ফলে বাংলা ভাষায় পদাবলী সাহিত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। চৈতন্যের জীবনচরিতও রচিত হতে থাকে সংস্কৃতের পাশাপাশি বাংলা ভাষাতে। বাংলা সাহিত্য দেবদেবী নির্ভর মঙ্গলকাব্য ও নাথসাহিত্যের প্রাচীর ভেদ করে প্রবেশ করে জীবন্ত মানুষের কাহিনী বর্ণনায়। ড. অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় যথার্থই বলেন, ‘চৈতন্যপ্রভাবেই বাংলা ভাষা গোঁড়া ব্রাহ্মণের নিকটও সংস্কৃতের ন্যায় আদরণীয় হয়ে ওঠে।’
শ্রীচৈতন্যের প্রথম জীবনীগ্রন্থ সংস্কৃত ভাষায় রচিত-মুরারী গুপ্তের শ্রীশ্রীকৃষ্ণচৈতন্যচরিতামৃতম (১৫৪২)। তবে বাংলা ভাষায় শ্রীচৈতন্যের প্রথম জীবনীকাব্য বৃন্দাবন দানের শ্রীচৈতন্যভাগবত (১৫৪৮)। এখানে কবি মহাপ্রভু সম্পর্কে বলেন:
সভার সহিত প্রভু হাস্য কথা রঙ্গে।
কহিলেন যেন মত আছিলেন বঙ্গে ॥
বঙ্গদেশি বাক্য অনুকরণ করিয়া।
বাঙালেরে কদর্থেন হাসিয়া হাসিয়া ॥
বিশেষ চালেন প্রভু দেখি শ্রীহট্টিয়া।
কদর্থেন সেই মত বচন বলিয়া॥ (চৈতন্যভাগবত)
এ থেকে প্রমাণিত হয় শ্রীচৈতন্যের পাণ্ডিত্য ভাষাশাস্ত্রেও বিস্তৃত ছিল। তিনি বহুভাষাবিদ পণ্ডিত ছিলেন। সংস্কৃতসহ বিভিন্ন ভাষায় তিনি সাহিত্যরস আস্বাদনের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের সাথে আলাপ-আলোচনায় শ্রোতার মাতৃভাষায় শুধু নয় ঐ ভাষার বাচনভঙ্গি বা ঢং অনুসরণ করে কথা বলতে পারতেন। তিনি বাংলাতো বলতেনই, এমনকি সিলেটি পেলে বাংলার উপভাষা সিলেটি ভাষাতেও কথা বলতেন। অথচ আজও আমাদের অনেকে আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষাকে অশিষ্ট বা অশ্লীল ভাষা মনে করেন। যদিও ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে উপভাষা মূল ভাষার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্বরূপ। চৈতন্যের এমন উদার আচরণ তাঁর বৈষ্ণব ধর্মের কারণেই সম্ভব হয়েছে। তাঁর ‘বৈষ্ণব’ ধারণা যেমন উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ সব গোষ্ঠীকে এক আসনে বসানোর এক অভূতপূর্ব বৈপ্লবিক প্রয়াস, তেমনি ভাষার ক্ষেত্রেও অস্পৃশ্যতা বা ছুৎ-মার্গ ঝেড়ে ফেলতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর কাছে ‘দেবভাষা’, ‘মানবভাষা’ বা ‘পক্ষীভাষা’ কোনো ভেদাভেদ সৃষ্টি করতে পারেনি; মানুষ যেমন অমৃতের সন্তান, বিভিন্ন ভাষাও তেমনি তাঁর কণ্ঠে ফুটেছে অমৃত বুলি হয়ে। শ্রীচৈতন্যের পার্ষদগণও নির্দিষ্ট এক অঞ্চলের ছিলেন না। তাঁদের:
‘কার জন্ম নবদ্বীপে কার চাটিগ্রামে।
কেহ রাঢ় ওড্রদেশে শ্রীহট্টে-পশ্চিমে ॥’ (চৈতন্যভাগবত)
এতে করে নবদ্বীপ-উড়িষ্যার সাধারণ মানুষজন তাদের মাতৃভাষা শুনতে পায় মহাপ্রভুর মুখে। দেবভাষা আর সাধারণ ভাষার মধ্যে বৈষম্য ঘুচে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্কৃত, বাংলা, উড়িয়া এবং সিলেটিসহ আরও বিভিন্ন উপভাষা ভেদাভেদ ভুলে বসে ভক্তি-সাহিত্যের একই পঙক্তিতে। কেননা শ্রীচৈতন্য আবির্ভূত হন যে নতুন দর্শন নিয়ে তা – ‘অচিন্ত্যভেদাভেদতত্ত্ব’ নামে সমধিক পরিচিত।
পিতা-মাতা সিলেটি হলেও শ্রীচৈতন্যর জন্মভূমি নবদ্বীপ। সুতরাং তাঁর মাতৃভাষা নবদ্বীপের তৎকালীন বাংলা ভাষা হবার কথা; কিন্তু কেমন ছিল সে মুখের ভাষা তাঁর প্রত্যক্ষ নিদর্শন ( বা ভিডিও ক্লিপ) আজ আমাদের নাগালে নেই। তবে চৈতন্যভাগবত গ্রন্থের ভূমিকায় ড. সুকুমার সেন লিখেন, ‘বৃন্দাবনদাসের গ্রন্থে তাঁহার সমসাময়িক ভাষা প্রায় সবটাই অনবলুপ্ত রহিয়াছে। … ইহাতে সমকালীন ভাষার সমীচীনতা যথাসম্ভব বজায় আছে।’ ভারতীয় আধুনিক ভাষার সাহিত্যে এ অভিনব সৃষ্টিকে স্মরণ করে কৃষ্ণদাস তাঁর চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে লিখেন:
‘বৃন্দাবনদাসের চরণ করি ধ্যান।
তাঁর আজ্ঞা লয়ে লিখি যাহাতে কল্যাণ ॥’ (চৈতন্যচরিতামৃত)
বৃন্দাবনদাসের গ্রন্থে শ্রীচৈতন্যের সরাসরি উক্তি বা উদ্ধৃতি নেই; তবু বৃন্দাবনদাস তাঁর গ্রন্থ-ভাষা ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে ঘোষণা করেন:
‘কাষ্ঠের পুত্তলী যেন কুহুকে নাচায়।
এই মত গৌরচন্দ্র মোরে যে বোলায় ॥’ (চৈতন্যভাগবত)
এ থেকে শ্রীচৈতন্যের ভাষার প্রতি বৃন্দাবনদাসের আনুগত্য সহজেই অনুমেয়। ফলে চৈতন্যভাগবত-র আলোকে বাংলা ভাষায় শ্রীচৈতন্যের প্রভাব পর্য়ালোচনা করলে দেখা যায়, যে চৈতন্য বড় হয়ে ধর্ম বর্ণের বিভেদ ভুলে সবাইকে এক করে ভক্তির জোয়ারে ভাসাবেন, তিনি শিশুকালেই:
‘তাবৎ কান্দেন প্রভু কমললোচন।
হরিনাম শুনিলে রহেন ততক্ষণ॥ …
জানিয়া প্রভুর চিত্ত সর্বগণ মিলি।
সবাই বলেন হরি দিয়া করতালি ॥’ (চৈতন্যভাগবত)
বাঙালি সমাজে শিশুকে লালন-পালন বা দেখাশোনার জন্য তার পাশে নারীরাই থাকেন। সুতরাং এখানে সর্বজন বলতে নারীদেরকে বোঝাবে। যে সমাজে ‘বামন চিনি পৈতা দেখে’ বামনী চেনার উপায় নেই ; বৈদিক যজ্ঞানুষ্ঠানে নারীর প্রবেশাধিকার দূরে থাক নারী হরি ধ্বনিও দিতে পারে না সে শুধু উলুধ্বনি দেবার অধিকার পায়-সেই সমাজের নারীকে হরিনাম করতে বাধ্য করেন নিমাই তাঁর শিশু বয়সেই। নারী আর ফিসফিসিয়ে কথা বলছে না, বা শুধু ঘুমপাড়ানি গীত গাইছে না। শ্রীচৈতন্যর প্রভাবে নারী এবার নিজের ভাষায় উচ্চস্বরে হরি নাম কীর্তন করছে হাতে তালি দিয়ে। এতে করে এত দিনের অন্তঃপুরের বাংলা ভাষা প্রকাশ্য ভাষা হিসেবে আবির্ভূত হয়। বাংলা ভাষা পায় বৈঠকী ও কীর্তনের ভাষার মর্যাদা। পরিণত বয়সে তাঁর বৈপ্লবিক বৈষ্ণব ধর্মান্দোলনের ফলে নিত্যানন্দের স্ত্রী জাহ্নবী দেবী খেতুরীর গুরুত্বপূর্ণ বৈষ্ণব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন; কবি জ্ঞানদাসকে দীক্ষা দিয়েছেন। এছাড়া শ্রীনিবাসের কন্য হেমলতাও দীক্ষাদান করতেন। এভাবে নারীপুরুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সমাজের নারী ভাষাকেও আলোকিত করে। ঘরোয়া বাংলা ভাষা ক্রমে সাহিত্যের ও সামাজিকতার ভাষায় রূপান্তরিত হয়।
কৈশোরে নিমাই হারিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ বর্ণনায় চৈতন্যভাগবত-এ প্রথম মহাপ্রভুর উক্তি পাওয়া যায়:
‘প্রভু বোলে আমি গিয়াছিলাম গঙ্গা তীরে।
পথ হারাইয়া আমি বেড়াই নগরে ॥
তবে দুইজন আমা কোলেতে করিয়া।
কোন পথে এইখানে থুইল আনিয়া ॥’ (চৈতন্যভাগবত)
শ্রীচৈতন্যের এই উক্তিতে তৎসম শব্দ পাওয়া যায় না। স্থাপিল বা রাখিল ক্রিয়া ব্যবহার না করে ‘থুইল’ ক্রিয়ার ব্যবহার প্রাকৃত বাংলা ভাষার মর্যাদা বাড়িয়েছে। এভাবে শ্রীচৈতন্যের বাল্যলীলার হাসি কৌতুকময় চমৎকার ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন বৃন্দাবনদাস:
‘হাসিয়া বলেন প্রভু শ্রীচন্দ্র বদনে।
আমার কি দোষ বিপ্র ডাকিল আপনে ॥ …
হাসিয়া কহেন প্রভু আমি সে গোয়াল।
ব্রাহ্মণের অন্ন আমি খাই চিরকাল ॥ …
প্রভু বলে ওহে বিপ্র তুমি তো উদার।
তুমি আমা ডাকি আন কি দোষ আমার ॥
মোর মন্ত্র জপি মোরে করহ আহ্বান।
রহিতে না পারি আমি আসি তোমা স্থান ॥
আমারে দেখিতে নিরবধি ভাব তুমি।
অতএব তোমারে দিলাম দেখা আমি ॥’
এসব বর্ণনায় বালক নিমাইয়ের মুখে যে ভাষার নমুনা আমরা পাই, তাতে
খুব সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া পুরোটাই আধুনিক বাংলা গদ্যভাষার অনুরূপ। অন্যভাবে বললে, গ্রাম বাংলার পটভূমি আর মুখের ভাষাকে আমরা প্রত্যক্ষ করি এ বর্ণনায়। এটা সম্ভব হয়েছে শ্রীচৈতন্যের মানবিক প্রেমধর্মের কারণে। এর পটভূমি রচিত হয় তাঁর সমসাময়িক কিংবা কিছুটা পূর্ববর্তী কবি চণ্ডীদাসের পদ রচনার মধ্যদিয়ে। চতুর্দশ শতকে চণ্ডীদাস বলেন :
‘শোনো হে মানুষ ভাই-
সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।্থ
চণ্ডীদাস বা চৈতন্যের এ চেতনা কিন্তু স্বজাত বা একেবারে নতুন নয়, ভারতবর্ষে হাজার হাজার বছর আগে থেকেই মানবধর্মের কথা-মানুষের মহত্বের কথা সগৌরবে বর্ণিত হয়েছে-খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রচিত মহাভারত-এ শরশয্যায় শায়িত ভীষ্মের উক্তি:
গুহ্যং ব্রহ্ম যদিদং তে ব্রবীমি
ন মানুষাচ্ছ্রেষ্ঠতরং হি কিঞ্চিৎ।
অর্থাৎ,
তোমারে একটা গুহ্য কথা জানাই
মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর কিছুই নাই।
শ্রীচৈতন্য এবার নতুন করে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের গুহ্য বা গোপন কথাটি শুধু প্রকাশ করলেন না খোল করতাল নিয়ে দল বেধে কীর্তন করতে করতে মানুষকে মনে করিয়ে দিলেন। মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের মুখের ভাষাও মর্যাদা লাভ করল-দেবভাষা সংস্কৃত আর মানব ভাষা বংলার মর্যাদা সমস্তরে পৌঁছাল। বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চার সংকোচ ঘুচে গেল চিরতরে।
শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের আগে বাংলা ভাষার চর্চা যে হয়নি তা কিন্ত নয়। একটু সচেতনভাবে লক্ষ্য করলে আমরা দেখব শ্রীচৈতন্যের প্রভাবে তাঁর পূর্ববর্তী বাংলা ভাষার সাথে পরবর্তী বাংলা ভাষার বিস্তর ব্যবধান। বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ। ধর্ম প্রচারের সুবিধার্তে চর্যাপদ প্রত্ন বাংলা ভাষায় লেখা হলেও আচার্য মুনিদত্ত তার টীকাগ্রন্থ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি লিখেন সংস্কৃত ভাষায়। শাসকগণের কূটনৈতিক কারণে মঙ্গলকাব্য ও অনুবাদ সাহিত্য বাংলায় রচিত হলেও কবি-অনুবাদকগণ দ্বিধা-সংকোচ মুক্ত ছিলেন না। বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য তাঁরা কৈফিয়ত দিয়েছেন। কখনও বলেছেন, ‘লোক নিস্তারিতে কহি লৌকিক ভাষে’ ; আবার কখনও স্বপ্নাদেশের বৃত্তান্ত অবতারণা করেছেন। অথচ চৈতন্যপ্রভাবে তার পরবর্তী কবি-সাহিত্যিক তথা সমাজের সকল স্তরের মানুষের বাংলা ভাষা সম্পর্কে সমস্ত দ্বিধা ও সংকোচ গেল ঘুচে। ফলে সতেরো শতকের মুসলিম কবিও বাংলাকে ভালোবেসে সক্রোধে গালি দিতে সাহস পান:
‘যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সবে কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি ॥ (আবদুল হাকিম)।
একুশ শতকের ভাষাবিজ্ঞানীর ভাষায় বলা যায়: ‘ঘরোয়া কথ্য ভাষার নগণ্য ভিত্তি থেকে মধ্যযুগের বাংলা ভাষা যে কালক্রমে একটি বর্ধিষ্ণু ও সৃজনশীল ভাষায় উন্নীত হয়েছিল তার মূলে আছেন চৈতন্যদেব, আর আছে তাঁর গণমুখী কীর্তন আন্দোলন। বাংলা ভাষার ক্রমবিকাশের ইতিহাসে চৈতন্যদেব তাই অবিস্মরণীয় প্রাণপুরুষ।’ (মৃণাল, ২০গ৯: ১০২)। তবু আক্ষেপ শ্রীচৈতন্য পরবর্তী যুগে বাংলা ভাষা বৈষ্ণবপদাবলী ও জীবনীসাহিত্য ইত্যাদি রচনায় ভক্তি আর কবিত্বের যে তূঙ্গ স্পর্শ করেছিল সেই উজ্জ্বলতা আর গভীরতা পরবর্তী সময়ে আর পাওয়া যায়নি। ড. সুকুমার সেন অনুমান করেন, ‘চৈতন্যের তিরোধানের পরে বাংলাদেশের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছু বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছিল।’ (সুকুমার, ১৯৬৩: ১১)। আর ড. দীনেশচন্দ্র সেন লিখেন যে শ্রীচৈতন্যের তিরোধানের পর বৈষ্ণবেরা এমন শোকাহত হয়েছিল যে পঞ্চাশ বছর তারা এই বাংলায় কীর্তন পর্যন্ত করা ভুলে গিয়েছিল। অনুমান করা যায়, শ্রীচৈতন্যের আকস্মিক জীবনাবসানের পর তাঁর বিপ্লবের একটি প্রতিবিপ্লব সূচিত হয়- যা তাঁর ‘অচিন্ত্যভেদাভেদতত্ত্ব’ বিরোধী ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ-সামন্তবাদ’। তুর্কী-মোগল আমলে রাজভাষা হয় ফারসি আর ইংরেজ আমলে ম্যাক্সমূলারের আর্যনীতিতে আস্থা রেখে নিজেদেরকে ইংরেজের সমগোত্রীয় ভাবতে থাকা পণ্ডিতগণ সংস্কৃত থেকে ধার করে আনা অলঙ্কারে ও সমসবদ্ধ শব্দে ভারাক্রান্ত করে বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের দুহিতা বানাতে ব্যস্ত হন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ যে প্রকৃত বাংলা ভাষার স্বপ্ন দেখেছেন, সে লোকায়ত বাংলা ভাষা প্রথম সফলভাবে সাহিত্য সভায় এসেছিল চৈতন্যপ্রভাবেই। বর্তমানে বাংলা ভাষা যে অন্তর্জাল-আন্তর্জাতিকতার আলোয় অবহেলিত তা থেকে মুক্ত করার উপায়ও ঐ শ্রীচৈতন্যের চেতনাজাত মানবিক প্রেম-ভক্তি তথা ‘অচিন্ত্যভেদাভেদতত্ত্ব’ চর্চায়।
তথ্যনির্দেশ