প্রসঙ্গ : সতীদাহ প্রথা

ডা. অঞ্জনা দত্ত

127

সম্প্রতি একটি কবিতা পড়েছিলাম। তার ভাবার্থ হলো কবির বাবা কখনো প্লেটের কোণা ভাঙা থাকলে সেই প্লেটে ভাত খেতেন না। চায়ের কাপের বেলায়ও একই নিয়ম ছিল। কিশোর ছেলেটি একদিন কৌতুহলবশত বাবাকে এই প্রশ্ন করলে বাবা গম্ভীর গলায় উত্তর দিয়েছিলেন একদিন বুঝবি। নিয়তির নিষ্ঠুরতায় একদিন কিশোরটির বাবা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তার মায়ের জায়গা হলো ঘরের কোণে। তাঁর একবেলা নিরামিষ ভোজন চালু হল। একদিন ডাক্তার এলেন। চোখ টেনে বললেন ‘বিধবার বসন তো রক্তেও’। সেদিন থেকে মায়ের খাবারে আরও টান পড়লো। একদিন মাও চলে গেলেন এই বিশ্বচরাচর থেকে। এই কবিতা থেকে অনেকের মত আমারও প্রশ্ন কুসঃস্কারের জন্য এই জিনিসগুলি আজও পালন করতে হচ্ছে ? সর্বত্র না হলেও কোথাও কোথাও তো বটেই। সতীদাহ প্রথা আজ থেকে প্রায় দুই আড়াইশ’ বছর আগে রদ করা হয়েছিল সনাতন ধর্মে এবং ব্রাহ্মধর্মে বিশ্বাসী কিছু শিক্ষিত তরুণের সামাজিক আন্দোলনের ফলে। অথচ সতীদাহ প্রথা সনাতন ধর্মের ধর্মগ্রন্থে বিশেষ উল্লেখ নেই। তারপরেও ব্রিটিশ আমলে আইনগতভাবে এটি রদ করা হলেও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটা অংশ এর বিরোধিতা করেন এবং এই আইনের বিরুদ্ধে প্রিভি কাউন্সিলে আপিল করেন। কিন্তু মামলায় সংস্কারবাদীরা জয়ী হন। তবু সীমিতহারে ভারতসহ উপমহাদেশের কোথাও কোথাও এটি পালন করা হতো। যে জিনিসটি শতাব্দী (?) ধরে চলে আসছে সেটি অস্বীকার করার মত শিক্ষা বা দৃষ্টিভঙ্গি সেই সময়ে ছিলই না। দুঃখের বিষয় এখনো অনেকক্ষেত্রে নেই। বিশেষকরে যে ব্যবস্থায় নারীদের সম্মান বাড়বে সে ব্যবস্থা খুব সহজে কার্যকর হয় না।
সতীদাহ প্রথা ঠিক কবে চালু করা হয়েছিল সেটি সঠিকভাবে জানা না গেলেও মনে করা হয় আনুমানিক ৩০০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে একজন গ্রীক লেখক এর বর্ণনা দেন। উনিশ শতকের শেষভাগে এই অমানবিক প্রথার উচ্ছেদ ঘটে বিভিন্ন কারণে। খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রচার, পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আন্দোলনের কারণে সতীদাহ প্রথা এই উপমহাদেশ থেকে প্রায় সমূলে বিলুপ্ত হয়। প্রায় বললাম এই কারণে কখনো সখনো শোনা যায় ভারতে কোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই জাতীয় ঘটনা ঘটে থাকে। তবে দুই একটা ঘটনাকে নিয়ম হিসাবে চালিয়ে দেয়া যায় না। আর যে ভ্রান্তিমূলক ধারণা নিয়ে আমরা ছিলাম সতীদাহ প্রথা নিয়ে, মানে এটা সনাতন ধর্মে একরকম বাধ্যতামূলক নিয়ম ছিল, এটি তা নয়। ধর্মগ্রন্থে এই নিয়ে কোন বক্তব্য নেই। কিন্তু পুরুষশাসিত সমাজপতিরা বিভিন্ন কারণে এটি প্রচলন করেন। এ প্রসংগে আমার শরৎচন্দ্রের একটি বিখ্যাত উপন্যাস ‘চন্দ্রনাথ’ এর কথা মনে পড়ে। চন্দ্রনাথ যখন কাশী থেকে সরযূকে নিয়ে আসেন বাড়িতে তখন তার কাকা মনিশংকরের একটা বিখ্যাত উক্তি আমি এখনো ভুলিনি। মনিশংকর সরযূ এবং চন্দ্রনাথের পুত্রসন্তানের আগমন উপলক্ষে সারা গ্রামবাসীকে খাওয়াবেন মর্মে ঠিক করায় চন্দ্রনাথ পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে কিছুটা আশংকার সাথে সমাজের প্রসংগ তোলেন। তখন মনিশংকর বললেন ‘সমাজ কে? সমাজ আমি, সমাজ তুমি। যার টাকা আছে সেই সমাজ। ‘আমার স্মৃশিক্তি ঠিকঠাক কাজ করলে কথাগুলি এই — ই ছিল। কাজেই শতাব্দীর পর শতাব্দী যে সব হতভাগী বিধবা ধর্মের নামে সহমরণের পথে যাত্রা করতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা আমাদের নমস্য। তাদের আত্মাহুতি কয়েকজন হলেও পুরুষ মানুষকে ভাবতে বাধ্য করেছিলেন এ অন্যায়! এটা মেনে নেয়া যায় না। এবং তারা মেনে নেননি।
ধর্মীয় বই থেকে আমি কোন উদ্ধৃতি আনতে চাই না। কিন্তু সমাজগতিরা যে জিনিসটি ধর্মগ্রন্থেও নেই সেটাকে কীভাবে সুকৌশলে ধর্মের নামে চালিয়ে এসেছে। কতগুলি নারীকে হত্যা করেছে! হত্যা করেছে কেন? সমাজ কে পরিচ্ছন্ন রাখতে। যাতে এই অল্পবয়েসী নারীরা তাদের বায়োলজিক্যাল চাহিদা না মেটাতে পারে। বাবুদের ঘরে বৌ রেখে বাঈজী বাড়ি গেলে ধর্মের অবমাননা হয় না। কিন্তু অকাল বৈধব্য বরণ করায় তাকে মরে যেতে হবে, অথবা বাঈজী বাড়ি কি সোনাগাছি বা টানবাজারে ঠাঁই নিতে হবে এটা ছিল মেয়েদের প্রতি নিষ্ঠুরতম অন্যায় এবং কৌতুক। অথচ ওদের কাছে যারা যায় তারা হলো সমাজের দন্ডমুন্ডের কর্তা।
তখন নারীদের শিক্ষা দীক্ষা ছিল না। তারা যে এই প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবেন তাদের কন্ঠস্বরে সে জোর ছিল না। তাদের পাশে কোন সহায়ক শক্তি ছিল না। যতদিন শ্বশুরবাড়ি থাকতেন খাটতে হতো কলুর বলদের মতো। শাশুড়ির উপর তার শাশুড়ি ছড়ি ঘোরাতো। ব্যস নতুন শাশুড়ি প্রতিশোধ নেয়ার জন্য হাতের কাছে পেয়ে গেলেন নতুন বৌ কে যার বয়স ছিল ৮-৯ এর বেশি নয় ।
আশাপূর্ণা দেবীর বইতে দেখতে পাই ছেলের বাড়ির চাইতে মেয়ের বাবা অর্থবিত্ত, সামাজিক মর্যাদা বেশি হলেও একটা জায়গায় তিনি আটকে যেতেন। মেয়েকে শাশুড়ির অমতে কিছুতেই বাপের বাড়ি আনা যেত না। মুখের ওপর বলে দিত মেয়েকে আর ফেরৎ পাঠানোর প্রয়োজন নেই। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ত্রয়ী ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’, ‘সুবর্ণলতা’ এবং ‘বকুল কথা’ এই তিনটি বইয়ের মধ্যে প্রথম প্রতিশ্রুতিতে তিনি যে সত্যবতীকে এঁকেছিলেন আজকের দিনেও এরকম ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কোন নারীর দেখা মিলবে কি? এটা সত্য যে শিক্ষিত পরিবারে এখন বাল্যবিধবা হয় না। কিন্তু দুবাই অথবা সিংগাপুরে কি আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসকারীর সাথে তার অর্ধেক বয়েসি মেয়ের সাথে বিয়ে তো হচ্ছে। বাবা মাও সুখী। মেয়েও খুশি ! আর যে নিয়ে যাচ্ছে সাথে করে সে তো বিশাল ত্রাতার ভূমিকায় আছে।
আজ এত বছরেও নারীদের জীবনযন্ত্রণায় এতটুকু পরিবর্তন আসেনি। যদিও এখন প্রচুর মেয়েদের সাফল্যের সাথেই কর্মক্ষেত্রে স্বাক্ষর রাখতে দেখা যায় । তবু দুঃখের বিষয় হচ্ছে অনেক মেয়েকে বিয়ের পর সংসার নামক জোয়ালখানা ঘাড়ে লাগিয়ে চাকরীর পথে অন্তরায় সৃষ্টি করা হয় । আর কেউ যদি ম্যানেজ করতে পারেও তাহলেও তাকে অফিস যাওয়ার আগে এবং অফিস করার পরে বাসায় এসে সেই উনুনের পাশেই বসতে হয়। আবার কিছু পুরুষ আছেন যারা আবার এবেলার খাবার ওবেলায় খাবেন না। কাজেই রাঁধো নতুন করে ওবেলায় ও । আমাদের সমাজে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক অথবা সংজ্ঞা এখনো ঠিকমত পন্ডিতজনেরা বিশ্লেষণ করেছেন ( দুঃখিত) কি না তা আমার জানা নেই। আগেকার দিনের প্রথা অনুযায়ী সমাজে । স্বামী অর্থ হলো প্রভু। আর স্ত্রী হলো দাসী। প্রাচীনকালে ছেলে যখন বিয়ে করতে যেত তখন মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিত ‘মা তোমার জন্য দাসী আনতে যাচ্ছি।’ এটা মায়ের ওপর টনিকের কাজ করতো মনে হয়। তিনি সাথে সাথেই কোমরে শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে তৈরি হতেন কিভাবে প্রথম রাতে বিড়াল মারতে হয়। দুঃখিত। এগুলো অনেকখানিই আমার ধারণা। বিভিন্ন পড়াশোনা থেকে। ব্যতিক্রমও হয়তো থাকতো কোন কোন ক্ষেত্রে । তবে ৫-৭ বছর আগে এক ছেলেকে বিয়ে করার সময় তার আত্মীয়রা একথা বলতে বাধ্য করেছিল আমার পরিচিত মহলেই। হতে পারে ঠাট্টা করে। তবে এটা কোন স্তরের ঠাট্টা সেটা আমি বুঝি না। লিখতে বসেছিলাম সহমরণ বা বিধবা বিয়ে নিয়ে। সনাতনধর্মে, চলে গিয়েছি অনেক দূরে। খুব বেশি দূরেও নয় । বলতে কি একেবারে আগুন গায়ের কাছে চলে এসেছে। বর্তমান সময়ে মেয়েদের বেশ বড় একটা অংশ চাকরীতে জড়িয়ে পড়েছেন। এটা অত্যন্ত একটা ভাল লক্ষণ। নিজের মানসম্মান বাঁচিয়ে খুব সুন্দরভাবে কাজ করা যায়। এতে যেমন মেয়েটি তার কষ্টার্জিত জ্ঞান সমাজে এবং দেশের কাজে লাগাতে পারে তেমন সংসারে কিছু স্বচ্ছলতাও আসে। তেমনি তার আত্মবিশ্বাসও বাড়ে। তবে এটা তখনই সম্ভব যদি নারীটির স্বামী বোঝেন কেন তার স্ত্রীর চাকরি করা প্রয়োজন। তিনি যদি তার স্ত্রীকে বন্ধু না ভেবে নিজেকে প্রভু ভাবা শুরু করেন তাহলে একজন নারীর পক্ষে কখনোই সম্ভব নয় ঘরে বাইরে সমান উদ্যমে কাজ করা। তখন তাকে সংসার টিকিয়ে রাখতে হলে চাকরি ছাড়তে হয়। প্রশ্ন উঠতে পারে চাকরি কেন ছাড়বে?
সংসার ছেড়ে বের হয়ে আসুক। যেখানে তার সম্মান নেই সেখানে থাকা কেন? আমি স্বামীর একটি অর্থ বলেছি, অন্যটি বলিনি। সেটি হলো স্বামী তার স্ত্রীর অলংকারও বটে । এই অলংকার ছাড়া যে কোন বিবাহিতা নারী সমাজের চোখে যথাযথ সম্মান পান না। আজ কথা আর বাড়াবো না। তবে স্বামী যে একজন বিবাহিতা নারীর জন্য অন্যতম অদৃশ্য অলংকার সেটি বলি।
আমি ১৯৮৬ সালে চাকরিতে যোগদান করি। তখন আমাদের হাসপাতালে আমরা ৫ জন মহিলা ডাক্তার ছিলাম। ৫ জনেরই স্বামী সন্তান সবই ছিল। কিন্তু যিনি আমাদের মাঝে বয়েসে বড় ছিলেন, আমি ঠিক জানি না, তাঁর সম্ভবত স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল। আপার তিনটি সন্তান ছিল। আপাই তাদের বড় করেছিলেন। লেখাপড়ায় তারা বেশিদূর যেতে পারেনি। আমার ধারণা সেটির জন্য তারাই দায়ী। আমার কাছে যে জিনিসটি পীড়াদায়ক ছিল আমাদের বাকী ৪ জন মহিলা চিকিৎসকের সাথে সিনিয়র মোস্ট ডাক্তাররা এইভাবে কথা বলতেন না। আপাকে যতটা অশ্রদ্ধা অথবা এই রকম একটা ভাব উনি কি জানেন? এইরকম আচরণ কোন কোন জুনিয়র চিকিৎসক ও করে ফেলতো। আমার এত খারাপ লাগতো এই গুলো দেখে। তখন আমার উপলব্ধিতে এলো আরে নারীর জন্য সব চাইতে বড় অলংকার তার স্বামী, বিদ্যার্জন নয়। ওটা থাকলে সেপরিচয় দিয়ে সমাজে স্বামীর আরও একটু স্ট্যাটাস বাড়ানো যাবে, না থাকলেও ক্ষতি নেই।
এই বিষয়ে কিছুদিন আগে ফেসবুকে আমাদের আলাপ হচ্ছিল। সেই আলাপের সময় ত্যক্ত বিরক্ত আমার স্নেহভাজন এক ভগ্নির উক্তি ছিল। প্রতিদিন অল্প অল্প করে মরার চাইতে সহমরণে যাওয়া ভাল। ‘কতটা দুঃখ কষ্ট পেলে বা দেখলে এমন উপলব্ধি হয় ! জানি না সেদিন কবে আসবে যেদিন আমরা নারীরা সব অপমানের উত্তর দিয়ে সসম্মানে বাঁচতে শিখবো!
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা
চট্টগ্রাম বন্দর হাসপাতাল