বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গৌরব ও ঐতিহ্য

মোতাহার হোসেন

11

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতীম ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হয়েছে ৪ জানুয়ারি। ছাত্রলীগ বয়সে প্রবীণ হলেও এখন দেশের প্রয়োজনে তরুণদের মতোই সমান প্রাসঙ্গিক। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘শিক্ষা শান্তি প্রগতি’ শ্লোগান নির্ধারণ করে এ সংগঠনটি গঠন করেন ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি। সংগঠনটি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গঠনের এক বছর আগেই গঠন করেন জাতির পিতা। জাতির পিতা জানতেন, মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে হলে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। আর ঐক্যবদ্ধ ছাত্র সমাজই পারে বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশিত একটি স্বাধীন ও শোষণ মুক্ত দেশ গড়তে। তাঁর এই বিশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন দেখেছেন বিশ্ববাসী ৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৫৮ সালের আয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ সালের ছয় দফা বাস্তবায়ন ও ১১ দফা দাবি প্রণয়ন, ৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ৭০ সালের নির্বাচন, ৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কর্মীরাই ছিল সম্মুখ সারির সৈনিক।
পরবর্তীকালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত, সাম্য-সমতা, অসা¤প্রদায়িক সোনার বাংলার গঠনের জন্য এ ছাত্র সংগঠন সাহসি ভূমিকা রেখেছে। একাত্তরে জাতির পিতা যখন মহান মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন তখন জীবন বিপন্ন হতে পারে জেনেও ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান দিয়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাই সর্বপ্রথম অতীতের ন্যায় রাজপথে নেমে আসেন আন্দোলনের ঝান্ডা নিতে। ছাত্রলীগ বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে দিতে জাতির পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে প্রায় ২০ হাজার নেতাকর্মী বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়।
আমাদের দুর্ভাগ্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কিছু বিপথগামী সেনা সদস্য জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই জীবনবাজি রেখে রাজপথে প্রতিবাদী মিছিল করেছে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসমত কাদির গামার নেতত্বে ছাত্রলীগ। পঁচাত্তর পরবর্তী মৃত্যু উপত্যাকায় পরিণত হওয়া বাংলাদেশে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আত্মদানের ইতিহাস দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। বঙ্গবন্ধু পরবর্তী বাংলাদেশে হত্যা ও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরি, গণতন্ত্রের মানসকন্যা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বিশ্ব মানবতার নেত্রী তথা ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রতিটি সংগ্রামেই তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে বিগত ‘ওয়ান ইলিভেন’ এর বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে মিছিল বের হয় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে। মূলত: এক এগারোর পরবর্তী চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধেও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এটি চির সত্য যে, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস মানেই ছাত্রলীগের ইতিহাস,আন্দোলনে সফলতার ইতিহাস মানেই ছাত্রলীগের ইতিহাস। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গৌরব উজ্জ্বল ঐতিহ্য ও অবদান রয়েছে এ ছাত্র সংগঠনের। বিগত ৭০ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনায় এটা বলা প্রাসঙ্গিক যে ছাত্রলীগের সৃষ্টিকাল হতে শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা অত্যন্ত সফলতার সাথে তাদের এ মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। তাছাড়া ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, বন্যাসহ দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগে, মানবতার কল্যাণে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। বিগত সময়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহবানে সাড়া দিয়ে দাঁড়িয়েছে ছাত্রলীগ।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা আর দেশের যোগ্য প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে ছাত্রলীগ। একবিংশ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর হাতেগড়া এই ছাত্র সংগঠন অসহায় দুস্থদের পাশে বার বার দাঁড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ শুধু বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করে মানবতার চেতনার উজ্জীবিত হয়ে শান্তি আর মুক্তির বার্তা নিয়ে নিরন্তর ছুটে চলছে। মানবতার ডাকে এই ছাত্রসংগঠনের সদস্যরা নিজের রক্ত দিতে সর্বদা প্রস্তুত থাকার দৃশ্য একাধিকবার দেখেছে শান্তিকামী বিশ্ব। বিগত ২০১৩ সালের এপ্রিলে রানা প্লাজা ধসের সময় হাজার হাজার ব্যাগ রক্ত দিয়েছে এ মানবীয় সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এর কারণ ছাত্রলীগের রক্তের প্রতিটি ফোঁটায় রয়েছে বঙ্গবন্ধুর মানবতাবাদী দর্শন, রয়েছে ত্যাগের মহিমা আর জাতির অধিকার আদায়ের প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার সুদীর্ঘ ইতিহাস। পাশাপাশি অসহায় দুঃস্থ মানুষের খাদ্য এবং বস্ত্রহীনে বস্ত্র তুলে দেওয়ার একাধিকবার বিরল নজির স্থাপন করেছে।
পত্রিকার খবর অনুযায়ী, দেশরতœ শেখ হাসিনার অন্যতম সফলতা ছিটমহল সমস্যার সমাধান, সেই বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় ৫০০০০ গাছ লাগায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। কারণ ছাত্রলীগ সূচনালগ্ন থেকেই মানবতার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। অতীতে বাংলাদেশে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের বর্তমান সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানীর নেতৃত্বে সারা বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, মহানগর ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় কর্মী তৈরির মাধ্যমে দেশ গঠনে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে নিরন্তর কাজ করবেন এই প্রত্যাশা থাকলো। পাশাপাশি ছাত্রলীগের অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখতে নিজেদের দেশ গঠন, শিক্ষাঙ্গনে শান্তি রক্ষা, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা, শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণ ঠেকানে নিজেদের নিয়োজিত রাখবেন এই প্রত্যাশা করছি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট