পূর্ণ চন্দ্র সেন উচ্চ বিদ্যালয়

প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক-বাহক ও বহু ইতিহাসের সাক্ষী

70

চলতি বছর জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা ১ নভেম্বর ’১৭ থেকে শুরু হয়েছে। এই পরীক্ষায় ‘হল সুপার’ এর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রায় ৩০ বছর পর প্রবেশ করলাম, পরীক্ষা কেন্দ্র হিসাবে বোয়ালখালী উপজেলাধীন সারোয়াতলী ইউনিয়নের পুর্ণচন্দ্র সেন উচ্চবিদ্যালয়ে। তাই সেখানে গিয়ে, ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে কিছু লেখার আগ্রহ সৃষ্টি হল। প্রথমে বলা যাক, এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে কিছু কথা।
এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন এলাকার স্বনামধন্য ব্যক্তি, শিক্ষানুরাগী, অবিভক্ত বাংলার প্রথম বাঙ্গালী ব্যারিষ্টার, জমিদার পূর্ণচন্দ্র সেন; যিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তৎকালীন সময়ে ‘ব্যারিষ্টার এট ল’ ডিগ্রী অর্জন করেন।
অগাধ মাতৃভক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব পূর্ণচন্দ্র সেন তাঁর মায়ের আদেশে আদিষ্ট হয়ে, এলাকায় শিক্ষা বঞ্চিত অন্ধকারাচ্ছন্ন মানুষকে আলোকিত করতে, ১৮৮০ সালে নিজ নামে এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠালগ্নে এই বিদ্যালয় ছিল বোয়ালখালী উপজেলায় ১ম এবং চট্টগ্রামের মধ্যে ২য় প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়। প্রাচীনতর এই বিদ্যাপীঠ ১৯০৮ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথমে সাময়িক স্বীকৃতি এবং এর কিছুকাল পর স্থায়ী স্বীকৃতি অর্জন করে, যা বিদ্যালয়ের জন্যে একটি সম্মানজনক অধ্যায় হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
শুরু থেকে এই বিদ্যালয় কুসংস্কার, নিরক্ষর, অন্ধকারাচ্ছন্ন মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে আলোকিত করে আসছে। এই বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন ভারতের প্রথম হাই কমিশনার সুবিমল দত্ত সহ রতœগর্ভা মুক্তকেশী দত্তের ৬/৭ রতœ, বিনোদ বিহারী চৌধুরী, রামকৃষ্ণ বিশ্বাস প্রমুখ। এছাড়া এ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে অনেকে সচিব, রাজনীতিবিদ, বিচারপতি, চিকিৎসক, প্রকৌশলী সহ বিভিন্ন পেশায় দক্ষতার সাথে খ্যাতি অর্জন করেছেন। মাষ্টারদা সূর্যসেনের সাংগঠনিক সভা ও সিদ্ধান্ত গ্রহনের স্মৃতিবিজড়িত এই বিদ্যালয়ে এককালে বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষার্থী ছাড়াও কক্সবাজার, পার্বত্য জেলা থেকে ছাত্রছাত্রী এসে শিক্ষা অর্জন করে গেছে। সুদূর অতীতকাল থেকে এলাকায় সূর্যের মত তেজোদীপ্ত হয়ে আলোকরশ্মি ছড়িয়ে যাচ্ছে এই বিদ্যালয়।
অবকাঠামোগত পর্যালোচনা করলে ৩০ বছর আগে বিদ্যালয়টির যে রূপ দেখেছি, সেই রূপ রয়ে গেছে এখনো। বিভিন্ন কারনে ইতোমধ্যে অনেকগুলো উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়েছি, দেখেছি। কিন্তু অবাক হতে হয়েছে সীমিত সংখ্যক ছাত্রছাত্রী নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ঐ সকল বিদ্যালয় জেএসসি, এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক না হবার সত্তে¡ও বিদ্যালয়ের ভৌত ও অভৌত অবকাঠামো, বিদ্যালয়ের পরিবেশ উচ্চগতিতে পরিবর্তিত হয়েছে, যা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। কিন্তু পিসি সেন স্কুল কেন এখনো পূর্বাবস্থায় বা এই দুরাবস্থায় রয়েছে? এই বিষয়ে কথা হয় চলমান জেএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র সচিব ও বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক কামরুল হাসান সাহেবের সাথে। আমাদের প্রিয় শামীম ভাইয়ের সাথে কথা বলে জানতে পারি (কামরুল হাসান ভাইয়ের ডাকনাম শামীম), সরকার কর্তৃক নির্দেশিত বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে প্রতি উপজেলা থেকে সরকারি বা জাতীয়করণের নিমিত্তে ৫টি বিদ্যালয় তালিকাভুক্ত করা হয়, কিন্তু পাঁচটি বিদ্যালয়ের তালিকার মধ্যে সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা এই বিদ্যালয়ের নাম নেই। তিনি দুঃখের সাথে বলেন, ‘যে কয়টি উপাদানের ভিত্তিতে জাতীয়করণের তালিকা তৈরী করা হল, সেখানে উপজেলা থেকে দুরত্ব বাদ দিয়ে বাকী প্রায় সব উপাদানে পিসি সেন উচ্চবিদ্যালয় উচ্চগ্রেডে অবস্থান, তারপরেও এই তালিকায় এই বিদ্যালয়ের নাম নেই।’ প্রধানশিক্ষক আক্ষেপ করে আরো বলেন, ‘স্কুল সরকারি হলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসাবে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হব, সেই প্রত্যাশা আমার নেই। ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি সঠিক বিচার হয়নি বলে আমার আক্ষেপ।’ প্রিয় শামীমভাই থেকে এজাতীয় বিভিন্ন কথা শুনে ভাবলাম; এখন ২০১৭ সাল, বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা জমিদার পূর্ণচন্দ্র সেন পরলোক গমন করেন ১৯১৭ সালে, অর্থাৎ আজ থেকে একশ বছর পূর্বে। হয়ত বেঁচে থাকলে বলা যেত, তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি কোন এককালে ভারতবর্ষে সেরা বিদ্যালয়ের তালিকায় থাকলেও আজ ছোট্ট একটি উপজেলা জাতীয়করণ তালিকায় সেরা পাঁচ-এর মধ্যে নেই। অথচ বর্তমানে বিদ্যালয়টির সার্বিক পরিবেশ পর্যালোচনা করে, এক শব্দে বলা যায়- অসাধারণ। ৭৬৪ শতক আয়তন বিশিষ্ট বিশাল এলাকার একপ্রান্তে বৃটিশ গঠনশৈলীতে নির্মিত প্রায় ডজন দুয়েক কক্ষ নিয়ে দীর্ঘ একতলা বিশিষ্ট বিদ্যালয় ভবন। (যদিও ১৩৭ বছর বয়সে ‘বার্ধক্যজনিত’ কারণে বর্তমানে মুমূর্ষু অবস্থায় আছে!)। প্রাচীন স্থাপথ্য শৈলীতে এই বিদ্যালয়ের আশেপাশে নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠানকে করেছে ¯িœগ্ধ অপরূপ। বিদ্যালয়ের সম্মুখ প্রান্তে সারি সারি নারিকেল গাছসহ বিভিন্ন ধরণের গাছ। আরো সামনে বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে সবুজ মাঠ, মাঠের উপরে সাদা মেঘের আনাগোনা বিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে বাড়িয়েছে বহুগুন। বিদ্যালয় ভবনের পশ্চাতে বড় এক দিঘী, সেই দিঘীতে শানবাধানো ঘাঁ। পাখপাখালীর কলকাকলী আর ছাত্রছাত্রীর কলকন্ঠ স্কুল এলাকা একাকার হয়ে আছে। ছায়া সুনিবিড় সুশীতল হাওয়ায় প্রশান্তির নীড়, এইযেন শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোঁয়া। এই বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ, অফিসরুম ছাড়াও রয়েছে লাইব্রেরী, ল্যাবরেটরী, মাল্টিমিডিয়া সেন্টার, অডিটোরিয়াম, স্কাউটরুম, কো-ক্যারিকুলাম অ্যাকটিভিটিস এর জন্যে ইনডোর-আউটডোর ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ওয়াশরুম ইত্যাদি। এছাড়া বিগত কয়েক বছরের জেএসসি, এসএসসি, এসএসসি (ভোকেশন্যাল) এর ফলাফল ঈর্ষনীয় সাফল্য। কামরুলভাই এমনিতেই একজন অভীজ্ঞ, দুরদর্শী ও চৌকস প্রধানশিক্ষক। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতায়, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায়, সুচারু পরিচালনায় ইতোমধ্যে বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষাসহ অনেকক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। বিদ্যালয়ের উন্নয়নের ব্যাপারে তিনি বলেন, এতসব হয়েছে নিজস্ব অর্থায়নে। সরকারি কোন বিশেষ অনুদান পাননি। বর্তমান সভাপতি শৈবাল দাশ ইতোমধ্যে প্রায় দেড়লক্ষ টাকা ব্যয়ে ডিপ টিউবওয়েলের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহের ব্যবস্থা করেছেন। এছাড়া তাঁর (সভাপতি) ব্যক্তিগত তহবিল থেকে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা বিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন যা শীঘ্রই কাজ শুরু হবে বলে প্রধানশিক্ষক ব্যক্ত করেন।
এই বিদ্যালয়ে ভূমির অভাব নেই, নেই ছাত্রছাত্রীর অভাব, অভাব শুধু সরকারি অনুদান বা সাহায্য সহযোগিতা, কথাটি বলেছেন বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক দিলীপ কুমার মল্লিক। অবশ্য কথা প্রসঙ্গে উপজেলা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তৈরীকৃত জাতীয়করণে ৫টি বিদ্যালয়ের তালিকায় এই বিদ্যালয় নেই, এই বিষয়ে দিলীপবাবু থেকে কিছু জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি।
যাহোক, বিদ্যালয় সম্পর্কে বিভিন্ন আলোচনা করা হল, এখন উপসংহারে আমার মন্তব্যে আসি। বিদ্যালয় হচ্ছে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। সমাজ ও সভ্যতার অগ্রগতির সাথে মানুষের চাহিদা উন্নতর হতে থাকে। পরিবর্তনশীল সমাজ ব্যবস্থায় সমকালীন জীবনের চাহিদা, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হচ্ছে। এভাবেই হচ্ছে সমাজের অগ্রগতি, যা বিদ্যালয় মূল ভূমিকা পালন করে। আবার সমাজের অগ্রগতির অর্থ হল নতুন চিন্তা, জ্ঞান, বিজ্ঞান, আহরণ করা। একইসাথে পূর্বগামীদের অর্জিত জ্ঞান, চিন্তা চেতনা সঞ্চিত করে অনুগামীদের হাতে হস্তান্তর করা। পরবর্তীতে অনুগামীদের সেই জ্ঞান সংরক্ষনের মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সঞ্চালিত করা। কিন্তু পিসি সেন উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে তা হয়নি। ফলশ্রæতিতে পূর্বগামীরা যা রেখেছে তা কেবল অনুগামীরা ব্যবহার করেছে ১৩৭ বছর ধরে। এখানে অনুগামী মানে শুধু সাধারণ জনগণ নয়, বৃটিশ সরকারের অনুগামী বাংলাদেশ সরকারও বটে।
এই অনুগামীরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে নতুন চিন্তা চেতনা উন্নয়ন ঘটাতে পারেনি অন্ততঃপক্ষে এই বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। এই অবস্থায় অনুগামী তথা এলাকার সুবিধাভোগী স্থানীয় জনসাধারণ এবং সরকারি বেসরকারি সংস্থা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অভিমুখে, ঐতিহ্যের ধারক বাহক ও বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সুদৃষ্টি কামনা করছি, যাতে পূর্ণচন্দ্র সেন সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয়ের হারানো গৌরব পুনরায় ফিরে আসে।