বাংলাদেশের বিধাতা প্রদত্ত ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিভেন্টের’ যেন দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি না হয়

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী

21

বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে অনুন্নত দেশের শ্রেণি থেকে উন্নয়নশীল দেশের সারিতে উন্নীত হওয়ায় জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত ও নির্দেশিত সমস্ত প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক শর্তাবলী পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৮ অর্থবৎসরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার ছিল ৭.১ শতাংশ। গত বৎসর ধরে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দাভাব দেখা গেলেও বাংলাদেশ ৭% হারেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে বরং কৃষি এবং শিল্পখাতে উৎপাদন বেড়েছে। সেবাখাতে উন্নয়ন কিছুটা কমলেও তবুও ৫২.২ হারের নিচে নামে নাই। উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে মাথাপিছু আয় বেড়েছে এবং এই সময়ে দরিদ্রতার হারও কিছু কমেছে। কিন্তু তারপরও সন্তোষজনক উন্নয়ন অব্যাহত থাকলেও অর্থনীতির নিয়ম অনুসারে যে হারে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়া উচিত ছিল এবং অর্থনীতির জন্য যা অতীব প্রয়োজনীয় ছিল সে হারে কর্মসংস্থান বাড়ে নাই। ২০১৬-২০১৭ সালে জাতীয় বেকারত্বের সূচক ছিল ৪.২% শতাংশ কিন্তু ২০১৭ সালে দেশের যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১০.৬%। সবচাইতে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো ২০১৭ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, যুব সম্প্রদায়ের শতকরা ২৯.৮ হার যুবক শিক্ষায়, চাকরীতে কিংবা কোন প্রশিক্ষণে নিয়োজিত ছিলনা অর্থাৎ এই বিরাট সংখ্যক যুবক ঐ সালে সম্পূর্ণ বেকার সময় অতিবাহিত করেছে বলেই প্রতীয়মান হয়। ইহা কিন্তু অর্থনীতির জন্য একটা অশনি সংকেত। কারণ এত বিরাট সংখ্যক যুবক যদি সম্পূর্ণ বেকারত্বের শিকার হয় তাহলে বিধাতা প্রদত্ত “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের” দ্বারা বাংলাদেশ উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনাই হাত ছাড়া হয়ে যাবে।
কারণ একটা দেশের জন্য বিধাতা বার বার এই সযোগ দেয় না। আরও উদ্বেগের কারণ হলো দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা যুগোপযোগী চাকরীর জন্য যুব সম্প্রদায়কে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে প্রায় ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। প্রযুক্তি বিদ্যায় বর্তমান যুব সম্প্রদায়কে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে আমাদের হাতে খুব অল্প সময়। “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট” অনাদিকাল পর্যন্ত থাকবেনা। ২০৪০ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে বিধাতা প্রদত্ত এই দান কমতে থাকবে। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে যাঁরা দেশের শিল্প ও বাণিজ্যে আন্তরিকতার সহিত পুঁজি বিনিয়োগ করছেন তাঁরা এই দেশের সু-সন্তান, দেশপ্রেমিক এবং এই দেশের আপামর জনতার শ্রদ্ধা ও ভালবাসার যোগ্য। যারা বিদেশে পুঁজি পাচার করছে তারা বেজন্মা এবং দেশদ্রোহী।
বর্তমান আমাদের দেশের জনসংখ্যার ক্ষেত্রে যে অবস্থা চলছে তা বিধাতারই দেওয়া একটা মহান দান। একটি দেশের ১৫ থেকে ৬৪ বৎসর বয়স্ক কর্মক্ষম জনশক্তি যখন কর্মে অক্ষম জনশক্তির চেয়ে বেশি থাকে, জাতির সে সময়টাকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউ.এন.ডি.পি) এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সম্পর্কীয় এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলের ৪৫ টি দেশের জনসংখ্যাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন বাংলাদেশ সবচাইতে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বর্তমানে ১০ কোটি ৫৬ লাখ যা মোট জনসংখ্যার ৬৬ ভাগ এবং ২০৩০ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ১২ কোটি ৯৮ লাখ হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে ২০৪২ সাল থেকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট’ এর সুযোগ আর থাকবেনা। তখন কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাবে। দুর্ভাগ্যের বিষয় আমাদের অদক্ষ পরিকল্পনা এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের খামখেয়ালীর কারণে আমাদের বেকার সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম-সংস্থার হিসাব মতে বর্তমানে বাংলাদেশের বেকারের সংখ্যা হলো ৩ কোটি। এই সংখ্যা দ্রæত বেড়েই চলেছে। আগেই বলেছি ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে শতকরা ২৯.৮ শতাংশ যুবক শিক্ষায়, চাকরীতে বা অন্য কোন প্রশিক্ষণে ছিলনা অর্থাৎ সম্পূর্ণ বেকার অবস্থায় ছিল। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় চাকরীর বাজারের জন্য উপযুক্ত জনশক্তি গড়ে তোলার মত দক্ষতা নেই। অথচ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শ্রম শক্তির দক্ষতা বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। তার একটা উদাহরণই যথেষ্ট হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি অধিবাসী বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় কর্মরত আছে। আর ভারতের অধিবাসী বিদেশে কর্মরত আছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ। সাম্প্রতিক এক হিসাবে দেখা যায় বাংলাদেশের এই খাতে বৈদেশিক মুদ্রায় আয় হচ্ছে ১৩ বিলিয়ন ডলার। আর একই সময়ে ভারতের আয় হয়েছে ৬৮ বিলিয়ন ডলার। এর কারণ ভারতীয় এবং বাংলাদেশের প্রবাসীদের মধ্যে শুধু কর্ম দক্ষতার পার্থক্য। আরেকটা দুশ্চিন্তার কারণ হলো, বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় বাড়লেও সে বর্ধিত আয়ে সকল নাগরিক সমভাবে উপকৃত হচ্ছে না। পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০১৬ সালে বাংলাদেশের শতকরা ৫ ভাগ সবচাইতে উপরের স্তরের মানুষ জাতীয় আয়ের শতকরা ২৮.১ ভাগ উপভোগ করছে এবং নি¤œতম স্তরের ৫ শতাংশ মানুষ জাতীয় আয়ের মাত্র ০.২ ভোগ করছে। আয়ের ব্যাপারে এই আকাশ পাতাল বৈষম্য বেশিদিন চলতে দেওয়া যায়না। এইভাবে অর্থনীতিকে চলতে দেওয়া যায়না। ইহা ছাড়াও ব্যাপারটা পরিষ্কারভাবে দেশের সর্বশ্রেণির মানুষ যখন বুঝতে পারবে তখন দেশের রাজনীতিতে যে বিস্ফোরণ ঘটবে তা বন্ধ করা কারও পক্ষেও সম্ভব হবেনা। উপর এবং নিচের শ্রেণির মানুষের মধ্যে এই ভয়াবহ আয়ের বৈষম্য শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বে এই ভয়াবহ অবস্থা চলছে। বিশ্বে “আয়ের এই অসহনীয়” বৈষম্য নিয়ে সারা বিশ্বব্যাপী একটি রাজনৈতিক বিস্ফোরণ যেকোন সময়ে ঘটতে পারে।
সবকিছুর পরও ইহা অনস্বীকার্য যে বর্তমানে বাংলাদেশ দ্রæত অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকেই চলছে। গত দশ বৎসরের উপরে বাংলাদেশর অর্থনীতি গড়ে ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৭৫১ মার্কিন ডলার। সর্বশেষ হিসাবে জানা যায় আমাদের মাথাপিছু আয় এখন দাঁড়িয়েছে ১৯০৯ ডলার যা ১৯৭২ সালে ছিল মাত্র ১২৯ ডলার এবং ২০১৭ সালেও ছিল ৯২৩ ডলার। বর্তামনে যদিও অর্থনীতির অনেক ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন প্রশংসাযোগ্য আবার অনেক ক্ষেত্রে আমাদের যথেষ্ট ব্যর্থতাও রয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে বর্তমানেও আমাদের দারিদ্রের হার ২৪.৩ শতাংশ। এখনও আমরা অত্যধিক জনসংখ্যার একটি দরিদ্র দেশ। আমাদের প্রশাসনে যে দক্ষতার প্রয়োজন তা অনুপস্থিত, আমাদের উৎপাদন ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক অদক্ষ। আমাদের দেশে ২৪.৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বাস করে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের শ্রমশক্তির ৮৭ মিলিয়ন অল্পশিক্ষিত। শ্রম শক্তির মাত্র ৪ ভাগ লোক শিক্ষিত বলা যায়। প্রাইমারি স্তরে শিক্ষার মান এত নি¤œস্তরের যে ৫ বৎসর ধরে প্রাইমারি স্কুলে পড়ার পর প্রায় ছাত্র সাধারণ যোগ অঙ্ক করতে পারেনা।
আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার বাড়া সত্তে¡ও সে হারে চাকরীর সংখ্যা বাড়ছেনা। অথচ লক্ষ লক্ষ যুবক প্রত্যহ চাকরীর বাজারে প্রবেশ করছে। আমাদের জিডিপি বাড়া সত্তে¡ও কেন কর্মসংস্থান বাড়ছেনা তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজন এবং সে অনুসারে তড়িৎ কর্মপদ্ধতি নেওয়া অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমাদের গড়ে জি.ডি.পি. বেড়েছে ৬.৬ শতাংশ করে, কিন্তু আমাদের চাকরী বেড়েছে মাত্র শতকরা .৯ হারে। সবচাইতে উদ্বেগের বিষয় হলো ২০১৩ সালের হিসাবে দেখা যায় আমাদের যুব সম্প্রদায়েরর ২৫.৩ শতাংশ বেকার রয়েছে। যারা লেখা পড়ায়ও নিয়োজিত ছিলনা বা কোন চাকরী বা অন্য কোন কাজেও নিয়োজিত ছিলনা। অর্থাৎ সার্বিক অর্থে তারা বেকার ছিল। ২০১৬-১৭ সালে বেকার যুবকের সংখ্যার হার দাঁড়িয়েছে ২৯.৪ শতাংশ। ইহা দেশের জন্য ভীষণ উদ্বেগের বিষয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনাকারীদের একটা কথা অবশ্যই গুরুত্বসহকারে স্মরণে রাখতে হবে যে লক্ষ লক্ষ যুবককে কর্মহীন রেখে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং শান্তি আসতে পারেনা। যুব সম্প্রদায়ের বিরাট সংখ্যায় বেকারত্ব একটি টাইম বোমার সাথে তুলনীয়। কাজেই ইহা বিস্ফোরণের আগেই জরুরি ভিত্তিতে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট