প্রিন্সিপ্যাল মোহাম্মদ সোলায়মান : অমর এক শিক্ষাবিদ

শাহজাহান আজাদ

70

ভাষা-সাহিত্য, শিল্প- সংস্কৃতি, ইতিহাস- ঐতিহ্য, ধর্ম- দর্শন জ্ঞান-বিজ্ঞান এই সব বিষয়গুলো যাঁর মন মনন চিন্তা চেতনায় জেঁকে বসেছিল বিরলপ্রজ শিক্ষাবিদ ভাষাসংগ্রামী মানবহিতৈষী জ্ঞানতাপস লেখক গবেষক প্রিন্সিপ্যাল মোহাম্মদ সোলায়মান সেই মহান ব্যক্তিত্ব। প্রখর স্মরণ শক্তির অধিকারী ও প্রতিভাশালী এই গুনী শিক্ষক দীর্ঘ তিন যুগের ও বেশী সময় শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর ঐতিহ্যবাহী কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজ ও সীতাকুন্ড ডিগ্রী কলেজে। একজন নিবেদিত প্রাণ আদর্শ শিক্ষক হিসেবে তিনি আজও কিংবদন্তী হয়ে আছেন। ত্রিকালদর্শী এই শিক্ষাবিদ ছিলেন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন সর্বশেষে মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ থানাধীন উত্তর হাশিমপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম ব্যবসায়ী পরিবারে তার জম্ম । পিতা মরহুম হাজী আবদুল আজিজ সওদাগর ও মাতা মোছাম্মৎ রশীদা খাতুনের আট সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। তাঁর ভাই (মেজদা) ভাষা সৈনিক আবুল কালাম আজাদ চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের ছাত্র সংসদের সাবেক জি,এস (১৯৪৯-১৯৫০) চট্টগ্রামের আরেক খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ছিলেন। ঢাকা চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনযুগেরও বেশীদিন শিক্ষকতা করেন। আবুল কালাম আজাদ ও মোহাম্মদ সোলায়মান দুইজনে তমুদ্দন মজলিস কর্মী হিসেবে ভাষা আন্দোলন সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ভাষা আন্দোলনের মহান স্থপতি প্রিন্সিপ্যাল আবুল কাসেমের অনুরক্ত এই দুই সহোদর ১৯৫২ একুশে ফেব্রুয়ারির উত্তাল দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার ঐতিহাসিক ছাত্র সমাবেশ ও ধর্মঘট সফল করতে পাকিস্তান সরকারের জারীকৃত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল করতে গিয়ে পুলিশী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। উল্লেখ্য, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ২১,২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারী তারা নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি তাদের বেঁচে থাকা নিয়েও সন্দেহ- গুঞ্জন চলছিল। কারণ একুশ ফেব্রুয়ারীর ঘটনায় পুলিশী নির্যাতনে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে পত্র পত্রিকা ও সংবাদ মাধ্যমগুলো সুস্পষ্ট কোন তথ্য দিতে পারেনি । ২৪-২৫ ফেব্রুয়ারী ধরপাকড় কিছুটা শিথিল হয়ে তারা গোপন অবস্থান থেকে বেরিয়ে ট্রেনযোগে চট্টগ্রাম ফিরে এলে শংকিত পরিবারবর্গ, আত্মীয় স্বজন , বন্ধু বান্ধব ও চট্টগ্রামের ভাষা আন্দোলন কর্মীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
মোহাম্মদ সোলায়মান গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪৬ সনে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৪৮ সনে কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৫০ সনে বি,এ ডিগ্রী অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৩ সনে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে এম,এ ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৫৪ সালের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রামের প্রাচীনতম কানুনগোপাড়া আশুতোষ কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দিয়ে তার শিক্ষকতা জীবন শুরু। ১৯৭৫ সনে চট্টগ্রাম এম ই এস কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত স্যার আশুতোষ কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। এই কলেজটিকে সরকারি করার জন্য অনেক চেষ্টা তদবির চালিয়ে অবশেষে সরকারি করা সময়ে তার বয়স ৫৭ হয়ে যাওয়ায় অবসর নিতে হয় তাঁকে। কোন আর্থিক সহায়তা (অবসর ভাতা/পেনশন) পাননি। পরে ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সীতাকুন্ড ডিগ্রী কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে অত্যন্ত কৃতি শিক্ষক ছিলেন তিনি। শ্রেণি কক্ষে তার প্রাঞ্জল পাঠদান তথা সরস ও তথ্যবহুল উপস্থাপনায় শিক্ষার্থীরা নিবিষ্ট থাকত সারাক্ষণ।প্রিন্সিপ্যাল মোহাম্মদ সোলায়মান তাঁর অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর অগাধ পান্ডিত্যের কারণে বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ গোটা দেশে তার সীমাহীন খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদানের জন্য তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ও গবেষক ড. আবদুল করিম (পরে উপাচার্য) ও অন্যরা তাঁকে বিশেষ অনুরোধ করলেও তিনি নিজ কলেজ ছেড়ে যাননি। ইসলামের মহান আদর্শে উদ্ভাসিত এ মনিষী ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত ধর্মভীরু, নীতিবান ও পরোপকারী ছিলেন। অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের অধিকারী এই মহান শিক্ষাবিদ ধর্ম, বর্ণ,দল-মত নির্বিশেষে সকল মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা পেয়েছেন। এতিম অসহায় গরীব দুঃখী মানুষের শিক্ষাসেবায় নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। নিজের জন্য কিছুই করতে পারেননি। পরের কল্যাণে সবসময় নিবেদিত ছিলেন। গরীব এতিম শিক্ষার্থীকে নিজ সন্তানের মতো মানুষ করেছেন। অনেক গরীব মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এইভাবে শতাধিক পরিবার তার বদান্যতায় উপকৃত হয়েছে। অথচ নিজ পরিবারের জন্য তেমন একটা চিন্তা করেননি । সত্যি বলতে কি নিজের একটি বাড়িও করতে পারেননি। পৈতৃক সম্পত্তির বেশিরভাগই বিকিয়ে-দিয়েছেন। কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন বলে সুযোগ নিয়েছেন কেউ কেউ । নিজে ঠকে গিয়েছেন কিন্তু কাউকে ঠকাননি ।
প্রিন্সিপ্যাল মোহাম্মদ সোলায়মান আজীবন শিক্ষাসেবায় নিয়োজিত ছিলেন । হাজার হাজার শিক্ষার্থীর অন্তরে তিনি জ্ঞানপ্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছেন। বৃহত্তর চট্টগ্রামের এমন কোনো পাড়া গাঁনেই যেখানে স্যার আশুতোষ কলেজের ছাত্র নেই। বস্তুতঃ বৃটিশ পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের পর একমাত্র বেসরকারি কলেজ হিসেবে এটি ১৯৩৯ সালের ১৮ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয়। কানুনগোপাড়ার কৃতি সন্তান দত্ত পরিবারের একাদশ রত্ম ভাতৃবর্গের জ্যেষ্ঠ বাবু রেবতি রমণ দত্ত এই কলেজটির মূল প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর ছোট ভাই ড. বিনোদ বিহারী দত্ত ছিলেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। কলিকাতা হাই কোর্টের তৎকালীন বিচারপপতি স্যার আশুতোষ মুখার্জী বৃটিশ বাংলার খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর নামে রেবতী বাবু কলেজটির নামকরণ করেছিলেন। তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক শিক্ষামন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন । তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় গভর্ণরের অনুমতি পাওয়ার সম্ভব হয়েছিল। এটি প্রতিষ্ঠার শুরুতে আরো যারা অবদান রাখেন তাঁরা হলেন ইন্ডিয়ান এডুকেশন সার্ভিস এর শামসুল উলামা কামাল উদ্দিন, প্রখ্যাত পালি ভাষা স্কলার ড. বেণীমাধব বড়ুয়া, খ্যাতিমান ঐতিহাসিক ড. কালিকা রঞ্জন কানুনগো। (সূত্র- প্রিন্সিপ্যাল মাখন নাগঃ কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজ – প্রিন্সিপ্যাল মোহাম্মদ সোলায়মান। দৈনিক আজাদী ২৫ মার্চ ১৯৯০)। উল্লেখ্য, এই কলেজের প্রথম প্রিন্সিপ্যাল মাখন লাল নাগ অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে কলেজটি পরিচালনা করে গোটা পাক-ভারত উপমহাদেশে এটিকে খ্যাতি ও মর্যাদার অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি দীর্ঘ ২৬ বছর এই কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। প্রিন্সিপ্যাল মোহাম্মদ সোলায়মান তাঁর প্রিয় শিক্ষক বাবু মাখন নাগের পদাংক অনুসরণ করে এই কলেজ পরিচালনা করেন। তাঁর মেধা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা আন্তরিকতা দিয়ে তিলে তিলে কলেজটিকে গড়ে তোলেন। তাঁর প্রচেষ্ঠায় বহু খ্যাতিমান লেখক, কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি, বিজ্ঞানী ও শিক্ষা প্রশাসক এই কলেজে পদার্পণ করেন। প্রয়াত সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক, পল্লী কবি জসীম উদ্দীন, ড. কাজী মোতাহের হোসেন, ড. আলাউদ্দীন আজাদ, ড. সুনীতিভূষণ কানুনগো, উপাচার্য ড. এ আর মল্লিক প্রমুখের নাম স্মরণযোগ্য। (সূত্র- অধ্যক্ষ সোলায়মান- এক ইতিহাস –অধ্যাপক পার্থ প্রতিম চৌধুরী। স্মরণিকাঃ নাগরিক স্মরণসভা কমিটি ১৯৯৩)।
প্রিন্সিপ্যাল মোহাম্মদ সোলায়মান কেবল শিক্ষকতা নয়, সংস্কৃতি চর্চা ও গবেষণায় তিনি ছিলেন সব্যসাচী লেখক ও। পত্র পত্রিকা ও সাময়িকীতে নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হত। ইসলামের ইতিহাসের ওপর শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর লেখা ও স্ব উদ্যোগে প্রকাশিত “প্রসঙ্গঃ সংস্কৃতি” (১ম খন্ড ), “পরাশক্তি ও আফগানিস্তান” এই দুটি তঁর গবেষণা গ্রন্থ এছাড়াও ১৭টির অধিক অপ্রকাশিত গ্রন্থের পান্ডুলিপি রয়েছে। তাঁতর সকল গ্রন্থ সমুহ প্রকাশিত হলে তাঁর জ্ঞান প্রতিভার বিচ্ছুরণে পাঠক সমাজ আলোকিত হত নিঃসন্দেহে।
মানুষ গড়ার কারিগর,বিরলপ্রজ শিক্ষাবিদ, ভাষাসংগ্রামী, মানবহিতৈষী, জ্ঞানতাপস লেখক-গবেষক প্রিন্সিপ্যাল মোহাম্মদ সোলায়মান ৬৫ বছর বয়সে ১৯৯২ সালের ১৮ নভেম্বর বুধবার সকালে চট্টগ্রামের হার্ট সেন্টার ক্লিনিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চট্টগ্রাম শহরবাসী প্রাক্তন ছাত্র ও সুধী মহলের অনুরোধে চক বাজার ফালাহ্ গাজী মসজিদের পাশে তাঁকে কবরস্থ করা হয়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। তাঁর মৃত্যু বার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।