প্রেম ও ধর্ম কেনাবেচার হাট

মুহাম্মদ মহিউদ্দিন

42

মে ঝেতে সটান লম্বা করে রাখা একটি লাশ। উত্তর-দক্ষিণ মুখ করা। ঘরটির ভেতরটা অন্ধকার। ল্যাম্পপোস্টের আলো প্রবেশ করে ঘরটিকে মৃদু আলোকিত করেছে। মৃদু আলোতে লাশটি আবছা দেখা যাচ্ছে। লাশের উপরটা সাদা চাদরে ঢাকা। চেহারাটা দেখা যাচ্ছে না। তবে চাদরের উপর থেকে মনে হচ্ছে এটি একটি মেয়ের লাশ। পা দুইটি চাদর থেকে বেরিয়ে আছে। মসৃণ। সুন্দর। লাল নেইল পলিশ নকে।
ইরফান আলী খান হঠাৎ ঘরের ভেতর লাশ দেখে খুব ঘাবড়ে গেলেন। ভয়ে শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেছে। কাঁপছেন। নড়ার শক্তিও হারিয়েছেন।
বিছানার পাশেই সুইচ বোর্ড। বাতি জ্বালানোর জন্য সুইচ বোর্ড হাতড়ালেন। কিন্তু পেলেন না। দম আটকে আসছে ইরফান আলী খানের। পূনরায় লাশটির দিকে তাকালেন। মনে হলো লাশটি নড়ছে। আরো বেশি ভয় পেলেন ইরফান আলী খান। অন্যদিন ঘুমের মধ্যে হাত দিলেই সুইচবোর্ড পেয়ে যান। কিন্তু আজ চোখ মেলেও খুঁজে পাচ্ছেন না।
দুই বেডের একটি বাসা। একাই থাকেন ইরফান আলী খান। ড্রইং-ডাইনিং এক সাথে। দুই বাথ। ছিমছাম। সুন্দর। সাজানো-গোছানো। দু’টো বেডের বড়টিতে থাকেন ইরফান আলী খান। ছোটটি খালিই পড়ে থাকে। বড় বেডরুমের সাথে একটি বারান্দা। বারান্দায় ইজি চেয়ার বসানো। বিকেলে ইজি চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়েন।
জোরে চিৎকার করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বেরুলো না। লাশটির দিকে তাকালেন। এটি পূর্ব-পশ্চিম হলো কী করে। মুখ চাদরে ঢাকা। পৃথিবীর দশ দিকের মধ্যে চারটি দিকই মূলত ব্যবহার হয়। সে-চারটিই ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। কে কে বলে চিৎকার দিলেন ইরফান আলী খান। চিৎকার দিয়েই ঘুম থেকে উঠে বসলেন। ঘেমে পরনের হাফ হাতা শার্ট ভিজে গেছে। লাইট-ফ্যান দু’টোরই সুইচ অন করলেন। কোথাও কোনো লাশ নেই। খাটে পা ঝুলিয়ে বসলেন। মাথার উপর সিলিং ফ্যানটি ঘুরছে।
এ কেমন স্বপ্ন দেখলেন ইরফান আলী খান? এ রকম স্বপ্ন তো আগে কখনো দেখেননি। প্রায় প্রতিরাতে কত স্বপ্ন দেখে। বিমানে দেশের বাইরে যাচ্ছে। টিকিট নিতে ভুলে গেছে। বিড়ম্বনা হচ্ছে। সাগর পাড়ে বেড়াতে গেছে। চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছে। আরো কত কি।
সব ঘরে বাতি জ্বালালেন ইরফান আলী খান। কোথাও কেউ নেই। বাথরুমে গেলেন। ফিরলেন বাতি নিভিয়ে। শুলেন বিছানায়। দেয়ালে ঘড়িটার দিকে তাকালেন। ঘড়ির তিনটি কাঁটাই ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। নড়চড় নেই। মনে হয় ব্যাটারি শেষ হয়ে গেছে। ক’দিন আগেই তো ব্যাটারি লাগালেন ইরফান আলী খান। এর মধ্যেই কাঁটা থেমে গেল। বালিশের পাশে রাখা মোবাইলটা হাতে নিলেন। পাঁচটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট।
বাতি নিভালেন। ঘুমানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলেন। ঘুম এলো না।
বিছানায় এপাশ-ওপাশ করলেন। চোখ বুজে থাকলেন বেশ কিছুটা সময়। তারপরও ঘুম এলো না।
বাইরে প্রকৃতির রূপ পাল্টাচ্ছে। অন্ধকার পেরিয়ে ভোরের আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। জানালায় ঝোলানো মোটা কাপড়ের পর্দার ফাঁক গলে আলো ঠিকরে পড়ছে ঘরের ভেতর।
বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে উঠলেন ইরফান আলী খান। প্রতিদিন ভোরে দরজার ফাঁক দিয়ে খবরের কাগজ দিয়ে যায় হকার। ইরফান আলী ঘরের কাগজটি মেঝ থেকে উঠিয়ে নিয়ে বাথরুমে ঢোকেন। বাথরুমের কমোডে বসেই পত্রিকা পড়া ইরফান আলীর দীর্ঘদিনের অভ্যেস। আজও তাই করলেন। মেঝ থেকে খবরের কাগজটি নিয়ে বাথরুমে ঢুকলেন। বসলেন কমোডে। কাগজের পাতা মেললেন।
হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠলো।
চমকালেন ইরফান আলী খান। কে এলো?
কাজের বুয়া রতনের মা তো আসার কথা নয়। দু’দিনের ছুটি নিয়েছে বেড়াতে যাবে বলে। তাহলে কে এলো! নাকি রতনের মা-ই এলো। বেড়াতে যায়নি হয়তো।
পূনরায় বেল বাজলো।
কাজ সারতে পারলেন না ইলফান আলী খান। ‘ভোগে নয় ত্যাগেই সুখ’-এই প্রবাদ বাক্যের আক্ষরিক অর্থের মতো বাথরুমে ত্যাগের সুখের কোনো তুলনা হয় না। শান্তিতে বাথরুম সারতে না পারলে মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। সবকিছুই অস্বস্থিকর মনে হয়।
ভাজ করা খবরের কাগজ খানা হাতে নিয়ে ইরফান আলী খান দরজার কাছে এলেন।
কে? কে? দু’বার বললেন ইরফান আলী।
আমি শৈবাল।
কাকে চাই?
আপনার কাছেই এসেছি। প্লিজ দরজাটা খুলুন। আমার ভারী বিপদ।
বিপদ!
জি।
কটাস করে ছিটকিনি খুললেন ইরফান আলী খান। দরজার কপাট খোলার সাথে সাথেই ভেতরে ঢুকে পড়লেন শৈবাল।
আপনাকে তো ঠিক-।
মুখের কথা কেড়ে নিয়ে শৈবাল বললেন- চিনতে পারলেন না। এই তো? পরিচয় দিচ্ছি। একটু স্বাভাবিক হতে দিন। অনেকটা খোঁজাখুঁজির পর আপনার বাসা পেয়েছি। বেশ ধকল গেছে।
আমার কাছে কেন?
বলছি। সবই বলছি।
আপনার নামটা যেন কী বললেন?
শৈবাল চৌধুরী।
ও।
শৈবাল চৌধুরীকে দেখছেন ইলফান আলী খান। মাঝারি দেহের গড়ন। বয়স আনুমানিক পঁয়তাল্লিশ। মাথার চুল কোকড়ানো। পেছনের দিকে সিঁথি করা। মাঝে মাঝে বেশ কিছু চুল পেকে সাদা। দাড়ি নেই। মোটা গোঁফ। ক্লিন শেভ। জিন্সের প্যান্টের উপর হাফ হাতা শার্ট। পায়ে বেল্ট মোড়ানো চামড়ার স্যান্ডেল।
আগাগোড়া দেখে বেশ পরিপক্ক মানুষ মনে হলো শৈবালকে। ইরফান আলীর পরনে ট্রাউজার। হাফ হাতা গেঞ্জি আর গলায় ঝুলছে একটি সাদা টাওয়েল।
স্বাভাবিক হলেন? বললেন ইলফান আলী খান।
জি। কিছুটা। আগে নিশ্চিত হয়েনি আমি ঠিক জায়গায় এসেছি কিনা?
জি। তাই করুন।
আচ্ছা আপনি তো ইরফান আলী খান!
কেন বলুন তো?
কারণ বলার জন্যই তো নিশ্চিত হতে চাইছি আপনি ইলফান আলী খান কিনা।
আপনি কি তাকেই খুঁজছেন?
জি।
যদি বলি আমি ইরফান আলী খান নই?
তাহলে তো আপনাকে কারণটা বলা যাবে না। আমাকে বেরিয়ে যেতে হবে। ইরফান আলী খানকে খুঁজে বের করতেই হবে। তাকে আমার খুব বেশি দরকার।
মিথ্যে বলে লোকটিকে বের করে দেবে কিনা ভাবছে ইরফান আলী।
না। নিশ্চয় জরুরী কোনো কাজেই আমার কাছে এসেছে। দু’জন চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
ঠিক আছে তাহলে আমি যাই। দিনের প্রথম প্রহরে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। বললেন শৈবাল চৌধুরী।
দরজার দিকে এগিয়ে যায় শৈবাল।
দাঁড়ান। পেছন থেকেই বললেন ইরফান আলী খান।
দাঁড়ালেন শৈবাল চৌধুরী। ফিরে তাকালেন।
বসুন মি. শৈবাল চৌধুরী। বললেন ইরফান আলী খান।
ইরফান নিজে গিয়ে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিলেন।
শৈবাল পেছনে ফিরে এসে দাঁড়ালেন।
তাহলে আপনিই ইরফান আলী খান! বললেন শৈবাল।
জি।
থাক বাবা। বাঁচা গেল। আপনাকে খুঁজে না পেলে যে আজ আমার কী হতো তা স্রষ্টাই জানেন।
কী হতো?
ড্রইং রুমের চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে শৈবাল। সোফা, বুক শেলফ, কার্পেট। সব মিলিয়ে বেশ সুন্দর। জানালায় দামী পর্দা ঝুলছে। দু’সোফার মাঝখানে একটি বড় ফুলের টব। কৃত্রিম রং-বেরংয়ের ফুল সাজানো।
আপনার ঘর তো দেখছি বেশ পরিপাটি। সুন্দর কোনো নারীর ছোয়া ছাড়া এ রকম গোছানো সংসার হয় না। ভাবী-বাচ্চা কি ঘুমোচ্ছে?
জি না।
কোথায় তারা? বেড়াতে গেছেÑ তাই বলেন।
তাও না।
তাহলে? এখনো বিয়েই করেননি?
না।
কী বলছেন? ইস আমি কী বলতে কী বলে ফেললাম। দুঃখিত। এত বড় বাসায় একাই থাকেন বুঝি?
হ্যাঁ। একাই থাকি।
ইরফান আলী খান বিরক্ত হচ্ছেন। শৈবাল চৌধুরীর রহস্যজনক আচরণ তাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। বাথরুমে গিয়েও ফ্রেশ হয়ে আসতে পারেননি। খবরের কাগজটিও পড়া হয়নি। দাঁত ব্রাশ করে হাত-মুখও ধোয়া হয়নি। লোকটি খামোখা বিরক্ত করছে।
শৈবাল চৌধুরী পায়চারী করছেন আর একের পর অবান্তর প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। পূনরায় মুখ খুললেন শৈবাল।
আপনার মতো বড় ব্যবসায়ীর এ রকম বাসায়ই মানায়। ফ্যামিলি বাসা নিয়ে একাই থাকেন। মজাই আলাদা।
আচ্ছা শৈবাল সাহেব আপনি কেন এসেছেন বলুন তো। আমাকে ফ্রেশ হতে হবে। অফিসে যেতে হবে। বললেন ইরফান আলী খান।
জি। অবশ্যই। ফ্রেশ হবেন। অফিসে যাবেন। নাশ্তা কি বাইরে করেন?
জি না। নাশ্তা বাসায়ই করি। কিন্তু আজকে আমার কাজের বুয়া…।
রতনের মা। কথার মাঝখানে ইরফানকে থামিয়ে বুয়ার নাম বললেন শৈবাল। ইরফান আলী খান বেশ চমকালেন।
রতনের মাকে আপনি চেনেন? বললেন ইরফান আলী খান।
জি না। নাম শুনেছি।
কিভাবে? রতনের মা কি কোন ষড়যন্ত্র করেই শৈবাল চৌধুরীকে পাঠিয়েছে? ভাবছেন ইরফান আলী খান।
সে সব বলার জন্যই তো আপনার কাছে এসেছি।
বলুন।
ইরফান সাহেব আপনার কাছে কি দেয়াশলাই হবে? অনেক কথা বলার মাঝখানে সিগারেট না খেলে আমার দম আটকে আসে।
আর কেউ আমার সামনে সিগারেট খেলেই আমার দম আটকে আসে। বললেন ইরফান আলী খান।
তারপরও আমাদের কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক সময় সয়ে যেতে হয়। ছাড় দিতে হয়। কী বলুন? তাই না? বললেন শৈবাল চৌধুরী।
জি। নিরূপায় হয়ে বললেন ইরফান আলী খান।
দয়া করে দিয়াশলাইটা নিয়ে আসুন।
শৈবালের দিকে আড় চোখে তাকালেন ইরফান আলী। তারপর রান্নাঘরের দিকে গেলেন। শৈবাল উল্টো ফিরে দেয়ালের পেরেকে ঝোলানো ক্যালেন্ডার দেখছেন। দিয়াশলাই নিয়ে ফিরলেন ইরফান আলী। পেছন থেকে দেখলেন শৈবাল চৌধুরীকে। ভেতরের জমাট হওয়া রাগ চেপে রেখে বললেন- দিয়াশলাই, এগিয়ে দিয়ে বললেন।
দিয়াশলাই নিলেন শৈবাল চৌধুরী।
এবার আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন। পেটে ক্ষুধা এবং বাথরুমের চাপ দু’টোর যে কোনো একটি থাকলেও মানুষের মেজাজ, মর্জি ভালো থাকে না। আপনি যান। ক্লিয়ার করে আসুন। তারপর ঠান্ডা মাথায় কথা বলা যাবে। ততক্ষণে আমি সিগারেটটা শেষ করি।
ইরফান আলী খান থমকে যায়। লোকটা বলে কি! কিছুটা সময় নেয়। তারপর বলে ঠিক আছে।
তারপর বেডরুমের দিকে যেতেই ইরফান আলীকে থামালেন শৈবাল চৌধুরী। দাঁড়ান। থামলেন ইরফান আলী। আমি জানি আপনার কাছে মোবাইল আছে। ভুলেও পুলিশে খবর দেয়ার চেষ্টা করবেন না। তাতে আমার চেয়ে আপনারই বিপদ বেশি।
মানে?
যান। ইচ্ছে মতো বাথরুম সেরে আসুন। তারপর বলছি। ইরফান সাহেব আসলে আমরা দু’জনেই মহাবিপদে পড়েছি।
ইরফান আলী খান কোনো কথা বাড়ালেন না। বেডরুমের দিকে চলে গেলেন।
সোফায় বসলেন শৈবাল। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করলেন। মারলবোরো। বেশ দামি সিগারেট। প্যাকেট থেকে একটি নিয়ে আঙুলের ফাঁকে ঢোকালেন। তারপর ফস্ করে দিয়াশলাইয়ের কাঠি মেরে সিগারেট ধরালেন।
ওদিকে বাথরুমের ভেতর মোবাইল নিয়ে ঢুকলেন ইরফান আলী খান। খবরের কাগজটি রেখে এসেছেন ড্রইং রুমের সোফায়। পুলিশে ফোন করবেন কি করবেন না ভাবছেন ইরফান আলী। শৈবাল চৌধুরী কী আমাকে বø্যাকমেল করছে? লোকটির নাম কি আসলেই শৈবাল চৌধুরী? নাকি অন্য কিছু। আর কেনইবা সে আমাকে বø্যাকমেল করতে যাবে। কাজের বুয়া রতনের মাকে চেনে। তাহলে কী রতনের মা…। থামে ইরফান আলী। আজকাল বুয়াদেরও বিশ্বাস করা যায় না। থাক। যা হবার হবে। পুলিশে জানিয়ে দিই। মোবাইলটা হাতে নিয়ে কল করতে গিয়েও করে না ইরফান আলী। ভাবছে। সত্যিই যদি বড় কোনো বিপদ হয়!
পুলিশে ফোন করলেন না ইরফান আলী। ফ্রেশ হয়ে ড্রইং রুমে ফিরে এলেন। শৈবাল চৌধুরী সোফায় হেলান দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন ইরফান আলীর উপস্থিতি টের পেলেন।
খবরের কাগজে মুখ রেখেই বললেন- বেশ জল তেষ্টা পেয়েছে জলের বোতলটা একটু আনবেন? ইরফান আলী কোনো কথা বললেন না। ফিরে গিয়ে জলের বোতল নিয়ে এলো।
এই নিন।
শৈবাল চৌধুরী বোতলের মুখ খুলে বেশ খানিকটা জল পেটে চালান করে দিলেন।
মি. শৈবাল চৌধুরী। সোফায় বসে ডাকলেন ইরফান আলী।
জি।
আর ভনিতা করবেন না। নাটক অনেক হয়েছে। এবার বলুন আপনি কেন এসেছেন? আমাকে আপনার কেন বেশি প্রয়োজন? কী বিপদ আমাদের? এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলেন ইরফান আলী।
সোফায় খবরের কাগজ রেখে উঠে দাঁড়ালেন শৈবাল চৌধুরী। পায়চারী করলেন। দু’তিন বার। তারপর ইরফান আলী খান সাহেবের মুখের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন শ্রেয়াকে চেনেন?
শ্রেয়া! চমকে উঠলেন ইরফান আলী।
আজ্ঞে হ্যাঁ। শ্রেয়া। বলুন চেনেন না?
কোন্ শ্রেয়ার কথা বলছেন আপনি?
পৃথিবীতে শ্রেয়া নামের মেয়ে অনেক থাকতে পারে। কিন্তু আমি যার কথা বলছি তাকে আপনি খুব ভালো করেই চেনেন। বললেন শৈবাল চৌধুরী। ইরফান আলী খানিকটা চুপ করে থাকলেন। তারপর দাঁতে ঠোঁটে কামড়াতে কামড়াতে বললেন- শৈবাল চৌধুরী।
জি।
আসলে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না আপনি কোন্ শ্রেয়ার কথা বলছেন?
আপনার সাথে কি অনেক জন শ্রেয়ার সম্পর্ক রয়েছে! বললেন শৈবাল চৌধুরী।
মি. চৌধুরী আপনি কিন্তু ভদ্রতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। বললেন ইরফান আলী খান।
রেগে কথা বললেও ইরফান আলীর চোখে-মুখে রাগের বহিঃপ্রকাশটা ঘটছে না। তাকে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে। শৈবাল চৌধুরী গোয়েন্দার মতো দেখছে ইরফান আলীকে।
দু’জনে চুপচাপ। পায়চারী করছে।
হঠাৎ কলিংবেল বেজে ওঠে। ইরফান আলী খান বেশ চমকে ওঠে। হাতে থাকা খবরের কাগজটি হাত থেকে পড়ে যায়। শৈবাল চৌধুরী না চমকালেও চমকানোর ভান করে।
কে এলো? বললেন শৈবাল চৌধুরী।
ভয় পেয়ে গেলেন ইরফান আলী। বললেন- জানি না।
দরজা খুলবো?
না। আমি দেখি।
দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন ইরফান আলী। হোল দিয়ে দেখলেন। হোলের গøাসটা ধুলো জমে আবছা হয়ে গেছে। তাই ঠিক বোঝা যায় না বাইরে কে দাঁড়িয়ে আছে।
কে? বললেন ইরফান আলী।
স্যার আমি মোখলেছ। বিদ্যুৎ বিল নিয়া আইছি।
বিল্ডিংয়ের দারোয়ান মোখলেছুর রহমান।
ইরফান আলী দরজা খুললেন। হাত বাড়িয়ে বিদ্যুৎ বিল নিলেন। বেটে খাটো মোখলেছ দাঁড়িয়ে আছে। আর কিছু বলবে? বললেন ইরফান আলী।
জে না স্যার। আইজকা অফিসে গেলেন না? ম্যাডাম আইবো?
মোখলেছের মুখে ম্যাডামের কথা শুনে চমকায় শৈবাল চৌধুরী।
মোখলেছ তুমি যাও। বললেন ইরফান আলী।
মোখলেছ ফিরে যায়। ইরফান আলী বিদ্যুৎ বিল হাতে নিয়ে পায়চারী করে। মেঝেতে পড়ে থাকা খবরের কাগজটি উঠিয়ে সোফায় রাখে।
চৌধুরী সাহেব। মাথা উঁচু করে বললেন ইরফান আলী।
জি।
শ্রেয়া-ট্রেয়া কাউকেই আমি চিনি না। প্লিজ আপনি এবার আসুন। আমার অফিসের বেশ দেরী হয়ে যাচ্ছে।
এখন আমি আপনাকে যে সংবাদটা দেব তা শুনে আপনার অফিসে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা পরিবর্তনও হতে পারে।
কী সংবাদ? আর কচ্লাবেন না। বেশ রেগেই বললেন ইরফান আলী।
শ্রেয়া আত্মহত্যা করেছে। বললেন শৈবাল চৌধুরী।
কী! চোখ কপালে তুলে বিস্ময়ে হতবাক হয়েই বললেন ইরফান আলী।
হ্যাঁ। ঠিক তাই। শ্রেয়া আত্মহত্যা করেছে।
কাল মধ্যরাত নাগাদ ও আত্মহত্যা করেছে। আর আত্মহত্যার আগে একটা চিরকুট লিখে গেছে। চিরকুটে আপনার এবং আমার দু’জনের নামই লিখা আছে। আর সে জন্যেই আমি আপনার কাছে ছুটে এসেছি।
থরথর করে কাঁপছেন ইরফান আলী খান। তোতলিয়ে বললেন- কী বলছেন?
যা সত্যি তাই বলছি। এবার বলুন আপনি শ্রেয়াকে চেনেন না?
ধপাস করে সোফায় বসে পড়েন ইরফান আলী। হাতে থাকা মোখলেছের দেয়া বিদ্যুৎ বিলটা পাখার বাতাসে উড়ে ঘরের কোনায় গিয়ে ঠেকেছে।
আপনি শ্রেয়ার কে হন? ইরফান আলী ভয়ালু চেহারায় বললেন।
হাজব্যান্ড। মানে স্বামীদেব।
কী বললেন?
হ্যাঁ। আমি শ্রেয়ার হাজব্যান্ড। ডকুমেন্ট আছে। শৈবাল চৌধুরী একটি প্রাইভেট ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার। শ্রেয়ার কাছে নিশ্চয় আমার সম্পর্কে অনেক কিছুই জেনেছেন। সে জন্য নতুন করে বলা বাহুল্য তাই না?
ইরফান আলী খান চুপচাপ। জমে পাথর হয়ে সোফার এক কোনায় জড়োসড়ো হয়ে বসে আছেন।
কাল রাতে আমার বাসায় ফিরতে বেশ বিলম্ব হয়েছিল। প্রাইভেট ব্যাংকের চাকরি। দশটা-পাঁচটা ডিউটি। তারপরও সাত-আটটার আগে বেরুনো হয় না। শ্রেয়া একাই বাসায় থাকে। তাই অফিস শেষ করেই বাসায় ফিরি। এটাই আমার নিত্যদিনের রুটিন। কিন্তু কাল একজন কলিগের বিয়ের দাওয়াত ছিল। ওটা সেরে ফিরতেই রাত বারোটা পেরিয়েছিল।
ফিরে দেখি শ্রেয়া ঘুমিয়ে পড়েছে। দরজার ছিটকিনি খুলতে শ্রেয়াকে জাগাতে হয়নি। কলিংবেল টিপতে হয়নি। শ্রেয়া ভেতর থেকে দরজার অটো তালা আটকে দিয়েছিল। বাহির থেকেই চাবি দিয়ে খোলা যায়। বাসায় ফিরে নিজে নিজে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়েছিলাম।
ইরফান আলী খান স্ট্যাচু হয়েই আছেন।
ইরফান সাহেব! কয়েকবারই ডাকলেন শৈবাল চৌধুরী। কিন্তু ইরফান সাহেবের কোন সাড়া মিলল না। কাছে গিয়ে ইরফান আলীর বাহু ধরে ঝাকুনি দিলেন। সম্বিত ফিরে পেলেন ইরফান আলী।
জি। আমাকে কিছু বললেন?
আপনি কি আমাকে শুনছেন?
হ্যাঁ। হ্যাঁ শুনছি। বলুন।
ইরফান সাহেব।
জি।
আপনি তো জানেন শ্রেয়া স্কুলে চাকরি করে। সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যেই বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। ফিরে দু’টোর পর। আর আমি আটটার পরে বিছানা ছাড়ি। সকালের নাশ্তাটা শ্রেয়া টেবিলে সাজিয়ে রেখে যায়। ওতেই আমি গড়িমড়ি কিছু মুখে দিয়ে অফিসের দিকে ছুট দেই।
ইরফান সাহেব শ্রেয়া আর আমার সংসারের বিন্দু-বিসর্গ সব কিছুই আপনি জানেন। তারপরও পরিবেশটা সহজ করার জন্যই এত কথা বলছি।
জি। বলুন। বললেন ইরফান আলী খান।
হ্যাঁ। হুঁ ছাড়া আর কিছুই বলছেন না তিনি।
বুঝলেন ইরফান সাহেব শ্রেয়া যে এমন একটা ঘটনা ঘটাবে তা আমি ঘুনাক্ষরেও টের পাইনি। ওর সাথে আমার তেমন কিছু ঘটেনি যে সে আত্মহত্যা করবে। কিন্তু শ্রেয়া আত্মহত্যা করেছে। এটাই সত্য। ওর এভাবে হঠাৎ করে আত্মহত্যা করাটা আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। চাকরির কারণে আমাদের রাতে বিছানায় ছাড়া তেমন একটা দেখা হতো না। রাতের খাবারটা প্রায়শই একসাথে খাওয়া হতো না। স্কুলে যেতে হবে দেখে শ্রেয়া আগে-ভাগে খেয়েই ঘুমিয়ে পড়তো। আর আমি রিমোট হাতে টেলিভিশনে চ্যানেল ঘুরাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়তাম। এতে করে কখন যে রাত বারটা পেরিয়ে যেত টেরই পেতাম না। খাবারটা টেবিলে ঢাকাই থাকতো। কোনো রকম নাকে মুখে দিয়ে খাওয়া পর্ব শেষ করতাম। তারপর কখনো দাঁত ব্রাশ করে আর কখনো ব্রাশ ছাড়াই শুয়ে পড়তাম শ্রেয়ার পাশে। সকালে ভাগ্যক্রমে ঘুম ভাঙলে কখনো দেখা হতো আর প্রায়শই দেখা হতো না। অথচ দু’জনে একি ছাদের তলায় এক বিছানাতেই থাকতাম।
কিছুটা দম নেয় শৈবাল চৌধুরী।
ওসব কথা থাক ইরফান সাহেব। চলুন আমরা নিজেদের বাঁচার পথ বের করি।
নড়ে-চড়ে বসে ইরফান আলী খান।
চিরকুটে কী লিখেছে শ্রেয়া বলবো? বললেন শৈবাল চৌধুরী।
না। এখন ওসব শোনার মতো ধৈর্য্য আমার নেই। ওটা নিয়ে আসেননি? বললেন ইরফান আলী খান।
জীবন বাঁচানোর জন্য তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এসেছি। মাঝ পথে অবশ্য একবার মনে পড়েছিল। ফিরে যাই। চিরকুটটা নিয়ে আসি। পরক্ষণেই মত পাল্টেছি। ফিরে গিয়ে আবার কোন বিপদে পড়ি। তবে চিরকুটে শ্রেয়া কী লিখেছে তা আমার আবছা মনে আছে।
শ্রেয়া কি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে?
না।
তো।
বিষ-টিষ কিছু একটা খেয়েছে। ওর মুখে ফেনা দেখলাম।
ইউরিনাল প্রেসারের কারণে ভোরেই আমার ঘুম ভেঙে যায়। বাথরুমে যাওয়ার জন্য বিছানা থেকে নামতে গিয়েই দেখি শ্রেয়া মেঝেতে শোয়া। জিরো পাওয়ারের নীল আলোয় ওকেও নীল দেখাচ্ছিল। হাতের পাশেই চিরকুটটা পরেছিল। মুখে ফেনা। শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ। নাড়ি দেখলাম। তাও থেমে গেছে।
কাল শেষ রাতে দেখা স্বপ্নের সাথে শৈবাল চৌধুরীর বর্ণনা এবং শ্রেয়ার আত্মহত্যার ঘটনাটি মেলানোর চেষ্টা করে ইরফান আলী খান।
মেঝেতে একটি লাশ। উত্তর-দক্ষিণ মুখ করা। সাদা চাদরে ঢাকা।
আর বেশি কিছু মনে করতে পারছেন না।
শৈবাল চৌধুরী পায়ের উপর পা তুলে সোফায় বসে আছে। ফস্ করে দিয়াশলাই দিয়ে সিগারেট ধরালেন। পাখাটা ঘুরছে। ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে সারা ঘরে। দু’আঙুলের ফাঁকে সিগারেটটি চাপা পড়ে আছে।
বুঝলেন ইরফান সাহেব।
জি।
এমনিতেই আমার ইনসমনিয়া। প্রায় রাতেই ভালো ঘুম হয় না। ঘরময় পায়চারি আর সিগারেট চলে একের পর এক। দিব্যি ঘুমিয়ে থাকতো শ্রেয়া। মাঝে-মাঝে খুব ইচ্ছে হতো শ্রেয়াকে মন ভরে আদর করি। পাছে ওর ঘুমে ব্যাঘাত হবে তাই দমন করতাম নিজেকে। কষ্ট হতো। খুব বেশি। ইনসমনিয়ার কারণে ঘুমও আসতো না। আদর-ভালোবাসায় শরীরটা শ্রান্ত-ক্লান্ত হলে ঘুম এসে যাবে। আসতোও মাঝে মাঝে। ইনসমনিয়া কেটে যেত। কিছু ছুটির দিন ছাড়া কদাচিৎ শ্রেয়াকে কাছে পাওয়া যেত।
কী আর বলবো ইরফান সাহেব। নিজেদের দাম্পত্য জীবনের অনেক কথাই তো আপনাকে বলে ফেলছি।
বলুন। বলে হালকা হোন। বললেন ইরফান আলী খান।
হালকা হবার জন্যই তো এসেছি। বলছি।
দেয়ালে পেরেকের সাথে আটকানো ঘড়ির দিকে তাকালেন ইরফান আলী খান। আর সেটা টের পেলেন শৈবাল চৌধুরী।
সকাল দশটা পেরিয়েছে। বাইরে রাস্তায় হকারদের হাক-ডাক। মাছ-তরকারি। কাগজ। আরো কত কী।
পেটে কোনো দানা-পানি পড়েনি বললেন শৈবাল চৌধুরী। সেটাই ভাবছি।
বাসায় কিছু আছে?
জি। কিছুটা সময় নেয় ইরফান আলী খান। তারপর বলে- ফ্রিজে ডিম আছে। ও হ্যাঁ পাউরুটিও আছে।
ডিম ভাজতে জানেন? বললেন শৈবাল চৌধুরী।
ব্যাচেলররা রান্না-বান্না ঠিক মতো না পারলেও ডিমটা অন্তত ভাজতে জানে।
বেশ। চলুন ডিম ভাজা দিয়ে পাউরুটি খাই।
আপনি বসুন। আমি ডিম ভেজে আনছি।
সাথে থাকি। কথা বললে মনে সাহস সঞ্চার হয়।
ইরফান আলী খান রান্না ঘরের দিকে গেলেন। শৈবাল চৌধুরী পিছু নিল।
ছোট্ট রান্না ঘর। দেয়ালে কয়েকটা থাক। থাকে হাড়ি-পাতিল আর মরিচ-মসলার কৌটা। ইরফান আলী রেফ্রিজারেটর থেকে দু’টো ডিম নিয়ে পাত্রে রাখলেন। পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচ নিয়ে কুচিকুচি করে কাটছেন। শৈবাল চৌধুরী রান্না ঘরের দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো।
ইরফান আলী খান সাহেব।
জি।
আপনার পেঁয়াজ কাটা বেশ সুন্দর। সরু করে কাটতে পারেন। সবাই পারে না। পেঁয়াজ কাটাও একটি আর্ট। কার কাছে শিখলেন?
ইরফান আলী খান চুপচাপ।
অসুবিধে থাকলে বলতে হবে না।
এখন আর সুবিধে-অসুবিধে নিয়ে ভাববার সময় আছে? শ্রেয়ার কাছে শিখেছি। পেঁয়াজ-মরিচে ডিম মেশাতে মেশাতে বললেন ইরফান আলী খান।
শ্রেয়া! অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে পড়ল শৈবাল চৌধুরীর মুখ থেকে।
একটা বড় ভুল হয়ে গেছে ইরফান আলী খান সাহেব। বললেন শৈবাল চৌধুরী।
গরম তেলে পিঁয়াজ-মরিচে মেশানো ডিম ঢালতে গিয়ে থামলেন ইরফান আলী খান। পেছন ফিরলেন।
কড়াইতে তেল গরম হয়ে ধোঁয়া উড়ছে।
জি।
ডিম মিক্স ঢেলে দিন।
ইরফান আলী খান তাই করলেন। অতপর জানতে চাইলেন কী ভুল হলো?
শ্রেয়ার মোবাইল ফোনটা নিয়ে আসা হয়নি। বালিশের কাছেই ছিল। ইস্। পুলিশ যদি পেয়ে যায়? ওর মোবাইল ফোনে তো আমাদের সবার নাম্বার আছে, তাই না?
হুঁ। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন- ইরফান আলী খান।
ওদিকে কড়াইতে ডিম পুড়ে ছাই হওয়ার যোগাড়।
ডিম ভাজাটা উল্টে দিন।
সম্বিত ফিরে পেলেন ইরফান আলী খান। ডিমভাজা শেষ করলেন। প্লেটে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে এলেন। পলিথিন প্যাকেটে মোড়ানো পাউরুটি রাখলেন।
এখন কী হবে! বেশ হতাশ হয়ে বললেন- ইরফান আলী খান।
শ্রেয়ার আত্মহত্যার জন্য আপনিই দায়ী। চিরকুটটা রেখে আসাতেই যত বিপত্তি। না হয় এতক্ষণে আমিই আপনাকে খুন করে ফেলতাম। রেগে গিয়ে বললেনÑ শৈবাল চৌধুরী।
ঘাবড়ালেন ইরফান আলী খান।
মোবাইল ফোন আর চিরকুটটাই কাল হয়ে দাঁড়ালো। পলিথিনের প্যাকেট ছিড়ে পাউরুটির পিস প্লেটে রাখলো। দু’জনে ডিমভাজা দিয়ে পাউরুটি খাচ্ছেন।
কী করা যায় বলুন তো? বললেন শৈবাল চৌধুরী।
মাথায় কিছু আসছে না।
মাথায় কিছু আনুন। এ সময়ে মাথায় কিছু না আসলে তো জেলের ঘানি টানতে হবে।
ইরফান আলী খান সাহেব।
জি।
আপনার জেলে থাকার অভিজ্ঞতা আছে?
জি না।
তাহলে এবার অভিজ্ঞতাটা হবে।
কেঁপে উঠলেন ইরফান আলী খান। কী বলছেন?
পরিস্থিতি তাই। বাঁচার পথ খুঁজুন।
আরো একটা বিষয় ইরফান আলী খান মনে মনে ভাবছেন। ভেবে কুঞ্চিত হচ্ছেন।
শ্রেয়ার মোবাইল ফোনটা পুলিশের হাতে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। শ্লীল-অশ্লীল অনেক ম্যাসেজ আছে শ্রেয়ার মোবাইলে। ইরফান আলী পাঠিয়েছেন। শ্রেয়ার সাথে তার সম্পর্ক প্রমাণের জন্য ঐ ম্যাসেজগুলোই যথেষ্ট। এক্কেবারে হাতে নাতে ধরা।
ডিমভাজা দিয়ে পাউরুটি গলা দিয়ে নামছে না। কয়েকটায় পানি দিয়ে পেটে চালান করলেন। ভাবছেন।
দুধ, চিনি, চা-পাতা আছে? জানতে চাইল শৈবাল চৌধুরী।
এতো কিছুর মধ্যে আবার চা! বেশ অবাক হলেন ইরফান আলী খান।
বলুন ইরফান সাহেব, চা পাতা আছে কিনা? দুধ, চিনি না হলেও চলবে। সকাল বেলা চা-টা না পেলে মাথা চড়াই থেকে যায়। তাছাড়া জেলে গেলে চা-শরবত কোনোটাই মন মতো পাওয়া যাবে না।
জি। আছে।
চুলোয় পানি বসিয়ে দিন। আর রেফ্রিজারেটর খুলে এক টুকরো লেবু পাওয়া যায় কিনা দেখুন। দুধ লাগবে না।
ইরফান আলী খান চুলোয় চায়ের পানি বসালেন। রেফ্রিজারেটর খুলে লেবুও পেলেন।
ডিমভাজা পাউরুটি শেষ করে সোফায় এসে বসলেন শৈবাল চৌধুরী। দিয়াশলাই কাটি জ্বালিয়ে সিগারেট ধরালেন। ইরফান আলী খান রান্না ঘরে। চা তৈরি করছে। মোবাইল ফোনটা ডাইনিং টেবিলের উপরই রেখে গিয়েছিলেন। বাজছে। বাজতে বাজতে থেমে গেল। ইরফান আলী খান চায়ের কাপ হাতে ফিরলেন। লেবু দিয়ে রং চা। কালার বেশ সুন্দর হয়েছে। এক্ষুণি চুমুক দিতে ইচ্ছে করে এ মন। গরম। ধোঁয়া উঠছে।
মোবাইলটা পূনরায় বাজছে। ডাইনিং টেবিলে হাতের কাপ রেখে মোবাইল তুলে নিলেন। মোবাইল বাজার শব্দ শুনেই বেশ চমকে গেছেন ইরফান আলী। স্ক্রীন দেখলেন। অফিসের ফোন। কিছুটা স্বাভাবিক হলেন। রিসিভ না করে চায়ের কাপ হাতে সোফায় এসে বসলেন। চা’তে চুমুক দিলেন। চুপচাপ। চায়ের ধোঁয়ার সাথে সিগারেটের ধোঁয়াও মিশে একাকার।
শৈবাল চৌধুরী।
নিরবতা ভাঙলেন ইরফান আলী খান।
জি।
কিছু একটা ভাবুন। বিপদ তো দোরগোড়ায় এসে পড়লো।
সেটাই ভাবছি। একটা কাজ করা যায়।
কী।
প্রথমেই আমাদের মোবাইল সিমটা পাল্টাতে হবে।
হুঁ। ঠিকই বলেছেন।
তারপর।
শ্রেয়ার মোবাইল পেলে তো পুলিশ আপনার বাসার ঠিকানা পেয়ে যাবে, তাই না? বললেন শৈবাল চৌধুরী।
মোবাইল ছাড়াও শ্রেয়ার হাত ব্যাগে আমার ভিজিটিং কার্ড আছে। বললেন ইরফান আলী খান।
কী বলেন?
হ্যাঁ।
তাহলে তো বেজায় বিপদ।
হ্যাঁ।
আমাদের এই বাসায়ও বেশিক্ষণ থাকা নিরাপদ নয়।
সেটাই তো বুঝতে পারছি।
কোথায় যাওয়া যায়?
ঢাকার বাইরে কোথাও। আর সিদ্ধান্ত নিতে দেরী হলেও বিপদ হতে পারে।
চলুন কক্সবাজার যাই। বললেন ইরফান আলী খান। কোনো একটা হোটেলে উঠে পড়ব। রথ দেখা কলা বেঁচা দু’টোই হবে।
চলুন। একবার ধরা পড়ে গেলে জামিন হবে না।
আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগে দু’জনেরই জেলের ঘানি টানতে হবে। ফাঁসিও হয়ে যেতে পারে। শ্রেয়া হঠাৎ এমন একটি কাÐ ঘটিয়ে বসবে…। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল।
ইরফান আলী খান তড়িঘড়ি ব্যাগ গুছিয়ে নিলেন।
জামা-কাপড় দু’এক জোড়া বেশি নিন। আমি তো কিছুই নিয়ে আসতে পারলাম না। বললেন- শৈবাল চৌধুরী।
নিলাম। প্রয়োজনে দু’একটা কক্সবাজার থেকে কিনে নেয়া যেতে পারে।
হ্যাঁ।
শৈবাল চৌধুরী ও ইরফান আলী খান ধানমন্ডি থেকে কলাবাগান বাস স্ট্যান্ডে এলেন। এয়ার কন্ডিশান বাসের দু’টো টিকিট নিলেন। বাসের নাম ট্রাভেলস। ছাড়বে সাড়ে এগারটায়। এখনো ত্রিশ মিনিট অপেক্ষা।
বাসের কাউন্টারে ব্যাগ রেখে বেরুলেন দু’জন। ফোনের দু’টো সিম নিলেন। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে চা খেলেন। শৈবাল চৌধুরী সিগারেট ধরালেন। চা দোকানের রেকে থাকা বয়াম থেকে চকোলেট নিয়ে মুখে পুরলেন ইরফান আলী খান।
একটা বিষয় সেই সকাল থেকে লক্ষ করছেন ইরফান আলী খান। শৈবাল চৌধুরীর স্ত্রী শ্রেয়া। শ্রেয়ার সাথে শৈবাল চৌধুরীর প্রায় চার বছরের সংসার। এক বিছানায় থাকা। এক ডাইনিং-এ খাওয়া। এত দিনের সংসার পাতানো স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে। সেজন্য শৈবাল চৌধুরীকে যতটা বিমর্ষ, দিশেহারা দেখানোর কথা ঠিক ততটা দেখাচ্ছে না। বরং কখনো কখনো মনে হচ্ছে বেশ স্বাভাবিক শৈবাল চৌধুরী। আসলেই কি স্বাভাবিক? নাকি স্বাভাবিক থাকার ভান করছে তা ঠিক বুঝা যাচ্ছে না।
শৈবাল চৌধুরী পানরত সিগারেটটি শেষ হতেই শেষ টানের আগুন দিয়ে নতুন একটা সিগারেট ধরালেন। আয়েস করে টান দিলেন। আকাশের দিকে ধোঁয়া ছাড়লেন। কুÐলী পাকিয়ে ধোঁয়া রাশি বাতাসে মিলিয়ে গেল।
আপনি কী চেন স্মোকার? বললেন ইরফান আলী খান।
জি না।
তো।
এসি গাড়িতে উঠে গেলে তো আর টানতে পারবো না। তাছাড়া বেশ টেনশান হলে চেন স্মোকার হয়ে যাই।
আপনি আরেকটি চকোলেট মুখে পুরে নিতে পারেন। বললেন শৈবাল চৌধুরী।
না। আমি চেন চকোলেট খোর নই।
চকোলেট খোর বলাতে হাসলেন শৈবাল চৌধুরী। হেসেই যোগ করলেন-শ্রেয়া কিন্তু চাকিং-এ বেশ পারদর্শী তাই না?
ইরফান আলী খানকে লক্ষ করে টেগ কোয়েশ্চানটা করলেন শৈবাল চৌধুরী। ঠোঁটে তার তাচ্ছিল্যের হাসি।
সংকোচিত হলেন ইরফান আলী।
দীর্ঘ সময় ধরেই শ্রেয়া কাজটি চালিয়ে যেতে পারে। মাঝে মাঝে এমনও হয় যে…। থামে শৈবাল চৌধুরী। ইরফান আলী খানের দিকে তাকিয়ে বাক্যহীন প্রশ্ন রাখে। চোখে চোখ রেখে। বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে ইরফান আলী খান। মাঝে মাঝে কী হয় বলুন? বললেন শৈবাল চৌধুরী।
কী হয়?
নিজের স্ত্রীকে নিয়ে স্ত্রীর প্রেমিকাকে এমনভাবে প্রশ্নটি করছে শৈবাল চৌধুরী যেন- তার স্ত্রী শ্রেয়া অনেকের সাথে অংশগ্রহণ করে থাকে। শৈবাল চৌধুরীর দ্বিতীয় সিগারেটটি শেষ হয়েছে। আঙুলের ফাঁক শেষ অংশটুকু ড্রেনে ছুড়ে মারল। দোকানের বয়াম থেকে চকোলেট আর চিপস্ নিয়ে নিল। সময় তো হয়ে এলো। চলুন উঠে পড়ি। বললেন ইরফান আলী খান।
চলুন।
দু’জনে বাসে উঠে পাশাপাশি সিটে বসলেন। বিলাসবহুল বাস। এয়ার ফ্রেশনারের মিষ্টি লেবুর গন্ধ। হেলানো সিট। জানালায় ফিক্সড গøাস। সোটা পর্দা। সিটের নীচে পাদানি। বাম হাতলের সাথেই একটা সুইচের মতো আছে। ওটা টিপলেই চেয়ারটা পেছন দিকে হেলে পড়ে। মোটামুটি ‘দ’ বর্ণমালার মতো শোয়া যাবে। যাত্রীদের অনেকে উঠে পড়ছে। পেছন দিকে তিন-চারটে চেয়ার খালি। পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত চলছে। সাউন্ড সিস্টেমে।
বাস ছাড়ার সময় হলো। গাইড পুরো বাসে চোখ বুলিয়ে গেল। জলের বোতল নিয়ে প্রতি যাত্রীর সিটের পেছনে ঝুড়িতে রেখে গেল। চালকের পাশে গিয়ে মাইক্রোফোন হাতে নিল। গাড়িতে আরোহনের দোয়া পড়ল। আরবিতে ও বাংলা তরজমাসহ সবাইকে স্বাগত জানাল পৃথিবীর দীর্ঘতম সমূদ্র সৈকত কক্সবাজারের উদ্দেশে।
বাস কলাবাগান ছাড়লো। রাস্তায় যানজট। ইরফান আলী খান চোখ বন্ধ করে পা দু’টো লম্বা করে বসে আছেন।
ঘুমাচ্ছেন? বললেন শৈবাল চৌধুরী।
নড়েচড়ে বসলেন ইরফান আলী খান।
ঘুমোচ্ছি না। চোখ বুজে আছি।
মন খারাপ?
এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল মন ভালো থাকে কী করে? থামলেন ইরফান আলী খান। মনের ভেতর তোলপাড় করা প্রশ্নটি করেই ফেললেন-
মি. শৈবাল চৌধুরী। আপনার স্ত্রী শ্রেয়া আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু আপনি…! থামে ইরফান আলী খান।
বলুন।
আপনি দেখছি বেশ স্বাভাবিক। কথাটা বলেই শৈবাল চৌধুরীর চোখে চোখ রাখলেন ইরফান আলী খান।
হা-হা-হা। হাসলেন শৈবাল চৌধুরী। বললেন- এই সময়ে স্বাভাবিক থাকতে পারাটাই বড় যুদ্ধ। অস্বাভাবিক হলেই তো পুলিশের চোখে পড়ে যাব। বাংলাদেশে আলোচিত মিরা হত্যার ঘটনা আপনার মনে আছে!
হ্যাঁ।
হত্যাকারী পালিয়ে হোটেলেই লুকিয়েছিল। সে এতটা অস্বাভাবিক হয়েছিল যে ঘুমের ঘোরেই মিরা হত্যার কথা ফাঁস করে দিয়েছিল।
শৈবাল চৌধুরীর হাতে খোঁচা দিয়ে থামার ইশারা করলেন ইরফান আলী খান। বাসে ওসব নিয়ে আলোচনা না করাই আমাদের জন্য মঙ্গল।
ঠিকই বলেছেন।
বাসের গাইড এসে প্রত্যেককে কম্বল দিয়ে গেল। এসির ঠান্ডা তীব্র হচ্ছে। নীচের দিকটা কম্বল জড়িয়ে নিল দু’জনে।
আচ্ছা ইরফান আলী খান সাহেব আপনি বললেন শ্রেয়ার ব্যাগে আপনার ভিজিটিং কার্ড আছে। আর কী কী আছে বলুন তো? পুলিশ তল্লাশী করলে তো সব বেরিয়ে পড়বে।
পুলিশের হাতেই তো যাবে। এখন আমাদের কিছুই করার নেই। বললেন ইরফান খান।
এ মুহূর্তে আমাদের কিছুই করার নেই। কিন্তু ভবিষ্যৎ আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুতি লাগবে।
তাও ঠিক।
ভিজিটিং কার্ড ছাড়া আর কী আছে বলুন। বললেন শৈবাল চৌধুরী।
কিছু নেই। তবে শ্রেয়ার ফোনে সব ডকুমেন্টে ঠাসা। বললেন ইরফান খান।
বলেন কী?
হ্যাঁ। শ্রেয়ার সাথে কাটানো বিভিন্ন সময়ের দু’জনের সেলফি।
আপত্তিকর ছবি। নাকি মোটামুটি ছাড় দেয়া যায়? সবধরনের ছবিই আছে।
উফ্। তাহলে তো বটেই।
বিপদ নাও হতে পারে। অবশ্য তা আপনার কপালের উপর নির্ভর করছে।
কেমন?
শ্রেয়ার ব্যাগ আমাদের ঘরে থাকে না। পাশের ঘরের আলমারীতে তালা দেয়া থাকে। ঘুমানোর সময়ও ফোন ব্যাগে পুরে রাখে। আপনার সাথে কী গভীর রাতে কখনো কথা হয়েছে? প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর দেয় শৈবাল চৌধুরী। হয়েছে নিশ্চয়। ব্যবসার কাজে আমি দেশের বাইরে থাকলে আপনি আর শ্রেয়া রাত জেগে ফোনে কথা বলেছেন। বলেননি? বললেন শৈবাল চৌধুরী।
এখন অস্বীকার করার কিছু নেই। বলেছি। রাত জেগে কথা বলেছি। অনেক সময় রাত পেরিয়ে ভোর হয়েছে। অযথা টেনশান বাড়িয়ে লাভ নেই। শ্রেয়া না ফেরার দেশে চলে গেছে। পুলিশ শ্রেয়ার ব্যাগটা খুঁজে না পেলেই লেটা চুকে যাবে।
সে প্রার্থনাই করছি।
বাস কাঁচপুর ব্রীজ পেরিয়েছে। শৈবাল চৌধুরী সিটের পাশে রাখা পলিব্যাগ থেকে একটা চিপস্ খুললেন।
ইরফান খানের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন।
নিন।
ইরফান খান চিপ্সের প্যাকেটে হাত ঢুকিয়ে চিপ্স নিলেন। মৃদু মিউজিক বাজছে। রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গান- ‘আমারও পরানও যাহা চায়…।’
শ্রেয়া মেয়েটির জন্য খুব আফসোস হয়। কত ঘাটের জল খেয়ে যে আমার কাছে এলো তারপরও শেষ রক্ষা হলো না। চিপ্স খেতে খেতে বললেন শৈবাল চৌধুরী। পূনরায় শুরু করলেন শ্রেয়ার জীবনের পুরো কাহিনীটাই আমি আপনাকে বলবো। ওর জীবনে আপনার অধ্যায়টুকুই আমার অজানা ছিল। আত্মহত্যার চিরকুট সেটাও জানার সুযোগ করে দিল। শ্রেয়ার সাথে আপনার সম্পর্কটা কীভাবে হলো সেটা পরে জানব। তার আগে আমি যেটুকু জানি সেটুকুই বলি।
শ্রেয়ার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল ইস্কাটন রোডের একটি ডেভলাপার হাউজে। ও সে অফিসে অভ্যর্থনাকারী হিসেবে চাকরি করতো। এখন যে ফ্লাটে থাকছি এটাও তার সেই- ডেভলাপার হাউজ থেকেই কেনা। বিভিন্ন সময়ে যাওয়া-আসার ফলে শ্রেয়ার সাথে আমার ভাব হয়। ধীরে ধীরে আমি শ্রেয়ার বোগলদাবায় ঝুকতে থাকি। ঘনঘন মেলামেশা হয়। রেষ্টুরেন্ট, কফি হাউজে, পার্কে ঘোরা হয়। খাওয়া-দাওয়া হয়। তবে শ্রেয়ার একটা বিষয় আমার খুব ভালো লেগেছিল।
কী?
ওর জীবনে ঘটে যাওয়া সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালোবাসার সব কথাই আমার সাথে অকপটে শেয়ার করেছিল। সবকিছু জানিয়ে আমাকে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ দিয়েছিল। সিদ্ধান্তটা আমি নিয়েছিলাম যতটা না আবেগ থেকে তার চেয়েও বেশি করুণা করে।
বাবা-মার একমাত্র মেয়ে ছিল শ্রেয়া। বাবা ব্যাংকার। মা গৃহিনী। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই ওর সাথে জিসান নামে এক ছেলের সাথে প্রেম হয়েছিল। গভীর প্রেম। ছেলেটি ওর ডিপার্টমেন্টেই পড়তো। কুড়িগ্রামের কৃষি পরিবারের ছেলে। আর্থিক অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। দু’-চারটা টিউশন করেই পড়ালেখার খরচ মেটাতো। বাড়িতেও টাকা পাঠাতো। এমন একজন কর্মঠ ছেলের সাথে প্রেম হয় শ্রেয়ার। জিসানকে ‘কর্মঠ’ ভাবে শ্রেয়া। তার কারণও আছে। টিউশন করে নিজেই একটি আলাদা বাসা নিয়ে থাকে। কাগজে-পত্রে বিয়ে হওয়ার আগে থেকেই জিসানের বাসায় নিয়মিত যাওয়া-আসা হয় শ্রেয়ার। জিসানের অর্ধাঙ্গীনি হিসেবেই ঘর সাজিয়ে রাখে। পারস্পরিক বোঝাপড়ায় দু’জনের সবকিছুই হয়। তারপর পিতা-মাতার অমতে বিয়ে হয়। শ্রেয়া ব্যাংকার বাবার বাসা ছেড়ে জিসানের বাসায় ওঠে। জিসানের নির্দিষ্ট কোনো চাকরি না থাকায় দিনের পুরো সময়টা শ্রেয়াকে দিতে পারে। যখন ইচ্ছে টিউশনে যায়। ফিরে দু’জনে ঘুরতে যায়। শ্রেয়া বান্ধবীদের সাথেও যোগাযোগ রাখে। জিসান টিউশনে গেলে শ্রেয়া বান্ধবীর বাসায় গিয়ে সময় কাটায়।
জিসান-শ্রেয়ার নব দাম্পত্য জীবন ভালোই কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ নীল আকাশে মেঘের আনাগোনা দেখতে পায় জিসান। শ্রেয়ার বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার মাত্রাটা যেন অতিরিক্ত বেড়ে যায়। সন্দেহ দানা বাঁধে জিসানের মনে। ইতোমধ্যে ভালো টাকার দু’টি টিউশনও ছুটে যায়। একদিন হঠাৎ করেই শ্রেয়াকে চাপ দেয় বাবার বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে আসতে। জিসান ব্যবসা করবে। শ্রেয়া টাকা আনতে অস্বীকার করে। তারপর শুরু হয় নির্যাতন। মুদ্রার অপর পিঠের দৃশ্য খুব অল্প সময়েই দেখতে পায় শ্রেয়া। জিসান টিউশনে যাওয়ার সময় শ্রেয়াকে তালাবদ্ধ রেখে যায়। নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। এক সময় সুযোগ বুঝে পালিয়ে যায় শ্রেয়া। তারপর বিচ্ছেদের চিঠি পাঠিয়ে দেয় জিসানকে। শ্রেয়ার বাবা-মা নিরূপায় হয়ে সন্তানকে গ্রহণ করে।
এ হলো শ্রেয়ার প্রথম বিয়ে এবং বিচ্ছেদের ঘটনা। ওর দ্বিতীয় বিয়ের ঘটনা আরো রোমাঞ্চকর। ধারাবাহিকভাবে সবই আমি আপনাকে বলব ইরফান সাহেব। বললেন শৈবাল চৌধুরী। ইরফান আলী খান বাসের জানালার পর্দা সরিয়ে সবুজ-ধান ক্ষেত, প্রান্তে গাছের সারি আর গ্রাম দেখতে দেখতে শৈবাল চৌধুরীর কথা শুনছিলেন। কিন্তু সব কথা ইরফান আলী খানের কর্ণকূহরে ঢুকেছে কি না নিশ্চিত নয় শৈবাল চৌধুরী।
ইরফান সাহেব! ডাকলেন শৈবাল চৌধুরী।
হঠাৎ চমকে সম্বিত ফিরে পেয়ে শৈবাল চৌধুরীর দিকে তাকালেন ইরফান খান।
হুঁ।
কী ভাবছেন?
ভাবছি একটি মেয়ে কত সহজেই তার অতীত লুকিয়ে রেখে পুত-পবিত্র হয়ে অন্য একজন পুরুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। কী অদ্ভূত! তাই না? বললেন ইরফান আলী খান।
অদ্ভূত হওয়ার কী আছে! পুরুষরাও কম কিসে। এই যে আপনি! আপনি জানতেন শ্রেয়া অন্য একজন পুরুষের স্ত্রী। মানে আমার স্ত্রী, তা জেনেও আপনি ওর সাথে পরকীয়ায় মত্ত হলেন। অঘোষিত স্বামী-স্ত্রীর মতোই ঘর-সংসার করলেন। ভালো ভালো গিফ্ট দিলেন। এটা কী অদ্ভূত নয়?
শৈবাল চৌধুরীর কথায় চমকালেন ইরফান আলী খান। আচ্ছা ‘মারকুইস’ নামে চমৎকার একটা পারফিউম আপনিই তো শ্রেয়াকে মাস তিনেক আগে দিয়েছিলেন?
অবাক হলেন ইরফান আলী খান।
শ্রেয়া বলেছিল ওটা তাকে তার বান্ধবী দিয়েছিল। বান্ধবীর স্বামী নাকি প্যারিস থেকে পারফিউমটি আনে। ‘মারকুইস’টির ঘ্রাণ এবং কৌটার শেপ দেখেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম বেশ দামি হবে।
ইরফান আলী খানের মনে পড়ে যায়। তিন মাস আগে সে ব্যবসার কাজে ব্যাংকক গিয়েছিল। সেখানে ডাউন-টাউনের একটি মার্কেট থেকে সে ‘মারকুইস’ পারফিউমটি কেনে সাড়ে চারশ বাথ দিয়ে। এছাড়া শ্রেয়ার জন্য বেশ কিছু বিকিনি ও জামা-কাপড়ও কিনে আনে ইরফান আলী খান।
ব্যাংককের মাসেজ পার্লারের গল্প শুনে শ্রেয়া বেশ উদগ্রীব হয়েছিল একবার যেতে। ইরফান আলী খান কথাও দিয়েছিলেন শ্রেয়াকে ব্যাংকক নিয়ে যাবেন। এ কথা মনে হতেই অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল ইরফান আলী খানের।
লক্ষ্য করলেন শৈবাল চৌধুরী। বেশ আপসেট হলেন মনে হয়।
হুঁ। শ্রেয়ার জন্য আনা ‘মারকুইস’ পারফিউমটি আমি ব্যাংকক থেকে এনেছিলাম। ব্যাংককের ম্যাসেজ পার্লারের গল্প শুনে ও খুব ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল একবার যেন তাকে নিয়ে যাই। কথাও দিয়েছিলাম। মাস খানেক পর ব্যবসার কাজে আমাকে ব্যাংকক যেতে হবে। তখন শ্রেয়াকে নিয়ে যাব। কিন্তু বেচারী তার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল।
সবই নিয়তি ইরফান আলী খান সাহেব। সবই নিয়তি। ব্যাংককের ম্যাসেজ পার্লারের কথা আমিও অনেক শুনেছি। কিন্তু কখনো যাওয়ার ভাগ্য হয়নি। আমাদের তো দীর্ঘপথের যাত্রা। গল্প শুনতে শুনতেই যাওয়া যাবে। বলুন।
বাস থেমে আছে। সামনে কী হয়েছে, কেন গাড়ি এগুচ্ছে না কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রায়ই দীর্ঘ যানজট হয়। অনেক সময় কৃত্রিম যানজট তৈরি করে রাখে কাভার্ড ভ্যানের চালকরা। রাস্তায় গাড়ি রেখে ঘুমিয়ে পড়লো। আর পেছনে দীর্ঘ লাইনের জট হয়ে গেল।
নিশ্চয় কোনো দুর্ঘটনা হয়েছে। বললেন শৈবাল চৌধুরী।
হতেও পারে। জবাবে বললেন ইরফান আলী খান।
থাকুক। বাস তো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। আমাদের তেমন একটা সমস্যা হবে না। তাছাড়া আমাদের তেমন কোনো তাড়াও নেই। আমাদের জন্য কেউ অপেক্ষাও করছে না। বরং আমরা যে ঢাকা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছি সেটাই আমাদের জন্য মঙ্গল। এক নাগাড়ে বললেন শৈবাল চৌধুরী।
হ্যাঁ। ঠিক তাই। ব্যাংককের ম্যাসেজ পার্লারের কথাই বলি।
সুকুমবিথ। ব্যাংকক শহরের পর্যটন এলাকা। সারা বিশ্ব থেকে পর্যটকরা ব্যাংকক ভ্রমণে গেলে সুকুমবিথ ঘুরে আসাটা ভ্রমণের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শহর। নিয়মতান্ত্রিক ট্রাফিক। আইল্যান্ডে সবুজ বৃক্ষ। ঝামেলামুক্ত ফুটপাত। সুকুমবিথ শহরের রাস্তার পাশে ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে ম্যাসেজ পার্লার। কাঁচের দরজার বাইরে-ভেতরে তরুণী মেয়েরা সেজে-গুঁজে বসে আছে। পথচারী যেতে দেখলেই ডাকছে। কেউ প্রয়োজন হলে ঢুকছে আর বাকিরা মৃদু হেসে এগিয়ে যাচ্ছে। কোনো জোর জবরদস্তি নেই। কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত নেই।
আমার এবারের ব্যাংকক ভ্রমণে আমার এক বন্ধু ছিল সাথে। আবির আহমেদ। এটা তার প্রথম ব্যাংকক ভ্রমণ। আমরা যে হোটেলে ছিলাম তার কাছেই বেশ কিছু ম্যাসেজ পার্লার ছিল। দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যে অথবা রাত যখনই হাঁটতে, বা কাজে বেরুতাম তখনই দেখতাম সাদা চামড়ার লাবণ্যময় মেয়েরা ডাকছে। বেশিরভাগ মেয়েদের শরীরে জামা বলতে খুব ছোট প্যান্ট আর অর্ধবুক খোলা টি-শার্ট অথবা বিশেষ ধরনের পাতলা জামা। শুনতাম ব্যাংককে নাকি পতিতারা রাস্তায় টানা-হেচড়া করে তাদের ঘরে নিয়ে যায়। ফুটপাতে হাঁটার সময় জড়িয়ে ধরতে চায়। কথাটা আমার কাছে সত্যি মনে হয়নি। কারণ আমি যে ক’বার ব্যাংকক গিয়েছি সেরকম কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হইনি। তবে একবার দেখেছিলাম রাত এগারটার দিকে আমি ও আবির বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের কাছেই একটি রেষ্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছি। হঠাৎ একটি ট্যাক্সিক্যাব এসে আমাদের সামনে দাঁড়ালো। ক্যাবের জানালা খুলেই তিন-চারটে সুন্দরী মেয়ে তাদের বুক প্রদর্শন করে ঠোঁট বাকিয়ে আমাদের ডাকল। তাদের ক্যাবে করেই যেতে বলল। প্রথমে দু’জনেই কর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম। মুখ ফসকে থ্যাঙ্ক য়্যু বেরিয়ে পড়লো ওতেই রক্ষে।
তো একদিন রাতের আর্লি ডিনার শেষ করে হোটেলে ফেরার পথে আবির ভাই বললেন- চলুন। একবার ম্যাসেজ পার্লারে ঢুকে দেখি। আমি আমতা আমতা করলেও আবির ভাইয়ের জোরাজুরিতে ঢুকে পড়লাম। অবশ্য ভালোই হয়েছে। অনেক কিছুই জানা গেছে।
ইরফান আলী খানের কথা শুনতে শুনতেই শৈবাল চৌধুরীর মনে হলো অতিরিক্ত টাকা খুইয়ে ব্যাংককে আপনার বডি ম্যাসেজের দরকার পড়ে না। বাংলাদেশেই তো আপনার প্রেমিকা, যিনি আমার সার্টিফিকেট সর্বস্ব স্ত্রী, আপনাকে সব ধরনের ম্যাসেজ পেতে সহযোগিতা করছে। আপনার মতো ভাগ্যবান, ব্যাঙ্গার্থে, ব্যক্তি ঢাকা শহরে অনেক রয়েছে। আমাদের চারপাশে, বন্ধুবান্ধবদের মাঝে, এমনকি প্রতিবেশীও হতে পারে। আমরা সামাজিকতার খাতিরে অনেকেরই মুখোশ টেনে খুলতে পারি না। আবার অনেকের মুখোশ খোলা থাকলেও দাপটের কারণে আমরা অনেকেই বলি- আহা!