বর্ষার বিরুদ্ধে শরতের মামলা

বিএম বরকতউল্লাহ

33

বর্ষার বিরুদ্ধে শরৎ মামলা ঠুকে দিয়েছে। মামলা সে এমনি এমনিতেই করেনি। বর্ষা ঋতুর অসম্ভব বাড়াবাড়িতে শরৎ রীতিমত ত্যক্ত-বিরক্ত। অন্য ঋতুর সঙ্গে পরামর্শ করেই শরৎ ঋতুরাজ বসন্তের দরবারে মামলা করেছে।
ঋতুরাজ বসস্ত বিচারকের আসনে বসে আছেন। অভিযুক্ত বর্ষা ঋতু আসামীর কাঠগড়ায় আর অন্য পাশে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত ও শীত ঋতু দাঁড়িয়ে আছে। শরতের পক্ষে অন্য ঋতুরা আদালতে উপস্থিত হয়েছে। কারণ এরাও বর্ষা ঋতুর যন্ত্রণায় অস্থির।
ঋতুরাজ বসন্ত বললেন, বর্ষার বিরুদ্ধে তোমার কী কী অভিযোগ আছে, বলো।
শরৎঃ মহামান্য রাজা, আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল। তার পরেই প্রকৃতিতে আমার আগমন ঘটে। শ্রাবণ মাসের শেষ দিনে বর্ষা বিদেয় হবে। ভাদ্র মাসের প্রথম দিন থেকেই আমার আগমন ঘটবে। প্রকৃতির এই তো নিয়ম। কিন্তু বর্ষাঋতু তার সময় শেষ হওয়ার পরও যেতে চায় না। প্রতিবছরই সে এমনটি করে। তার কারণে আমি সময় মতো প্রকৃতিতে হাজির হতে পারি না। তাকে অনুরোধ করলে সে মেজাজ গরম করে বলে, ‘আসা যাওয়া আমার ইচ্ছা। প্রকৃতিতে আমার প্রয়োজন বেশি। আমার সাথে বাড়াবাড়ি করলে তোমার সাজানো প্রকৃতি কয়েক মুহূর্তের ঢলে তছনছ করে দিব। তখন তোমার পুরো শরৎকালটাই হাসের মতো তই তই করে কাটাতে হবে। বুঝেছ শরৎবাবু?’
তার কথার জবাব দিতে গেলেই সে আমাকে ময়লাযুক্ত পানিতে চোবানোর হুমকি দেয়। আমি এই ভয়ংকর উদুমদুমা বর্ষাঋতুর অন্যায় আচরণের দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রার্থনা করছি মহারাজ।
রাজাঃ তার জন্যে তোমার আর কি কি সমস্যা হয় তা একে একে আদালতে পেশ করা হোক।
শরৎঃ মহামান্য রাজা, দেখুন, বর্ষাঋতু আমার দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে। ঠকঠক করে আমার পা আর বুক কাঁপছে। কথাবার্তা এলোমেলো হয়ে গেলে আমাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন হুজুর।
রাজাঃ অতি সরলভাবে ভয়হীন চিত্তে তোমার কথা বলে যাও।
শরৎঃ বর্ষার পরেই আমার ফুলেল গন্ধ নিয়ে, শান্তির পরশ নিয়ে প্রকৃতির বুকে ফিরে আসার কথা। আমি আপন নিয়মে প্রকৃতিকে অপরূপ সাঝে সজ্জিত করি।
কাশফুলে প্রকৃতিকে সাজাই। নানা জাতের পাখি, কীটপতঙ্গ আর প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের আগমন ঘটে কাশবনে। তারা কাশফুলের সাথে ছবি তুলে নিয়ে পত্রিকায়, ফেসবুকে প্রকাশ করে, কাশবনকে নিয়ে রচনা করে অজস্র ছড়া, কবিতা, গান আর গল্প। তখন আকাশে সাদা মেঘের ছোটোছুটি আর ফসলের ওপর বয়ে চলে এলোমেলো হাওয়া। ঠিক সেই মুহূর্তে বর্ষার অযাচিত বর্ষণে সব লন্ডভন্ড হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্য কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায় আমার সাজানো বাগান!
পাশে দাঁড়ানো অন্য ঋতুরা শরৎঋতুর বক্তব্যকে সমর্থন দিয়ে বলল, বর্ষাঋতুর কারণে আমরা পুরো দুই মাস সময় পাই না। দিনে দিনে প্রকৃতির সাথে আমাদের সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে। তাদের নানান অভিযোগের ভারে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছি মহারাজ।
শরৎঋতু রাগে-অভিমানে আরো বলতে লাগল, মহামান্য রাজা এক বর্ষাঋতুর কাছে আমরা সবাই জিম্মি হয়ে পড়েছি। প্রতি বছর বর্ষাঋতুকে খালি ছাড় দিয়েই যাব? আর গোঁয়ার বর্ষা যখন তখন বৃষ্টি নামিয়ে আমাদের তছনছ করে দেবে? মানুষেরা অভিযোগ করে বলে, আমরা বর্ষা আর শরতের মধ্যে কোন তফাৎ খুঁজে পাই না।
বর্ষার কাছে এভাবে নাজেহাল হওয়ার হাত হতে আমাদের রক্ষা করুন মহামান্য রাজা!
রাজাঃ কিহে বর্ষাঋতু, তোমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ব্যাপারে তোমার কি কিছু বলার আছে?
বর্ষাঋতুঃ নিশ্চই বলার আছে মহারাজ। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সব সত্য নয়। আমি নিরূপায় হয়ে প্রকৃতির আহŸানে সাড়া দিতে গিয়ে সময় ঠিক রাখতে পারি না মহারাজ। আমি চলে যাওয়ার পর আসে শরৎকাল।
বর্ষার পর হঠাৎ করেই শরতের ত্যাজোদীপ্ত রোদের তাপে প্রকৃতি দিশেহারা হয়ে যায়। তখন আমি মেঘের কোলে হেসে খেলে আকাশে উড়ে বেড়াই। নিচে তাকিয়ে দেখি গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ফুলের নরম পাঁপড়িগুলো, গাছের কচি পাতাগুলো, কৃষকের ক্লান্ত হাতগুলো আর সোনালী ফসলের বিবর্ণ মাঠ আমাকে ডাকছে। তখন আমি বৃষ্টি হয়ে নেমে এসে প্রকৃতিকে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিই। আমার ছোঁয়ায় শান্ত-শীতল হয়ে আনন্দে নেচে ওঠে প্রকৃতি। তার মায়ার জালে পড়ে ফিরে যেতে কয়েকটা দিন বিলম্ব হয়ে যায়। প্রকৃতির বিপদে সাড়া দিয়ে কি আমি অপরাধ করেছি মহারাজ!
আমার ঝড়, বৃষ্টি আর বন্যায় প্রকৃতি যেমন কষ্ট পায় আবার আমার পরশে প্রকৃতি প্রাণও ফিরে পায়। আমি ছাড়া প্রকৃতিকে শান্ত করে সাধ্যি কার? আমিই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা আর সবুজ করে রাখি, এগুলো কি আমার অপরাধ? আপনি আমাদের রাজা। আপনার ন্যায়দন্ড মাথা পেতে নেব মহারাজ।
রাজাঃ যুক্তিতে তো কেউ আর কম যাও না। প্রকৃতির জন্য সব ঋতুরই প্রয়োজন আছে। ছয় ঋতুর দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে আমাদের সুনাম-সুখ্যাতি আছে।
এত ঋতুবৈচিত্র্যতা আর কোথাও নেই। আমাদের অবহেলা আর খামখেয়ালীপনার কারণে এই সোনার বাংলার বৈচিত্র্যতা নষ্ট করা যাবে না- এই কথাটি পরিষ্কার মনে রাখতে হবে তোমাদের।
তোমাদের আচরণ আমাদের ঐতিহ্যের বিপরীতে যতে পারে না। বিধায়-বর্ষাঋতুকে ভবিষ্যতে এ ধরণের কর্মকাÐ হতে বিরত থাকার জন্য এবং তাকে অন্যসব ঋতুর সাথে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে প্রকৃতিতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করার জন্য বলা হলো। একই সাথে বাদী পক্ষকেও বাস্তব অবস্থা অনুধাবনসহ আরও সহনশীল মনোভাব পোষণের জন্যে পরামর্শ দেওয়া হলো। রাজা এই রায় ঘোষণা করে আসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। আর বাদী-বিবাদীগণ ন্যায় বিচার প্রাপ্তির আনন্দ নিয়ে যে যার কাজে চলে গেল।