প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম সংক্ষিপ্তকরণ সময়ের দাবী

লিটন দাশ গুপ্ত

69

শিক্ষাক্রমকে বিভিন্ন শিক্ষাবিদ দার্শনিক বিশেষজ্ঞ বিদগ্ধজন বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তবে সার্বিকভাবে শিক্ষাক্রমের মূলকথা হচ্ছে একটি বিশেষস্তরের শিক্ষনীয় বিষয়বস্তুর সমষ্টি বা রূপরেখা। বর্তমান সময়ের শিক্ষাক্রম প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষাস্তর পর্যন্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়; শিক্ষার্থীর মেধা, বয়স, বুদ্ধি, পরিবেশ, অভিরুচি, পরিপক্কতা, ধারণ ক্ষমতা ইত্যাদির চেয়ে অধিকতর বিষয়বস্থু সংযোজিত হয়েছে। যদিও বা এখন জ্ঞান বিজ্ঞানের পরিধি, দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই হিসাবে নবসৃষ্ট নবআবিষ্কৃত জ্ঞানবিজ্ঞানের সাথে সমন্বয় রেখে শিক্ষাক্রম তৈরীর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু সেটা হতে হবে জাতীয় চাহিদা সঠিক নিরূপণ ও শিক্ষার্থীর ধারণ ক্ষমতা নির্ধারণ করে। বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষাক্রম সংস্কার করা হয়েছে ২০১২ কি ২০১৩ সালে। কিন্তু এই শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীকে সার্বিকভাবে বিকশিত করতে পারছে বলে মনে হচ্ছেনা। শিক্ষার্থীর ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বহুগুন ভারী শিক্ষাক্রমের ভারে শিক্ষার্থী নূয়ে পড়েছে। অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছে বা মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।
কটিনতর এই শিক্ষাক্রম কিভাবে আয়ত্ব করতে সক্ষম হচ্ছে আমার জানা নেই। তবে এ+ আর গোল্ডেন এ+ পেয়ে পাশ করেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মানসম্মত শিক্ষা অর্জিত হচ্ছেনা বলে ধারণা করতে পারি। অর্থাৎ ভালো পাশ করছে বটে কিন্তু শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। অনেকটা সার্টিফিকেট নির্ভর শিক্ষা অর্জন হয়ে পড়েছে।
আবার শিক্ষার্থীর শিখন শেখানোর কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্জিত সার্টিফিকেট, ঐ শিক্ষার্থীর সাপেক্ষে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, কোন এক জায়গায় শিক্ষা যেন হোঁচট খাচ্ছে। তার মানে শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ণ ব্যবস্থায় ত্রুটি রয়ে গেছে। তা ছাড়া প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাক্রম আমি কোন না কোনভাবে পর্যালোচনা করেছি বা পড়ার সুযোগ হয়েছে। এখানে মাধ্যমিক বলতে নিম্ন মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত অর্থাৎ ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাক্রমের কথা বলছি, সাথে তো প্রাথমিক শিক্ষা আছে।
আমরা জানি শিক্ষাক্রম হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি। অর্থাৎ শিক্ষাক্রমকে কেন্দ্র করে শিক্ষাব্যবস্থা আবর্তিত হচ্ছে। বিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থী সুনিয়ন্ত্রিত বিষয়ের বিষয়বস্তুর বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জনের সমষ্টি হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষাক্রম।
এখানে কেবল কিছু সংখ্যক শিশু নয়, প্রতিটি শিশুর স্বতন্ত্র একক সত্ত্বার সমষ্টিগত স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য প্রতিফলিত হতে হবে। তাই সকল শিশুর রুচি সামর্থ্য চাহিদার সমন্বয়ে শিক্ষাক্রম রচিত হবে। যাতে সকল শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ হবার সুযোগ নিশ্চিত হয়। আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট ও সমকালীন চাহিদার ভিত্তিতে বিষয়বস্তু গ্রহন করে সমাজে সম্পৃক্ত বা অভিযোজিত হবার সুযোগ থাকতে হবে। বুঝে কিংবা না বুঝে শিক্ষার্থী কঠিন তথ্য ও তত্ত¡ আত্মস্থ আর মুখস্থ করে নিলে শিক্ষা হয়না। এভাবে শিক্ষা গ্রহণ করলে শিক্ষার্থীর বিদ্যা-বুদ্ধি অর্জনের বিপরীতে বিবেক আবেগ লোপ পাবার সম্ভাবনা থেকে যায়। জীবনকেন্দ্রিক ও সৃজনশীলকাজ সম্বলিত উদ্যোগ, সমাজ সেবামূলক কর্মসূচী সক্রিয়ভাবে সমস্যার সমাধান, খেলাধুলা আনন্দ বিনোদন এমনকি বিশ্রাম নেবার সময় নির্ধারণ করে দিতে হবে শিক্ষাক্রমে।
বিভিন্ন শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞ তাদের মতামতে শিক্ষাক্রমে বিভিন্ন উপাদান অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ শিক্ষাক্রমে একটি লক্ষ্য উদ্দেশ্য থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে শিক্ষাস্তর ভিত্তিক। অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য উদ্দেশ্য এবং মাধ্যমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এর মধ্যে ভিন্নতা হতে হবে। এখন আমার কথা হচ্ছে ঐ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আমাদের দেশে শিক্ষাক্রম প্রণীত হয়েছে কী, আর হয়ে থাকলে কতটুকু পূরণ করতে পেরেছে বা করতে পারছে, তা এখন সময় এসেছে বিচার বিশ্লেষণ করার। বর্তমানে অর্জিত শিক্ষা হয়েছে সার্টিফিকেট নির্ভর যা আগেই বলেছি। সার্টিফিকেট অর্জিত হয়েছে, তথাকথিত এ+ আর গোল্ডেন এ+ পেয়েছে কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে কতটুকু প্রতিফলিত করতে পেরেছে তা ভাবার সময় এসেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বইয়ের পঠিত বিষয়বস্তু দৈনন্দীন বাস্তব জীবনের সাথে সমন্বয় বা সামঞ্জস্য নেই। বলাবাহুল্য, মাধ্যমিক স্তরের যে ১৩ টি বিষয় রয়েছে তার মধ্যে কেবল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছে! যেমন- ইন্টারনেটে ব্রাউজিং, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো ইত্যাদির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে বটে, কিন্তু কথা হচ্ছে এই সব ব্যবহারিক আইসিটি জ্ঞান গ্রামের অশিক্ষিত রাখাল ছেলে কিংবা খেটে খাওয়া শ্রমজীবি ছেলেরা না পড়েও আরো বেশী দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছে।
মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমের বিষয়বস্তু অর্জন করে জীবনমুখী কর্মমুখী দক্ষ জনশক্তি তৈরী ও উৎপাদনক্ষম নাগরিক সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। এছাড়া বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা শেষে, শিশুর আটটি বিকাশের কথা বলা হয়েছে। যেমন- শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, নৈতিক, মানবিক, নান্দনিক, আবেগিক, আধ্যাত্বিক এই আটটি বিকাশ প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যে থাকলেও বাস্তব ক্ষেত্রে কয়টি অর্জিত হয়েছে বা হচ্ছে তা হিসাবে নিকেশ করার সময় এসেছে একই সাথে প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিয়েছে।
দেশের আর্থসামাজিক ও বাস্তব অবস্থাকে পাশ কাটিয়ে প্রবর্তিত বর্তমান সময়ের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রমে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। যার ফলে এই শিক্ষাক্রম দেশে ব্যাপক আবেগ বিবেকহীন নাগরিক সৃষ্টির পাশাপাশি সন্ত্রাস ঘুষ দুর্নীতি বেকারত্ব ও দারিদ্য সংকট সমাধানের পক্ষে যথেষ্ট কার্যকরী ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে বলবনা, সাধারণ মানুষের আশা আকাঙ্খা প্রত্যাশা পূরণে সফল হয়নি। তাই শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীর ধারণক্ষমতা অনুযায়ী যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : শিক্ষক ও সাহিত্যিক