বঙ্গবন্ধুর অন্তঃকক্ষ ভাষণের ভাষা

ড. শ্যামল কান্তি দত্ত

28

সূচক শব্দ: ভাষা-শৈলী, দাপ্তরিকভাষা, আঞ্চলিকভাষা, কথ্যভাষা, মানভাষা।
সারসংক্ষেপ: ইউরোপের আদলে এশিয়ায় অসাম্প্রদায়িক-ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের একমাত্র জন্মদাতা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি পাকিস্তান গণপরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণ (১৯৫৫) থেকেই অনলবর্ষী কথামালা দিয়ে বাঙালির ক্ষোভের চিত্র উন্মোচিত করেন। ভাষা আন্দোলনের (১৯৫২) পরেও পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি অনড় থেকেছেন। মুক্তিযুদ্ধের আগেই (১৯৭১) শহিদ মিনারে ও বাংলা একাডেমিতে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছেন-হাতে ক্ষমতা আসার সাথে সাথে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে তাঁর শেষ ভাষণেও (১৯৭৫) তিনি শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার পুর্নব্যক্ত করেন দ্যর্থহীন কণ্ঠে। বাঙালিকে কেবল ভাষাভিত্তিক জাতি-রাষ্ট্র উপহার দেননি, তিনি জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়ে (১৯৭৪) এ ভাষাকে আন্তর্জাতিক ভাষার মর্যাদা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর এইসব ভাষণগুলোকে বর্তমান প্রবন্ধে অন্তঃকক্ষ ভাষণ অভিধা দিয়ে তাঁর ভাষা-শৈলী বিশ্লেষণের প্রয়াস। এতে করে বর্তমান প্রজন্ম জানতে পারবে বাংলা ভাষা বিষয়ক বঙ্গবন্ধুর ভাবনা এবং তাঁর অসমাপ্ত পরিকল্পনা সম্পর্কে। জাতির পিতার ভাষা-শৈলী অনুধাবনে আমাদের আগামী প্রজন্মের প্রাণেও মাতৃভাষা বাংলার প্রতি ভালোবাসার বোধ বিকশিত হবে, ফলে বাংলা ভাষা মাতৃভাষার আসনে থেকেও সর্বস্তরে রাষ্ট্রভাষার আসন ফিরে পাবে সগৌরবে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫) রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যেমন তাঁর বজ্রকণ্ঠে মাঠ কাঁপিয়েছেন তেমনি গণপরিষদে কিংবা সংসদেও তাঁর কণ্ঠ থেকে যেনো ওঙ্কার ধ্বনি নিঃসৃত হয়েছে। ৭ই মার্চের ভাষণে তিনি বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশনা দিয়েছেন-মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। ১৯৭১ এর সে ভাষণ আজ বিশ্ব ইতিহাসের অংশ। উদ্যানের সে ভাষণ নিয়ে অনেক আলোচনা আমরা পাই বটে। কিন্তু অন্তর্গৃহে তিনি যে ভাষণ দিয়ে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা এনে দিয়েছেন। সে কথা অতোটা আলোচনায় আসেনি। অন্তর্গৃহের অর্থাৎ উন্মুক্ত প্রান্তরের পরিবর্তে হলরুমে বা অল্পপরিসরে তিনি যে ভাষণগুলো দিয়েছেন, এগুলোর ভাষাভঙ্গিও ময়দানের মেঠো ভাষা নয়। এভাষার কণ্ঠও একটু অন্যরকম-অনেকটা যাত্রাপালার ভাষা আর নাটকের ভাষার ব্যবধানের মতো। এই ভাষণগুলোকেই আমরা অন্তঃকক্ষ ভাষণ অভিধায় আলোচনা-বিশ্লেষণ করতে চাই ভাষাতাত্তি¡ক দৃষ্টিভঙ্গিতে। আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে (১৯৫২) ও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে (১৯৭৪) বাংলায় ভাষণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা ভাষাকে যেমন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে গেছেন। তেমনি পাকিস্তান গণপরিষদে, শহিদ মিনারে, বাংলা একাডেমিতে, গণভবনে এবং বাংলাদেশ সংসদে দেওয়া ভাষণগুলোতে বাংলা ভাষা সম্পর্কে তাঁর প্রেম, তাঁর ভাবনার স্বরূপ আজও অনেকটা অনুদ্ঘাটিত। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষার বিশ্লেষণ আজ সময়ের দাবি। তাঁর ভাষাদর্শনের বিশ্লেষণ আমাদের বর্তমান ভাষাপরিস্থিতির নাজুক অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় অনুসন্ধানে সহায়ক হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
পাকিস্তান গণপরিষদে শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম ভাষণ দেন ২৫ আগস্ট ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে। গণপরিষদে তাঁর ভাষণ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই বলেন: ‘বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তান কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টে দেয়া ভাষণগুলি লক্ষ্য করলে বাঙালির হাজার বছরের লাঞ্ছনা-বঞ্ছনার কথা শোনা যায়। তিনি প্রতিবাদী কণ্ঠে সোচ্চার করে রাখতেন সংসদকে। বাংলার মানুষকে বুভুক্ষু রেখে, দরিদ্রতর বানিয়ে, তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার যে চক্রান্ত করেছিল পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী, তার বিরুদ্ধে অনলবর্ষী ভাষণ দিতেন তৎকালীন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।’ গণপরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণেই তিনি ‘পূর্ব বাংলা’ নাম পরিবর্তন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামকরণের প্রস্তাবের তীব্র ভাষায় বিরোধিতা করে ‘বাংলা’ নামের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি ইংরেজিতে যা বলেন তার বঙ্গানুবাদ:
‘স্যার, আপনি দেখবেন ওরা পূর্ব বাংলা নামের পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে, আপনারা এটাকে বাংলা নামে ডাকেন। বাংলা নামের নিজস্ব ইতিহাস আছে, ঐতিহ্য আছে। …আপনারা যদি এটা পরিবর্তন করতে চান, আপনাদের বাংলায় ফিরে যেতে হবে এবং তাদেরই জিগ্যেস করতে হবে তারা এটা পরিবর্তন চায় কি না।
একই ভাষণে তিনি পাকিস্তানকে এক ইউনিট করবার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ জানিয়ে দক্ষ এ রাজনীতিবিদ তাঁর বক্তব্যের উপসংহারে একটি শর্ত জুড়ে দেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেন। আর এ শর্ত না মানলে পরিণাম কী হতে পারে সে হুমকি দিতেও ভোলেননি: ‘… জুলুম মাৎ করো ভাই। যদি এই বিল আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন তাহলে বাধ্য হয়েই আমাদের অসাংবিধানিক পথ বেছে নিতে হবে। আপনারা সাংবিধানিক পথে এগোবার চেষ্টা করেন।’
শুধু প্রদেশের নাম নয় বিভিন্ন প্রচলিত নাম ব্যবহারে এবং যৌক্তিক ও সময়োপযোগী নামকরণের প্রতি তাঁর আগ্রহ ও সংগ্রাম ছিল বরাবর। বঙ্গবন্ধুর প্রচেষ্টাতেই-পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগকে অসাম্প্রদায়িক সংগঠনে পরিণত করার লক্ষ্যে এর নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয় (১৯৪৯) এবং ১৯৫৩ সালের কাউন্সিল অধিবেশনে তা কার্যকর হয়। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিমলীগ (প্রতিষ্ঠা: ২৩ জুন, ১৯৪৯) নাম থেকেও কাউন্সিল অধিবেশনে ‘মুসলিম’ শব্দ প্রত্যাহার করে (২১ অক্টোবর, ১৯৫৫) পার্টিকে সকল ধর্মের মানুষের সংগঠনের রূপদানের সময়ে (প্রস্তাবকারী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলেও, তাঁর শিষ্য) পার্টির সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান মুখ্য ভ‚মিকা পালন করেন। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু ‘পূর্ব বাংলার’ নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। তিনি বলেন, “একসময় এদেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকু চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। … একমাত্র ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর কোন কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। … জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।”
এ থেকে প্রমাণিত তিনি কেবল স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিই নন, এই দেশটির জন্মের আগেই তিনি প্রথম এর নামকরণও করেন। তার আগেও অবশ্য আমরা এ নাম পাই কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭) রচিত ‘দুর্মর’ কবিতায়:
‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলা দেশ…
সাবাস, বাংলা দেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয় :
জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।’
এ কবিতায় ‘বাংলা দেশ’ বলতে নির্দিষ্ট ভূখন্ডকে নির্দেশ করে না, শব্দটি সমাসবদ্ধ বা নিরেটও নয়। যেটা বঙ্গবন্ধু প্রথম নির্দিষ্ট করে দেন তাঁর ঐ বক্তব্যে এবং একশব্দে ব্যবহার করলেন ‘বাংলাদেশ’। পরের ইতিহাস আমাদের সকলের জানা। তবে প্রচলিত নামের প্রতি তাঁর প্রবল পক্ষপাত ছিল। তাঁর প্রমাণ বাংলাদেশের প্রাক্তন গণপরিষদের সদস্য জনাব আবদুর রব সাহেবের আকস্মিক মৃত্যুতে আনীত শোক প্রস্তাবের আলোচনায় বঙ্গবন্ধু বলেন:
আমি বক্তব্য পেশ করার সময় বার বার শুধু ‘বগা মিয়া’ বলেছি কারণ, দেশের লোকে তাঁকে ‘বগা মিয়া’ বলেই জানত (০৭ এপ্রিল, ১৯৭৩, জাতীয় সংসদ; শেখ হাসিনা ও বেবী মওদুদ সম্পাদিত গ্রন্থ: পৃ. ৫৮)।
১৯৫৫ সালের ২১ শে সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো ছাড়াও তিনি বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ চান। স্পিকার ওহাব খান পশতু ভাষা না-জানা সত্তে¡ও একজন সদস্যকে ওই ভাষায় বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করার সুযোগ চান। কিন্তু অনুমতি না পেয়ে-কিছুক্ষণ ইংরেজিতে ভাষণ দিয়ে আবার বাংলায় তিনি বলতে শুরু করেন: ‘আমরা ইংরেজি বলতে পারবো, তবে বাংলাতেই আমরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। যদি পরিষদে আমাদের বাংলায় বক্তৃতার সুযোগ না দেওয়া হয় তবে আমরা পরিষদ বয়কট করবো। … বাংলাকে অবশ্যই প্রতিষ্ঠা করবো।’ বলা বাহুল্য বঙ্গবন্ধুর বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করবার সংগ্রাম এখনও অব্যাহত আছে। তাঁর দেওয়া সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে: ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ উৎকলিত আছে বটে তবে সর্বস্তরে তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এরপর পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশ এক করে ‘পশ্চিম পাকিস্তান’ ঘোষণা করবার বিলের সমাপ্তি আলোচনায় ৩০ শে সেপ্টেম্বর ১৯৫৫ খ্রি. তিনি আরও সোচ্চার কণ্ঠে বলেন, ‘এদের কাছ থেকে মধু আমরা আশা করতে পারি না। তাদের কাছ থেকে বরাবরই বিষ আশা করতে পারি। পাকিস্তানের জনগণ আরো বিষ আশা করতে পারেন।’
বঙ্গবন্ধুর এই বক্তব্যও কাব্যগুণে সমৃদ্ধ। তাঁর এই বক্তব্যে উপমা-রূপক ও সাহিত্যগুণ কতোটা তার উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়: গত শতকের আশির দশকের শেষদিকে চট্টগ্রামের বহুল জনপ্রিয় আঞ্চলিক গান লিখেন আহমেদ বশির। গানের কথা: মধু কই কই বিষ খওয়াইলা (অনেকে লিখেন: মধু হই হই বিষ হাওইলা)। গানটি বর্তমানে চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে সারা বাংলায় জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছে। বিস্ময়কর কুশলতায় প্রেমের গানের এই কথাগুলোকে কতো আগে প্রতিবাদের ভাষায় ব্যবহার করেছেন বঙ্গবন্ধু। একই উপমা বঙ্গবন্ধু তাঁর পিতার কাছে লেখা চিঠিতেও আরও আগে ব্যবহার করেন। শেখ মুজিব ৬ ফেব্রূয়ারি ১৯৫২ তারিখ তাঁর পিতার কাছে জেল থেকে চিরকুটে লিখেন, ‘খোদার রহমতে আমি মরবো না। হার্টের চিকিৎসা না করেই পাঠিয়ে দিয়েছে। কারণ সদাশয় সরকার বাহাদুরের নাকি যথেষ্ট টাকা খরচ হয় আমার জন্য। এদের কাছে বিচার চাওয়া আর সাপের দাঁত এর কাছে মধু আশা করা একই কথা।’ বাংলার লোকসাহিত্যের মধু-বিষ উপমার এই সাদৃশ্য থেকে সহজেই অনুমান করা যায় শেখ মুজিবের বক্তব্য কতোটা আকর্ষণীয়, কতোটা বাংলার জনগণের চির চেনা, কতোটা আপন। তাইতো, বঙ্গবন্ধুর কথা শোনে বাঙালি ভেবেছে এই তো আমাদের মনের কথা।
পাকিস্তান গণপরিষদে ৯ নবেম্বর, ১৯৫৫ তারিখেও বঙ্গবন্ধু বাংলায় ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন: ‘মাননীয় ডেপুটি স্পীকার, মহোদয় আমাকে বাংলায় কথা বলতে হবে। আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে এ ভাষা আপনার বোধগম্য হবে না, তবুও আমাকে বাংলাতেই বলতে হবে। (কথার মাঝে বাধা দান) … মাননীয় স্পীকার মহোদয়, আজ বাংলা ভাষায় আমাকে বক্তব্য দানের সুযোগ দেয়ায় আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই। … আমি আশা করি অপেক্ষাকৃত বিজ্ঞোচিত পরামর্শই প্রাধান্য পাবে এবং ক্ষমতাসীন দল জনাব সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক আনীত সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পথ খুঁজে বের করবে।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই ভাষণ বস্তুত পাকিস্তান গণপরিষদে মাতৃভাষার অধিকারকে সমুন্নত করার পথ খুলে দেয়। যদিও পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী সে পথ বার বার রুদ্ধ করতে মরিয়া ছিল। ১৯৫৬ সালের ১৭ জানুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান গণপরিষদের দৈনন্দিন কর্মসূচি বাংলায় মুদ্রণের বিষয়ে একটি ঐতিহাসিক বক্তব্য পেশ করেন:
‘মহোদয়, একটি বিশেষাধিকার প্রশ্নে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। মহোদয় পাকিস্তান গণপরিষদের কার্যপ্রণালী বিধি ২৯-এর অধীনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, সংসদের সরকারী ভাষা হচ্ছে তিনটি : ইংরেজি, বাংলা ও উর্দু। কিন্তু মহোদয়, আপনি জানেন যে, দিনের আলোচ্য কর্মসূচি কেবল ইংরেজিতে ও উর্দুতে বিতরণ করা হয়, বাংলায় করা হয় না। আমি জানি না বিষয়টি আপনি অবগত আছেন কি নাই, কিংবা এটি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে কি না। কিন্তু, মহোদয়, আমি জানতে চাই সংসদের অফিস থেকে কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, কেন এই কান্ড করা হচ্ছে এবং কেনই বা বাংলাকে বাদ দেয়া হয়েছে। বিশেষাধিকার প্রশ্নে আপনার মনোযোগ আকর্ষণের কারণ আমার এটি। … কার্যবিবরণী নিশ্চয়ই বাংলায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যেহেতু তিনটি ভাষাই সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃত সেহেতু তিনটি ভাষাকেই সমান মর্যাদা দিতে হবে। যদি দিনের আলোচ্য কর্মসূচী ইংরেজি ও উর্দুতে প্রকাশ করা হয় তাহলে তা অবশ্যই বাংলাতেও করতে হবে, কেননা দিনের আলোচ্য কর্মসূচী কার্যবিবরণীরই অংশবিশেষ। … আপনি ডেপুটি স্পীকার এবং আপনার ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত। কিন্তু আমি বলতে চাই যে আমাদের ব্যাখ্যা হলো এটা অফিসিয়াল রেকর্ডের অংশবিশেষ। এবং যেহেতু দিনের আলোচ্য কর্মসূচি ইংরেজি ও উর্দুতে প্রকাশ করা হয়েছে সেহেতু তা বাংলাতেও করা উচিত ছিল।’ এখানে বাংলায় ভাষণ দানের পাশাপাশি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রতিটি কাজে বংলা ভাষা ব্যবহারের নিশ্চয়তা রক্ষায় শেখ মুজিবের মরিয়া মনোভাব ফুটে উঠেছে। বাংলা ভাষার মর্যাদাহানির জন্য তিনি গণপরিষদের কাছে কৈফিয়ৎ তলব করতেও পিছপা হননি।
১৯৫৬ সালের ৭ ফেব্রূয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে আবারও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষা নিয়ে কথা বলেন; তাঁর বক্তব্যের কিছু অংশ এখানে উপস্থাপন করছি:
“আমার সংশোধনী প্রস্তাবের সমর্থনে আমি খোদ খসড়া শাসনতন্ত্রের ধারার প্রতি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। এতে বলা হয়েছে : ‘একটি জাতীয় ভাষার (Official Language) উন্নয়ন ও শ্রীবৃদ্ধির জন্য সম্ভাব্য যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার দায়িত্ব হইবে ফেডারেল ও প্রাদেশিক সরকারের।’
অন্যত্র আবার বলা হয়েছে : ‘পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সরকারী ভাষা (ঙভভরপরধষ খধহমঁধমব) হইবে উর্দু ও বাংলা।’
কিন্তু মহোদয়, আপনি লক্ষ্য করবেন যে বিবেচনাধীন বর্তমান ধারায় তারা বলেছেন যে একটি জাতীয় ভাষার উন্নয়ন ও শ্রীবৃদ্ধির জন্য সম্ভাব্য যাবতীয় ব্যবস্থা ফেডারেল ও প্রাদেশিক সরকার গ্রহণ করবেন। … আমি আমার সংশোধনীতে উল্লেখ করেছি যে, ‘দুটি রাষ্ট্রভাষা, যথা, বাংলা ও উর্দুর উন্নয়ন ও শ্রীবৃদ্ধির জন্য সম্ভাব্য যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব হবে ফেডারেল ও প্রাদেশিক সরকারের।’ এই দুই রাষ্ট্রভাষার উন্নয়ন ও শ্রীবৃদ্ধির জন্য আমাদের অবশ্যই অবিলম্বে সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মহোদয়, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাতৃভাষা বাংলা এবং আপনি যদি ইচ্ছা প্রকাশ করেন তাহলে আমি এর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা দিতেও প্রস্তুত। মহোদয়, সিন্ধু, বেলুচিস্তান, পাঞ্জাব, সীমান্ত প্রদেশ, ভাওয়ালপুর ইত্যাদি নিয়ে তৎকালীন গঠিত এলাকায় উর্দু ছিল শিক্ষার মাধ্যম। পূর্ব বাংলায় একমাত্র বাংলা ভাষাতেই জনগণ কথা বলে। অথচ এই পশ্চিম পাকিস্তানে আমরা দেখতে পাই উর্দু, সিন্ধী, পশতু ও পাঞ্জাবী ভাষাভাষী জনগণ। কিন্তু সেখানে যেখানে পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৫৬ ভাগ রয়েছে তারা সকলেই বাংলা ভাষাভাষী। … এটি জনগণের দাবি, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার দাবি এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি মানুষ এই সংশোধনী চায় যে আজ থেকে এবং ভবিষ্যতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও উর্দু হবে।”
বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়চেতা মনোভাবের কারণেই পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী-জাতীয় ভাষা, দাপ্তরিক ভাষা, সরকারী ভাষা ইত্যাদি শব্দের মারপ্যাঁচে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা হরণের অপচেষ্টায় সফল হতে পারেনি, বাঙালিকে ধোঁকা দিতে পারেনি। পাকিস্তানের রাজনীতি বিষয়ে শুধু নয়, গোটা পাকিস্তানের ভাষা-পরিস্থিতি সম্পর্কেও যে তাঁর কতোটা স্বচ্ছ ধারণা ছিল উপর্যুক্ত ভাষণের খন্ডাংশ তার প্রমাণ। বঙ্গবন্ধুর ভাষা বিষয়ক অভিজ্ঞতা তাঁর ভাষণের ভাষাকে শাণিত করেছে, তাঁকে করেছে দক্ষ সংসদ-সদস্য। তাঁর ভাষা-দর্শনের গুণেই তিনি হয়েছেন বঙ্গবন্ধু থেকে বাঙালি জাতি-রাষ্ট্র বাংলাদেশের জাতির পিতা।
ঊশিশশো বাহাত্তরের ৪ঠা নভেম্বর জাতীয় সংসদে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হবার মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের স্বরূপ উন্মোচিত হয়। সহজ ও সাধারণ ভাষায় বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন: ‘ভাষাই বলুন, শিক্ষাই বলুন, সভ্যতাই বলুন, আর কৃষ্টিই বলুন, সকলের সাথে একটা জিনিস রয়েছে, সেটা হলো অনুভ‚তি। …এই সংগ্রাম হয়েছিল যার উপর ভিত্তি করে সেই অনুভ‚তি আছে বলেই আজকে আমি বাঙালি, আমার বাঙালি জাতীয়তাবাদ।’ একই সাথে পাকিস্তানপন্থী ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসীদের বিরোধিতার কথা আন্দাজ করে-আরব দেশগুলোর প্রতি ঈঙ্গিত করে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বলেন: ‘অনেক দেশে আছে, একই ভাষা, একই ধর্ম, একই সবকিছু নিয়ে বিভিন্ন জাতি গড়ে উঠেছে-তারা এক জাতিতে পরিণত হতে পারে নাই। জাতীয়তাবাদ নির্ভর করে অনুভূতির উপর’ (পৃ. ৪৪)। এভাবে সংজ্ঞা ও উদাহরণ দিয়ে তিনি দেশবাসীর অনুভ‚তি ছোঁয়ে যেতেন তাঁর ভাষা-শৈলীর দক্ষতায়। সংবিধানের আরও দু’টি স্তম্ভ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন:
‘দ্বিতীয় কথা, আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। গণতন্ত্র সেই গণতন্ত্র, যা সাধারণ মানুষের কল্যাণ করে থাকে। … আমরা চাই শোষিতের গণতন্ত্র … শোষিতকে রক্ষা করার জন্য এই গণতন্ত্র ব্যবহার করা হবে। সেজন্য এখানের গণতন্ত্রের সংজ্ঞার সঙ্গে অন্য অনেকের সংজ্ঞার পার্থক্য হতে পারে।
তৃতীয়ত, ংsocialism বা সমাজতন্ত্র । আমরা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি।… সমাজতন্ত্রের মূল কথা শোষণহীন সমাজ। … রাশিয়া যে পন্থা অবলম্বন করেছে, চীন তা করে নাই- সে অন্য দিকে চলেছে। … সেজন্য দেশের environment দেশের মানুষের অবস্থা, তাদের মনোবৃত্তি, তাদের কাস্টম, তাদের আর্থিক অবস্থা, তাদের মনোভাব সবকিছু দেখে step by step এগিয়ে যেতে হয়। একদিনে সমাজতন্ত্র হয় না’ (৪ঠা নভেম্বর ১৯৭২, জাতীয় সংসদ, পৃ. ৪৫)।
বঙ্গবন্ধু তাঁর সংবেদনশীল ভাষায় সংজ্ঞা দিয়ে স্পষ্ট করেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুঁজিপতিদের গণতন্ত্র নয়। তাঁর গণতন্ত্রের সংজ্ঞা আলাদা, সে শোষিতের গণতন্ত্র। একইভাবে, তাঁর সমাজতন্ত্রও মস্কোপন্থী কিংবা পিকিংপন্থীদের মতো নয়। তাঁর লক্ষ্য কমিউনিজম নয়, সোশ্যিয়লিজম মানে শোষণহীন সমাজ। এভাবে বিশ্বের বৈজ্ঞানিক মতবাদ বা পরিভাষা তিনি তাঁর নিজের মতো করে সমাজে প্রচলন করতে চেয়েছেন একজন দক্ষ সমাজবিজ্ঞানীর মতো করে, রাষ্ট্রের আইনে ঠাঁই দিয়েছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মতো করে। আবার এগুলোকে সংজ্ঞায়িত করেছেন একজন ভাষাবিজ্ঞানীর মতো। শাসনতন্ত্র আর আইনের ব্যবধান ব্যাখ্যায়ও বঙ্গবন্ধু একজন বাগর্থবিজ্ঞানী বা অর্থতাত্ত্বিকের মতো করে শব্দদুটোর পরিধি-সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে বলেন:
‘আমার ভাইয়েরা ভুল করছেন-শাসনতন্ত্র অর্থ আইন নয়। শাসনতন্ত্রের মাধ্যমে আইন হয়। আইন যে কোন সময় পরিবর্তন করা যায়। শাসনতন্ত্র এমন একটা জিনিস, যার মধ্যে একটা আদর্শ, নীতি থাকে। সেই শাসনতন্ত্রের উপর ভিত্তি করে আইন করতে হয়’ (৪ঠা নভেম্বর ১৯৭২, জাতীয় সংসদ, পৃ. ৪৯)
তবে বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মভিরু একটি অঞ্চলে ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি চালুকরণ। অবশ্য বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে জন্মনেওয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদেই সে বীজ উপ্ত হয়েছিল। তবু বঙ্গবন্ধুর নিবিড় পরিচর্যা ও পারিভাষিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ব্যতীত তা বাস্তবায়ন কতোটা সম্ভব ছিল তা গবেষণার বিষয় বটে। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়:
‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। … ২৫ বৎসর আমরা দেখেছি, ধর্মের নামে জুয়াচুরী, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানী, ধর্মের নামে অত্যাচার, ধর্মের নামে খুন, ধর্মের নামে ব্যাভিচার-এই বাংলার মাটিতে এ সব চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে যে, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলব ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করা হয়েছে’ (৪ঠা নভেম্বর ১৯৭২, জাতীয় সংসদ, পৃ. ৪৬)।
এখানে কাব্যিক পুনরাবৃত্তি ব্যবহার করে, নিকট অতীত ইতিহাসের উদাহরণ দিয়ে আবেগময় ভাষায় বঙ্গবন্ধু তাঁর যৌক্তিক বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এ প্রসঙ্গে তপন পালিত যথার্থই লিখেছেন: ‘এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু ইংরেজি সেক্যুলারিজম এর বাংলা করেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা এবং এর নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, যার বিরোধিতা মৌলবাদীরা যেমন করেছে, বামপন্থীরাও করেছে। মৌলবাদীরা বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা বলেছে। আরবি ও উর্দু অভিধানে সেক্যুলারিজম-এর অনুবাদ করা হয়েছে লা দ্বিনীয়া এবং দুনিয়াঈ। এ দুটি শব্দের বাংলা অনুবাদ হচ্ছে ধর্মহীনতা ও ইহজাগতিকতা। বঙ্গবন্ধু সেক্যুলারিজম-এর বাংলা করেছেন ধর্মনিরপেক্ষতা, যার অর্থ রাষ্ট্র এবং রাজনীতি থেকে ধর্ম পৃথক থাকবে। বামপন্থীরা বলেছেন সেক্যুলারিজম-এর বাংলা অনুবাদ হবে ইহজাগতিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা নয়। তিনি জেনে বুঝেই সেক্যুলারিজম-এর বাংলা ধর্মনিরপেক্ষতা করেছেন।’ এখানে বঙ্গবন্ধু কেবল তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ব্যাখ্যা করেননি, একজন সফল পরিভাষাবিদ হিসেবেও তাঁর স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
ভাষাবিজ্ঞানে পরিভাষা মানে সংজ্ঞার্থ শব্দ। যথাযথ পরিভাষা না থাকার কারণেই রাষ্ট্রের সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারে সমস্যা দেখা দিতে পারে-একথা অনুধাবন করে ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন- ‘আমি ঘোষণা করছি, আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে, সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। বাংলা ভাষার পন্ডিতরা পরিভাষা তৈরি করবেন, তারপর বাংলা ভাষা চালু হবে, সে হবে না। পরিভাষাবিদরা যত খুশি গবেষণা করুন, আমরা ক্ষমতা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা চালু করে দেব, সে বাংলা যদি ভুল হয়, তবে ভুলই চালু হবে, পরে তা সংশোধন করা হবে।’ (ঢাকা : দৈনিক ইত্তেফাক, ১৬ ফেব্রূয়ারি, ১৯৭১)। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে বঙ্গবন্ধু যে কত আন্তরিক ছিলেন, ওপরের ভাষ্য থেকে তা সম্যক উপলব্ধি করা যায়। অথচ অপ্রিয় হলেও সত্য, তাঁর এ অঙ্গীকার বাস্তবায়ন আজও অসমাপ্ত। ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু কেবল স্বাধীনতার কথাই বলেননি, আমাদের মুক্তির কথাও বলেছিলেন; সেই মুক্তির অঙ্গীকারই ৭২-এর সংবিধানের চারটি মূল স্তম্ভ রূপে প্রকাশ পেয়েছে। তাইতো বাঙালির প্রথম সংবিধান উপস্থাপনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শেষ করেছিলেন এই বলে: ‘…ভবিষ্যৎ বংশধররা যদি সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে শোষণহীন সমাজ গঠন করতে পারে, তাহলে আমার জীবন সার্থক হবে, শহীদের রক্তদান সার্থক হবে। … খোদা হাফেজ! জয় বাংলা!’ (পৃ. ৫৩)। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল, বিশ্বাস ছিল-সেই আদর্শের ভিত্তিতে স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের। কিন্তু সে-স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারছি কি, বহাল আছে কি সে বিশ্বাস! সে আগামী প্রজন্ম বলতে পারবে। অথচ আমরা দেখি ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২৫ শে জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী বিল পাস করা উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সংসদে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন:
‘তবু আজকে আমূল পরিবর্তন করেছি সংবিধানকে। … আজ আমি বলতে চাই ঃthis is our Second Revolution। … যাঁরা দেশকে ভালোবাসেন, চারটি principle-কে ভালোবাসেন-জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা-এই চারটিকে, তাঁরা আসুন, কাজ করুন। … দেশকে বাঁচান, মানুষকে বাঁচান, মানুষের দুঃখ দূর করুন। আর, দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, চোরাকারবারীদের উৎখাত করুন’ (পৃ. ৮৮)।
এখানে তিনি সংবিধানের আমূল পরিবর্তন করলেও এর চারটি মূলনীতিকে কোনো পরিবর্তন করেননি। অথচ পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মম হত্যাকান্ড ঘটিয়ে বন্দুকের নলের জোরে সংবিধানের মূলনীতিতে পরিবর্তন এনে বাংলাদেশকে পাকিস্তানপন্থীদের হাতে তোলে দেওয়া হয়। বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়, যাদের উৎখাতের আহব্বান জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, তারপর মাত্র সাত মাসের মাথায় তারাই ষড়যন্ত্র করে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে উৎখাত করে। এবং এর অন্যতম কারণ বঙ্গবন্ধুর আপোষহীন ভাষায় বক্তৃতা-বিবৃতি। অর্থাৎ তাঁর ভাষার দৃঢ়তাই তাঁর শত্রূদের রূঢ়তা-ক্ষিপ্ততা বাড়িয়ে দিয়েছিল বলে মনে হয়। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু জানতেন: ‘বাঙালিকে সামরিক বাহিনীতে নেয়া হত না। কারণ বাঙালিরা বিদ্রোহ করে-এই হচ্ছে তাদের দোষ’ (৪ নভেম্বর ১৯৭২, জাতীয় সংসদ, পৃ. ৩৮)। আর তাঁরই নেতৃত্বে সৃষ্ট স্বাধীন বাংলাদেশে সেই বাঙালি সামরিক বাহিনীর কতিপয় উচ্চাভিলাসী ঘাতকের কথিত বিদ্রোহেই তাঁকে অকালে প্রাণ দিতে হলো। তবে এ যে নিছক সেনাবিদ্রোহ নয় এর পেছনে আরও দেশি-বিদেশি অনেক চক্র এবং ‘সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র’ জড়িত সেকথা কারো অজানা নয়। এ প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক বঙ্গবন্ধু-কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য: কিন্তু বাস্তব কী নির্মম! জাতির জনকের হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত তাঁরই প্রিয় সেনাবাহিনী! কিন্তু আমি বিশ্বাস করি সমগ্র সেনাবাহিনী এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত নয়। অথচ ১৫ আগস্টের হত্যার দায়িত্বের বোঝা তাদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। … বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার আজও হয়নি বলেই হত্যার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর কাঁধে চেপে আছে। বিলম্বে হলেও বিচার হয়েছে; তবু, অসমাপ্ত রয়ে গেল তাঁর মানুষের দুঃখ দূর করবার স্বপ্ন। তবে আশার কথা সে স্বপ্ন পুরণের সংগ্রাম থেমে নেই, সংগ্রাম চলমান।
কী ছিল সেই স্বপ্ন? তাঁর ভাষণেই আছে সে কথা: ‘Central Government -এর 125 step বা Provincial Government -এর 33 step আমরা রাখব না। এই ১২৫ এবং 33 step -এর মধ্যে যে কত ফাঁক ছিল, যাঁর সুবিধা নিয়ে অনেক promotion হত। সাত আসমান। এর বেশী step সরকারী চাকুরিতে থাকবে না। মাত্র ৭ step থাকবে। … Pay Commission করা হয়েছে। সেটাকে বন্ধ করার জন্য চেষ্টা হয়েছে। বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। কেউ ৭৫ টাকা পাবে, কেউ ২ হাজার টাকা পাবে-তা হতে পারে না। সকলের বাঁচবার মতো অধিকার থাকতে হবে’ (৪ নভেম্বর ১৯৭২, জাতীয় সংসদ, পৃ. ৪৭-৪৮)। সকলের বাঁচবার অধিকার চাইতে গিয়ে ‘সম্পদ ভাগ করে খেতে হবে’ নির্দেশ দিয়েছিলেন বলেই কি ঘাতকেরা তাঁকে বাঁচতে দেয়নি! জাতীয় বেতন-স্কেল এর ধাপ আজও সাতটিতে আনা যায়নি। অবশ্য, বেতনের ধাপ ১২৫টি থেকে কমিয়ে ২০টিতে আনা হয়েছে-সর্বোচ্চ-সর্বনিম্নের ব্যবধান ২৬.৬ গুণ থেকে কমিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতে এসে ৯ গুণ হয়েছে। তবু পুঁজিপতিদের চোখ রাঙানি থেমে নেই। এর মাঝেও বঙ্গবন্ধুর ভাষা-দর্শন সেই স্বপ্ন পূরণের সংগ্রামে প্রেরণা হয়ে প্রতিধ্বনিত হয় প্রতিনিয়ত প্রতিটি বাঙালির প্রাণে।
সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হবার পূর্বের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে, স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে গণভবনে মন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে এবং আরও কিছু ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বুলি-মিশ্রণ ও বুলি-লম্ফন প্রয়োগের প্রমাণ মেলে। বুলি-মিশ্রণ (code mixing) ও বুলি-লম্ফন (code shifting / code switching) দুটি ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষা। ভাষাবিজ্ঞানে বুলি-মিশ্রণ হল ‘একটা ভাষার কথাবার্তায় অন্য ভাষার শব্দ বা পদবন্ধ মিশিয়ে ভাষাটাকে একটা মিশ্র চরিত্র দেয়, কিন্তু অন্য ভাষার একটানা বাক্য বলে না। …আর বুলি-লম্ফন হল এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় চলে যাওয়া। তাতে অন্য ভাষার অন্তত একটা পুরো বাক্য থাকবে। অর্থাৎ একটা বক্তব্য অন্তত সে ভাষার ব্যাকরণ মেনে পুরো বাক্যে প্রকাশিত হবে।’ বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলোতে দুটি বৈশিষ্ট্যই বিস্তর মেলে; যেমন-
ক. ‘সরকারী কর্মচারীদের মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে যে, তাঁরা শাসক নন-তাঁরা সেবক। Some people come to me and wanted protection from me. I told them, `My people want protection from you, gentlemen. … গণতন্ত্রে মৌলিক অধিকার ব্যবহার করতে হবে। তার জন্য ethics মানতে হয়। খবরের কাগজে journalism করতে হলে ethics মানতে হয় তা না হলে ethics impose করা হয়। … যাই হোক, আমরা সংবিধানের ethics -এ যা রেখেছি, তাতে কেউ কেউ বলছেন যে, পূর্বের শাসনকালের কিছু কিছু আইনকে আমরা ethics দিয়েছি। সব দেশেই এটা করা হয়ে থাকে। তা না হলে বঃযরপং করে সব শেষ করে ফেলবে। দেশের প্রয়োজনেই এগুলিকে দেবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’ (৪ নভেম্বর ১৯৭২, গণপরিষদ, ঢাকা, পৃ. ৪৭-৫১)।
খ. ‘খবরের কাগজে যা পড়ি তিন দিন পরে পুলিশ রিপোর্টে তা আসে নাথিং মোর দ্যান দ্যাট। এই সম্বন্ধে একটু মেহেরবানি করে আপনাদের এজেন্সিকে স্ট্রং করে ফেলেন। এই সম্বন্ধে আপনাদের কাছে অনুরোধ আপনারা যাঁরা হাই অফিসিয়াল আছেন অনুরোধ করবো শ্রম দেন। … This is Bangladesh. This is not Pakistan. Independent country …, যদি কেউ না পারে…। যদি একচ্যুয়াল খবর অ্যাডমিনিস্টটররা যদি একচ্যুয়াল খবর না পায় তাহলে অ্যাডমিনিস্ট্রেশন চলতে পারে না, ডিসিশন নিতে পারে না এবং এক্সপ্লেইন ভুল হয়।’ (১০ ফেব্রূয়ারি, ১৯৭৩, গণভবন, ঢাকা, ওঙ্কারসমগ্র: পৃ. ২১৭)।
গ. ‘Opposition Party করতে হলে ২৫ জনের কমে হয় না এবং সেই সংখ্যা যদি তারা রাখতে পারতেন, তাহলে আমরা তাঁকে opposition leader হিসাবে গ্রহণ করতে পারতাম। যদি ১০ জন সদস্য বিরোধী হয়, তা হলে তাঁকে Opposition grouping বলা হয়-the Party । এবং তার কমে Opposition Grop হয় না।’ (১২ এপ্রিল, ১৯৭৩, ঢাকা, জাতীয় সংসদ, পৃ. ৬১)।
ঘ. ‘আমরা কলোনী ছিলাম। আমরা কোন কিছুতে ংself-sufficient না। আমরা food-এ ংself-sufficient না, আমরা কাপড়ে self-sufficient না, আমরা তেলে self-sufficient না, আমরা খাবার তেলে self-sufficient না, আমাদের raw materials কিনতে হবে, ওষুধে self-sufficient না। … আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশে নিশ্চই এই তিন বছরের মধ্যে আমরা কিছু করেছি। আপনাদের কি কোন গবর্নমেন্ট ছিল ? কেন্দ্রীয় সরকার ছিল? ছিল কি আপনাদের foreign office? ছিল কি আপনাদের defence office ? ছিল কি আপনাদের planning? ছিল কি আপনাদের finance? ছিল কি আপনাদের customs ? কী নিয়ে আমরা আরম্ভ করেছিলাম ? Avcbv‡`i ? Kx wb‡q Avgiv Avi¤¢ K‡iwQjvg ? We have now organized a national government – an effective national government . insha-allah, and better than many countries. I can challenge. …. তবে কথা হল এই -সবচেয়ে বড় কাজ আমাদের, We have to work sincerely and honestly for the emancipation of the poor people of this country. this is our aim. ইনশাল্লাহ্।’ (২৫ জানুয়ারি, ১৯৭৫, ঢাকা, জাতীয় সংসদ, পৃ. ৮৪Ñ৯৩)।
এইসব উদ্ধৃত ভাষণের বাক্যগুলোতে বাংলা বর্ণমালায় লিখিত বাক্যগুলো বুলি-মিশ্রণের উদাহরণ, আর ইংরেজি বর্ণমালায় লিখিত বাক্যগুলো বুলি-লম্ফনের উদাহরণ। এখানে আরবি ভাষার অনন্বয়ী অব্যয় পদ বা আবেগ-শব্দ ((interjection) ‘ইনশাল্লাহ্’ ব্যবহার হয়েছে অনেক বার; এছাড়াও এসব ভাষণেও কিছু অসম্পূর্ণ বাক্য কিংবা এমন কিছু বাক্য পাওয়া যায় যেগুলো বাংলা ভাষার ব্যাকরণ সম্মতও নয়। তবে এ বিষয়গুলো বিচারে আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিক দর্শন (modern linguistic philosophy) বিবেচনায় নিয়ে এগুতে হবে। কেননা, ভাষাবিজ্ঞানী (linguist) মাত্রেই স্বীকার করবেন: ‘প্রকৃত বাক্য পর্যালোচনা করে একজন ভাষাভাষীর প্রয়োগ বা সম্পাদনা রীতি পর্যালোচনা করা যেতে পারে কিন্তু সেইটে থেকে তার ভাষাজ্ঞানের আংশিক উদ্ঘাটন সম্ভব মাত্র। একজন মানুষের ভাষা ক্ষমতা এবং ভাষা প্রয়োগের মধ্যে পার্থক্য এই কারণেও গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা যখন কথা বলি তখন তা প্রায়শই ব্যাকরণ সম্মত হয় না। সে কারণেই ব্যাকরণের লক্ষ্য মানুষের ভাষা ব্যবহার নয় বরং ভাষাজ্ঞান।’ আর তাই ভাষণের ভাষায় অপূর্ণ বাক্যের ব্যবহার দেখানো-তা যতই বস্তুুনিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে হোক না কেন-ব্যাকরণের লক্ষ্য নয়। সে আলোচনাও ভাষাবিজ্ঞান (linguistics) নয়। সুতরাং, সমাজভাষাবিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে বর্তমান বাঙালি সমাজের দিকে তাকালেও দেখা যাবে এমন বাংলিশ গোছের ভাষা এখন অনেকেই অহরহ বলছেন। বাংলা বাক্যে ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে কিংবা বাংলা সংলাপে দু’একটা ইংরেজি বাক্য ঢুকিয়ে দিয়ে নিজের আভিজাত্য জাহির করছেন। এর কারণ সম্পর্কে বাংলাদেশের ভাষাবিজ্ঞানীর অব্যর্থ অবলোকন: ‘ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালির অসচেতন ভাষা-অভ্যাসে এ ধরনের কথা শোনা যায়, এতে বোঝা যায় যে, দ্বিভাষিকতার মধ্যে তাঁরা দুটি ভাষার ব্যাকরণকে আলাদা রাখতে পারেন না, তার ফলে প্রায়ই এই রকম একটা মধ্যবর্তী ভাষা (রহঃবৎসবফরধঃব ষধহমঁধমব) বলে চলেন।’ অনুমান করতে অসুবিধা হয় না এর কারণ, দুশো বছরের ইংরেজ শাসন থেকে মুক্ত হলেও ইংরেজি ও বাংলার মধ্যে আধিপত্য ও অধীনতার মাত্রাভেদ রয়ে গেছে। তেইশ বছরের পাকিস্তানী অপশাসনের নামে ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাবে ধর্মের নামে আরবি শব্দের ব্যবহারও বাড়ছে প্রচলিত বাংলা শব্দ পাল্টিয়ে। সমাজের এই ধর্মীয় ভাষার প্রভাব থেকে বঙ্গবন্ধুও মুক্ত থাকতে পারেননি। ‘বাকশাল’ কায়েম করতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের ৭ম অধিবেশনের সমাপ্তি ভাষণ ‘জয় বাংলা!’ ধ্বনি দিয়ে শেষ করলেও জনগণের আত্মবিশ্বাস অর্জনের লক্ষ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের বহুল ব্যবহৃত ধর্মীয় ভাষাতেই তাকেই বলতে হয়:
‘তাই, আল্লাহর নামে, চলুন, আমরা অগ্রসর হই। বিসমিল্লাহ্ বলে আল্লাহর নামে অগ্রসর হই। ইনসাল্লাহ্ আমরা কামিয়াব হবই। খোদা আমাদের সহায় আছেন। … যদি সকলে মিলে নতুন প্রাণে নতুন মন নিয়ে খোদাকে হাজির-নাজির করে, নিজের আত্মসংশোধন করে, আত্মশুদ্ধি করে, ইনশাল্লাহ্ বলে কাজে অগ্রসর হন; … ইনসাল্লাহ্ আমরা কামিয়াব হবই’ (২৫ জানুয়ারি, ১৯৭৫, জাতীয় সংসদ, পৃ. ৯২)।
এখানে লক্ষ্যণীয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) মতো জাতির জনকও চেয়েছেন ধর্মকে ধারণ করে সকল ধর্মের ভিত্তিতে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে-সকল ধর্মের অধিকার রেখে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা করতে। নজরুল যেমন একহাতে শ্যামাসংগীত আর ইসলামী সংগীত লিখেছেন, ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধুও ‘ইনসাল্লাহ্’ বলেই আবার ‘জয় বাংলা’ বলেছেন। অথচ পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের অব্যবহিত পরেই আর ‘জয় বাংলা’ বলা গেল না। ‘তুমিই নমাজের প্রভু’ বদলে হয়ে গেল ‘তুমিই সালাতের রব’। এভাবে বাংলা শব্দের সাথে সাথে ফারসি প্রচলিত শব্দ পাল্টিয়ে অনাবশ্যক আরবি শব্দ আমদানী করা হল নির্বিচারে। বেতার-টিভিতে আর ‘সালাম সালাম হাজার সালাম-সকল শহীদ স্মরণে’ (গীতিকার: মোহাম্মদ আবদুল জব্বার) এই জাতীয় গান শোনা গেল না। এরই ধারাবাহিকতায় ‘আস্সালামু আলাইকুম্ বিয়াইন সাব’ জাতীয় গান নিয়ে বিনোদন জগতে আসলো ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’(১৯৯৭) জাতীয় সিনেমা। শুধু তাই নয় এই ধরনের সিনেমার গান পেলো ‘মেরিল-প্রথমআলো’ চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৮)। লালসালু (১৯৪৮) উপন্যাসের মজিদের মতো ভন্ড মানুষদের ভাষা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে থাকলো দীর্ঘদিন ধরে। উপরন্তু বিনোদন মাধ্যমের প্রভাবে হাল আমলে বাংলা ভাষায় হিন্দি ভাষার আধিপত্য বাড়ছে। বাংলাদেশের নিজস্ব ভাষানীতি (ষধহমঁধমব ঢ়ড়ষরপু) প্রণীত না হওয়া এবং সুনির্দিষ্ট ভাষা-পরিকল্পনার (intermediate language) অভাবে এবিষয়ে বাঙালির সতর্কতা নেই বললেই চলে। বাঙালির গৌরবময় ভাষা-আন্দোলন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার বিকাশ, ভাষাভিত্তিক জাতি-রাষ্ট্র অর্জন, সংবিধানে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি, অহংকারের একুশে ফেব্রূয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রূপে স্বীকৃতি লাভ ইত্যাদি এতো কিছু হলেও ইংরেজি ও হিন্দি-উর্দু ভাষার প্রতি বাঙালির অকারণ সমীহ আর মাতৃভাষা বাংলার প্রতি অনাবশ্যক হীনম্মন্যতার অমানিশা আজও কাটানো গেছে বলে মনে হয় না। সে কারণে দেশের তথা জাতির ভাষাপরিস্থতি অনুধাবনের লক্ষ্যেই প্রয়োজন জাতির পিতার ভাষাজ্ঞানের বিশ্লেষণ; তাঁর ভাষার শৈলী অনুসন্ধান।
বঙ্গবন্ধুর ময়দানের ভাষণগুলো যেমন কাব্যময় তেমনি তাঁর অন্তঃকক্ষ ভাষণগুলোতেও কাব্যগুণ বিদ্যমান। সংস্কৃত অলঙ্কারশাস্ত্রে কবিতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়: ‘কাব্যং রসাত্মক বাক্যং’। আর ভাষাকে রসসিক্ত করতে দরকার অলঙ্কার। কেননা, অলঙ্কার ভাষার সৌন্দর্য সম্পাদন করে ভাষার রস ধারণের শক্তি বাড়িয়ে দেয়। এমনি এক শব্দালঙ্কার হচ্ছে অনুপ্রাস (language policy)-০কবিতায় বা প্রবাদ প্রবচনে একাধিক ব্যঞ্জন ধ্বনির পুঃন পুঃন প্রয়োগকে অনুপ্রাস বলে। বঙ্গবন্ধু প্রচুর পরিমাণে অনুপ্রাস প্রয়োগ করেছেন তাঁর ভাষণগুলোতে। এক্ষেত্রে তিনি কেবল অনুরূপ ব্যঞ্জনধ্বনি বা শব্দ নয় বরং কয়েকটি শব্দের একটি বাক্যাংশ পুনঃ পুনঃ প্রয়োগ করে তাঁর কাব্য নৈপুণ্যের নজির সৃষ্টি করেছেন। যেমন-
ক. ‘আমাদের মনে রাখতে হবে, যে রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। সে রক্ত যেন বৃথা না যায়। রক্ত দিয়েছে সসামরিক বাহিনীর ভায়েরা, রক্ত দিয়েছে পুলিশ, রক্ত দিয়েছে ভ‚তপূর্ব ইপিআর, রক্ত দিয়েছে আনসার, মোহাজেদরা। রক্ত দিয়েছে প্রত্যেকটা বাঙালি, এমনকি সরকারি কর্মদারীরাও রক্ত দিয়েছে এই স্বাধীনতা সংগ্রামে’ (১০ এপ্রিল, ১৯৭২, ঢাকা, গণপরিষদ, পৃ. ১৪)।
খ. ‘প্রায় ২০ লক্ষ থেকে ৩০ লক্ষ লোককে হত্যা করে। হত্যা করে বৃদ্ধকে, হত্যা করে মেয়েকে, হত্যা করে যুবককে- যেখানে যাকে পায়, তাকেই হত্যা করে । … এদের পাশবিক অথ্যাচার পশুর মত, বর্বরের মত-যাতে হিটলারও লজ্জা পায়, হালাকু খানও লজ্জা পায়, যাতে চেঙ্গিস খানও লজ্জা পায়,’ (১২ অক্টোবর, ১৯৭২, ঢাকা, গণপরিষদ, পৃ. ২৭)।
গ. ‘গৃহহারা, সর্বহারা কৃষক,মজুরী দুঃখী বাঙালি, যারা সারা জীবন পরিশ্রম করেছে, খাবার পায় নাই। তাদের সম্পদ দিয়ে গড়ে উঠেছে কলকাতার বন্দর, তাদের সম্পদ দিয়ে গড়ে উঠেছে বোম্বের বন্দর, তাদের সম্পদ দিয়ে গড়ে উঠেছে মাদ্রাজ, তাদের সম্পদ দিয়ে গড়ে উঠেছে করাচী, তাদের সম্পদ দিয়ে গড়ে উঠেছে ইসলামবাদ, তাদের সম্পদ দিয়ে গড়ে উঠেছে লাহোর, তাদের সম্পদ দিয়ে গড়ে উঠেছে ডান্ডি গ্রেটবৃটেন। এই বাংলার সম্পদ বাঙালির দুঃখের কারণ ছিল’(০৪ নভেম্বর, ১৯৭২, ঢাকা, গণপরিষদ, পৃ. ৩৬)।
ঘ. ‘কিন্তু, আমরা চেয়েছিলাম একটা শোষণমুক্ত সমাজ। আমরা চেয়েছিলাম, বাংলাদেশ একটা স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে। আমরা চেয়েছিলাম এই দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। … কাদেরকে হত্যা করা হয়েছে ? হত্যা করা হয়েছে তাদেরকে, যাঁরা স্বাধীনতার মুক্তিযোদ্ধা। কাদেরকে হত্যা করা হয়েছে ? যাঁরা স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিল। কাদেরকে হত্যা করা হয়েছে ? পঁচিশ বৎসর পর্যন্ত এই বাংলাদেশে পাকিস্তানী শোষকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাঁরা কারা-নির্যাতন, অত্যাচার অবিচার সহ্য করেছে, তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। … আর, যাদের পয়সায় আমাদের সকলের সংসার চলে, যাদের পয়সায় আমাদের রাষ্ট্র চলে, যাদের পয়সায় আজ আমার এসেম্বলি চলে, যাদের পয়সায় আমরা গাড়ি চড়ি, যাদের পয়সায় আমরা পেট্রোল খরচ করি, যাদের পয়সায় আমরা কার্পেট ব্যবহার করি, তাদের জন্য কী করলাম? সেইটাই বড় জিনিস। … বাংলাদেশকে ভালোবাসব না । বাংলার মাটিকে ভালোবাসব না, বাংলার ভাষাকে ভালোবাসব না, বাংলার কালচারকে ভালোবাসব না। আর ফ্রি স্টাইলে চালাব-এটা হতে পারে না।’ (২৫ জানুয়ারি, ১৯৭৫, জাতীয় সংসদ, পৃ. ৭৭-৮৯)।
উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিগুলোর নিম্নরেখ বাকাংশের বারংবার ব্যবহারের মধ্যদিয়ে যেমন ধ্বনিমাধুর্য সৃষ্টি হয়েছে তেমনি ভাষণের কাব্যময় ভাষার বক্তব্যও গভীর তাৎপর্য লাভ করেছে। আর ভাষণকারকে দিয়েছে এক অনন্য ভাষাশৈলীর গৌরব।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদ এর ভিত্তিতে। বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন করে জেলে গেছেন। এই ভাষা-আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তিনি বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন দেখেছেন। হাজার বছর ধরে বাঙালি জাতি নিজেদের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছে। সেই জাতির জন্য একটি দেশ এনে দিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। তিনি তাঁর মাতৃভাষার ঋণের কথা ভুলে যাননি। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য দেশের মর্যাদা লাভ করে। এর আট দিন পর, ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন মাতৃভাষা বাংলায়। জাতিসংঘে এটি ছিল প্রথম বাংলায় ভাষণ। এতে করে বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে পেয়েছে সম্মানের আসন, আর এই ভাষাভাষী মানুষেরা পেয়েছে গর্ব করার অবকাশ।
বিশ্বপরিসরে এর আগে এমন করে বাংলাভাষাকে কেউ পরিচয় করিয়ে দেননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বাঙালি হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর অবদানে বিশ্বের দরবারে প্রথম বাংলা ভাষা পরিচিত পেয়েছিল। কিন্তু জানামতে, বিশ্বাঙ্গনের কোথাও তিনি বাংলায় বক্তব্য রাখেননি। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে চীনের বেইজিং-এ আয়োজিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিনিধিদের শান্তি সম্মেলনে ভারতের মনোজ বসু আর পূর্ব পাকিস্তানের শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেন, যা ইংরেজি, চিনা, রুশ ও স্পেনিশ ভাষায় অনুবাদ করে উপস্থিত প্রতিনিধিদের শোনানো হয়। ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে অমর্ত্য সেন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। তিনিও তাঁর বক্তব্যটি রেখেছিলেন ইংরেজিতে। ড. মুহম্মদ ইউনুস ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি তাঁর ৩৫ মিনিটের ভাষণের মধ্যে মাত্র দেড় মিনিট বাংলায় বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর পরে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে চেতনায় ধারণ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিতে পেরেছেন সুদৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ে। এরপর তিনি যতবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গিয়েছেন, ততবার বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি করেছেন। অন্তর্জাল থেকে জানা যায়: বিশ্বব্যাপী ৩৫ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। তবে বাংলা ভাষা বলতে বিশ্ব বাংলাদেশকেই বুঝে। মাতৃভাষা বিবেচনায় বাংলা এখন চতুর্থ। ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে সপ্তম। ইউনেসকো ২০১০ সালে বাংলা ভাষাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুরেলা ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বের ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা পড়ানো হয়। বাংলা ভাষার এত গৌরব সত্তে¡ও সারা বিশ্বে তার তেমন কোনো প্রচারের ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ সরকার। তারচেয়েও বেদনার কথা এদেশের শতাধিক সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগই নেই। অন্যন্য বিষয়ও পড়ানো হয় ইংরেজি মাধ্যমে। ইংরেজি মাধ্যমে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে বাঙালি জনসাধারণের সেবার চাকুরিতে তাঁরা এখন নিয়োগ পান!
জাতির পিতার মাতৃভাষায় জাতিসংঘে দেয়া ভাষণটিতে চমৎকারভাবে উঠে আসে একাত্তরে বাংলাদেশ কেন সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিল, কী তার সেক্রিফাইস, কোন্ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জন্ম হয় স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রটির এসব ইতিহাস। রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি ব্যাখ্যা করে সারাবিশ্বের নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন বাঙালির মহান নেতা। নাতিদীর্ঘ ভাষণের সূচনায় বঙ্গবন্ধু বলেন ‘আজ এই মহামহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সঙ্গে আমি এই জন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগিদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনভাবে বাঁচিবার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশে মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়া বাঁচিবার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম করিয়াছেন, তাঁহারা বিশ্বের সকল জাতির সঙ্গে শান্তি ও সৌহার্দ্য নিয়া বাস করিবার জন্য আকাঙ্ক্ষিত ছিলেন। যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত আছে, আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন।’ ভাষণে তিনি স্বাধীন বা