বাংলা বানানের নিয়ম ও কানুন

ড. শ্যামল কান্তি দত্ত

100

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের সংবিধানের মূলনীতিগুলো আমরা অটুট রাখতে পারিনি পুরোপুরি। তেমনি সংবিধানের প্রথম ভাগ তৃতীয় অনুচ্ছেদে-‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’ ঘোষিত হলেও, আজও আমরা কোনো ভাষানীতি প্রণয়ন করতে পারিনি। গ্রহণ করতে পারিনি পূর্ণাঙ্গ ভাষাপরিকল্পনা। কেননা, কার্যকরী ভাষানীতি চালুকরতে গেলে তো প্রথমেই দরকার সুষ্ঠু ভাষাপরিকল্পনা। যদিও ভাষানীতি ব্যতিরেখে ভাষাপরিকল্পনা উদ্দেশ্যহীন এবং অসার হতে বাধ্য। ভাষাপরিকল্পনার দুটো ভাগ: মর্যাদা পরিকল্পনা ও অবয়ব পরিকল্পনা। আশার কথা বাংলা একাডেমি বাংলা ভাষার অবয়ব পরিকল্পনার নিরলস প্রয়াস অব্যাহত রেখেছেন। অঙ্গ, উপাদান বা অবয়ব পরিকল্পনা বলতে বোঝায় ভাষার বানান প্রমিতকরণ, উচ্চারণে সমতা আনয়ন, পরিভাষা প্রণয়ন ও প্রমিত ব্যাকরণ-অভিধান নির্মাণ। সরকারও সম্প্রতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন : পাঠ্যপুস্তকে, রাষ্ট্রীয় কাজে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায়-অভিসন্দর্ভে বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বানানরীতি অনুসরণের।
জাতীয়ভাবে অভিন্ন বাংলা বানান চালু করার লক্ষ্যে ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। ২০১২ সালে এর পরিমার্জিত সংস্করণ চ‚ড়ান্ত করা হয় এবং আশা করা হয়, এতে ‘বাংলা বানান প্রমিতকরণ ও সমতা বিধানে সহায়ক হবে।’ ২০১৫ সালে পরিমার্জিত সংস্করণের প্রথম পুনর্মূদ্রণ প্রকাশিত হয় এবং এতে একাডেমি বানানে ই-কার (ি ) ব্যবহৃত হয়। কেননা, ‘বাংলা একাডেমী’ নামটিই ২.১ নম্বর নিয়ম অনুযায়ী বানানে ছিল না। অবশ্য, ৪ নম্বর নিয়মে বলা আছেÑব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার নাম এই নিয়মের আওতাভুক্ত নয়। তবু একাডেমি নিয়ম মেনে নিজের নাম পরিবর্তন করেছে; এটি আশার কথা, যদিও বাংলাদেশে এ পুস্তিকাটি অভিন্ন বানান প্রচলনে সফল হচ্ছেÑবলা যায় না। এর কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে আমাদের অভিমত জানাতে চাই।
প্রথমেই মনে রাখা চাই, ভাষা নদীর ¯্রােতের মতো প্রবহমান; সুতরাং, তার অবয়ব বা বানানও পরিবর্তনশীল। পরিবর্তনের মধ্যেও ভাষার বানান তার অতীত-ঐতিহ্যকে মুছে ফেলে না একেবারেই। আর একারণেই আধুনিক কোনো ভাষার বানানই উচ্চারণানুগ নয়। তবু রাষ্ট্র তার ঐক্য ও জাতীয়তাবোধের বিকাশের লক্ষ্যে প্রমিত বানানের নিয়ম প্রণয়ন করে। যা আসলে আইন-কানুন বা বিধান প্রণয়নের মতোই। ‘কেননা বানানের বিধান ব্যাকরণের নিয়ম নয়, বিধান বা কানুন মাত্র।’ তাই প্রথম সংস্করণের মুখবন্ধে লেখা হয়: ‘এইসব নিয়ম বা এইসব বানানে ব্যাকরণের বিধান লঙ্ঘন করা হয়নি।’ এবং ইঙ্গিত করা হয়: ‘এটি কোনো বানান-সংস্কারের প্রয়াস নয়।’ অথচ, পুস্তিকার উদাহরণে উল্লেখ না থাকলেও ২.১ নিয়ম অনুযায়ী ঈদ, শহীদ, ঊনিশ ইত্যাদি বানান সংস্কার করে ইদ, শহিদ, উনিশ ইত্যাদি লিখতে হয়। যুক্তি দেওয়া যায়, এটি ১৯৮৮ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ৪ নম্বর বানানের নিয়ম। সুতরাং, নতুন সংস্কার নয়। তবু আমাদের মনে হয়, ১৯৮৪ সালে প্রণীত স্কুল টেকস্টবুক বোর্ড প্রণীত ১১ নম্বর নিয়ম বজায় থাকলে এমন সংস্কারের প্রয়োজন হতো না। সেখানে আছে: বিদেশী শব্দের শেষে ই (ি ) অথবা ঈ ( ী) থাকলে ই (ি ) কার হবে। অর্থাৎ শব্দে আদি ও মধ্যের ঈ পরিবর্তনে প্রস্তাব সেখানে ছিল না।
পুস্তিকার প্রথম নিয়ম অর্থাৎ ১.১ নম্বর নিয়মে আছে: এই নিয়মে বর্ণিত ব্যতিক্রম ছাড়া তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের নির্দিষ্ট বানান অপরিবর্তিত থাকবে। কিন্তু নিয়মটির কোনো উদাহরণ নেই। অথচ, মুখবন্ধে আছে: ‘প্রতিটি নিয়মের সঙ্গে বেশি করে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে যাতে নিয়মটি বুঝতে সুবিধা হয়।’ (পৃ. ১১)। এমন অসঙ্গতি পুস্তিকাটিতে চোখে পড়ার মতো হলেও দীর্ঘ দিন ধরে বিশেষজ্ঞ কমিটির নজরে আসেনি কেনÑতা বোধগম্য নয়। এভাবে ১.৪ নিয়মে ‘সংগীত’ বানানের বিকল্প ‘সঙ্গীত’ বর্জন করা হল। অথচ ১.৫ নিয়মে ইন্-প্রত্যয়ান্ত শব্দের সমাসবদ্ধ রূপে সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম-অনুযায়ী হ্রস্ব ই-কার হয়Ñমেনে নিয়েও সংযুক্ত করা হয়: ‘ঈ-কারের ব্যবহারও চলতে পারে।’ এতে করে অসমতা উসকে দেয়া হল। এখন ‘মন্ত্রিপরিষদ’ এবং ‘মন্ত্রীপরিষদ’ দুটি বানানই প্রমিত বানান। যদিও দ্বিতীয় বানানটি বাংলাদেশে প্রচলিত নয়। বরং, ‘সঙ্গীত’ প্রচলিত বানান অথচ প্রমিত বাংলা বানানে তা বর্জিত।
অতৎসম শব্দ ‘কী’ এর পদ-পরিচয় সর্বনাম, বিশেষণ, ক্রিয়া-বিশেষণ ও যোজক পদ বলে উল্লেখ করা হলেও ‘কি’ কোন পদ তা উল্লেখ করা হয়নি। বলা বাহুল্য, ‘কি’ ক্রিয়া-বিশেষণ পদাণু। ৩.২ নম্বর নিয়মের উদাহরণে ‘সুন্দরী মেয়ে’ বাংলা লিঙ্গান্তরের অপপ্রয়োগ। কেননা, বাংলা ভাষায় বিশেষণের লিঙ্গান্তর হয় না। ২.৬ নম্বর নিয়মে ইসলাম ধর্ম-সংক্রান্ত কয়েকটি শব্দে বিকল্প বানান লেখা হয়েছে। আমাদের মনে হয় এই নিয়মে আরবি ভাষা থেকে আগত ও বাংলায় বহুল প্রচলিত ঈদ, শহীদ, কুরআন ইত্যাদি বানান বিকল্প হিসেবে সংযুক্ত করা যেতে পারে। বানানগুলোর সাথে এদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভ‚তি জড়িত। তাঁদের অনেকে ইদ, শহিদ, কোরান ইত্যাদি বানানের প্রস্তাবকে কালো কানুন ভাবেন। সুতরাং, মানুষের অন্তরে বিধান চালানো বিধাতার হাতেই থাকুক।
আপাতত, এধনের বিকল্প বানান সংযুক্ত করে এবং আরও কিছু অসংগতি দূর করে অনেক বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে ক্রমান্বয়ে অভিন্ন বাংলা বানানের পথে যাত্রা আরও সুগম হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।