বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী ও আমাদের প্রত্যাশা

অধ্যাপক মোহাম্মদ ইলিয়াছ

317

২০২০ সাল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী। আর ২০২১ সালে পালিত স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এই দুই বছর জাতীয় জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূণ বছর। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বছরগুলো পালনের ঘোষণা দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২০ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী উদযাপনের গণনা শুরু হবে। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। ফলে ১৭ মার্চ ২০২০ সাল থেকে ২৬ মার্চ ২০২০ সাল পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছে মুজিববর্ষ। নানা উন্নয়ন ও গঠনমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হবে। শুধু বাংলাদেশে নয়, ইউনেস্কোর সদস্যভুক্ত ১৯৫টি দেশে একযোগে পালিত হবে মুজিববর্ষ।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন সংগ্রাম করেছেন মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশে ব্যাপক উন্নয়ন কমকাÐ হয়েছে এবং হচ্ছে। অর্থনৈতিক অর্জন হয়েছে। পদ্মা সেতুর প্রায় অর্ধেক এখন দৃশ্যমান। বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে গেছে ৯৫ শতাংশ মানুষের ঘরে। উন্নত স্যানিটেশনের সুবিধার আওতায় এসেছে ৯৭ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে অর্থনৈতিক অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা এসেছে। ২০১৯ সালে মাথাপিছু আয় ১হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০০৫-২০০৬ অথবছরে তা ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার। দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালে দুর্নীতির বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতি গ্রহণের কথা বলেছেন। দূর্নীতিবাজ যে-ই হোক, যত শক্তিশালীই হোক না কেন তাদের ছাড় দেয়া হবে না। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ফলে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে স্থান দিয়েছে। কৃষিখাত, শিক্ষাখাত, তথ্য-প্রযুক্তিখাত,স্বাস্থ্যখাত ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ দেশের আথ-সামাজিক খাতের প্রচুর অগ্রগতি হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে চোখে পড়ার মত অগ্রগতি হয়েছে। দেশের সব শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা জাতীয়করণের আওতায় আনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বহু স্কুল-কলেজকে জাতীয়করণ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও বাংলাদেশ জন্মের সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশের সব এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা জাতীয়করণের আওতায় আনা উচিত। কেননা দেশে সরকারি ও বেসরকারি দুই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকার কারণে শিক্ষাক্ষেত্রে যে ধরনের অগ্রগতি হওয়া দরকার তা হচ্ছে না। আমাদের দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে সরকারি ও বেসরকারি নামে দু’ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে। এ দুই ব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের মধ্যে চালু রয়েছে দু‘ধরনের ফি.ব্যবস্থা। শিক্ষকদের সুবিধাও দু’ধরনের। সরকারি শিক্ষকরা পান উপযুক্ত আর্থিক সুবিধা। আর বেসরকারি শিক্ষকরা সরকারি শিক্ষকদের মতো সুবিধা পান না। অথচ বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা প্রায় শতকরা ৮৫ ভাগ শিক্ষার্থী পড়ান। পেনশন সুবিধা পান না বেসরকারি শিক্ষকরা। নামে মাত্র পান বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য সুবিধা। বেসরকারি শিক্ষকরা সরকারি দায়-দায়িত্ব পালন করেন বেশি। দেশে শিক্ষকদের মধ্যে দু‘ধরনের ক্ষমতায়নের কারণে শিক্ষা ব্যবস্থায় অসঙ্গতি বিরাজ করছে। তাই দেশের সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদেরকে ক্ষমতায়নের এক প্লাটফরমে নিয়ে আসতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় দেশ থেকে বেসরকারি শব্দটি তুলে দিতে হবে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষককে একই উন্নয়ন ও ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। অন্যদিকে দেশের সব শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষার একই স্বাধীনতা দিতে হবে। টিউশন ফিসহ অন্যান্য ফি পরিশোধ সকল শিক্ষার্থীর জন্য একই হতে হবে। দেশের সব স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা জাতীয়করণের আওতায় আসলে গুণগত পরিবর্তন হবে শিক্ষা ব্যবস্থার। ইতোমধ্যে যদিও এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে তা যথেষ্ট নয়। উপজেলাভিত্তিক কিংবা থানাভিত্তিক একটি স্কুল কলেজ জাতীয়করণ হলে সফলতা আসবে আংশিক। দেশে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণীত হয়েছে। এ শিক্ষানীতির সার্বিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন। জাতীয় শিক্ষানীতির মাধ্যমে বর্তমান সরকার রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ২০২১ সালের লক্ষ্য দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে ও মধ্যম আয়ের দেশে পরিণতকরণ। এছাড়াও সরকারের টার্গেট রয়েছে শিক্ষার মাধ্যমে যথোপযুক্ত জনশক্তি তৈরি। সরকারের দিন বদলের অঙ্গীকার পূরণ ও দেশকে উন্নত দেশে পরিণতকরণের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণের আওতায় আনতে হবে। বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি হাই স্কুল ও একটি কলেজ সরকারিকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এ পর্যন্ত বহু কলেজ ও হাই স্কুল জাতীয়করণের তালিকায় স্থান পেয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি বর্তমান সরকারের একটি সাহসী উদ্যোগ। বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে বড়-বড় সাহসী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে জনগণকে দেখিয়ে দিয়েছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে আরো একটি সাহসী উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নের জন্য। সাহসী উদ্যোগটি হচ্ছে মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ। গুণগত শিক্ষা ও ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের স্বার্থে সরকারকে অবশ্যই এটি বাস্তবায়ন করতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকীতে আমরা চাই দেশের সকল বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হোক। আশা করি, বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকার দেশের সব এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা জাতীয়করণের উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলাদেশ জন্মের সুবর্ণজয়ন্তীতে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: প্রাবন্ধিক