বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার বৈপ্লবিক সংস্কারের কোন বিকল্প নেই

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী

159

আধুনিক যুগে একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা সে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থা সব দেশেই নিয়ন্ত্রণ করে সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশ্বের যেসব দেশ উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত সে সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবেই অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত থেকে মুদ্রানীতি সহ সমস্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থাই নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে অর্থনীতির উপর অশুভ কোন হস্তক্ষেপ ঐ সব দেশে প্রায় অসম্ভব বলে বিবেচিত হয়। সেসব দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মুদ্রানীতি সহ অন্যান্য মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে দর কষাকষি করার কোন সুযোগ নেই। সম্প্রতি আমাদের অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের উপস্থিতিতে এবং বাণির্জিক ব্যাংকগুলির পরিচালকদের উপস্থিতিতে এমন কতগুলো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যা বিশ্বের যেকোন অর্থনীতিবিদ অনুমোদন করবেন না। উপরোক্ত বৈঠকে অর্থমন্ত্রী এবং বাংলাদেশে ব্যাংকের গর্ভনর ব্যাংকের সুদের হার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার শর্তে আমানকারীদের আমানতের সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বাধ্যতামূলক নগদ জমার হার (সি. আর. আর.) ১ শতাংশ কামানো হয়েছে।
গত ১ এপ্রিল অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স (বিএবি) যা বাংলাদেশের ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন, সোনরগাঁও হোটেলে এক বৈঠকের আয়োজন করেন। এই বৈঠকে তাঁরা অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেবের সম্মতিক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এক শতাংশ সি.আর.আর কমিয়ে দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী সাড়ে ছয় শতাংশের পরিবর্তে সাড়ে পাঁচ শতাংশ হারে সি.আর.আর. এর হার কার্যকর হয়েছে। যাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে সর্বমোট ১০ হাজার কোটি টাকা চলে গেছে যা কিন্তু আমানতকারী সাধারণ মানুষেরই টাকা। ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সভায় গিয়ে স্বয়ং অর্থমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সি আর আর এর মতো স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই সিদ্ধান্ত, কত যুক্তিযুক্ত হয়েছে তা ভাববার বিষয়। এক শতাংশ সি আর আর এর হার কমানোর ফলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলির হাতে চলে গেছে।
ঋণের সুধের হার দশ শতাংশের থেকে কমিয়ে এক অংকের ঘরে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সি আর আর কমানো হলেও কিন্তু সুদ হার কমানো নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জানা গেছে ইতিমধ্যেই অনেক ব্যাংক দশ শতাংশের উপরেও সুদ দিয়ে আমানত নিচ্ছে। অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ১৩ শতাংশের বেশি সুদ পড়বে। এই পরিস্থিতি যদি সত্যি হয় তাহলে কিভাবে সুদের হার ১০ শতাংশের নিচে নামানো সম্ভব হবে। এখনো অনেক ব্যাংকের তারল্য সংকট রয়েছে। বিশেষ করে নূতন প্রজন্মের ব্যাংকগুলো আস্থার সংকটে ভুগছে এদের তারল্য সংকটের দ্রুত সমাধান আশা করা যায় না। এমন কি যেসব ব্যাংক ৯ শতাংশ সুদে আমানত রাখছেন তারাও ১০ শতাংশের নিচে কি করে সুদের হার কমাবে তা কারও বোধগম্য হয় না।
আসলে দেশের সমগ্র ব্যাংকিং ব্যবস্থাটাই ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানা যায়। দেশের ৫৫টি ব্যাংক ঋণ গ্রহীতাকে ঋণ দিয়েছে সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা, যা সব ব্যাংকগুলো বিতরণকৃত ঋণের ৩৬ শতাংশ। আর ব্যাংকগুলোর মোট মূলধনের ২৩৩ শতাংশ। এসব ঋণ খেলাপী ঋণে পরিণত হয়েছে এবং হচ্ছে প্রায় ব্যাংকঝুঁকি ভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণ করতে পারছে না। কোন ব্যাংকের মূলধনের দশ শতাংশের বেশি ঋণ নিলে তা বৃহৎ ঋণ হিসাবেই ধরা হয়। কোন ব্যাংক ঐ ব্যাংকের মূলধনের ১৫ শতাংশের বেশী ঋণ দিতে পারে না। এর বেশি ঋণ দিতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। অথচ বড় বড় ব্যবসায়ী একাধিক গ্রুপ সৃষ্টি করে আইনকে ফাঁকি দিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাব কাটিয়ে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে গেছে। কারণ আইনে আছে একটি গ্রুপ ব্যাংকের মূলধনের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নিতে পারে। এভাবে একই ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন গ্রুপ সৃষ্টি করে ব্যাংকের মূলধনের চাইতে বেশি ঋণ নিয়ে গেছে।
৩১ অক্টোবর ২০১৭ থেকে দেখা যায় অগ্রনী ব্যাংকের মোট মূলধন ৩ হাজার ৫৩ কোটি টাকা কিন্তু বৃহৎ অংকের ঋণ দেওয়া হয়েছে ৭ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। তার অর্থ এই ব্যাংকটি ঋণ দিয়েছে মোট মূলধনের ১৯৯ শতাংশ। জনতা ব্যাংকের মোট মূলধন ২ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। বৃহৎ অংকের ঋণ দিয়েছে ১৩ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা যা মোট মূলধনের ২৩৩ শতাংশ। এই ঋণ গ্রহীতারা বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক প্রভাব এবং অন্যান্য কৌশল খাটিয়ে কোটি কোটি টাকা ব্যাংকের বৎসরের পর বৎসর আটকে রেখেছেন।
সম্প্রতি রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে চলতি ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ২০১৮-২০১৯ইং অর্থ বছরের বাজেটের সুপারিশ তুলে ধরার জন্য এক প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে সি. পি. ডি.। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সি পি ডি) সম্মানিত ফেলো ড. দেব প্রিয় ভট্টাচার্য আমাদের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা এবং ব্যাংকিং খাতের বিকলাঙ্গ ও এতিম অবস্থা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। মুদ্রানীতি ঘোষণার পর সি আর আর (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও) কমিয়ে তারল্য সংকট দূর করার প্রয়াসের তিনি তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার মতে তারল্য ঘাটতি রোগের উপসর্গ। তাঁর মতে রোগ হচ্ছে আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে একটি বিকলাঙ্গ ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিণত করা হয়েছে। তিনি ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থাপনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে ২০১৭ সাল ছিল ব্যাংকিং কেলেংকারীর বছর। এখন ব্যাংকিং ব্যবস্থা এতিমে পরিণত হয়েছ এবং বর্তমানে এতিমের উপর অত্যাচার চলছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তুলতে সরকারি উদ্যোগে অর্থ দেয়ার বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, মানুষের করের টাকা দিয়ে এভাবে ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা এবং দুর্নীতির জন্য ক্ষতি পূরণ দেয়া অনৈতিক। এ ধরনের ব্যাংকের জন্য অর্থের উৎস খোঁজার পরামর্শ দেন তিনি। প্রয়োজনে ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার পক্ষেও মত দেন তিনি। মূল প্রবন্ধটা উপস্থাপন করেন সংস্থার রিসার্চ ফেলো তৌফিক ইসলাম খান। তাদের মতে যে ব্যাংক ডুবে গেছে তাকে ডুবতে দেওয়া উচিত। যে ব্যাংক মার্জার হতে চায় তাকে মার্জারের সুযোগ দেওয়া উচিত। মূল প্রবন্ধে বলা হয় বাংলাদেশর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দুর্বল জায়গায় রয়েছে এবং প্রবন্ধে বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সতর্কতামূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা, মানুষের করের টাকা ব্যাংকগুলোকে না দেয়া, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট থেকে রক্ষার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ইত্যাদি।
২০১৭-২০১৮ইং অর্থ বৎসরে শেষ অর্ধ সময়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সময়োপযোগী মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছিলেন যা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় হ য ব র ল পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য অতীব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় ব্যাংক পরিচালকদের চাপের মুখে অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে সি আর আর এর হার কামানো সহ যেসব পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছেন তাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনভাবে কাজ করার যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত নীতিমালা আছে তা চরমভাবে লংঘিত হয়েছে। ব্যাংক পরিচালনার ব্যাপারে যাঁদের দীর্ঘ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁদের মতে সি আর আর ঋণ দেওয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং তাতে নিঃসন্দেহে খেলাপী ঋণের পাহাড় আরো উঁচু হতে থাকবে।
একটি ব্যাংকের মোট পুঁজিতে উদ্যোক্তাদের ১০ শতাংশের বেশি কোন অবস্থাতেই অবদান থাকে না। বাকী ৯০ শতাংশ সাধারণ মানুষের। কাজেই সরকারকে মানুষের পুঁজির নিরাপত্তা দেওয়া একটি শাসনতান্ত্রিক কর্তব্য, যা রাষ্ট্র কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে দিয়ে থাকেন। সে জন্য বিশ্বের সব রাষ্ট্রে ব্যাংকিং ব্যবস্থা শতভাগ কিন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনৈতিক নির্দেশেই মুদ্রানীতিসহ সবকিছু পরিচালনা করেন, তাহলে সমগ্র ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, এই বিষয়ে কোন অর্থনীতিবিদ দ্বিমত পোষণ করবেন না। বর্তমানে আমরা ঠিক সে অবস্থার কাছাকছি পৌঁছে গেছি। আমাদের অর্থনীতির বর্তমান পরিধিতে যত ব্যাংকের প্রয়োজন তার থেকে নিঃসন্দেহে অনেক বেশি ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তা অর্থনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। কাজেই জনগণের টাকায় এদের অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখার কোন প্রয়োজন নাই। অর্থমন্ত্রী নিজেই বহুবার স্বীকার করেছেন এবং পরিশুদ্ধ ইংরেজিতে বলেছেন, “Loan defaulters have gobbled up the money that could be invested otherwise, doing great loss to the coutry.” অর্থাৎ, ‘ঋণ খেলাপীরা গোগ্রাসে টাকাগুলি খেয়ে ফেলেছে যা অন্য কোনখানে বিনিয়োগ করা যেত এবং তাতে দেশের বিরাট ক্ষতি সাধন করা হয়েছ।’
যাই হোক, আসন্ন ব্যাংকিং ব্যবস্থার ধস সামলাতে হলে আমাদের সম্পূর্ণভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার করতে হবে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। এই ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ এবং অভিজ্ঞ ব্যাংকারের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করতে হবে, কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ব্যাংক ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কোন বিকল্প নাই।
লেখক : কলামিস্ট