বাংলার মেলা

চট্টগ্রামের বৈশাখী মেলা

জামাল উদ্দিন

29

মেলা বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। মেলা মানেই আনন্দ। সারা দিন মজা করে ঘুরে বেড়ানো। ইচ্ছে মতো এটা-ওটা কেনা। বাঁশি বাজিয়ে, ধুলো উড়িয়ে দিনভর হাঁটাহাঁটি। তারপর ক্লান্ত দেহে ঘরে ফেরা। মেলায় মানুষ যেমন জুটে যায়, তেমনি তারা ঘনিষ্টও হতে পারে। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনে থেকে এই মিলনক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। এটি কেবল সাংস্কৃতিক মিলন ক্ষেত্র বা লেনদেনের স্থান নয়, ব্যবহারিক জীবনেরও এক বিরাট লেনদেনের স্থান। যে যুগে দোকান বা হাট সৃষ্টি হয় নি, তখন এই মেলাতেই বিনিময়ের লেনদেনের সূচনা হতো। সেদিনের মানুষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে এক গোষ্ঠী থেকে অন্য গোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচয়, আদানপ্রদান, সংগৃহীত বস্তু ও জীবজন্তুর বিনিময় করতো।
সভ্যতার বিবর্তনে মানুষে মানুষে মিলণমেলার বিশেষ উপযোগিতা রয়েছে। কিন্তু যেহেতু এর গতি অতি মন্থর, তাই তাকে উপলদ্ধি করতে পৌরাণিক জীবনকে পর্যালোচনা করার প্রয়োজন আছে।
প্রকৃতির সন্তান মানুষ, এই প্রকৃতির কোলে সে লালিত পালিত হয়ে আধুনিক একবিংশ শতকে পদার্পণ করেছে। তাই মানুষের আচার-অনুষ্ঠান, পুজা-পার্বণে বিশ্বপ্রকৃতির প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।
মানুষ যখন আরণ্যক প্রাণী মাত্র, ঋতু পরিবর্তনের কারণ, চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ ইত্যাদি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তাদের কাছে ছিল না। কিন্তু মননশীল বুদ্ধিজীবী মানুষ, জ্যোতিষ-শাস্ত্রের জ্ঞান, জ্ঞানী-গুণীর আয়ত্বে এলেও আজকের মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তাদের ছিল না। কিন্তু এই সব গুণী ব্যক্তিগণ অজ্ঞজনকে যে ভাবে ব্যাখ্যা করতেন এবং চালনা করতেন জনসাধারণ তাকে বেদবাক্যরূপে গ্রহণ করতো। তাই দেখা যায় মকর সংক্রান্তিতে স্নানযাত্রা। এদিন নদীতে অবগাহন করলে পূণ্য লাভ করা যায়। তাই এদিনে বিশেষ বিশেষ নদী তীরে বহু মানুষের সমাগম হতে দেখা য্য়া।
মানুষ গ্রাম নগর বা শহর যেখানেই বাস করে, সেখানেই তারা র্পস্পরকে অবলম্বন করে জীবন নির্বাহ করে। তার জন্য নদী তীরে স্নানযাত্রার দিনে মানুষের পূণ্য কর্মের সঙ্গে সেখানেও একটা পূণ্য উৎসব বসে যায়। প্রবীণেরা এই দিনের স্নানের মাহাত্ম উপলদ্ধি করে স্নান করতে যান, কিন্তু তাদের সঙ্গে বহু ছেলে, মেয়ে, বুড়ো সেখানে যান কেবল আনন্দ-উপভোগ করতে এবং ব্যাপারীরা পসরা সাজিয়ে বসে কিছু অর্থ উপার্জনের আশায়। পূণ্যার্থীরা যখন দেবদেবীর মাহাত্ম কীর্তন করতে রাস্তা দিয়ে মিছিল করে চলতে থাকে, তখন মনে হয় স্বর্গীয় মহিমা ধারা বর্ষিত হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাপারীরা কেউ রেশমী চুরি, ইমিটেশন গহনা, বাচ্চাদের নানা খেলনা বা গৃহস্থের ঘরের প্রয়োজনীয় বাঁশের কুলো, চুপড়ি ইত্যাদি দ্রব্য নিয়ে পশরা সাজিয়ে বসে কেনাবেচা শুরু করে দেয়। আবার অন্যদিকে নটনটীরা নৃত্যগীত করে দর্শকদের আকর্ষণ করেও কিছু পয়সা উপার্জনের চেষ্টা করে। কোথাও জিলিপি, পাপড় ভাজা, লাড্ডু ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্য বিক্রি হচ্ছে। আজকাল ডিমের রোল বা চাইনিজ-এর দোকানও দেখতে পাওয়া যায় মেলায়। লোকসমাগমে কয়েক দিনের জন্য সেই স্থান গমগম করতে থাকে সরকার থেকে সেখানে অস্থায়ী বিজলী বাতির ব্যবস্থাও কোথাও কোথাও হয়ে থাকে। নইলে কুপিবাতি বা হ্যাজাকের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে মেলা। তবে মানব জীবনের আদিম রূপটি আদিবাসী সমাজে দেখা যায়, তা নগর-শহরের মেলার রূপের থেকে অনেক আলাদা। তবে যা-ই হোক না কেন আমাদের মধ্যে যদিও লৌকিক ধর্মের প্রয়োজনে মেলার সৃষ্টি হয়েছিল, কিন্তু এই মেলার মধ্য দিয়েই জাতি সকল সংকীর্ণতার উদ্ধে উঠতে পারে এবং হৃদয় খুলে দু-হাত ভরে দিতে সক্ষম হয় একদিকে, অন্যদিকে অপরকে গ্রহণ করবার ক্ষমতাও তার থাকে। তাই বলা যেতে পারে হৃদয়ের লেনদেনের মিলনমেলা হয় আমাদের মেলা।

চট্টগ্রামের মেলাঃ
চট্টগ্রাম নামটি সমগ্র ভারতেবর্ষে সুপরিচিত ও সু-উল্লেখ্য। পরাধীন ভারতে এবং অভিভক্ত বাংলার ইতিহাসে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এক বিষ্ময়কর ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা।
দুই বাংলায় অর্থাৎ পশ্চিমবাংলা এবং বাংলাদেশে যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সূত্রে এক মন, একপ্রাণ। তা দুই দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চাও মেলাগুলি দেখলে বোঝা যায়। কবি নজরুলের কণ্ঠে একদা যেমন ধ্বনিত হয়েছিল —-‘একই বৃন্তে দুইটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান” ঠিক তেমন করেই বলা যেতে পারে পশ্চিম বাংলায় রাম নামের এক ভাই থাকেন আর বাংলাদেশে থাকেন অপর ভাই রহিম নামের মানুষটি, দুই ভাই দুই দেশের উপমা ও দুই মেরূর অধিবাসী হলেও আন্ত ফন্ডু স্রোতে দুজনেই যে একই প্রবাহ তা দুই বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা ,হাট, মেলা এবং ভাবের আদান-প্রদানের যোগসূত্র দেখে ধরা যায়। বিশেষ করে হাট বা মেলার সূত্রে যে সমাজ জাতীয়তাবোধ ও মেলবন্ধনের সূত্র ধরেই হ’ল কৃষ্টিগত প্রমাণ।
চট্টগ্রামের মেলা সম্পর্কে বলা যায়, সমগ্র ভারতবর্ষ থেকে বৈচিত্র্যময় চট্টগ্রামের মেলা। চট্টগ্রামের বাঙালি, হিন্দু, বৌদ্ধ, মগ, মুসলমান ছাড়াও – পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা সহ তেরটি নৃ-গোষ্ঠীর এক ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান। এতগুলো জনগোষ্ঠীর এক জায়গাতে বসবাস ভারতবর্ষের আর কোথাও নেই। তাই চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মেলার ঐতিহ্য বাংলাদেশের এক বিশেষ ও অভিনব দিক।
চট্টগ্রামে ছোট-বড় নানা ধরনের মেলা -খেলা ও উৎসব অনুষ্ঠিত হয় জাতি ধর্ম নির্বিশেষে। এরই মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য মেলা হল—- সীতকুন্ডের মেলা, রাউজান মহামুণির মেলা, লালদীঘির জব্বারের বলী খেলা ও মেলা, পটিয়ার সূর্য খোলার মেলা ইত্যাদি।

সীতাকুন্ডের মেলা : শিব চতুর্দশীতে আরম্ভ হয়ে দোল পূর্ণিমা পর্যন্ত চলে এই মেলা। প্রতি বছর একই সময়ে এবং একপক্ষ কালের কিছু কম বেশি সময় ধরে চলে এই মেলাটি। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় যে, এখানে দেবী সতী বা দূর্গার খন্ডিত দেহাংশ পড়ে, সেই থেকে তীর্থক্ষেত্র হয়েছে এবং এটি ধর্মীয় পীঠস্থান স্বরূপ। এটা পৌরাণিক ৫১ আদ্যাপীঠের অন্যতম একটি।
অবিভক্ত বাংলার একটি বিখ্যাত মেলার স্বরূপ। অতীতে এবং আধুনিককালেও ধর্ম বিশেষের পথ ধরেই পশ্চিম বাংলা, ত্রিপুরা ও আসাম থেকে এই মেলায় নানা সূত্রে মানুষ আসে। কথিত আছে যে, স্থানীয় চন্দ্রনাথ পাহাড়ে চন্দ্রনাথ শিবের মন্দিরে ওই দিন স্বয়ং দেবতা শিব এসে বসত করে থাকেন। এই পুণ্যতীর্থ লোক বিশ্বাসের কলাণে এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কল্যাণ কামনায় লোকে দূর-দূরান্ত হ’তে এখানে এসে গিরিশ ধর্ম শালায় রাত্রি যাপন করে সীতাকুন্ডে স্নান করে, চন্দ্রনাথ মন্দিরে পুজা দেয়। সূউচ্চ চন্দ্রনাথ পাহাড়ে সবাই পৌঁছায় না বা পারে না। তাই স্থানীয় অনেকেই কাছাকাছি ব্যাসকুন্ড স্নান সেরে অদূরবর্তী ভৈরব মূর্তিতে পুজা দেয় প্রসাদ খান। অনেকে আবার আরও কিছু দূরে শম্ভুনাথ শিবের মন্দিরে উঠে পুজা দেয়। যারা আরও শক্তি রাখেন তারা পায়ে হেঁটে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে পৌঁছে চন্দ্রনাথ মন্দির সংলগ্ন চাতালে বসে পুজা দিয়ে প্রসাদ খেয়ে, কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে নেমে আসেন নিচে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ে মেলা সেরে চন্দ্রনাথ দর্শন করে ফিরে আসতে পারেন লোকেরা, মেলায় বেচা-কেনা,খাই-খাওয়া, যাত্রা, পালাগান প্রভৃতি চলে। ধর্মশালা, যাত্রী আবাস এবং জল ও বৈদ্যুতিক আলোর সুবিধা থাকায় অনেকে এখানে ২/৩ দিন বাস করেও থাকেন। তাই এটাকে নানাভাবে শ্রেষ্ঠতর মেলা বলা চলে।
ঠিক এই সময় মহেশখালীতে আদিবাসীদের শিব মন্দিরে মেলা হয়। নৌকা যোগে দ্বীপে পৌঁছে পুজো দেয় মেলার লোকেরা। বিশেষ করে সীতাকুন্ডের মেলায় এসে এখান থেকেই লোকজন মখেশখালীর মেলায় যোগদেয়। এই উপলক্ষে তখন চট্টগ্রাম বেশ উৎসব মূখর হয়ে ওঠে।

পাহাড়তলীতে মহামুনির মেলা : স্থানের নাম মহামুনি, গ্রাম-পাহাড়তলী, থানা রাউজান। সেখানে মায়া বা বৌদ্ধমূর্তি সু উচ্চ ও সুপরিসর ছাপ জুড়ে এই মায়ার কাছে সবাই জড়ো হয়। চৈত্র সংক্রান্তিতে এ মেলা হয়। সংক্রান্তির দু-একদিন আগে থেকে লোকেরা এখানে আসেন মহামুনির মেলাতে যোগ দিতে। এখান থেকে কিছু দূরে এবং উচুঁতে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী অঞ্চ