একুশের গ্রন্থমেলা উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী

বইমেলা জ্ঞানচর্চার দ্বার উন্মুক্ত করে

29

রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বইমেলা শুধু বই কেনাবেচা জন্য নয়। বইমেলা কিন্তু আকর্ষণ করে। আমাদের সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রটাকে প্রসারিত করে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে বাংলা একাডেমি চত্বরে অমর একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের ইতিহাস তুলে ধরে এসব কর্মকা্নডে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা উল্লেখ করেন তিনি। অনুষ্ঠানে এ বছর বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার, স্মারক ও সার্টিফিকেট তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলা ট্রিবিউন
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আন্তরিকতার সঙ্গে চেষ্টা করেছি আমাদের ঐতিহ্যগুলোকে ধরে রাখার জন্য। এটা মনে রাখতে হবে, বইমেলা শুধু বই কেনাবেচা জন্য নয়। আমাদের সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রটাকে প্রসারিত করে। অজানাকে জানার সুযোগ করে দেয়। এটা আমাদের প্রাণের মেলা। এই মেলা কিন্তু অনেক নবীন লেখককে তাদের সাহিত্যকর্ম প্রকাশের সুযোগ করে দেয়, আবার অনেক পাঠক তৈরি করে। তাই লেখক-পাঠক-পরিবেশক সবাইকেই আমি আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। এই মেলা আমাদের জ্ঞান চর্চার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। আমাদের যে ঐতিহ্য রয়েছে, আমাদের যে ভাষা রয়েছে এই ভাষার চর্চা আরও বৃদ্ধি হোক, সেটাই আমরা চাই।’
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দু’টি ভূখÐ, এদের মধ্যে দূরত্ব প্রায় ১২শ কিলোমিটার। দুই ভূখন্ডের জনসংখ্যায়
আমরা বেশি ছিলাম। তারপরও আমরা শোষিত-বঞ্চিত হচ্ছিলাম। তারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তা মেনে নেয়নি। জাতির পিতা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী। তারই প্রস্তুাবে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিসসহ অন্যান্য সংগঠন মিলে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলে। তারই প্রস্তাবে ১৯৪৭ সালের ১১ মার্চ ধর্মঘট ডাকা হয়। ওই ধর্মঘট পালন করার সময় পিকেটিং করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুসহ অনেক ছাত্রনেতা গ্রেপ্তার হন। সেই আন্দোলন ধীরে ধীরে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের হয়ে তিনি সারাদেশ সফর করেন। এই আন্দোলনের একটা পর্যায়ে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়, তাকে আর মুক্তি দেওয়া হয়নি। কিন্তু বন্দিখানায় থেকেও যখনই তিনি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেছেন, ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, কথা বলেছেন এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি সবসময় নির্দেশ দিয়েছেন। এসময় বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু অংশও পড়ে শোনান প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু কিন্তু ভাষার মর্যাদার সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। আমি এটুকু বলতে পারি- আজ আমাদের যা যা অর্জন, সবকিছুর পেছনে আমাদের মহান ত্যাগ যেমন রয়েছে, তেমনি বঙ্গবন্ধুরও অবদান রয়েছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারই ২১ ফেব্রয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, সরকারি ছুটি দেয় এবং সেইসঙ্গে শহীদ মিনার গড়ার প্রকল্প গ্রহণ করে। বাজেটের টাকা দিয়ে শহীদ মিনার তৈরির কাজও শুরু হয়েছিল। এরপর আবার আমাদের দেশে মার্শাল ল জারি হলো। আর মার্শাল ল জারি হলে যা হয়, আমাদের পথ অনেকটা বন্ধ হয়ে গেল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এরপর জাতির পিতা ছয় দফার ভিত্তিতে যে সংগ্রাম করেছিলেন, তারই পথ বেয়ে, অর্থাৎ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছয় দফা আন্দোলন, এরপর আমাদের স্বাধীনতা। আজকে স্বাধীন জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য, আমাদের সবসময় একটা আঘাত আসে। মাত্র সাড়ে ৩ বছর জাতির পিতা হাতে ক্ষমতা পেয়েছিলেন। এরই মধ্যে তিনি একাট জাতিকে, একটা প্রদেশকে রাষ্ট্রে পরিণত করে, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে, তার সবকিছু করেছিলেন। আজকে আমরা বাংলা একাডেমির এই বইমেলায় উপস্থিত হয়েছি, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন কিন্তু প্রথম তিনিই শুরু করেছিলেন। আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা, আমরা যেন মাতৃভাষায় কথা বলতে পারি, তার সব ব্যবস্থা তিনি করে গিয়েছিলেন।’
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করে। সেসময় আমরা জানতে পারলাম যে কানাডাপ্রবাসী দু’জন বাঙালি এবং তাদের সঙ্গে আরও কয়েকটি দেশের মাতৃভাষাপ্রেমী, তারা একটি সংগঠন গড়ে তোলে। তাদের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব আসে যে জাতিসংঘে আমাদের ২১ ফেব্রæয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু কোনও সংগঠন এককভাবে প্রস্তাব করলে হয় না, কোনও একটি দেশকে করতে হয়। যখনই এই খবরটি আমার কাছে এলো, সঙ্গে সঙ্গে আমরা প্রস্তাবনা পাঠালাম। আপনারা জানেন, ২১ ফেব্রয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা শুধু এইটুকু কাজ করেই ক্ষান্ত হইনি, আমরা একটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটও প্রতিষ্ঠা করেছি, যার মাধ্যমে সারাবিশ্বের মাতৃভাষাগুলোর চর্চা করা সম্ভব। অনেক মাতৃভাষা হারিয়ে গেছে, সেই ভাষাগুলোকেও যেন আমরা ধরে রাখতে পারি তার চর্চা করা, তা নিয়ে গবেষণার সুযোগ আমরা করে দিয়েছি।
তিনি বলেন, আজ এই বাংলা একাডেমি আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন যেমন করছে, তেমনি বিদেশি বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য অনুবাদ হচ্ছে, বাংলা ভাষার বিভিন্ন লেখা অন্য ভাষায় অনুবাদ হচ্ছে। সারাবিশ্বের সঙ্গে একটি সংযোগ হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীন জাতি হিসেবে আমরা স্বাধীনতার চেতনা নিয়ে বাংলাদেশকে গড়তে চাই। আমরা এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই যে বাংলাদেশ হবে অসা¤প্রদায়িক, যে বাংলাদেশ হবে শান্তিপূর্ণ। যে বাংলাদেশে প্রতিটি ধর্ম-বর্ণ তার নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে। এবং বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ কিংবা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যারা আছে, তারাও যেন তাদের ভাষা চর্চা করতে পারে। সেভাবেই আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।
ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। অনুষ্ঠানে জিম্বাবুয়ে, মিশরসহ কয়েকটি দেশের বেশ কয়েকজন লেখক-সাহিত্যিকও বক্তব্য রাখেন।