বঙ্গমাতা এক মহীয়সী নারী

ওমর ফারুক চৌধুরী জীবন

29

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মহান সব ব্যক্তির সাফল্যের পেছনে বরাবরই শক্তি যুগিয়েছে কোন না কোন মহীয়সী নারী। একজন পুরুষের জীবনে সবটুকু মনোবল, প্রেরণা ও শক্তির পেছনে টনিক হিসেবে কাজ করেছে তার অর্ধাঙ্গিনী। তেমনি এই বাঙালির উত্তান পতনের দিনে পর্দার পেছন থেকে সাহস যুগিয়েছে যে নারী তিনি হলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অর্ধাঙ্গিনী বেগম ফজিলতুন্নেছা মুজিব। ক্লান্তিতে শ্রান্তিতে নুয়ে পড়া প্রিয়তম স্বামীর মাথার ঘামটুকু মুছে দিয়ে শান্তির শীতল হাওয়া বইয়ে দিয়েছেন তিনি। দিন-মাস, বছর চলে যায় স্বামী জেলে। ছেলে মেয়েদের নিয়ে সংসারের বোঝা একাই টেনে নিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে দলের নেতাকর্মীরা তার কাছে এসে আশ্রয় পেয়েছে। কখনো কাউকে খালি হাতে ফেরত দেননি, কাউকে নিরাশ করেন নি। জেলে থাকলে কি পরিমাণ অভাব অনটনে সংসার চালিয়েছেন বেগম মুজিব তার খুব কমই টের পেতেন বঙ্গবন্ধু। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বলেছেন, ‘আমার স্ত্রীর মতো সাহসী মেয়ে খুব কমই দেখা যায়। আমাকে যখন পিন্ডির ফৌজ বা পুলিশ এসে জেলে নিয়ে যায়, আমার উপর নানা অত্যাচার করে, আমি কবে ছাড়া পাব বা ফিরে আসব ঠিক থাকেনা তখন কিন্তু সে কখনই ভেঙ্গে পড়েনি। আমার জীবনে দুটি বৃহৎ অবলম্বন। প্রথমটা হলো আমার আত্মবিশ্বাস, আর দ্বিতীয়টা হলো আমার স্ত্রী-আকৈশর গৃহিণী।’ গভীর অনিশ্চয়তা ও শঙ্কার মাঝেও তিনি অসীম ধৈর্য, সাহস ও বিচক্ষণতার সাথে সকল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন।
একজন স্বামী শেখ মুজিব বাঙালি জাতির পিতা হয়ে উঠার নেপথ্যে সবটুকু রসদ যুগিয়েছেন বেগম মুজিব। শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের একটি চিঠির অংশবিশেষে বঙ্গবন্ধুকে তিনি লিখেছেন, ‘আপনি শুধু আমার স্বামী হওয়ার জন্য জন্ম নেননি, দেশের কাজ করার জন্যও জন্ম নিয়েছেন। দেশের কাজই আপনার সবচাইতে বড় কাজ। আপনি নিশ্চিন্ত মনে আপনার কাজে যান। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আল্লাহর উপরে আমার ভার ছেড়ে দিন।’ আগরতলা যড়যন্ত্র মামলায় আটক বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে ইসলামাবাদে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের প্রস্তাব দেয় আইয়ুব খান। এ প্রস্তাবে সমর্থন দিল তৎকালীন আওয়ামী লীগের অনেক নেতৃবৃন্দ। এবং কুচক্রীমহল স্বাধীনতা সংগ্রামকে নস্যাৎ করতে ‘আপস ফরমুলা’ নিয়ে ততৎপর হয়ে উঠলে অত্যন্ত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সম্পন্ন বেগম মুজিব ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তির বিপক্ষে। দলের নেতাকর্মীসহ অনেকেই একদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে প্যারোলে নিয়ে যাওয়ার জন্য জেল গেটে হাজির। এয়ারপোর্টে পিআইএ বিমানও ছিল প্রস্তুত। অত্যান্ত দৃঢ়চেতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব তার কন্যা শেখ হাসিনাকে দিয়ে খবর পাঠালেন, ‘শেখ মুজিব যদি প্যারোলে মুক্তি নিয়ে ফিরে আসেন তবে তিনি সংসার ছেড়ে টুঙ্গিপাড়ায় চলে যাবেন।’ বঙ্গবন্ধু জানালেন, আগরতলা ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নিয়ে, ৩৪ জন আসামিসহ তাঁকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। তবেই তিনি গোলটেবিল বৈঠকে বসবেন। এ নিয়ে অনেক নেতারা ক্ষেপে গেলেন। তাদের অনেকে ৩২ নম্বর বাড়িতে এসে বেগম মুজিবকে ভয় দেখালেন, বুঝাতে চাইলেন, যে শেখ মুজিবকে মেরে ফেলা হবে। তিনি বিধবা হবেন। পিতৃহারা হলে তাঁর সন্তানদের কি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু বেগম মুজিব তার সিদ্ধান্তেই অটল থেকে বললেন, ‘মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার না করলে, ৩৪ জন বন্দিকে জেলে রেখে শেখ মুজিব প্যারোলে যাবেন না। বাংলার মানুষ তা চায় না।’ এ ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।


১৯৭১ সালে মার্চের উত্তাল সময়ে বঙ্গবন্ধু যখনি একটু বিচলিত হয়েছেন বেগম মুজিব পাশে থেকে সাহস যুগিয়েছেন। এক ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসভায় বক্তব্য রাখবেন। এ সভায় বক্তব্য কী হবে তা দলীয় ফোরামে দীর্ঘ আলোচনা হয়। জনসভায় বঙ্গবন্ধু কী বলবেন, সেটা নিয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন মত দেন। একপক্ষের মত দিল, বঙ্গবন্ধু যেন জনসভায় সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। অন্যপক্ষ স্বাধীনতার সরাসরি ঘোষণা পরিহার করে আলোচনার পথ খোলা রাখার পক্ষে মত প্রদান করেন। অপরদিকে হুমকি-ধামকিও আসে প্রচুর। ভীতসন্ত্রস্ত পূর্ব পাকিস্তান সামরিক সদর দপ্তর থেকে বিভিন্নভাবে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে এই বার্তা দেয়া হল যেন, ৭ মার্চ কোনোভাবেই স্বাধীনতা ঘোষণা না করা হয়। এমতাবস্থায়, ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণ দেয়ার আগে বঙ্গবন্ধুকে খানিক চিন্তিত মনে হলে বেগম মুজিব বলেছিলেন, ‘আল্লার নাম নিয়ে তোমার মন-দিল-অন্তর থেকে যা আসে- তাই বলে দিও।’ জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু কোন ধরনের লেখা স্ক্রিপ্ট ছাড়াই অনর্গল বলে গেলেন। বুকের ভেতরের জমানো সব ঢেলে দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা করলেন।
বেগম মুজিব সম্পর্কে বিশিষ্ট কলামিস্ট ভাষাসৈনিক আবদুল গাফফার চৌধুরী লিখেছেন, ‘মাথায় গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে বহুদিনের আত্মগোপনকারী ছাত্রনেতা কিংবা রাজনৈতিক কর্মী অভুক্ত অস্নাত অবস্থায় মাঝ রাতে এসে ঢুকেছেন বত্রিশের বাড়িতে, তাকে সেই রাতে নিজের হাতে রেঁধে মায়ের স্নেহে, বোনের মমতায় পাশে বসে খাওয়াচ্ছেন বেগম মুজিব। এই দৃশ্য একবার নয়, কতবার দেখেছি।’ তৎকালীন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ ও আবদুর রাজ্জাক একবার বাড়ি ভাড়া দিতে পারছিলেন না। যাদের কথায় তখন বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ উঠত আর বসত সেই ছাত্রনেতাদেরকে বাড়িওয়ালা বাসা থেকে বের করে দেয়ার উপক্রম হলে, তাঁরা বঙ্গবন্ধুর স্ত্রীর কাছে গেলেন। বঙ্গমাতা টাকা দিলে তাঁরা বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করেন।
বঙ্গবন্ধু যখন জেলে থাকতেন তখন বার্তা বাহক হিসেবে কাজ করতেন বেগম মুজিব। দলের নেতা কর্মীদের কাছে বঙ্গবন্ধুর সকল নির্দেশনা নিয়ে আসতেন আবার দলের বিষয়াদি, বিভিন্ন ঘটনা জেলে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বলে আসতেন। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ জেল জীবনে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সেতুবন্ধন ছিলেন বেগম মুজিব। প্রখর স্মরণশক্তি বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ তিনি মনে রাখতে পারতেন বলে বঙ্গবন্ধু বেগম মুজিবকে তাঁর ‘সারা জীবনের জীবন্ত ডায়েরি’ বলতেন। প্রিয়তম স্বামীকে খুব ভালবাসতেন বেগম মুজিব। বঙ্গবন্ধু ছাড়া তার কেউ ছিল না। একবার প্রায় একনাগাড়ে ১৭ থেকে ১৮ মাস কারাগারে থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য বেশ খারাপ হয়েছিল। এ অবস্থা দেখে তিনি খুব ব্যথিত হলে প্রিয় স্বামীকে বলেন, ‘জেলে থাক আপত্তি নেই। তবে স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখ। তোমাকে দেখে আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেছে। তোমার বোঝা উচিত আমার দুনিয়ায় কেউ নাই। ছোটবেলায় বাবা-মা মারা গেছেন… তোমার কিছু হলে বাঁচব কি করে?’ শুনে বঙ্গবন্ধু বলছিলেন, ‘খোদা যা করে তাই হবে, চিন্তা করে লাভ কি?’
১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট জন্ম নেয়া শেখ ফজিলাতুন্নেছার ডাক নাম ছিল ‘রেণু’। বাবা শেখ মোহাম্মদ জহুরুল হক-কে হারিয়েছেন অল্প বয়সে। যখন ৫ বছর বয়স তখন মা হোসনে আরা বেগমকে হারান। দাদার হাতে লালন পালন হতে হতে দুই বছর পর দাদাও চলে যান পরপারে। তারপর বঙ্গবন্ধুর পরিবারে কাছে চলে আসেন রেণু। এরপর বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুৎফুর রহমান আর মাতা সায়েরা খাতুনের আদরে বড় হতে থাকেন। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৩৯ সালে ১৯ বছর বয়সে ফজিলাতুন্নেছাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করেন। তখন স্ত্রী রেণুর বয়স ছিল ১৩ বছর। বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমার যখন বিবাহ হয় তখন আমার বয়স বার তের হতে পারে। রেণুর বাবা মারা যাবার পরে ওর দাদা আমার আব্বাকে ডেকে বললেন, ‘তোমার বড় ছেলের সাথে আমার এক নাতনীর বিবাহ দিতে হবে। কারণ, আমি সমস্ত সম্পত্তি ওদের দুই বোনকে লিখে দিয়ে যাব।’ রেণুর দাদা আমার আব্বার চাচা। মুরব্বির হুকুম মানার জন্যই রেণুর সাথে আমার বিবাহ রেজিস্ট্রি করে ফেলা হল। আমি শুনলাম আমার বিবাহ হয়েছে। তখন কিছুই বুঝতাম না, রেণুর বয়স তখন বোধহয় তিন বছর হবে।’
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রামী জীবন সম্পর্কে যত আলোচনা হবে বঙ্গমাতার জীবন সম্পর্কে ততই জানা যাবে। বঙ্গবন্ধু মুজিব ও বেগম মুজিব ছিলেন একে অপরের পরিপূরক। অত্যন্ত জ্ঞানী, বুদ্ধিদীপ্ত, দায়িত্ববান ও ধৈর্যশীল একজন মহীয়সী নারী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব তার আঁচলে গুছিয়ে রেখেছিলেন বাংলাদেশকে। পঁচাত্তরের পনের আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সাথে ঘাতকের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন তিনি। সেই মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এর জন্মদিনে স্মরণ করছি বিনম্র শ্রদ্ধায়। বাঙালি জাতির আষ্টে-পিষ্ঠে জড়িয়ে আছে বঙ্গামাতার ঋণ। এই জাতি কি তার ঋণ শোধ করতে পারবে?
লেখক : প্রাবন্ধিক