বহুজাতিক ভারতের জন্য ধর্মভিত্তিক রাজনীতি শুভ ফল বয়ে আনতে পারেনা

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী

6

ভারতীয় স্বাধীনতার প্রাক্কালে স্বাধীনতার স্থপতিদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল ভারতকে একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা হবে। এ সিদ্ধান্তের পিছনে যে যুক্তিগুলি ছিল তা ছিল অখন্ডনীয় এবং স্পর্শকাতর। ভারতীয় ধর্ম নিরপেক্ষতার মূল ভিত্তিই হলো ধর্মীয় সহিষ্ণুতা। ভারতীয় স্বাধীনতার স্থপতিদের প্রায় সবাই ছিলেন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত, রুচিশীল, দেশের স্বার্থে নিবেদিত প্রাণ। তাঁরা লোভ লালসাকে জয় করতে আশ্চর্যজনকভাবে সার্থক ছিলেন। রাজনীতিতে ত্যাগ তিতিক্ষায় তাদের অসাধরণ অবদান থাকায় প্রায় সবাই কিংবদন্তীর পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন। গান্ধীজী ছিলেন সবার নেতা এবং সারা বিশ্বে শ্রদ্ধার-পাত্র হিসাবে পরিগণিত হয়েছিলেন। গান্ধীজীর নেতৃত্বে প্রায় সব রাজনীতিবিদ ঐক্যমতে পৌঁছেছিলেন যে ভারতীয় রাজনীতির ভিত্তি ধর্ম নিরপেক্ষতা ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। এর বাইরে গেলে ভারতের অখন্ডতা এবং একতা রক্ষা করা কিছুতেই সম্ভব নহে। কারণ ভারতে ধর্মের সংখ্যা প্রায় ১২টা, ৩০০ এর মতো জাত (ঈধংঃব), ৪০০০ হাজারের মত উপজাত (ঝঁন-ঈধংঃব), ১০০ এর মতো প্রধান ভাষা এবং ৩০০ এর মতো আঞ্চলিক ভাষা। এই অবস্থায় ভারতীয় ঐক্য রক্ষার প্রয়োজনে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং ধর্ম নিরপেক্ষতার কোন বিকল্প হতে পারে না। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এই সমস্যা ভারতীয় রাজনীতিতে তেমন প্রভাব ফেলতে পারে নাই। এমন কি স্বাধীনতার প্রায় ৪০ বৎসর পর্যন্ত ভারতীয় রক্ষনশীলরা হিন্দুত্ববাদের শ্লোগান ভারতে সু-প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন নাই। ভারত বিভাগের সময় ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে, বিশেষ করে পাঞ্জাব সীমান্তে হাজার হাজার হিন্দু, মুসলমান এবং শিখ দুর্বৃত্তদের হাতে প্রাণ দিয়েছে, কিন্তু কোনদিন ভারত বা পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বলেন নাই মুসলমান ভারতে থাকতে পারবেনা বা হিন্দুরা পাকিস্তানে থাকতে পারবে না। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান গণপরিষদে দেওয়া তাঁর প্রথম বক্তৃতায় বলেছিলেন। “You are free, you are free to go to your temples, you are free to go to your mosque or any other place of worship in this state of Pakistan……You will find in the course of time that Hindus would cease to be Hindus and Muslims would cease to be Muslims not in the religious sense, because that is the personal faith of individual, but in the political sense as citizens of the State.” অর্থাৎ “পাকিস্তান নামের এই রাষ্ট্রে আপনারা স্বাধীনভাবে মন্দিরে বা মসজিদে বা অন্য কোন ধর্মস্থানে গিয়ে প্রার্থনা করতে পারবেন। একটি সময় আসবে যখন আপনাদেরকে আর মুসলামান বা হিন্দু বলে আখ্যায়িত না করে শুধু পাকিস্তানি বলেই আখ্যায়িত করবে।”
এই গেল পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বক্তব্য। এবার শুনুন মহাত্মা গান্ধীর কথা। বৃটিশ সরকার ১৯৪৮ ইংরেজির মধ্যে অবশ্যই ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণা করার দায়িত্ব দিয়ে লর্ড মাউন্ট ব্যাটনকে ভারতের শেষ ভাইসরয় হিসাবে ভারতে পাঠালেন। ভাইসরয় ভারতে পৌঁছার অল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা আরম্ভ করেন। মহাত্মা গান্ধীর সাথে ভাইসরয়ের দীর্ঘ আলোচনা শুরু হলো। যখনই তিনি শুনলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারত ভাগের প্রস্তাব দিয়েছেন তখন গান্ধীজীর ভারত বিভক্ত না করে জিন্নাহকে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্ব দেওয়ার জন্য ভাইসরয়কে প্রস্তাব দেন। মাউন্ট ব্যাটন যখন এই প্রস্তাবে গান্ধীর আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন তখন গান্ধীজী বলেছিলেন-“I am entirely sincere, I will tour the length and breadth of India to get the people to accept it, if that is your decision.” অর্থাৎ “আমি সম্পূর্ণ আন্তারিক, এই সিদ্ধান্ত যদি আপনি নেন, যাতে এই প্রস্তাব ভারতীয় জনগণ গ্রহণ করে তার জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করব।” স্বাধীনতার স্থপতিদের এইরকমই ছিল ভারতের ঐক্যের প্রতি মমত্ববোধ। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় গত ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতীয় স্বাধীনতার স্থপতিদের শতাব্দীর লালিত স্বাধীন ভারতে “Unity in diversity” বা “বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য” গড়ার স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হচ্ছে।
কংগ্রেস সভাপতি, স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, গান্ধীজীর ভাব-শিষ্য জওহর লাল নেহেরুর পতি রাহুল গান্ধী কংগ্রেস সভাপতি হিসাবে পদত্যাগ করে যে চিঠি লিখেছেন তার এক জায়গায় তিনি লিখেছেন,“I have no hatred or anger toward ‘Bharatia Janata Party (BJP) but every living cell in my body instinctively resist their idea of India. This resistance arises because my being is permeated with an Indian idea that is and has always been in direct conflict with theirs. This is not a new battle, it has been waged on our soil for thousands years. Where they see difference, I see similarity where they see hatred , I see love, what they fear, I embrace.”অর্থাৎ “ভারতীয় জনতা পার্টির প্রতি আমার কোন বিদ্বেষ বা ক্ষোভ নেই কিন্তু ভারত সম্পর্কে তাদের ধারণাকে রুখে দাঁড়াতে আমার প্রত্যেক জীবকোষ সচল হয়ে উঠে। কারণ ভারত সম্পর্কে আমাদের ধারণা তাদের ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। ইহা একটি নূতন সংঘর্ষ নয়। হাজার বৎসর ধরে এই যুদ্ধ ভারতের ভূমিতে চলছে। তারা যেখানে বিভক্ত দেখে আমরা সেখানে ঐক্য দেখি, যেখানে তারা পার্থক্য দেখে, আমি সেখানে সাদৃশ্য দেখি, যেখানে তারা ঘৃণা দেখে, সেখানে আমি প্রেম দেখি। তারা যেটাকে ভয় করে, আমি সেটাকে আলিঙ্গন করি।” সদ্য অনুষ্ঠিত ভারতীয় নির্বাচনের সময় দেশি বিদেশি গণমাধ্যমের রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত নির্বাচনে বিজেপি নিজেদেরকে নির্বাচনী স্বার্থে সমস্ত সরকারী প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করেছে। কাজেই বিরোধীদল বিজেপি’কে মোকাবিলা করতে গিয়ে সরকারি সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে মোকাবিলা করতে হয়েছে, যা ভারতের জন্য ইহা একটি নূতন দৃশ্য। কারণ এর আগে ভারতের যেকোন নির্বাচনে সরকারি দল সরকারি কোন প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের জন্য ব্যবহার করার কথা কল্পনাও করে নাই। সোজা কথা হল বর্তমানে ভারতে অধিকারের বৈষম্য চলছে। মুসলমান নাগরিক দেখলেই বিশেষ হিন্দু নাগরিক তাকে “জয় শ্রী রাম” স্লোগান দিতে বাধ্য করছে। সংশ্লিষ্ট হিন্দু নাগরিক মনে করে সে এ স্লোগান দিতে মুসলমানকে বাধ্য করতে পারে। এতে গুরুতর নাগরিক বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। ইহার মোকাবিলায় একটি বিপ্লবী পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া কোন ব্যাপারই নয়। ভারতীয় শাসনতন্ত্র বিরোধী কাজ কর্ম চালিয়ে ভারতীয় সরকার দেশে বিদেশে ভারতের মর্যাদার হানি করছে।
অবশ্য বিজেপিরও করার কিছু নেই। কারণ বিজেপির গুরু সংগঠন হল, আর.এস.এস.। ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত ভারতের সমস্ত শিক্ষা ও সাংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানগুলির নিয়ন্ত্রণ আর.এস.এস’র হাতে চলে গেছে। অথচ ভারতের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রতি সারা বিশ্বের গণতান্ত্রিক শক্তির অশেষ শ্রদ্ধা ছিল। সারা বিশ্বে যাঁরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল তারা ভারতকে নিজের দেশ না হলেও, বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে আত্মিক সম্পর্ক রাখে। নিজের দেশের কোটি কোটি মানুষের আত্মমর্যাদায় আঘাত করে ভারতের ঐক্য বজায় রাখা যাবে বলে যারা মনে করে তারা আহমকের স্বর্গে বাস করছে। মানুষ সব কিছু সহ্য করলেও তার মূল্যবোধের প্রতি আঘাত ইতিহাসের কোন কাল মানুষজাতি সহ্য করেছে বলে প্রমাণ নাই।

লেখক : কলামিস্ট