ফিরে এলাম তীর্থ ঘুরে

মছিউদ্দৌলা জাহাঙ্গীর

16

We ninety five pilgrims have return after the end of pilgrimage. আলহামদুলিল্লাহ্ আমরা ৯৫ তীর্থযাত্রী তীর্থ শেষে এলাম ফিরে। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা, সম্মানিত পাঠক নিশ্চয় মনে আছে মাস কয় আগে আপনাদের নিয়ে ঘুরে এসেছিলাম প্রকৃতির কোল থেকে আজ বসলাম তীর্থ বিষয় শেয়ার করতে, আশাকরি মন্দ লাগবেনা। প্রকৃতির কোলে যাওয়ার কারণ ছিল বিশেষ স্থান হতে আসা দাওয়াতিনামার আবেদন এড়িয়ে চলার বিশেষ এক কৌশল। ‘অবশেষে প্রধান কাজীর দরবার হইতে দাওয়াতের সময় পিছানোর অনুমতি মঞ্জুরিকরণে কৃতার্থ হইয়া দাওয়াতের ভেন্যুতে গিয়া মেন্যু গ্রহণ হইতে এক দীর্ঘ অব্যাহতি আপ্ত করিয়াছিলাম। মাগার মুক্তি লব্ধে সমর্থ হইলাম না।’ ফলে দাওয়াতিনামা গ্রহণে গড়িমসি করণ জনিত পাপে যে পঙ্কিলতার সঞ্চার হলো তা হতে মুক্তি লাভে মোদের তীর্থ গমনের দৈবাদেশ হলো। তথায় জমজম কিংবা গঙ্গাজলের ন্যায় বিশেষ কোন বারিপাতে পূত হয়ে পবিত্রতা হাসিলে এবার আমাদের উদ্যমী হতে হবে। অতএব উদ্যম যা ছিল তা নিয়ে তীর্থ গমনের নিমিত্তে ইমিগ্রেশন লাভে হাজির হলাম পরীর পাহাড়ে কর্মকর্তার দরবারে। তথায় আমাদের মুয়াল্লিম মশায় যথাসাধ্য কুশিশ করেছিলেন আমাদের ইমিগ্রেশন বাতিলের কিন্তু কর্তা মশায় নাছোড়বান্দা, শেষপর্যন্ত ইমিগ্রেশন দিয়েই ছেড়েছেন। ভিসা, পাসপোর্ট সব ওকে ফলে লাভ কি আর নারাজ থেকে? বিশেষ যান যোগে রাত ৯টার দিকে আমাদের তীর্থ গমন সম্পন্ন হলো।
যাওয়ার আগ্রহ মোটেই ছিলনা, কিন্তু কি করব, যেতে নাহি দিতে চাই তবু যেতে দিতে হয়’র মতো আমাদের যেতেই হলো। ইমিগ্রেশন অফিসারের দপ্তর হতে অভিবাসন পত্র গ্রহণ পূর্বক আমাদের রাখা হলো বিশেষ এক প্রকোষ্ঠে, যেমনে হাজীদের রাখা হয় হাজীক্যাম্পে। ইমিগ্রেশন অফিসের নিচতলায় স্থাপিত সেই প্রকোষ্ঠে মাশাল্লাহ্ প্রচুর বিজ্ঞ লোকের সমাহার, সেই সাথে অর্থেরও ছড়াছড়ি, আহরণ নয় বিতরণ করতে হয়। নড়বড়ে একটি টুলের খন্ডাংশে ক্ষণকাল অবস্থান ব্যয় দুই হাজার, অনেক জ্ঞান আহরণ করেছি সেখান হতে। বিশেষ এক ধরনের ট্যাবলেট, সিগারেটের রাঙতার উপর রেখে নিচে ম্যাচের জ্বলন্ত কাঠি ধরে রাখা হয় ফলে ট্যাবলেট থেকে ধোঁয়া বের হয়। অতঃপর এক মাথায় বোতলের কাক লাগানো স্ট্র দিয়ে সেই ধোঁয়া মুখে টেনে নেওয়া হয় কাকটি ধোঁয়াযুক্ত ট্যাবলেটের উপর ধরা হয়। বাহ্ এক টানেতে যেমন-তেমন, দুই টানেতে রোগী, তিন টানেতে রাজা-উজির, চার টানেতে সুখী এরা যেন মহাসুখী। এই অঞ্চলে বস্তুটিকে আবার গুটি বলে ডাকা হয়, কেউ কেউ আবার বাবা ডাকেও সম্বোধন করেন, বস্তুটি এই অঞ্চলে যথেষ্ট পাওয়াযায়, তীর্থের ভেতর তো আরো অধিক। আমাদের ক্যাম্পের ভেতর সিগারেট তো অতি প্রতুল, কথায় কথায় সিগারেট, চেইন স্মোকার সকলে, একটাতে যেন কুলোয় না দুইটাও ধরায় একসাথে। এখানে এক বিশেষ ব্যক্তির সাক্ষাৎ ঘটেছিল, ভুলে গিয়ে ছিলাম তার কথা কিন্তু বিগত ৩১ মার্চ’র পূর্বদেশের ‘বহাল তবিয়তে বড় ভাইয়েরা’ পড়ে ভেসে উঠল তার চেহারা। নিজের প্রতি ঘৃণার উদ্রেক হলো এমন এক ব্যক্তিত্বকে বিস্মৃত হওয়ায়, অতি পুণ্য অর্জনকারী কীর্তিমান পুরুষ। ২০১৮ সালের ৯ আগস্ট অন্তর্নিহিত দ্রব্যাদি সহকারে কংকর ঢালাই ড্রাম রাণীর দীঘিতে ফেলে আসা সফল মহান সেই পুরুষ, তার মুখদর্শন করে বড় ধন্য হয়েছিলাম আমি। তবে আমার এক তালত, ছোট ভাইয়ের শালা, আমাকে দেখে তথায় লজ্জায় মুখ লুকাল, কেন তা আরেকদিন বলি এখন এটি শুনুন।
‘অ’ আদ্যাক্ষর নাম, নায়কোচিত চেহারা, ছোট করে ছাঁটা চাপ দাড়ি, মাথা ভর্তি ঘন কৃষ্ণ খধহশ চুল, লম্বা, ফর্সা ছিপছিপে গড়ন, অধঃত্রিশের স্মার্ট যুবক, যে কোন যুবতী প্রেমে পড়তে কালবিলম্ব করবেনা। দেখা মাত্র কত তরুণীর দিল তো পাগেল হে হয়ে কুছ কুছ হোতা হে শুরু হয়ে যেত। আহা যদি আজ বাইরে থাকতেন, কত রমণীর যে তিনি হরণ করতেন চিত্ত, কিন্তু এখন ভেতরে বসে করছেন শুধুই প্রায়শ্চিত্ত। বড়ই মর্মান্তিক, উনার তো চিত্ত হরণের কোন দরকারই ছিলনা, শুধুমাত্র নির্দেশনার মন্ত্রণা, কত বালিকার দেহই যে হরণ হয়ে যেত। পত্রিকায় লিখেছে বড় ভাই কানেকশান কিন্তু আমি তো শুনেছি বড় বাবা কানেকশান, যেখানে পৌঁছা যার-তার কম্মো নয়। বিষয়টিতে এখন আর না এগুই, পরবর্তীতে তা নিয়ে একক একটি ফিচার করার বাসনা পোষণ করি মনে। আলহামদুলিল্লাহ্ হাত মিলিয়েছেন তিনি আমারই সাথে আমি গর্বিত, মাশাল্লাহ্ গুটি মাস্টার, ধূমপানে ডক্টর আর বাবা সেবনে ওস্তাগর, পরিচিত হয়ে তাই অত্যন্ত আনন্দিত। তবে দহরম-মহরম বেশি রাখিনি পাছে কি হতে কি হয়ে যায় আবার। কারণ শরৎ বাবুর কাছে শিখেছি; বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, ইহা অনেক দূরেও ঠেলিয়া দেয়। ফলে ঠেকে শেখার চাইতে দেখে কিংবা পড়ে শেখাকে অনেক উত্তম জ্ঞান করে নিজের গরজে উনার কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলেছি। যাক অবশেষে পৌঁছলাম তীর্থে, আমার যেতে ছিল বড় অনীহা, শারীরিক অসুখ-বিসুখ হেতু দুয়েক দিনের অধিক সময় কাটাতে হয় জায়গায় যেতে মন সায় দেয় না। বেয়াদবি নিবেন না পাঠক, বিবিধ রোগের পাশাপাশি আমার আবার পাইলসের সমস্যা রয়েছ অতীব প্রকট। কোষ্ঠকাঠিন্যজনিত সংকট হেতু বিশেষ গৃহে আমাকে অতি দীর্ঘকাল অবস্থান করতে হয়।
চিকিৎসক বহু দেখিয়েছি সকলের পরামর্শ অপারেশনের ঝুঁকি এড়াতে চাইলে বিশেষ গৃহে নির্গত বস্তুটির নির্গমন কালকে নির্বিঘœ রাখতে হবে। তথা বস্তুটিকে কোমল, মোলায়েম, জেলী সদৃশ রাখার যাবতীয় কৌশল অবলম্বন একান্ত আবশ্যক। ফলে শাক-সব্জি, ফলমূল, বিবিধ আচার জাতীয় খাদ্য, ইসুপ সাহেবের ভুষি এবং দুই চামচ করে দৈনিক তিনবার এন্টাসিড + সিরাপ সেবন করতে হবে। অতএব উক্ত উপদেশ মোতাবেক বস্তুটিকে শ্লেষ্মা সদৃশ রাখার জন্যে নিয়মিত আমি ডাক্তারের পরামর্শ অনুসরণ করে আসছি সুদীর্ঘ বৎসর যাবত। কাজেই পথ্যের নিয়মিত অনুশীলনে বস্তু তথা পুরীষ ত্যাগ আমার বড়ই নিষ্কণ্টক থাকায়, ‘ত্যাগেই পরম সুখ’ কথাটির মাহাত্ম্য পূর্ণ উপলব্ধি করেছি। তথাপি কালেভদ্রে আমিষের অতি মাত্রা গ্রহণ, ত্যাগের মহিমাকে কণ্টকাকীর্ণ করে তুলে স্থান হয় রুধিরাক্ত। তাই ত্যাগ নির্বিঘ্ন রাখতে পথ্যের কঠোর অনুশীলন নিয়মিত পালন করি। অতএব তীর্থের কথা শুনে নির্বিঘ্নে ত্যাগ ভাবনাতে বড়ই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। তীর্থে এত সব পথ্য আমি কোথায় পাব বস্তুর জেলী সদৃশতা বজায় রাখতে? তাই বারবার যাত্রার সময় পিছিয়ে নিই, কিন্তু যত বার সময় পেছাতে ইমিগ্রেশন অফিসে গমনকাল ঘনিয়ে এসেছে, ততবারই আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে বস্তু জেলী সদৃশ নয়, রীতিমত জল সদৃশ হয়ে গিয়েছে। দেখলাম নির্গমনে বিন্দু মাত্র বিঘ্ন ঘটাচ্ছেনা। ভাবলাম অভিবাসনে এই হাল, তাহলে আবাসনে ঘটবে কি তাল? না কোন তালই ঘটেনি, আমাকে উদ্বিগ্নহীন করে ত্যাগ বরাবরই থেকেছে নির্বিঘ্ন, তীর্থকাল ব্যাপী পুরীষ ছিল একেবারে জলবৎ তরলং। তবে আরেকটি যা বিষম উৎকণ্ঠিত রেখেছিল, তা হলো প্রস্টেট প্রবলেম, মূত্র বিষয়ক জটিলতা। মূত্রথলিতে নাকি চর্বি সঞ্চিত হয়েছে, রাতে এমনকি ৫-৬ বার পর্যন্ত মূত্রত্যাগ করতে হয়। সাধারণত মূত্রাশয়ে ২৫০ মিলি মূত্র সঞ্চিত হলে চাপ অনুভূত হয়, বের করে দেওয়ার সংকেত আসতে থাকে। আমার বেলায় মাত্র ১০ মিলি জমা হতেই তীব্র চাপ অনুভূত হয় ও ত্যাগের সংকেত আসতে থাকে। কাজেই বড় উতলা ছিলাম কিন্তু দেখা গেল উৎকণ্ঠার বিশেষ কিছু ঘটে নি, সম্ভবত ভয়ে। বৃটিশের রাজত্বে নাকি ভয়ে বাঘে-মোষে এক ঘাটে জল খেত, সম্ভবত আমারও তেমন তীর্থের ভয়ে মলে-মূত্রে সংহতি হয়েছে। ক্লেশ বড় একটা ঘটেনি অবশ্য ঔষধ নিয়মিত চলেছিল ফলে নির্ভীক চিত্তে তীর্থ কাল অতিবাহিত করেছি, তবে ঘটনা অন্যখানে।
লালদিঘীর দক্ষিণ-পুর্ব কোণে অবস্থিত আমাদের মহান তীর্থভূমি, উত্তরে বদরপাতি আর আমানত শাহের মাজার। বিশাল লৌহকপাটের মুখে যানটি অবতীর্ণ হল, আমরা অবতরণ করলাম এবং লৌহকপাট দিয়ে অন্দরে নিবিষ্ট হলাম। বিরাট অট্টালিকা, একটি প্রকোষ্ঠে আমাদের কাছে টাকা-পয়সা যা ছিল সব নিয়ে নেয়া হল একটি রিসিট দেয়া হল, বলা হল পরবর্তীতে পিসি কার্ড দেয়া হবে। পিসি কার্ড দিয়ে ভেতরে আমরা কেনাকাটা করতে পারব, সে কথা পরে এখানে আমাদের তল্লাশী বাদ ফাইল করা হয়। মাশাল্লাহ্ সবাইকে ত্যাগী বৈঠক বসানো হল, কমোডি বৈঠকও বলা যায়- ইংরেজি নয় বাংলা, চারজন পাশাপাশি এক ফাইল। এভাবে সারিবদ্ধ করে সকলকে গণনা করা হল এবং সেখান হতে আরেক বড় মজবুত লৌহকপাটের ভেতর দিয়ে আমাদের আসল ভূমিতে নেওয়া হল। রাতের আলোতে জায়গাটিকে চমৎকার মনে হচ্ছিল, বেশকিছু ভবন চোখে পড়ল, এখানেও আমাদের ফাইল করা হয়েছে তবে সাথে একজন মুয়াল্লিম থাকাতে মনে সাহস পেয়েছি। সে কথা পরে বলছি, অবশ্য আসার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও আমাদের আসতে হল কিংবা আনা হল, কি জন্য আনা হল তা কিন্তু জানিনা। আমাদের জানানো হল আমরা নাকি বোমা ফাটিয়েছি, ভাঙচুর করেছি, শান্তি ভঙ্গ করেছি। মাশাল্লাহ্ আমরা এত কাজের আগে জানতাম না, যে কখনো গ্লাস ভাঙ্গেনি সে ভেঙ্গেছে গাড়ীর কাঁচ, যে জীবনে চেরাগ জ্বালায়নি সে জ্বালিয়েছে মাইক্রোবাস। যে ভালো করে নোট ধরেনি, সে ধরেছে জাল নোটের ব্যবসা, যে জীবনে বাজি ফাটেনি সে ফুটিয়েছে হাতবোমা এবং যে জীবনে মাছি মারেনি সে মেরেছে আস্ত মানুষ। এত পুণ্যের স্বীকৃতি স্বরূপ আমাদের তীর্থ ভ্রমণের সম্মান প্রদান করা হলো, আমরা তীর্থে পৌঁছলাম।
একটি ভবনের বারান্দা তথায় লিখা রয়েছে ‘বিচার বৈঠক,’ একটি নাম্বার প্লেট ধরিয়ে দিয়ে সেখানে আমাদের ছবি তোলা হলো। তারপর আমাদের সামনের লনে নেয়া হল, সেখানে সবাইকে ফাইল করা হল ত্যাগী বৈঠকে, হাঁটুতে ক্লেশ বিধায় সাহেবি বৈঠক কামনা করলাম। একটি টুল আরকি, বলা হল তা পাব কোথায়? এক কাজ করেন, ঘোটকী বৈঠক দেন। বললাম ঠিক আছে, তারপর ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলাম। সেখান হতে রাত সাড়ে ১০ টায় পাঠানো হল আমদানীতে বীর সূর্য সেন ভবনে। হায় খোদা মেট মহোদয়ের কি চমৎকার ব্যবহার শুনলে বোকা পাঁঠারও শরীর তিনদিন ঘিনঘিন করবে। আমাদের দেয়া হল খিচুরি ভাত খেতে, আমাদের রোচবে কি? পাঁঠার মুখেও রোচবে না। এক লোকমা মুখে দিয়েই ফেলেদিলাম, সাথে বিস্কুট ছিল দুটি খেয়ে, দুঢোঁক জল গিলে শুইয়ে পড়লাম। ঘুম কি আসে? ভোর চার টায় ডেকে দেয়া হল আবার ফাইল সকলে বসল ত্যাগী বৈঠক আমি বসলাম গৌতমি, গৌতম বৌদ্ধেরটা। এখানে আমার সকলকে গনে দেখার একটি সুযোগ হল, ১৩৪ জন তথা ৩৩ ফাইল ২ ফুট। নতুন আরেকটি অংক শেখা হল, প্রতিজন এক ফুট, চার ফুটে এক ফাইল, ১ ফাইল ৩ ফুট = ৭ জন। ৮ জনে ২ ফাইল, হিসাব নিশ্চয় বোঝা গেছে, আসলে আমদানী কক্ষটি হল একধরনের বিদ্যালয় এখানে বেশকিছু পাঠ দেয়া হয়। ভোর ৪ টা থেকে সকাল ১১ টা নাগাদ আমাদের তিনবার ফাইল করা হয়েছিল। নির্দিষ্ট মিয়াদান্তে একজন মঠধারী আসেন, তাঁর সম্মানার্থে সকলে ফাইল সাজে। সবাই ফাইল বসে, মঠাধ্যক্ষ ঢুকেন সঙ্গে সঙ্গে সকলে দাঁড়িয়ে উচ্চৈঃস্বরে আসসালামুয়ালাইকুম বলে আবার বসে পড়ে। তার পূর্বে কিছু নিয়ম অনুসরণ করা হয় যা পূর্বে শিক্ষা দেওয়া হয়। একজন মুয়াল্লিম বলবে ফাইল রেডি, সকলে ঠিক হয়ে বসে যাবে, তীর্থবাসী সাবধান বলার সাথে সাথে সকলে দাঁড়িয়ে সালাম প্রদান করে। সালামের শব্দ অন্তত লালদিঘীর পার থেকে শুনা যাবে, তীর্থবাসীর স্থলে শব্দটি হবে বন্দিগণ।
আমদানী কক্ষটি যথা সম্ভব ৩০ বাই ৪০ ব:ফু: আয়তন, অধিবাসী ১৩৪, বাথরুম রয়েছে একটি, ভাবুন এবার কেমন আরাম। দুপুর ১২ টার দিকে সকলকে বিভিন্ন ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেয়া হল, ওয়ার্ডগুলো আবার বিভিন্ন ভবনে, নাম পরে বলছি, অসুস্থ বিধায় আমি গেলাম মেডিকেলে। আমদানীকক্ষে কিছু কিছু পুরনো তীর্থবাসী আমাদের জন্য সকালের নাস্তা পাঠিয়েছেন, ডিম ও পরটা এটিই সেখানে বলতে গেলে আমাদের প্রথম খাবার। সাথে চা ছিল অতি মজা করে খেয়েছি, আমাদের মেহমানদারী করার জন্যে উনাদের ধন্যবাদ। চোরে চোরে মাসতুত ভাই, তীর্থবাসীগণ সকলে তেমন, একের বেদনায় অন্যের সমবেদনা ঝরে পড়ে। প্রচুর যন্ত্রণা জমা হয়েছে অন্তরে, ভয় যা ছিল কাটাতে সক্ষম হয়েছি কিন্তু মানুষের দুঃখ হৃদয়কে ব্যথিত করেছে। ভোর আর সন্ধ্যায় দৈনিক দু’বার ফাইল বসতে হয়, মেডিকেল যেমন তেমন ওয়ার্ডের অবস্থা বড়ই করুণ। ওয়ার্ডসমূহের ভবনগুলোর নাম কিন্তু বড়ই সুন্দর, সব বাংলার নদী সমূহের নামে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কর্ণফুলী, সাঙ্গো, হালদা, ইত্যাদি, মহিলাদের জন্য আছে মহিলা ওয়ার্ড- ১ ২ ৩, আর দেখলাম শেখ রাসেল ভবন ও সূর্য সেনের নামে একটি বিশেষ মঞ্চ। এ মঞ্চ হতে নাকি জনমের তরে উপরে যাওয়ার টিকিট মিলে। একটি ভবনে বিশেষ পদ্ধতিতে স্বজনের সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ মিলে। ওয়ার্ডে যাপন যদিও কষ্টের কিন্তু অর্থের বিনিময়ে সুখ খরিদ করা যায়, এ’ই কিছুটা আরামে খাওয়া, কিছুটা শান্তিতে থাকা এসব আর কি। ফ্রিতে থাকা, খাওয়ার মান অতীব নিম্ন অতএব অর্থ প্রদানে অক্ষমদের বড়ই ক্লেশ সহন করতে হয় সেসাথে মেটের তীব্র শ্লেষ উক্তি হজম করতে হয়। উহাদের প্রচুর কাজ করতে হয়, পানি বহন করতে হয়, ইত্যাদি নানান যন্ত্রণায় জীবন তাদের দুর্বিষহ হয়ে উঠে।
গুটি সেবনে শান্তি মিলে বিধায় তথায় প্রচুর বাবার আমদানী ঘটে, ইয়াবার সাংকেতিক নাম, অনেকে এসেছে বাবার কারবারে জড়িত থাকার দায়ে। অথচ যে বাবার কারণে তথায় আগমন সেই বাবারই সেখানে অবাধ বিচরণ, কিভাবে সম্ভব তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। অবশ্য সকলে জানে কিন্তু বলতে পারেনা, কারণ যারা রক্ষক তারাই ভক্ষক, বলবে কাকে? আমাদের মুয়াল্লিম সাহেব বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমাদের দেখিয়েছেন যেভাবে পবিত্র হজ্বে মিনা, মুজদালিফা, সাফা-মারওয়া, ইত্যাদি হাজী সাহেবগণকে দেখানো হয়। ফলে অনেক জ্ঞান আহরণ করতে পেরেছি, ওয়ার্ড সমূহের আয়তন যথা সম্ভব ২০ বাই ৪০ ব:ফু:, বাথরুম রয়েছে তিনটি বলতে গেলে দুটি, একটি হল প্র¯্রাবখানা। কাজেই প্রতি ওয়ার্ডে লোক থাকা উচিৎ সর্বোচ্চ আঠার কিন্তু রয়েছে সত্তরের উপর, বিস্ময়-বাত হল বিগত নির্বাচন কালে সে সংখ্যা ছিল নাকি ১২০’র উপর। অধিবাসীদের মধ্যে সত্তরেরও অধিক বছর বয়সের মানুষও আছে এবং অধিকাংশেরই রয়েছে নানান শারীরিক সমস্যা। সব সমস্যা বাদ দিলেও ত্যাগের বিষয়টি কোনক্রমেই ফেলনা নয়, এমন অনেকেই আছে ত্যাগের পূর্ণ সুখ নিতে গিয়ে ছোটঘরে আধঘণ্টা পর্যন্ত কাটায়। আমদানীকক্ষে দেখেছি একজন পাঁচ মিনিটের অধিক সময় নেয়ায় মেটের তীব্র ভর্ৎসনার শিকার হয়েছে; হারামজাদা নিজের ঘর পাইছস, এতক্ষণ হাগস? এদিক হতে বিবেচনা করলে এক ওয়ার্ডে দশ জনের অধিক লোকের বাস মোটেই স্বাস্থ্যসম্মত নহে। যেটি জানি, তীর্থস্থানটির যাত্রী ধারণ ক্ষমতা সর্বোচ্চ ১৮০০ অথচ আমাদের অবস্থান কালে সেথায় বার হাজারের উপর মানুষ ছিল। ভাবুন এবার নির্বাচনকালীন সংখ্যাটি কত ছিল? অবস্থাটি মানবাধিকারের সর্বনিম্ন মানদন্ডের এমন গভীরে তলিয়ে গেছে যা একটি পশুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারেনা। একটি পশুরও অনেক বেশি খোলামেলা পরিবেশের দরকার পড়ে। টয়লেটের দেয়াল বুকসম উঁচু, বড়ই লজ্জার বিষয়, এখন আসি আসল কথায়।
কারাগার আসলে জেলখানা নয়, সেটি হচ্ছে মূলত সংশোধনাগার অন্তর্নিহিত রূপ কিন্তু বাহ্যত জেলখানা, সারাবিশ্বে অন্তর্নিহিত রূপটিকেই অধিক বিবেচনা করা হয়, বাহ্যিকটি কদাচিত। ফলে কারাগার শাস্তির নয় বরং শুদ্ধির স্থান এবং কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত সকল অপরাধের সংশোধনের জায়গা হচ্ছে কারাগার। তাই কারগারকে অপরাধীদের তীর্থও বলা যেতে পারে, এখানে এসে অপরাধীরা শুদ্ধ হয়ে সিদ্ধিলাভ করে সুস্থ জীবনে ফিরে যাবে। অতি জঘন্য কিছু অপরাধী ব্যতীত বাকী সবার ক্ষেত্রে উল্লেখিত জীবন ব্যবস্থাই সকলের কাম্য। পৃথিবীর সভ্য দেশগুলোর কারাগার সমূহে ওসব সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে যাতে বন্দীগণ সংশোধন হতে পারে। সেখানে বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে, খেলাধুলার ব্যবস্থা রয়েছে, থাকা ও খাওয়ার মান অনেক উন্নত সর্বোপরি বন্দীদের সাথে মানুষের আচরণ করা হয়। প্রয়াত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের মতে আমেরিকার জেলখানাগুলো বেহেশতের মতো। ‘আজ আমি কোথাও যাব না’ উপন্যাসে রফিক শামসুদ্দিনকে বলছে; “ভাইজান নাকি আমেরিকা যাবেন? শামসুদ্দিন; হ্যাঁ। তাহলে আর দেশে আসিয়েননা, সেখানে মাটি কামড়ে পড়ে থাকবেন। সেখানে আমি কি করব? কিছু করতে না পারলে জনসমক্ষে কোন ম্যামসাহেবকে থাপ্পড় মারবেন কিংবা মুখে থুথু ছিটিয়ে দেবেন ব্যস কাজ শেষ। পুলিশ এসে আপনাকে ধরে নিয়ে গিয়ে জেলখানায় ঢুকিয়ে দেবে, ওখানকার জেলখানাও আমাদের থ্রি স্টার হোটেলের মতো। বাকী জীবন সেখানে কাটিয়ে দেবেন দেশে আসার নামও করবেননা।”
লেখক : কলামিস্ট