প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থী উপযোগি হওয়া জরুরি

লিটন দাশ গুপ্ত

8

বর্তমানে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রাথমিকস্তর থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষাস্তর পর্যন্ত, শিক্ষাক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়; শিক্ষার্থীর মেধা, বয়স, পরিবেশ, অভিরুচি, পরিপক্কতা, ধারণ ক্ষমতা ইত্যাদি অপেক্ষা অধিক ও কঠিনতর বিষয়বস্তু সংযোজিত হয়েছে। যদিও বা জ্ঞান বিজ্ঞানের পরিধি, দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই হিসাবে নবসৃষ্ট নবআবিষ্কৃত জ্ঞানবিজ্ঞানের তথ্য উপাত্তের সাথে সমন্বয় রেখে শিক্ষাক্রম তৈরীর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। আবার সেই অনুযায়ী শিক্ষাক্রম সংস্কার করা হয়েছে ২০১২ সালে, এবং তা ১৯১৩ সালের শিক্ষাবর্ষ থেকে গৃহীত হয়েছে। কিন্তু সৃজনশীল নামের হলেও বাস্তবক্ষেত্রে এই শিক্ষাক্রম অতিমাত্রায় পুস্তক নির্ভর হয়ে যাওয়ায়, শিক্ষার্থীকে সার্বিকভাবে বিকশিত করতে পারেনি বলে অনেকের মত আমারও ধারণা। শিক্ষার্থী সার্বিক বিষয়বস্তু অর্জন ও ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বহুগুন ভারী এই শিক্ষাক্রমের ভরে নূয়ে পড়েছে অনেকে শিক্ষার্থী। আনন্দহীন অবস্থায় তাদের শৈশব কৈশোর হারিয়ে যাচ্ছে।
তবে তাদের সার্বিক চাহিদার তুলনায় কটিনতর এই শিক্ষাক্রম কিভাবে আয়ত্ব করতে সক্ষম হচ্ছে তা আমার জানা নেই। কারণ দেখা যায় পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীর গুনগত শিক্ষা অর্জিত হয়নি, যা বাস্তবক্ষেত্রে বিষয়টি প্রতীয়মান হচ্ছে। সোজা কথা হচ্ছে, ভালো পাশ করছে বটে কিন্তু শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকটা সার্টিফিকেট নির্ভর হয়ে পড়েছে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা।
আবার শিক্ষার্থীর শিখন শেখানোর কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্জিত সার্টিফিকেট ঐ শিক্ষার্থীর সাপেক্ষে মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেখা যায়, কোন এক জায়গায় হোঁচট খেতে হচ্ছে। তার মানে নিশ্চয় শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ণ ব্যবস্থায় কোন এক জায়গায় ত্রুটি রয়ে গেছে। তা ছাড়া প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাক্রম আমি কোন না কোন ভাবে পর্যালোচনা করেছি বা আমার বিশ্লেষণ করে দেখার সুযোগ হয়েছে।
এখানে মাধ্যমিক বলতে, নিম্ন মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত অর্থাৎ ৬ষ্ঠ শ্রেণি হতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাক্রমের কথা বলছি, সাথে তো প্রাথমিক শিক্ষা আছে।
আমরা জানি শিক্ষাক্রম হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি। বিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থী সুনিয়ন্ত্রিত বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সমষ্টি হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষাক্রম। এখানে প্রতি ক্লাসে কেবল কিছু সংখ্যক শিশু নয়, প্রত্যেকটি শিশুর স্বতন্ত্র ও একক সত্ত্বার সমষ্টিগত স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য প্রতিফলিত হতে হবে শিক্ষাক্রমে। তাই সকল শিশুর রুচি সামর্থ্য চাহিদার সমন্বয়ে শিক্ষাক্রম রচিত হতে হবে। যাতে সকল শিশুর পূর্ণ বিকশিত হবার সুযোগ নিশ্চিত হয়। যেহেতু ১৬ বছর পর্যন্ত শিশু ধরা হয়, তাই প্রাথমিক ও মাধ্যমিকস্তরের শিক্ষার্থীদের শিশু বলছি।
শিক্ষাক্রমে আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট ও সমকালীন চাহিদার ভিত্তিতে বিষয়বস্তু গ্রহন করে সমাজে সম্পৃক্ত বা অভিযোজিত হবার সুযোগ থাকতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জটিল গাণিতিক সমীকরণ ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব উপাত্ত বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হবে না। তাই আমি মনেকরি জীবনকেন্দ্রিক ও সৃজনশীল বিষয় সম্বলিত বাস্তবভিত্তিক সাধারণ জ্ঞান, সমাজ সেবামূলক কর্মসূচীতে অংশগ্রহন, সক্রিয়ভাবে সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা, খেলাধুলা আনন্দ বিনোদন এমনি বিশ্রাম নেবার সময় আছে কিনা দেখতে হবে শিক্ষাক্রমে। আর তা হতে হবে শতভাগ শিক্ষার্থী প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে।
বিভিন্ন শিক্ষাবিদ, অভীজ্ঞ শিক্ষক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞ তাদের মতামতে শিক্ষাক্রমে বিভিন্ন উপাদান অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ শিক্ষাক্রমে একটি লক্ষ্য উদ্দেশ্য থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে শিক্ষাস্তর ভিত্তিক। অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য উদ্দেশ্য এবং মাধ্যমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এর মধ্যে ভিন্নতা থাকবে। এখন আমার কথা হচ্ছে, যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আমাদের দেশে শিক্ষাক্রম প্রণীত হয়েছে, সেই লক্ষ্যে আমরা কি পৌঁছাতে সমর্থ হয়েছি? শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্য কি সাধিত হয়েছে? আর হয়ে থাকলে কতটুকু পূরণ করতে পেরেছে, তা এখন সময় এসেছে বিচার বিশ্লেষণ করার। বর্তমানে অর্জিত শিক্ষা, সার্টিফিকেট নির্ভর হয়েছে যা আগেই বলেছি। শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট অর্জিত হয়েছে, তথাকথিত এ+ আর গোল্ডেন এ+ পাচ্ছে ছড়াছড়ি, কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে কতটুকু প্রতিফলিত করতে পারছে তা ভাবার সময় এসেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বইয়ের পঠিত বিষয়বস্তু দৈনন্দীন বাস্তব জীবনের সাথে সমন্বয় বা সামঞ্জস্য নেই। মাধ্যমিক স্তরের যে ১৩ টি বিষয় রয়েছে, তার মধ্যে শতভাগ শিক্ষার্থী কেবল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করে নিয়েছে। যেমন- ইন্টারনেটে ব্রাউজিং, ফেসবুক, ইমো, ভাইভার ইত্যাদির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে। যা লেখা পড়া করে নয়, দেখে শুনে ও কৌতুহল থেকে অর্জিত হয়েছে। অথচ অশিক্ষিত গ্রামের রাখাল ছেলে কিংবা শ্রমজীবি ছেলেরা, না পড়েও আরো দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে বা হচ্ছে।
এছাড়া বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা শেষে, শিশুর আটটি বিকাশের কথা বলা হয়েছে। এই আটটি বিকাশ প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যে থাকলেও অধিকতর বিষয়বস্তু সমৃদ্ধ শিক্ষাক্রম ও কঠিনতর নিয়মনীতির কারণে, বাস্তব ক্ষেত্রে কয়টি অর্জিত হয়েছে বা হচ্ছে তা এখন হিসাবের প্রয়োজীয়তা দেখা দিয়েছে।
দেশের আর্থসামাজিক ও বাস্তব অবস্থাকে পাশ কাটিয়ে প্রবর্তিত বর্তমান সময়ের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম সুদূর প্রসারী হয়নি বলে আমার বিশ্বাস। যার ফলে দেশে ব্যাপকহারে আবেগ বিবেকহীন নাগরিক সৃষ্টির পাশাপাশি সন্ত্রাস ঘুষ দুর্নীতি বেকারত্ব ও দারিদ্য সংকট দেখা দিচ্ছে বা দেখা দেবার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সমস্যা সমাধানের পক্ষে যথেষ্ট কার্যকরী ভূমিকা রাখতে না পারলে, ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারের এসডিজি’র অন্যতম লক্ষ্য মানসম্মত শিক্ষাসহ সকল ক্ষেত্রে আশা আকাক্সক্ষা প্রত্যাশা পূরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে। এই অবস্থায় নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন আগামী প্রজন্ম গড়তে শিক্ষাক্রম সংক্ষিপ্ত ও সহজবোধ্য করার বিষয়টি ভাবার সময় এসেছে।