বত্রিশ নম্বরের সেই বাড়িটির কাহিনি

রফিক উদ্দিন চৌধুরী

19

ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ৩২ নম্বর রোডের সেই বাড়ি। যেখানে বাঙালি জাতির অনেক গৌরবময় স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। আবার সেই সাথে আছে বেদনাদায়ক ও কলংকময় নারকীয় ঘটনা। পাকিস্তানি সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপরেখা পরিকল্পনা এবং সব ব্যবস্থা এ বাড়ি থেকেই নেয়া হয়েছে। স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এসে শাসনভার গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনকালে তিনি কোনদিন সরকারি বাসভবন ব্যবহার করেননি। এ বাড়ি থেকেই বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। তারপর আসে ১৫ আগস্ট এর সেই কালো রাত। এখানেই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিমর্মভাবে নিহত হন দেশ-বিদেশী চক্রের হাতে।


তাইতো আজ ধানমÐির রক্তে ভেজা ৩২ নম্বরের তিনতলা বাসভবনটি বাঙালি জাতির আন্দোলন সংগ্রামের জ্বলন্ত প্রতীক, স্বাধীনতা ও পরবর্তী সময়ের ইতিহাসে সমৃদ্ধ এবং ১৫ আগস্টের নির্মম বর্বরতার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ ঐতিহাসিক বাড়িটি আজ আর কারো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এটা এখন বাঙালি জাতির ইতিহাস ও জাতীয় সম্পদ। পৈত্রিক সূত্রে ৩২ নম্বরের বাড়িটি শেখ হাসিনা ও শেষ রেহানার হওয়া সত্তে¡ও তাঁরা ১৯৯৪ সালের ১৪ আগস্ট জাতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। এ বাড়িটির বর্তমানে মালিকানা স্বত্ব এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের। ৩২ নম্বরের এ বাড়িটি পরিণত হয়েছে যাদুঘরে। ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘর’। প্রতিদিন হাজারো মানুষের ঢল। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘরে আসেন প্রিয় নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। সেই সাথে প্রিয় নেতার জন্যে রেখে যান দু’ফোটা চোখের জল। ঘাতক চক্র কিভাবে একটি পরিবারকে বুলেটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করেছে তা স্বচক্ষে দেখে কেউই স্থির থাকতে পারেনা। এ যেনো অবিশ্বাস্য, কিন্তু বাস্তব। সব কিছুই সযতেœ রক্ষিত আছে সেই স্মৃতি যাদুঘরে।
মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা নিয়ে যে নেতার উত্থান তাঁকে কি কেউ হৃদয় থেকে, স্মৃতি থেকে এমন কি ইতিহাস থেকে ¤øান করতে পারে? অসম্ভব। একটি সদ্য স্বাধীন দেশ পুনর্গঠনে যখন নিরলসভাবে বঙ্গবন্ধু দিন-রাত আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন ঠিক সেই সময় তাকে খুন করা হলো নির্মমভাবে।
আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে যে ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়ে আছে তার মধ্যে ধানমÐি আবাসিক এলাকার ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নং বাড়িটি অন্যতম। বর্তমানে সংখ্যা পরিবর্তন করে ১১ নম্বর সড়কের ১০নং করা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে এবং ইতিহাসের পাতায় ‘বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়ি’ অংকিত হয়ে আছে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনের একটি দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন ধানমÐি আবাসিক এলাকার ৩২ নম্বর এ বাড়িতে। এই বাড়িতে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তথা স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের সামগ্রীক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি পরিচালিত হয়েছে এই ঐতিহাসিক বাড়িটিতেই। বাংলাদেশকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর এই বাড়িটিতেই।
১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর থেকে দুই কামড়ার দ্বিতীয় তলার বাড়িতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে বসবাস করতে থাকেন। শুভ দিনক্ষন দেখেই তিনি পরিবার নিয়ে এই গৃহে প্রবেশ করেন। তখন থেকে এই বাড়ি ক্রমেই হয়ে উঠে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের মুক্তির পরিকল্পনা কেন্দ্র। দেশি-বিদেশি বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং জ্ঞানী-গুণী মনীষী সুধীজনের আগমন ঘটে এই ঐতিহাসিক বাড়িতে।
১৯৬২ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৮-৬৯ সালে মহান গণঅভ্যুত্থান এই বাড়ি থেকে অনুপ্রাণিত এবং ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সফল নির্বাচন এই ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে পরিচালিত। ১৯৬২, ৬৪, ৬৬ সালে এই বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন এবং কারাবরণ করেন।
পাকিস্তানের সামরিক রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের অবিস্মরণীয় অসহযোগ আন্দোলন এ বাড়ি থেকে পরিচালিত হয়েছিল। এ বাড়ি থেকে যে নির্দেশ নামা পাঠানো হতো ইয়াহিয়ার সামরিক ফরমান উপেক্ষা করে এদেশের মানুষ তা পালন করতো। অফিস-আদালত-কোট-কাচারি ব্যাংক-বীমা থেকে শুরু করে সব কিছু পরিচালনা হত সেই নির্দেশনামা ভিত্তিতে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ এর কালো রাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর সশস্ত্র আক্রমণ করার সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর বাড়ি থেকেই রাত সাড়ে বারোটায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য নির্দেশ দান করে বলেন “পাকিস্তানী সেনা বাহিনী পিলখানা ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। আমি বিশ্বের জাতি সমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সাথে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রæদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমাদের আবেদন ও আদেশÑদেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনাদের পাশে এসে যুদ্ধ করার জন্য পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান। কোনো আপোষ নেই। জয় আমাদের হবেই। পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রæকে বিতাড়িত করুন। সকল আওয়ামী লীগ নেতা, কর্মী এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক লোকদের কাছে এই সংবাদ পৌঁছে দেন। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করুন। জয় বাংলা”।
রাত দেড়টায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এই ৩২ নম্বর বাড়িতে আক্রমণ চালায় এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়।
দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বীরের বেশে ফিরে আসেন এই বাড়িতে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবার নিয়ে এই ৩২ নম্বর বাড়িতেই ছিলেন। ঐদিন রাত্রে এই বাড়িতে ঘাতকদের হাতে তিনি নিহত হন। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল, দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র রাসেল, নব পরিনীতা দুই পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর সহোদর শেখ আবু নাসের, শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর গর্ভবতী স্ত্রী এবং কর্ণেল জামিল সহ আরো অনেকেই।
একটা ইতিহাস হয়ে গর্বের সাথে দাঁড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের রক্তে এই ৩২ নম্বর বাড়িটি। প্রতিটি কক্ষ এখনো ঘাতকের বুলেটে ক্ষত-বিক্ষত। এমনকি বিভিন্ন স্থানে রক্তের অস্পষ্ট চিহ্ন এখনো ফুটে আছে। যেখানে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় সিঁড়ির মাঝামাঝি স্থানটি এখনো জাতীয় পতাকা দিয়ে শ্রদ্ধাভরে ঢেকে রাখা হয়েছে। ছোপ ছোপ রক্ত এখনো সম্পূর্ণভাবে মুছে যায়নি। একটি কক্ষের সিলিং-এ অস্পষ্ট ভাবে লেগে আছে কারো মাথার ঘিলু। সবকিছুই রক্ষিত আছে খুবই সযতেœ।
একটি অতি সাধারণ পরিবার। জামা-কাপড়, চপ্পলসহ বিভিন্ন ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখলে বুঝতে কারো অসুবিধা হবার কথা নয় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা কি সাধারণ জীবন-যাপন করতেন। ছোট ডাইনিং-কাম-ড্রয়িং রুমে রয়েছে অতি সাধারণ একটি সাদাকালো টেলিভিশন, খাবার টেবিলে এখনো রক্ষিত আছে অনেক কিছুর মাঝে বিভিন্ন ধরনের আচার। এক পাশে রয়েছে শিশু রাসেলের সেই তিন চাকার ছোট্ট সাইকেলটি।
বঙ্গবন্ধুর শোবার ঘরে কাঠের দরজার পরিবর্তে কাঁচ দিয়ে পুরো দরজাটা সেঁটে দেয়া হয়েছে। শোবার ঘরটি দেখলে কখনো মনেই হবেনা বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে নেই। বঙ্গবন্ধুর শোবার ঘরে রাখা হয়েছে চপ্পল, খাটের পাশে রয়েছে সাতটি পাইপ, পানদানি, দুটি আপটার শেভ লোশন, মাটির ব্যাংক, দুটি কলম, ছোট্ট একটি ড্রেসিং টেবিল-যার আয়না ১৫ আগস্ট-এ গুলিবিদ্ধ হয়। খাটের নিচে বঙ্গবন্ধুর পরনের জুতো এমতাবস্থায় রয়েছেÑযা দেখলে মনে হবে বঙ্গবন্ধু বিছানা ছেড়ে খালি পায়ে কোথাও হাঁটতে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর কক্ষে পবিত্র কোরান শরীফটি সেভাবেই খোলা অবস্থায় আছে।
ঘটনার রাত্রে গোলাগুলির শব্দ শুনে কী হচ্ছে তা দেখার জন্য বিছানা ছেড়ে খালি পায়ে দৌঁড়ে গিয়েছিলেন সিঁড়ির দিকে। দোতলায় মূলত: হত্যাযজ্ঞ চলে। একের পর এক খুন করা হয় বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সকল সদস্য এবং বাড়িতে সেদিন অবস্থানরত সবাইকে জড়ো করে। ঘাতকদের এই নির্মম হত্যাযজ্ঞে শিশু রাসেলও ছিল। রেহাই পায়নি বাড়ির চাকরও!
শেখ রেহানার কক্ষে প্রবেশ করলে দর্শনার্থীরা অনায়াসে বঙ্গবন্ধু পরিবার সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে পারেন। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার যে মধ্যবিত্তের জীবন-যাপন করতেন তারই প্রতিচ্ছবি বহন করে শেখ রেহানার কক্ষে। এই কক্ষে আছে বঙ্গবন্ধুর রক্ত মাখা পাঞ্জাবিÑ যা ১৫ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধুর পরনে ছিল। বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত চশমা ও লুঙ্গির সঙ্গে আছে একটি তোয়ালে। যে তোয়ালে দিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুকে শেষ গোসল দিয়ে তার মৃতদেহ মুছে দেওয়া হয়েছিল। আছে মার্কিন কাপড়Ñযে কাপড় জড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ মুড়ে দেওয়া হয়েছিল। কাঁচের বাক্সে আরো রাখা হয়েছে বেগম মুজিবের শাড়ি ও বøাউজ। শেখ রেহানার কক্ষ থেকে বেরিয়ে দর্শনার্থীদের আসতে হয় সেই সিঁড়ির গোড়ায়Ñযে সিঁড়িতে ঘাতকের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়েছিল গোটা বাংলাদেশ, লুটিয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কাঁচের কম্পোজিশনে পতাকা শোভিত দেয়ালে লেগে আছে রক্তের দাগ, বুলেটের ক্ষত। কী নির্মম, কী বীভৎস! দেখে থমকে দাঁড়াতে হয়। শরীর অসার, রক্ত হিম হয়ে আসে। দুঃখ বেদনায় ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঘাতকের নিমর্ম হত্যাযজ্ঞের নীরব স্বাক্ষী রক্তাক্ত স্মৃতি বিজড়িত সেই সিঁড়ি…।

লেখক : সাংবাদিক