বিশ দিনেও খোঁজ মিলেনি ২১ মাঝিমাল্লার

বাঁশখালীর পুঁইছড়ি জলদাশ পাড়ায় শোকের মাতম

ওয়াসিম আহমেদ

45

গত ৩১ মে বাঁশখালীর খাটখালী ঘাট থেকে যাত্রা করেছিল মাছ ধরার ট্রলার ‘এফবি জহরলাল’। ট্রলারে ছিলেন ২১ মাঝি-মাল্লা। ১০ দিনের মাথায় তারা ফিরে আসার কথা থাকলেও ২০ দিনেও তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে ট্রলারটি। তাদের ফিরে আসার অনিশ্চয়তায় এখন পুঁইছড়ি ইউনিয়নের জলদাশ পাড়ায় বইছে শোকের মাতম।
সময়টা তখন দুপুর ১টা ছুই ছুই। আকাশ মেঘলা থাকায় অসহ্য গরম অনুভব হচ্ছিল। জলকদর খালের পাশে এই ছোট্ট পাড়াটিতে প্রায় ২০০ পরিবারের বাস। তাদের সবার একটিই পেশা-আর তা হল সমুদ্রে মাছ ধরা। অল্প এ জায়গাটুকুতে এমন ঘনবসতিই বলে দেয় তাদের জীবন কতটা মানবেতর। বাড়ির সামনে তুলসি গাছটি বৃষ্টির পানিতে প্রাণবন্ত হয়ে আছে। ২১টি প্রাণের অনিশ্চয়তা যেন সবকটি প্রাণকে প্রাণহীন করে রেখেছে।
গতকাল সকালে জলদাশ পাড়ায় গিয়ে জানা যায়, ট্রলার মালিক হরিধরের সাথে ৮ মাসের চুক্তি হয় ২০ মাঝি-মাল্লার। ৮ মাসে তাদের একেকজনের বেতন ১ লাখ ১০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। সমুদ্রে যাওয়ার সময় কিছু আগাম টাকা নিয়েছিল তারা। তাছাড়া দধি গোপাল জলদাশ যান ১০ হাজার টাকায় ১০ দিনের জন্য।
হরিধর জানান, তাদের যাওয়ার কথা ছিল শ্রাবন মাসের ১ তারিখ। কিন্তু ১ মাস আগে গেলে শেষের ১ মাস কাজ করতে হবে না-শর্তে তারা সবাই সমুদ্রে যান।
পুঁইছড়ি ইউনিয়নের জলদাস পাড়ার বাসিন্দা সুশংক জলদাস (৭৫)। অন্যদের মতো তারও পেশা সমুদ্রে গিয়ে মাছ ধরা। এখন জীবন সায়াহ্নে এসে মৃত্যুর প্রহর গুণছেন। সুশংকের চার ছেলেরা হলেন সৌরভ জলদাশ (৪১), সুবল জলদাশ (৩৮), কালু জলদাশ (২০) ও উজ্জ্বল জলদাশ। ছোট ছেলে শারীরিকভাবে অক্ষম, তাই চট্টগ্রাম শহরে গার্মেন্টেসে চাকরি করেন। তৃতীয় ছেলে দুই বছর আগে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে মারা যান। আর প্রথম দুই সন্তান পূর্বসুরিদের সেই পেশাকে ধারণ করে জীবিকার প্রয়োজনে গত ৩১ মে সাগরে যান। চার ছেলের তিন জনকে হারিয়ে শোকার্ত সুশংকের ঝাপসা চোখে ঘোর অন্ধকার ভবিষ্যৎ।
সৌরভ জলদাশ বাড়ির সবার বড় ছেলে। তার ৪ মেয়ের সন্তানের দুজনই বিবাহের উপযুক্ত। সুবলের ২ ছেলে ও ১ মেয়ে। ছোট ছেলে উজ্জ্বল জলদাশের পরিবারের ৪ জনসহ ১৫ জনের সংসারে সবাই একসাথে থাকেন। ছোট্ট একটি টিনের ঘরে তাদের বসবাস।
ডাক নাম জিয়া। আসল নাম জয়রাম জলদাশ (৩৫)। বাবা গোপাল জলদাশ ও মা যামিনি জলদাশের একমাত্র সন্তান তিনি। দুই মেয়ে, স্ত্রী ও বাবা-মাকে নিয়ে থাকতেন জলদাশ পাড়ার ছোট্ট একটি কুঠিরে। বাকি ২০ জনের মত সেও আর ফিরে আসে কিনা সন্দেহ। পরিবারের একমাত্র আশা ভরসার শেষ সম্বল জিয়ার ফিরে আসার চেয়ে না আসার নিশ্চয়তাই বেশি। এমন নিশ্চয়তায় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পানে তার পুরো পরিবার।
সেই ট্রলারটিতে ছিলেন উপেন্দ্র জলদাশ ও নিরঞ্জন জলদাশ। সম্পর্কে তারা মাম-ভাগনে। নিরঞ্জনের বাবাও ৪০ বছর আগে ট্রলারে মাছ ধরতে গিয়ে মারা গেছেন। তার বড় ভাই ইন্দ্র দাশ বলেন, ‘আমিও ২৫ বছর ধরে ট্রলারে মাছ ধরতে যাই। আমার যতটুকু অভিজ্ঞতা তাতে নিশ্চিত করে বলা যায়, তারা কেই বেঁচে নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার ভাইয়ের দুই মেয়ে, এক ছেলে। ছেলেটি কলেজে পড়ে। তাদের ভবিষ্যৎ যে কি হবে জানি না।’
বুলবুল জয়দাশের বাড়ির সামনে যেতেই কান্নার শব্দ স্পষ্ট হচ্ছিল। তার তিন মেয়ে আর স্ত্রী মিলে বিলাপ করে কান্না করছিলো। অবুঝ ছেলেরাও মায়ের সাথে কান্না করছিল। স্ত্রীর কাছ থেকে বুলবুল জলদাশের কথা জানতে চাইলে, সব প্রশ্নের উত্তর ছিল একটি। মাটির পানে তাকিয়ে গড়িয়ে পড়া চোখের জল।
দধি গোপাল জলদাশ গিয়েছিলেন ১০ দিনের জন্য। তার সাথে কোনো দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি হয়নি। ট্রলার মালিকের বাঁশখালী থানায় করা নিখোঁজ ডায়রিতেও তার নাম নেই। দধি গোপাল জলদাশের স্ত্রী পাখি রাণী জলদাশ বলেন, ‘আমার স্বামী কোনো টাকা নেয়নি। সে কি বেঁচে আছে না মারা গেছে তাও জানি না। তবে শুনেছি তার কথা অস্বীকার করছে ট্রলার মালিক।’
এ বিষয়ে ট্রলার মালিক হরিধর কৈবর্ত দাশ বলেন, ‘এই নামের কেউ ছিল না। আমি খাতায় দেখেছি, এমন কোনো নাম দেখিনি। তারপরও আমি খোঁজ নিয়ে দেখবো।’
শুধু এই কয়েকটি পরিবারে নয় পুরো গ্রামজুড়েই বইছে শোকের মাতম। পাড়ারই বাসিন্দা হরিপদ জলদাশ বলেন, ‘আমরা হলাম সবদিক থেকে বঞ্চিত। আমাদের ব্যবহার করা হয়। এখানে কেউ আসে না। এমনকি এত বড় ঘটনার পরও একজন মানুষ এই পরিবারগুলোকে সান্ত¦না দিতে আসেনি।’
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘আমরা এখনো নিশ্চিত হতে পারি নি ট্রলারটির কি অবস্থায় রয়েছে। কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সাথে কথা বলেছি, তারাও প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী সবকটি উপজেলায় খবর দেয়া হয়েছে। যাতে কোনো সংবাদ পেলে আমাদের জানানো হয়।’