চুয়েটের সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী

বস্তুগত উন্নয়নের পাশাপাশি আত্মিক উন্নয়নও প্রয়োজন

35

তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লক্ষ্য হচ্ছে শুধুমাত্র বস্তুগত উন্নয়নের মাধ্যমে উন্নত দেশ গঠন করা নয়, পাশাপাশি একটি উন্নত জাতিও গঠন করা। উন্নত জাতি গঠন করার জন্য মেধা-মূল্যবোধ, দেশাত্ববোধ, মমত্ববোধের সমন্বয় প্রয়োজন। বস্তুগত উন্নয়নের পাশাপাশি উন্নত জাতি গঠনে মানুষের আত্মিক উন্নয়নও প্রয়োজন। এটি ছাড়া শুধু বস্তুগত উন্নয়ন দিয়ে খুব বেশিদূর এগিয়ে যাওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, বস্তুগত উন্নয়নের মাধ্যমে শুধু উন্নত দেশ গঠন করা সম্ভব, সুরম্য অট্টালিকা হয়। সুরম্য সেতু হয়, নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ করা যায়, ফ্লাইওভার করা যায়, পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে ফুটো করে সুড়ঙ্গ পথে রেল চলে। উন্নত জাতি গঠন করা ভিন্ন কাজ।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এর সুবর্ণ জয়ন্তী উদ্যাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রফিকুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন। ড. হাছান মাহমুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে দুটি স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। একটি হচ্ছে দিনবদল, আরেকটি হলো ডিজিটাল বাংলাদেশ। আজকে দিনবদল হয়েছে, এখন দেশের কোন শহরের অলিগলিতে কিংবা গ্রামের মেঠোপথে মা আমাকে একটু বাসি ভাত দেন এই ডাক শোনা যায় না। বাসি ভাতের সমস্যা আমরা সমাধান করতে পেরেছি। এখন কবিতায় কুঁড়েঘর আছে বাস্তবে কুঁড়েঘর খুঁজে পাওয়া যায় না। আকাশ থেকে চট্টগ্রাম ও ঢাকা শহর চেনা যায় না। একইসাথে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নও পুরণ হয়েছে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে ১৫ কোটি মোবাইল সিম ব্যবহারকারী রয়েছে। মোবাইলফোনে শুধু কথা বলা যায় না, ভিডিও কল করা যায়। দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে টাকা পৌঁছে যায়। ভোলার মনপুরা থেকে কৃষক ভাই জমিতে দাঁড়িয়ে পোকার ছবি তুলে সদরের কৃষি অফিসারের কাছে পাঠিয়ে সরাসরি পরামর্শ নেন পোকা দমনে কোন ওষুধ দিতে হবে। দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টেলিমেডিসিন সেবা নিচ্ছে সাধারণ মানুষ। এসব সম্ভব হচ্ছে ডিজিটাল বাংংলাদেশের স্বপ্ন পূরণের কারণে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর করার স্বপ্নের কথা বলেছেন। আমাদের সাম্মিলিত প্রচেষ্ঠা হবে দেশকে সেই স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছানো শুধু নয়, দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও উন্নত জাতি গঠনের ক্ষেত্রেও স্বপ্নের ঠিকানাকে অতিক্রম করতে চায়।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ইউরোপে গত একশ বছরে অনেক উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু সেখানে প্রতি একশটি বিবাহের মধ্যে পঞ্চাশটি ভেঙ্গে যাচ্ছে। ইউরোপের কোন মহাসড়কে যখন দুর্ঘটনা ঘটে পাশ দিয়ে শতশত গাড়ি চলে যায় কেউ একপলক তাকায় না। তাদের অনেক মেধাবি সন্তান-সন্ততিরা ভালো স্কুলে পড়ে, তারা অনেক ভালো শিক্ষা পায়, কিন্তু তারা যখন বড় হয় তখন মা-বাবাকে বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে দিয়ে দেই। আমরা উন্নয়ন চায়, তবে সমাজকে ইউরোপের মতো সেই জায়গায় নিয়ে যেতে চাই না। ইউরোপে আজকে এগুলোই হচ্ছে মাথাব্যথা। মানুষ প্রচন্ড আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবে। তার পরিবারকে নিয়েও ভাবে না। এই আত্মকেন্দ্রিকতা আমাদের সমাজ যেন এই অন্ধ অনুকরণের দিকে অগ্রসর না হই এই লক্ষ্যে আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজকে উন্নয়নের মহাসড়কে অদম্য গতিতে এগিয়ে চলছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণের পথে উল্লেখ করে ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ নয়, মধ্যম আয়ের দেশ। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এদেশে মাথাপিছু কৃষিজমির পরিমাণ পৃথিবীতে সর্বনিম্ম। ৫০ এর দশকের মাঝামাঝি যখন লোকসংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৭০ লাখ তখন খাদ্য ঘাটতি শুরু হয়। আজকে লোকসংখ্যা ১৬ কোটি ৭০ লাখ ছাড়িয়েছে। লোকসংখ্যা সাড়ে তিনগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মাথাপিছু কৃষি জমি কমেছে ৩০ শতাংশ। এরপরও বাংলাদেশ আজকে পৃথিবীকে অবাক করে দিয়ে খাদ্যে উদ্বৃত্তের দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। গত সাড়ে দশ বছরে পৃথিবীর সবদেশের তুলনায় সবচেয়ে জিডিপি গ্রোথ রেট বেশি ছিল বাংলাদেশের। প্রকৌশলীদের অবদান ও ভুমিকা ব্যতিরেখে এই উন্নয়ন অগ্রগতি কখনো সম্ভবপর হতো না।
তিনি বলেন, বৈশ্বিকভাবে আমরা বাঙালিরা হয়তো ধনি নই, কিন্তু আমরা মেধার দিক দিয়ে পৃথিবীর অনেক দেশ ও জাতি থেকে ধনী। পৃথিবীর অনেক দেশ ও জাতিগোষ্ঠির তুলনায় আমরা মেধাবী। ইউরোপের বাইরে প্রথম যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান তিনি কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর, গাছের যে প্রাণ আছে তা প্রথম যিনি আবিস্কার করেন তিনি বাঙালি স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, আজ থেকে বিশ বছর আগে পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভবন শিকাগোর চিয়ার্স টাওয়ার এর স্থপতি বাঙালি ড. এফ আর খাঁন। বর্তমানেও পৃথিবীর অনেক সুরম্য অট্টালিকা নির্মাণে যুক্ত আছেন বাংলাদেশ থেকে পাশ করা প্রকৌশলীরা। বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা শুধু দেশে মেধার স্বাক্ষর রেখেছে তা নয়, তারা সমগ্র পৃথিবীব্যাপী তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছে। গত ৫১ বছর ধরে চুয়েট যাদের প্রকৌশলী হিসেবে তৈরি করেছেন তারা আজকে পৃথিবীব্যাপী অবদান রাখছে।
তিনি বলেন, ৫১ বছরের পথচলায় চুয়েট বহু প্রকৌশলী তৈরি করেছেন। যারা শুধু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে অবদান রাখছে তা নয়, তারা সমস্ত পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশের উন্নয়ন সমৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। মধ্যপ্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে সুরম্য অট্টালিকা নির্মাণে চুয়েটের প্রকৌশলীদের অবদান রয়েছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য এবং একটা নিরাপদ ও স্বাধীন আবাসভূমি গড়ার জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দেশ স্বাধীন করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে ষড়যন্ত্র করে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। আজকে বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশ পরিচালনা করছেন। বঙ্গবন্ধুর সেই লক্ষ্য সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য তিনি নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। দেশে বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম ও মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে পৃথিবীর উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের পর্যায়ে উন্নিত করার জন্য রূপকল্প নির্ধারণ করেছেন। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে বিভিন্নপর্যায়ে প্রকৌশলীরা যারা আছেন তাদের মেধা, দক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে কার্যকর ভুমিকা রাখতে হবে। এতে আমরা একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ পাব। বিজ্ঞপ্তি