বর্ণিল উৎসবে মাতলো সবাই

বাংলা নববর্ষ বরণ

সবে বিদ্যালয়ে যাওয়া ছোট্ট শিশুটি থেকে শুরু করে শেষ বয়সের বৃদ্ধ মানুষটিও শামিল হয়েছিল বৈশাখের লাল-হলুদের বর্ণিল মিছিলে। সকাল থেকে একেকটি মঙ্গল শোভাযাত্রা শহরজুড়ে ছড়িয়ে দিতে থাকে মঙ্গলবার্তা। বাঙালির বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ছিল বিদেশিদেরও। এবারের বর্ষবরণের ব্যাপ্তি ছাড়িয়েছে বিগত বছরগুলোর নববর্ষ উদ্যাপনকে

ওয়াসিম আহমেদ

31

নতুন বছরের নতুন দিন পহেলা বৈশাখ। নতুন এই দিনকে বরণ করতে শহরজুড়ে ছিলো উৎসবমুখর পরিবেশ। নগরীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সব বয়সীদের পদচারণায় মুখর ছিলো নগরী। যেন একদিনের লাল-হলুদের গল্প রচিত হয়েছিল শহরে। সবকটি মুক্তমঞ্চ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানজুড়ে ছিলো বৈশাখী আনন্দের ছড়াছড়ি। সব ধরনের সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে সব সম্প্রদায়ের মানুষের বাধাহীন আনন্দে মেতে ওঠায় এবারের বর্ষবরণ পায় অনন্য মাত্রা। সবে বিদ্যালয়ে যাওয়া ছোট্ট শিশুটি থেকে শুরু করে শেষ বয়সের বৃদ্ধ মানুষটিও শামিল হয়েছিল বৈশাখের লাল-হলুদের বর্ণিল মিছিলে। সকাল থেকে একেকটি মঙ্গল শোভাযাত্রা শহরজুড়ে ছড়িয়ে দিতে থাকে মঙ্গলবার্তা। বাঙালির বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ছিল বিদেশিদেরও। এবারের বর্ষবরণের ব্যাপ্তি ছাড়িয়েছে বিগত বছরগুলোর নববর্ষ উদযাপনকে।
১৪ এপ্রিল ভোর সাড়ে ৬টায় ডিসি হিলে রক্ত করবীর ‘এসো হে বৈশাখ’ গানের মধ্য দিয়ে নগরীতে বর্ষবরণ শুরু হয়। এরপর একের পর এক গান-নৃত্যে মাতোয়ারা হয়ে উঠে বৈশাখের বাতাস। সকাল ৯টায় সার্কিট হাউজ থেকে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়, যা শিল্পকলায় গিয়ে শেষ হয়। শিল্পকলার ছাত্র-ছাত্রী, চট্টগ্রাম শিশু একাডেমির শিশুসহ সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে পূর্ণতা পায় শোভাযাত্রাটি। এরপর সকাল সাড়ে ১১টায় চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বের হয়ে এক বর্ণিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। এ যেন এক শুদ্ধ বাঙালির মিছিল। গায়ে পাঞ্জাবী, মাথায় গামছা পড়া ছেলেগুলোর বেশভূষায় বাঙালিত্বের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এছাড়াও চুলের খোপায় বাহারী ফুলের ক্রাউন, লাল-হলুদ শাড়ি আর পায়ের আলতা রমণীদের দিয়েছে অনন্যতা।
মঙ্গল শোভাযাত্রা শেষে দুপুর গড়াতে নগরী রূপ নেয় গান-নৃত্যে মূর্ছনায় ভরা এক বর্ণিল শহরে। যেদিকে শোনা যায় সেদিকে বাজছে বাঙালির চিরায়ত গানের সুর। সেই সুরের সাথে মিতালী পেতে আয়োজন করা হয় পান্তা-ইলিশের। নগরীর মুক্ত মঞ্চগুলোর আশেপাশে এবং বেশকিছু রেস্টুরেন্ট-রেস্তোরাঁয় ছিলো পান্তা-ইলিশের আয়োজন।
প্রতিদিনের ক্লাস-পড়া ভুলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছিলো বর্ষবরণের সুন্দর আয়োজন। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ছিল বর্ষবরণের আয়োজন। অনেকে ক্যাম্পাসে এবং নগরীর কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে আয়োজন করে বর্ষবরণের জমকালো আয়োজন। জামালখানের রীমা কনভেনশন হলে ছিল প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের বর্ষবরণের আয়োজন। সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত সেখানে ছিলো আনন্দ উদযাপনের সুর। এছাড়াও পোর্টসিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, চিটাগাং ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির আয়োজন এবং বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজন ছিলো দেখার মতো।
সবধরণের আনন্দের মাঝে অনেকে মেতেছেন পারিবারিক মিলনমেলায়। পেশাজীবীদের পহেলা বৈশাখ উদযাপনে ছিলো এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন। একদিনের জন্য সব ব্যস্ততা ভুলে সবাই মিলিত হয়েছেন পারিবারিক মিলনমেলায়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এমন এক মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। পরিবারের সাথে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে নগরীর বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দুপুরে বাঙালি খাবারের ব্যবস্থা ছিলো সবার জন্য।
এছাড়াও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের আনন্দ আয়োজন উপভোগ করেছেন ক্লাব সদস্য ও তাদের পরিবারবর্গ। বর্ষবরণ উপলক্ষে সদস্যদের জন্য মধ্যাহ্নভোজ সহ ছিলো আনন্দ আয়োজন। কানায় কানায় ভরে উঠেছিলো নগরীর পর্যটন স্পটগুলো। কাজীর দেউরী শিশুপার্ক, পতেঙ্গা সী বিচসহ সবকটি স্পটে ছিলো মানুষের ঢল। বর্ষবরণের মূল আকর্ষণ ছিলো সিআরবিতে সাহাবউদ্দীনের বলী খেলায়। সেখানে দেশী বলীর পাশাপাশি বিদেশী বলির অংশগ্রহণে যোগ হয় নতুন আনন্দ। বড় আয়োজনের পাশে বিচ্ছিন্ন আয়োজনগুলোর মধ্যে বর্ষবরণ ছিলো অন্যতম উপলক্ষ। এদিন বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর মনমাতানো মাস্তি ছিলো বর্ষবরণের আরেকটি যোগ। নগরীর অভয়মিত্র ঘাটে ছিল ৩৩নং ওয়ার্ডের আনন্দ আয়োজন। বিকেল ৫টার মধ্যে সরকারি নির্দেশনা থাকায় কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়া শেষ হয় সুশৃঙ্খল বর্ষবরণ। সন্ধ্যা ৬টার আগে অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে বাসায় ফিরে যান সবাই।