বন্ধ হোক দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

19

পাপিয়া নামক যুবলীগের এক নারী নেত্রী (সদ্য বহিষ্কৃত) এবং এনু ও রুপন নামক দুই ভাইয়ের গ্রেফতারের পর তাদের অন্ধকার জগতের গল্প যেন শেষ হচ্ছেনা গণমাধ্যমে। বিশেষ করে, পত্রপত্রিকা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম- সবখানেই পাপিয়া নামের মেয়েটিকে নিয়ে ব্যাপক শোরগোল, কিছুদিন আগে সম্রাট নামের ক্যাসিনো-সম্রাট নিয়ে যেমনটা হয়েছিল, এখন সম্রাটের জায়গায় করে নিয়েছেন রুপন আর এনু। কয়েকদিন পরপর পাপিয়া, সম্রাট, এনু ও রুপনরা সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়ে আমাদের বিবেকের দুয়ারে কড়া নাড়ে বাঙালিরা আসলে যাচ্ছে কোথায়! যে বাঙালিদের একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র জাতি হিসাবে গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে গেছেন, তাঁর কন্যা পশ্চাপদ এ জাতিকে যেখানে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে প্রাণপণ যুদ্ধ করে যাচ্ছেন, সেখানে সরকারের সহযোগী সংগঠনের নাম ব্যবহার করে অন্ধকার জগতের গডফাদার সেজে দেশ ও জাতির সর্বনাশে মত্ত হওয়ার ঘটনা শুনে আমাদের বিচলিত হতে হচ্ছে। এর আগে স¤্রাট, এমদাদ তাদের অনুসারি এনু ও রুপনের টাকা গোডাউন দেখে দুর্নীতির শিকড় কতদূর বিস্তৃত তা কিছুটা ধারণা করা যায়। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন এবং দুর্নীতির বিস্তারে যারা প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে সম্পৃক্ত তাদের সকলকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নচেৎ এ দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতি কোনভাবেই বন্ধ হবে না। মনে রাখা চাই, পাপিয়া, স¤্রাট, এনু রুপনরা একদিনে তৈরি হয়নি এবং কোনো অন্তরালেও তাদের বিচরণ ছিল না। প্রকাম্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ে তারা অপরাধ জগতের রাজা-রাণী হয়ে উঠেছিল। দেশের রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী বলয়েই ঘোরাফেরা করতে দেখা যেত তাদের। তাই ‘ব্যক্তির দায় দল নেবে না’ এমন দাবি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। নরসিংদীর নেত্রী পাপিয়া ঢাকার পাঁচ তারকা হোটেলে রঙমহল সৃষ্টি করে যে অপরাধ করতেন বলে সম্প্রতি গনমাধ্যমে প্রকাশ, তা শুধু নরসিংদী নয়, গোটা বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র। ঘুষ-দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে হেন কোনো অপকর্ম নেই যা হয় না। সবকিছুই ঘটে ক্ষমতা বলয়ে থাকার প্রভাব দেখিয়ে। দৃশ্যপট একই থাকে। হিসাবের ভুল হলে শুধু পাত্রপাত্রী পাল্টে যায়। পাপিয়া বা সম্রাটের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় হয়নি।
তবে আশার সংবাদ হলো, এসব অপরাধী সরকারি দলের প্রভাবশালীদের বলয়ে থকলেও সরকার প্রধান তাদের প্রতি কিঞ্চিত সহানুভুতি প্রদর্শন করেন নি। তিনি বরং স¤্রাটের অনুসারি এবং পাপিয়াদের অনুসারীদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা মনে করি, যাদের হাত ধরে পাপিয়া-সম্রাটদের উত্থান, পর্দার অন্তরালের সেই খলনায়কদের চেহারা প্রকাশ করার সময় এসেছে। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, বর্তমান সরকারের ইতিবাচক দিক হল, তারা নিজ দলের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করছে। যদিও গ্রেফতার ব্যক্তিরা বেশির ভাগই চুনোপুঁটি, রাঘববোয়াল নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আমরা আশা করব, সরকার ক্যাসিনোকান্ড, মাদকবিরোধী ও অন্যান্য ক্ষেত্রের দুর্নীতিবাজ রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেবে এবং দুর্নীতির মূলোৎপাটনে এগিয়ে যাবে। একই সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি, লুটেরা, জালিয়াতদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারপ্রধান রজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব পোষণ করেছেন। এখন প্রশাসনের সর্বস্তরেও নজর দেয়া দরকার। অন্যথায় দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা স্বপ্নই থেকে যাবে।
ক্যাসিনোকান্ডে জড়িতদের মধ্যে আরও অনেকের বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তাদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করা এবং ক্যাসিনো-দুর্নীতি-মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই। কোনো কারণে যাতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে ছেদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া দুর্নীতিবাজ, ক্যাসিনো-জুয়াড়িদের পাশাপাশি তাদের দোসর, সহকারী, প্রশাসনে তাদের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিতদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো দরকার। এমনকি গ্রেফতার হওয়া জুয়াড়ি-দুর্নীতিবাজদের স্থান দখলে কারা এগিয়ে আসছে, সেদিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে। সমন্বিত, সর্বাত্মক ও লাগাতার কঠোর অভিযান ছাড়া দুর্নীতি-ক্যাসিনো-জুয়া-মাদকের কারবার বন্ধ হবে না।
বর্তমানে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি, অর্থনীতির অগ্রগতি চলমান। আমরা পর্যায়ক্রমে মধ্যম আয়ের ও উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে স্বপ্ন যারা দেখিয়েছেন তথা বর্তমান সরকারকে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি-অনিয়মসহ লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর সব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে যে কোনো উপায়ে।