প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুর জন্য যোগ্যতাভিত্তিক অভিক্ষাপদ

চৌধুরী আবদুল্লাহ্ আল মামুন

5

১৯৮১ সাল থেকে বাংলাদেশে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তৃতীয় পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনার আওতায় (১৯৮৫-১৯৯০) জাতীয় শিক্ষাক্রম ও টেক্সট বুক বোর্ড কর্তৃক সে সময়ে প্রচলিত প্রাথমিক শিক্ষাক্রম পরিমার্জন ও নবায়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। ১৯৯০সালে প্রাথমিক শিক্ষা আইন পাশ করা হয়। আইনে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। ১৯৯২সালে সরকার ৬৮টি থানায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করেন। এ কার্যক্রমের আশানুরূপ সাফল্যে ১৯৯৩সালে সারা দেশে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয় এবং তা অব্যাহত থাকে। ১৯৯২সাল হতে ২০০৪সাল পর্যন্ত প্রতি স্কুল থেকে ৫ম শ্রেণির অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের কেবল ২০% বৃত্তি পরীক্ষায় অবর্তীর্ণ হতো। উল্লেখ্য প্রাথমিক শিক্ষারমান নির্ণয়ের সূচক হিসেবে বৃত্তি পরীক্ষায় পাশের হারকে গণ্য করা হতো। সেজন্য বছরের শুরু থেকেই ৫ম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের নিয়ে বিশেষ ক্লাস / কোচিং এর ব্যবস্থা কর হতো। শিক্ষকগণ ৫ম শ্রেণির ৮০% শিক্ষার্থীর প্রতি অপেক্ষকাকৃত কম মনোযোগ দিতেন। পরবর্তীতে তা ৩০% (মডেল স্কুল এর ক্ষেত্রে ৫০% এবং পিটিআই সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ১০০%) এ উন্নীত করা হয়। ফলে শিক্ষকগণ ৫ম শ্রেণির ৩০% শিক্ষার্থীর প্রতি বেশি নজর দিতেন যাতে করে কেউ পরীক্ষায় অকৃতকার্য না হয়। সকল শিক্ষার্থীদের প্রতি সমান গুরুত্ব প্রদান কীভাবে সম্ভব সে ব্যাপরে নেপ (ঘধঃরড়হধষ ধপপধফবসু ভড়ৎ ঢ়ৎরসধৎু বফঁপধঃরড়হ) বিশেষভাবে চিন্তা-ভাবনা ও পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করে। নেপ পাইলটিং কার্যক্রম হিসেবে ডিপিইও ময়মনসিংহ এর মাধ্যমে ২০০৪ সালে ময়মনসিংহ জেলার সকল উপজেলায় অভিন্ন প্রশ্নপত্রে সমাপনী পরীক্ষা সম্পাদন করা হয়। ২০০৫ সালে ৬ বিভাগের ১ জেলায় নেপ কর্তৃক সরবারাহকৃত বিষয় ভিত্তিক নমুনা প্রশ্নের মাধ্যমে সমাপনী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৬ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশব্যাপী নেপ কর্তৃক সরবরাহ নমুনা প্রশ্ন ব্যবহার করে সমাপনী পরীক্ষা নেয়া হয়। উল্লেখ্য এক্ষেত্রে প্রতি জেলার ডিপিইও নিয়ন্ত্রনকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তিনি প্রয়োজনে সরবরাহকৃত প্রশ্নের ২৫%পরিবর্তন ও স্থানীয় পর্যায়ে মুদ্রণ করে পরীক্ষা পরিচালনা করেন। নেপ কর্তৃপক্ষ বিগত সরকারের (২০০৮-২০১৪) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ২য় সভায় দেশব্যাপী ৫ম শ্রেণির সকল শিক্ষার্থীদের জন্য সমাপনী পরীক্ষার ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রস্তাব রাখে। সংসদীয় কমিটির সভায় মাননীয় প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে তিনি তাঁর উপজেলায় সমাপনী পরীক্ষার আয়োজন করেছিলেন।
সংসদীয় কমিটির ২য় সভায় ২০০৯ সালে দেশব্যাপী সমাপনী পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং তা এখনও অব্যাহত আছে। ইতমধ্যে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার পরিমানগত দিক অর্থাৎ ৬+ থেকে ১০+ সকল শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করার বিষয়টি অর্জিত হয়েছে। এর গুণগত দিক যেমন নিয়মিত হাজিরা নিশ্চিত করা, প্রতি বিষয় এবং প্রতিটি শ্রেণির জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন করা এবং পাঁচ বছর মেয়াদি শিক্ষাচক্র কৃতিত্বের সাথে সমাপ্ত করানো এখনও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি বিশেষ করে প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন।
নেপ ইতোপূর্বে বৃত্তি পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন করতো এবং এখন সমাপনী পরীক্ষা প্রশ্নও প্রণয়ন করছে। এসকল প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে অধিকাংশ প্রশ্ন মুখস্ত নির্ভর । অর্থাৎ যে সকল শিক্ষার্থীর স্মরণ শক্তি বেশি তারাই পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে। তাছাড়া প্রশ্ন পত্রে শিক্ষার্থীদের অনুধাবন প্রয়োগ এবং উচ্চতর দক্ষতার প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগ সীমিত। ১৯৮৮ সাল থেকে এদেশে প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে যোগ্যতা ভিত্তিক শিক্ষাক্রম চালু করা হয় এবং ১৯৯১ সাল হতে যোগ্যতা ভিত্তিক শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন শুরু হয়। কিন্তু আমাদের অভীক্ষাপদ প্রণয়ন পদ্ধতি এখনও যোগ্যতাভিত্তিক নয়। নেপ সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে পর্যায়ক্রমে যোগ্যতাভিত্তিক অভীক্ষাপদ সংযোজনের জন্য ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মন্ত্রণালয়ে একটি ঢ়ড়বিৎ ঢ়ড়রহঃ ঢ়ৎবংবহঃধঃরড়হ করে। সে প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় হতে পরিপত্র জারি করা হয়। পরিপত্র অনুযায়ী নেপ প্রতি বছর যোগ্যতাভিত্তিক অভীক্ষাপদ প্রণয়ন, পাইলটিং, মার্কি ও বিশ্লেষণপূর্বক আইটেম ব্যাংক তৈরি করবে এবং উক্ত আইটেম ব্যাংক হতে নির্ধারিত পরিমাণ / সংখ্যক যোগ্যতাভিত্তিক অভীক্ষাপদ সংযোজন করবে।
যোগ্যতার ধারণা : প্রাথমিক স্তরে ২০০২সনে পরিমার্জিত যোগ্যতা ভিত্তিক শিক্ষাক্রম প্রবর্তন করা হয়েছে। পরিমার্জিত শিক্ষাক্রমে ৫০টি প্রান্তিক যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ প্রান্তিক যোগ্যতাসমূহ প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও জাতীয় আদর্শের ভিত্তিতে এবং শিশুর চাহিদা পারঙ্গমতা, বয়স, সামর্থ্য ও অভিরুচির ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হয়েছে।
যোগ্যতা : শিখন-শেখানোর মধ্য দিয়ে কোন জ্ঞান, দক্ষতা বা দৃষ্টিভঙ্গি পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ব করার পর শিশু তার বাস্তব জীবনে প্রয়োজনের সময়ে তা কাজে লাগাতে পারলে সেই জ্ঞান, দক্ষতা বা দৃষ্টিভঙ্গিকে তার একটি যোগ্যতা বলা হয়। উদাহরণ-বাংলা বিষয়ের শিখন শেখানো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুদ্ধভাবে ও স্পষ্ট স্বরে কথা বলতে পারা দক্ষতা আয়ত্ব করার পর শিশু যদি নিজ গৃহে এবং বন্ধুদের সাথে শুদ্ধ ভাষায় ও স্পষ্ট স্বরে কথা বলতে পারে, তবে সেটি তার যোগ্যতা বলে বিবেচিত হবে।
প্রান্তিক যোগ্যতা : প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা শেষে শিশুরা যে পূর্ব নির্ধারিত যোগ্যতা গুলো অর্জন করবে বলে আশা করা যায় সেগুলি প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের প্রান্তিক যোগ্যতা। উদাহরণ-প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে পরিমার্জিত ২০০২ সনের যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমে সর্বমোট ৫০টি প্রান্তিক যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন- ১৯নং প্রান্তিক যোগ্যতা পরিবেশ পরিচিত সমাজ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রান্তিক যোগ্যতা জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা এবং এ বিষয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।