বাংলাদেশের রাজনীতি এবং নির্বাচন

মীর আব্দুল আলীম

69

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনে নির্বাচন আগামী ১৫ মে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের বছর এটা। পুরো বছরটাই নির্বাচন ঘিরেই কাটবে। তাই ভয় হচ্ছে; ভীষণ ভয়। সামনে নির্বাচনকে ঘিরেই এমন ভয় হচ্ছে। চুন খেয়ে মুখ পোড়া মানুষ আমরা, তাই মিষ্টি দই দেখলেও ভয় পাই। আর দেশের স্বভাবটাই আমাদের ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। কারণ সরকারের প্রতি ৫ বছরে শেষ বছরটা ভালোয় ভালোয় কাটে না। মারামারি, খুনোখুনি আর নানা হাঙামায় উত্তপ্ত থাকে দেশ। কোন প্রকার হাঙামা না থাকলেও বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা আর হুঙ্কারে আমরা যারা সাধারণ মানুষ তারা ভড়কে যাচ্ছি। কি জানি কি হয়, এই ভয় মনের ভেতর।
নির্বাচনকে সামনে রেখে, এমন ভয় হচ্ছে। বিগত নির্বাচনগুলো একতরফা হলেও এবার মনে হচ্ছে তা হবে না। যেকোন মূল্যে বিএনপি নির্বাচনে যাবে এমন আবাস পাওয়া যাচ্ছে। ৩১ মার্চেও এক সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপি খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।’ বড় রাজনৈতিক দু’দল নির্বাচনে গেলে যা হয় তাই হয়তো হবে। আবহাওয়াটা ফের গোমট ঠেকছে। বোধ করি আলোর দেখা মিলবে না। রাজনৈতিক যুদ্ধ আবারও হবে। আবারও অশান্তির দাবানলের ভয়; পেট্রোল বোমে মানুষ পুড়ে মরার ভয়; পুলিশের গুলিতে জীবন যাওয়ার ভয়,; শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নষ্টের ভয়; মামলা হামলার ভয়; জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হওয়ার ভয়; সম্পদ নষ্টের ভয়; সর্বোপরি ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংসের ভয় আমাদের বেশ পেয়ে বসেছে। গণতন্ত্র, সুষ্ঠু রাজনীতি, অপরাজনীতি এসব নিয়ে আলোচনায় আসতে চাই না। তবে এটাই বলতে চাই, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া এ সরকারে সময়টা খুব একটা খারাপ যায়নি। দেশে বিদেশি বিনিয়োগ শুরু হয়েছে, দেশের দৃশ্যমান উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয়েছে। গণতন্ত্রেও ঘাটতি থাকলেও, হরতাল অবরোধ না থাকায় জনমনে স্বস্বি ছিলো। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পেরেছে, শিল্প কারখানায় উৎপাদন হয়েছে। ভয় এখানেই; এ ধারা ঠিক থাকবেতো? সামনের দিনগুলো ভালো যাবে, মনে হচ্ছে না। আবার জ্বালাও পোড়াও, ভাংচুর, হরতাল অবরোধ এসব হবে নাতো?
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসছে নির্বাচনে তারা যাবেই। হুঙ্কার দেয়া হচ্ছে রাজপথ দখলের। তাঁদের কথায় বোঝা যাচ্ছে যেন যুদ্ধ আবারও শুরু হবে। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় আবার বদ হবে দেশের আমজনতা। পূর্বের স্টাইলে মানববিরোধী আন্দোলন হলে অশান্তি বাড়বে। অর্থনীতি ধ্বংস হবে। দেশে বেকার বাড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থা দেখা দেবে। সে যুদ্ধে দেশের অর্থনীতি পঙ্গু হবে। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হবে। এমনটা আমরা আর চাই না। তবে এটাও সত্য বিরোধী দলের রাজনীতি করার পরিবেশ দিতে হবে বর্তমান সরকারকে। কি করবে বিরোধীদল? তাদের রাজনীতি করার পরিবেশটাতো দিতে হবে। সে পরিবেশ পাচ্ছে না তারা। দেশের স্বার্থে সরকারকে ছাড় দিতে হবে, তবেই দেশে শান্তি বিরাজ করবে। তবে বিরোধীদলকে মনে রাখতে হবে, কোনভাবেই দেশের জানমাল নষ্ট হয় এমন কর্মসূচি তাদের আর দেয়া ঠিক হবে না। জ্বালাও পোড়াওয়ের রাজনীতি বিএনপিকে অনেকটাই পিছিয়ে দিয়েছে। তারা ভোটের রাজনীতিতে পিছিয়ে না গেলেও জ্বালাও পোড়াওয়ের কারণে নানাভাবে অনেক পেছনে পড়েছে এবং এ কারণে তাদের খেশারতও দিতে হচ্ছে। বিরোধী দলগুলো সহনশীল হবে সেসঙ্গে সরকারদলও সব ক্ষেত্রে সদয় হবেন এমন প্রত্যাশা আমরা করছি।
বাংলাদেশের নির্বাচন মানেই অস্থিরতা আর ভয়। এবারও আমরা রাজনৈতিক মাঠে এমন পরিবেশ লক্ষ করছি। প্রকৃতিতে যেমন কালবৈশাখী শুরু হয়ে গেছে তেমনই, রাজনৈতিক অঙ্গনেও উথালপাথাল হাওয়া বইতে শুরু করেছে। পত্রিকা খুললেই রাজনৈতিক গরম খবর দেখতে পাই। রাজনৈতিক দলের নেতারা নির্বাচনকে ঘিরে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে উত্তাপ ছড়াচ্ছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও নির্বাচনকে ঘিরে বেশ উুদ্দপনা দেখা যাচ্ছে। তবে তারা দেশে নির্বাচনকে ঘিরে আর কোন অশান্ত পরিবেশ চায় না। জনগণ ভুলে যায়নি যেন ভয়াল স্মৃতি। ১৯৯৬ আর ২০১৩-১৪ কি ভয়ংকর ছিলো। যেন স্মৃতি হাতড়ে জনগণ ভয় ভড়কে যাচ্ছে। আবার এমনটা হবে নাতো? জাতীয় নির্বাচনের যেখানে আর মাত্র ৮-৯ মাস বাকি এ নির্বাচনকে ঘিরে কি হবে? জনগণ চায় ঝামেলা মুক্ত রক্তপাতবিহীন নির্বাচন। তারা অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনও প্রত্যাশা করে। বেসরকারি দলের জ্বালাময়ী বক্তব্য যেমন তারা আশা করে না তেমনই তারা সরকার দলের কাছে সমতা বজায় রেখে সঠিক নির্বাচনের প্রত্যাশা করে।
এ অবস্থায় কি করবে নির্বাচন কমিশন? আমরা জানি, নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের উপরই ন্য¯ত। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সকল নির্বাচন সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ করার জন্য ওয়াদা করেছেন। তিনি তাঁর ওয়াদা রক্ষা করবেন এটাই আমরা কায়মনে চাই। অবশ্য এদেশে ওয়াদা ভঙ্গেও যথেষ্ট রেওয়াজ আছে। এ নির্বাচন কমিশনের কাছে আমরা এমনটা প্রত্যাশা করি না।
ক’বছর আগে রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে আমরা প্রতিদিন কী দেখেছি? দেশজুড়ে নৈরাজ্য দেখেছি। সে কথা এখনো ভুলে যাইনি আমরা। হতভাগা বাবার চোখের সামনে গুলিবিদ্ধ কিংবা পেট্রোল বোমায় ঝলসে যাওয়া ছেলের চিৎকার শুনেছি। সম্পদ হারিয়ে পথে বসতে দেখেছি অনেককে। এরা তো সবাই রাষ্ট্রেরই সুনাগরিক ছিলো? এদের তো বাঁচার আর সম্পদ রড়্গার অধিকার আছে। এসব রক্ষায় সরকারেরও দায় ছিলো। কিন্তু ঐসব দানবদের হাত থেকে কেউই আমাদের রক্ষা করতে পারেনি। প্রতিনিয়ত চোখের সামনেই এসব ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছি। কিছুই করতে পারিনি আমরা। এসব রোধে আইন আছে। নাগরিকের নিরাপত্তাবিধান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দ্বিতীয় অপরিহার্য কাজ। বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ২৬-৪৭ক অনুচ্ছেদ পর্যন্ত নাগরিকের অধিকারগুলো বর্ণিত আছে। সেখানে কাউকেই নির্বিচারে মানুষ হত্যার বৈধতা দেওয়া হয়নি। এ হত্যার দায় যেমন বিরোধী দলের ছিলো, রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে সরকার দলও এ দায় কিছুতেই এড়াতে পারে না। যখন হরতাল-অবরোধের নামে জীবন্ত মানুষ পুড়ে ঝলসে যায়, কয়লা হয়, যখন তাদের উপার্জনের একমাত্র সম্বল কেড়ে নেওয়া হয়, অসহায় স্বজনের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়; যখন কষ্টার্জিত লাখ লাখ টাকার সম্পদ চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এ কথা বলতেই হয় সুস্থ গণতান্ত্রিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে না পারাটা, বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক দিক। আর আতংকের দিক হলো, এ অবস্থা থেকে দেশ খুব সহসা মুক্তি পাচ্ছে না। বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের একজনের ক্ষমতা আকড়ে ধরে থাকার হীন প্রচেষ্টা এবং অপর দলের আবছা অন্ধকার পথে ক্ষমাতায় প্রবেশের ষড়যন্ত্র, তারা না বুঝলেও তাদের এ অপপ্রয়াস, আপামর জনসাধারণ ঠিকই বুঝে। যাই হউক, আমরা স্বাধীন হয়েছি তা প্রায় ছেচল্লিশ বছর পেরিয়েছে। ষড়যন্ত্র, গোপন তৎপরতা আমাদের রাজনীতিতে লেগে আছে। যখনই দেশটিতে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় আসে, ঠিক তখনই নির্বাচনকে ঘিরে শুরু হয় গোপন তৎপরতা ও ষড়যন্ত্র। আরেকটি সাধারণ নির্বাচন সামনে। যথানিয়মে শুরু হয়ে গেছে গোপন তৎপরতা ও ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাথে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট এবং বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন জোটও। এতে আপামর জনসাধারণ খুশি এবং নির্বাচনের প্রতি সমর্থনও আছে। কিন্তু যখন তারা বুঝতে পারে প্রকাশ্য নির্বাচনে অন্তরালে রয়েছে গোপন অভিসন্ধি তখন সুষ্ঠু নির্বাচন আর আস্থার জায়গাটাতে থাকে না।
আমরা যতদুর জানি, নির্বাচন শেখ হাসিনা সরকারের অধীনেই হবে, এ ব্যাপারে তারা বদ্ধপরিকর। এহেন পরিস্থিতিতে বিএনপি কোন পথে যাবে? ২০১৪ সালের নির্বাচন বানচালে ব্যবহৃত পেট্রোল বোমা, হরতাল নাকি অবরোধ? আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার মত নীতিতো খুব একটা কাজে আসবে না। প্রশাসন, পুলিশ সবাই এখন তৎপর। আওয়ামী পন্থি পুলিশ এসব মিশিলে গুলি চালানোর জন্য অস্ত্র তাক করেই রেখেছে। এ অবস্থায় বিরোধীদল কতদূর যেতে পারবে সেটাই এখন প্রশ্ন।
বিএনপির ধারণা ছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে, নির্বাচিত সরকার কয়েক মাসের বেশি টিকবে না। তারা আন্দোলনের মাধ্যমে অবার সরকারকে নির্বাচন দিতে বাধ্য করবে। বাধ্য হয়ে তাদের দাবি মেনে নিয়ে তত্ত¡াবধায়ক বা সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিবে। সে আশায় বিএনপির গুঁড়েবালি ছিলো। নির্বাচনে না গিয়ে তারা পস্তালো। এবার তারা তা করবে বলে মনে হয় না। নির্বাচনে তাঁরা যাবেই। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে যাবে, এটা শতভাগ সঠিক। রাজনৈতিক গেমলারের ভ‚মিকায় এখন বড় দুই দল। দাবার গুটির মতো সুদূরপ্রসারী নিন্তায় যে চাল দিবে, তার গলায় বিজয়ের মালা উঠবে। বিজয়ের মুকুট যার মাথায় উঠুক এটা নিয়ে এদেশের মানুষ খুব একটা ভাবে না। দেশের মানুষ চায় একটু শান্তি, জীবনের নিরাপত্তা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন। নির্বাচনকে ঘিরে অনাহুত রক্তপাত যেন না ঘটে।
নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ-উদ্দীপনায় কোনো ঘাটতি নেই। মানুষ ভোট দিতে যে কতটা উদগ্রীব, তা মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোর ভোটের হারে বোঝা যায়। নির্বাচনের সততা বা ভোটের পবিত্রতা রক্ষার বিষয়টি তাই রাজনৈতিকভাবে খুবই স্পর্শকাতর। সে জন্যই এ দেশে ‘আমার ভোঁ আমি দেব যাকে খুশি তাকে দেব’ স্লোগান দিয়ে যেমন আন্দোলন হয়েছে, তেমনি কোটিখানেক ভুয়া ভোটারের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার ষড়যন্ত্রও ব্যর্থ হয়েছে এবং সংযুক্ত হয়ে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা। কিন্তু গণতন্ত্রের কয়েক যুগ পরও আমরা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি। সন্দেহ নেই, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলতে আমরা প্রকৃত নির্বাচনই বুঝে থাকি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটতে হবে। তারা নিরপেক্ষ না হলে আমরা কীভাবে প্রকৃত নির্বাচন আশা করব? নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্ক নিরপেক্ষ না হওয়ার দায় কার? তবু নির্বাচন কমিশনই পারে এদেশের আপামর জনসাধারণের মনে আশার আলো জ্বালাতে। তা না হলে নির্বাচন এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ আবারও সংকটে নিপতিত হবার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
আমরা গঠনমূলক রাজনীতি চাই। ব্যক্তি স্বাধীনতা চাই। ধ্বংসাত্মক রাজনীতির পরিবর্তন চাই। সরকারি দলের উচিৎ হবে বিরোধী দলের দাবিগুলোকে সম্মান জানানো। আবার বিরোধী দলেরও উচিৎ হবে সরকারকে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করার সুযোগ দেয়া এবং দেশ পরিচালনায় সহায়তা করা। যা তারা করে না। দেশের জাতীয় স্বার্থগুলোতে দুই দলকে একই প্লাটফর্মে দাঁড়াতে হবে। এভাবে আর কত কাল চলবে? অপেক্ষার পালা কি শেষ হবে না? জানি না, কবে আমাদের বিবেক জাগ্রত হবে; কবে বদলাবো আমরা; কবে বদলে যাবে এদেশ? কবে ফিরে আসবে স্বাধীন সোনার বাংলাদেশ।

লেখক : সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট