বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ এখন সমীহ’র নাম

10

মো. আবদুর রহিম

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। এই জাতিরাষ্ট্রের জন্ম ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। ২০২১ সালের ২৬ মার্চ এ দেশটির স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। ব্রিটিশদের ঔপনিবেশ ও পাকিস্তানিদের ঔপনিবেশ থেকে এ দেশের মানুষ মুক্তির জন্য শতাব্দী থেকে শতাব্দী ধরে লড়াই সংগ্রাম করেছে মুক্তির জন্য, অধিকারের জন্য, স্বাধীকারের জন্য, স্বাধীনতার জন্য। সবশেষে মুক্তির দূত জন্মেছিল ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বাংলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। যার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। এই মানুষটি ছোটবেলা থেকেই উপলব্ধি করেছিল বাংলার বাঙালির শোষণ আর বঞ্চনার বেদনা। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সন পর্যন্ত সময়ে বাঙালির সার্বিক মুক্তির মন্ত্রে তিনি দীক্ষিত করে সজাতিকে। শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা, জাতির পিতা থেকে তিনি বিশ^নেতার আসনে অধিষ্ঠিত হলে একমাত্র বাঙালি জাতির মুক্তিদূত হিসেবে। লড়াই, সংগ্রাম, রক্ত আর ত্যাগের ভিতর দিয়ে বিশে^র বুকে জন্ম হয় একটি দেশ, একটি জাতি, একটি পতাকা ও একটি সংবিধান। এ দেশটির নাম বাংলাদেশ। এদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বর্তমানে বাংলাদেশের বয়স ৫০ বছর। এ দীঘ পথ চলায় এ জাতির বহু সূর্য সন্তানের জীবন গেছে, সম্পদ গেছে, গেছে এ জাতির স্থপতির প্রাণ সপরিবারে। এ দেশটি ২১ বছর শাসিত হয়েছে সামরিক আর স্বৈরশাসনের মধ্য দিয়ে। এদেশের পরাজিত অপশক্তি বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ এ দেশটিকে করেছে ক্ষত-বিক্ষত। ১৯৯৬ সালে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। নতুন স্বপ্ন নিয়ে শুরু তার পথ চলা। এদেশের কাÐারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান এর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি হাল ধরেন বাঙালি জাতির। সেই থেকে দেশ পুনর্গঠনের যাত্রা শুরু হলেও ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত প্রায় ৮ বছর উন্নয়নের চাকা থমকে গিয়েছিল। পরে ২০০৯ থেকে আবার ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে বহির্বিশে^ বাংলাদেশ আজ একটি সমীহের নাম। জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব আজ সর্বমহলের চোখে পড়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর পররাষ্ট্র নীতি ছিল, ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। সেই নীতির উপর ভর করে তার কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে আজ বিশ^ দরবারে একটি রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। জাতির পিতা প্রণীত বৈদেশিক নীতির এই মূলমন্ত্রকে পাথেয় করে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার বিশে^ শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত ১১ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে শান্তিপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে শেখ হাসিনার সরকার। কক্সবাজারে বিভিন্ন ক্যাম্পে তাদের কষ্ট লাঘবের জন্য ভাসানচরে ১ লাখ মানুষের বসবাস উপযোগী উন্নত মানের অবকাঠামো নির্মাণ করে দিয়েছে সরকার। যেখানে শুধু স্ব-ইচ্ছায় যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাঠানো হচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়ক বেয়ে ধাবিত হচ্ছে। বাংলাদেশ-করোনাকালে ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়ে দেশকে স্থিতাবস্থায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন অভিযাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের লাগাতার বিগত ১২ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ বিশে^র বুকে একটি আত্মমর্যাদাশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশ বিষ্ময়কর উন্নয়ন করেছে। জনগণের সরকার হিসেবে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য, সে দায় থেকে সরকার তার কর্তব্যপালন করেছে। দ্য ইকোনমিস্টের ২০২০ সালের প্রতিবেদন দেখা যায়, ৬৬টি উদীয়মান সবল অর্থনীতির দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান নবম। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশে^র ২৪তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। উন্নয়নের পথে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে শেখ হাসিনার সরকার বদ্ধপরিকর। দেশে যে সকল অসাধু মানুষ নানা কৌশলে জনগণের সম্পদ কুক্ষিগত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে সরকার। দুর্নীতিবাজকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। বর্তমান করোনাভাইরাস মহামারির ভয়াবহতা কমে আসায় স্বস্তিতে দেশবাসি। কোভিড-১৯ এর টিকা দ্রæত আনার চেষ্টায় সরকার। টিকা প্রাপ্তির পরপরই চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সন্মুখসারির যোদ্ধাদের অগ্রাধিকার দেবে সরকার। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ এর ঘাটতি মিটিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদেন স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। বিগত ২০২০ সালে দেশে করোনাভাইরাস, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়েছে। এ সময় বিশ^ অর্থনীতিতে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক দেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে এসেছে। সে দিক থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিভিন্ন নীতি সহায়তা এবং উদার নৈতিক আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদানের মাধ্যমে অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে বাংলাদেশ। গত অর্থ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি ৫.২৪ শতাশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলমান অর্থবছরে জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির হার ৭.৪ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। ২০২০ এ মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের ঢাকার উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার অংশে রেল লাইন বসানো হয়ে গেছে। জাপান থেকে ট্রেন ঢাকায় পৌঁছেবে। নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন পদ্মা সেতুর সর্বশেষ স্প্যান ১০ ডিসেম্বর বসানোর মাধ্যমে দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে রাজধানী সহ অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সুদূরপ্রসারি উদ্যোগ গ্রহণের ফলেই দেশে করোনাভাইরাসের ক্রান্তিকালে ডিজিটাল প্রযুক্তি ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশের ১৮ হাজার ৪৩৪টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ৩ হাজার ৮০০ ইউনিয়নে ফাইবার অপটিক কেবল স্থাপনের মাধ্যমের ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে। আগামী ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। এই সময় আমাদের জাতির পিতার স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক কল্যাণকামী দেশগড়ার জন্য নতুন করে অঙ্গীকারে আবদ্ধ হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃঢ় সুযোগ্য দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অকুতোভয় সর্বোপরি দুঃসাহসী নেতৃত্বের গুণে বাংলাদেশ শুধু এশিয়ায় নয়, বরং বিশ^সভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। তিনি নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যে কারণে বাংলাদেশ আজ বিশে^র জন্য রোল মডেল। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক ইশতেহার ঘোষণা করেছিল। সেই নির্বাচনী ইশতেহারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল দক্ষ, সেবামুখী ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ নির্মূল করে একটি ক্ষুধা-দারিদ্র-নিরক্ষরতামুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা। সে লক্ষে এগুচ্ছে বাংলাদেশ। ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ মাধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের সমৃদ্ধিশালী-মর্যাদাশীল দেশ। ২০২১ সালের আগেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পথ নকশা তৈরি করা হয়েছে। রূপকল্প-২০৪১ এর কৌশলগত দলিল হিসেবে দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ প্রণয়ন করা হয়েছে। দেশ গড়ার সংগ্রামে আরও বেশি আত্মত্যাগ, আরও বেশি ধৈর্য, আরও বেশি পরিশ্রম দরকার, আমরা যদি একটু কষ্ট করি, একটু বেশি পরিশ্রম করি, সকলেই সৎপথে দায়িত্ব পালন করি এবং ঐক্যবদ্ধ থাকি তাহলে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া সম্ভব।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চারনেতা স্মৃতি পরিষদ