প্রসঙ্গ : যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা

মোহাম্মদ ইমাদ উদ্দীন

5

যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশে একটি গুরুতর সমস্যা, কিন্তু এটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকাল সংবাদপত্র বা রেডিও টেলিভিশন খুললেই প্রতিদিনই কমবেশী সড়ক দুর্ঘটনা ও যানজটের খবর দেখতে পায়। নাগরিক জীবনের একটি বড় বিড়ম্বনার বিষয় হলো যানজট। ঢাকা শহরসহ বিভিন্ন স্থানে এই বিড়ম্বনা বেশি। যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা এখন আমাদের দেশে কোনো অপ্রত্যাশিত খবর বলে মনে হয় না।
ঢাকা শহর ও শহরের প্রবেশ মুখ যানজট প্রায়ই অসহনীয় হয়ে উঠে। রাজধানীর ছোট বড় সকল রাস্তায় নানাপ্রকার যানবাহন এলোপাতাড়ি ছুটতে গিয়ে শৃঙ্খলা ঠিক রাখে না। মুহূর্তের মধ্যে চলার গতি থেমে যায়। অফিসগামী ঠিক সময় অফিসে পৌঁছাতে পারে না। শিক্ষার্থীরা যেতে পারে না স্কুল-কলেজ, মাদরাসায়। এমন কি মুমূর্ষু রোগীবহনকারী অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত আটকা পড়ে থাকে সিগন্যালের যানজটে। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের শ্রমঘণ্টা পথেই নষ্ট হয়ে যায়। যা জাতীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অনুন্নত সড়ক ব্যবস্থা, সড়ক চলাচলে অজ্ঞতা, দক্ষ চালকের যানবহন চালনা, পথচারীর নির্বিকার চলাফেরা, অসাবধানতা, ফুটপাত ব্যবহার না করা, ট্রাফিক সিগন্যাল মান্য না করা ইত্যাদি যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তাছাড়া ত্রুটিপূর্ণ যানবহনের এবং অপরের জীবনের মূল্য সম্পর্কে উদাসীনতার কারণেও অনেক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। প্রয়োজনের তুলনায় বাংলাদেশে সড়কব্যবস্থা খুবই নগন্য। যেটুকু আছে তাও আবার যানবাহনে জন্য উপযোগী নয়। কারণ উন্নত দেশে যেসব রাস্তা আছে সেগুলো দ্বিমুখী, কিন্তু বাংলাদেশের বেশীর ভাগ রাস্তাই একমুখী। ফলে এই একমুখী রাস্তাগুলোর মাঝখানে ‘ডিভাইডার’ ব্যবহার করে দ্বিমুখী করা হয়েছে। অনেক সময় চালকরা ডিভাইডার না মেনে ওভারটেক করতে থাকলে বিপরীতমুখী যানবহন দুর্ঘটনা ঘটায়।
আমাদের দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থা অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ। আর ট্রাফিকরা অদক্ষ ও দায়িত্বহীন। তাদের অনেকেই রাস্তায় যান চলাচল সুষ্ঠু রাখার বদলে ঘুষ আদায়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। তাছাড়া ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকা ও চালককর্তৃক আইন অমান্য করার করণে যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা মারাত্মকভাবে ধারণ করেছে।
ঢাকা শহরসহ বিভিন্ন শহরে গাড়ি পার্কিং এর তেমন কোনো সুব্যবস্থা নেই। ফলে রাস্তার পাশেই গাড়ি এলোপাথাড়ি পার্কিং করে রাখা হয়। এতে রাস্তার সংকীর্ণ হয়ে যান চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করে।
তাছাড়া শহরের রাস্তাগুলোর দু’পাশে দেখা যায় দোখানপাট ও বাজার। পথচারীদের চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ওভারব্রীজ, ফুটপাত ও আন্ডারপাস নেই। তাই মানুষ রাস্তার মাঝখান দিয়ে পার হতে চেষ্টা করে। ফলে যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা উভয়টি ঘটে।
যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনার সমস্যা নিরসনে চাই কিছু টেকশই পদক্ষেপ। যেটা জনগণ ও সরকারের যৌথ প্রচেষ্টায় সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন যথার্থ আইন প্রণয়ন এবং প্রণীত আইনের সুষ্ঠু ব্যবহার। রাজনৈতিক দলগুলোর সমাবেশ মিছিলের জন্য স্বতন্ত্র মাঠ তৈরি করতে হবে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকেও যানজট সৃষ্টি না করার ব্যাপারে সহযোগিতা করতে হবে।
রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে রাজপথ ও ফুটপাতগুলি হকার মুক্ত করতে হবে। আর লাইসেন্সবিহীন যানবহন দৌরাত্ম্য কমাতে হবে এবং পার্কিং ছাড়া যত্রতত্র যানবহন পার্কিং বন্ধ করতে হবে।
বাস, ট্রাক, শ্রমিকদের স্বেচ্ছাচারিতারোধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয় এবং দায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে আহত নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। বাস, ট্রাক, মালিক, চালক ও শ্রমিকদের একগুয়েমিপূর্ণ ধর্মঘট আইন করে বন্ধ করতে হবে। ওরা মানুষ মারবে, অন্যায় করবে আবার ধর্মঘট করে গাড়ি চলাচলও বন্ধ করবে, এটা চলতে দেয়া যায় না।তাই এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনার জন্য কেবল চালকরাই যে এককভাবে দায়ী তাও নয়। অনেক ক্ষেত্রে সর্বসাধারণের অসাবধানতার কারণে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়। তাই সড়ক দুর্ঘটনরোধে জনগণকে বিভিন্ন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। এ পদক্ষেপ নিতে হবে ছাত্র ও যুব সমাজকে। তারা পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে হবে। যদিও সড়ক দুর্ঘটনা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তোলার জন্য প্রশাসনিকভাবে ট্রাফিক সপ্তাহ পালিত হয়। তার পরও হাইওয়েতে মাঝে মাঝে পুলিশ বক্স নির্মাণ করতে হবে যাতে বাস, ট্রাক প্রভৃতি যানবহন নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আবার কোনো চালক যাতে তার বাহনে অতিরিক্ত বা মালামাল বহন না করে সেদিকে অবশ্যই প্রশাসনকে খেয়াল রাখতে হবে। রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং, সিগন্যাল লাইট অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। আর জনবসতিপূর্ণ এলাকা, স্কুল-কলেজ ও ভার্সিটি সামনে গতিরোধক তৈরি করে দুর্ঘটনা এড়ানো কিছটা সম্ভব।
সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হলো চালকদের মাদক সেবন। অতিমাত্রায় মাদক সেবনের ফলে চালক অনেক সময় মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালান এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা হন। সেটার প্রতি যাত্রীদেরকেও সজাগ হতে হবে এবং মাদক সেবন নিষিদ্ধ করতে হবে।
একটি দুর্ঘটনা সারা বছরের কান্না। সড়ক দুর্ঘটনার মতো অভিশাপ কারো জীবনে যেন না আসে সে বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। তাই সড়ক দুর্ঘটনারোধে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এমন কি দুর্নীতি মুক্ত দক্ষ ট্রাফিক নিয়োগ দেয়ার নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক