প্রসঙ্গ : মুজিববর্ষ

61

লায়ন ডাঃ বরুণ কুমার আচার্য বলাই

এপিজে আবদুল কালামের একটি উক্তি দিয়ে শুরু করি। তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমরা আজকের দিনটি উৎসর্গ করি যেন আমাদের শিশুরা একটি সুন্দর আগামী পেতে পারে।’’ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। আর শ্রেষ্ঠদের সবকিছু হবে শ্রেষ্ঠ। সে হিসেবে মানুষের চলাফেরা, আচার-ব্যবহার, চরিত্র, রুচিবোধ, সৃজনশীলতা, মননশীলতা-সবকিছু শ্রেষ্ঠ হবে, এটাই স্বাভাবিক। সারাবিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তারের ফলে মানুষ নিত্য-নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে দিন দিন উন্নতির স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করে সেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রাখছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষ দিন দিন সভ্য হচ্ছে। অন্যদিকে গুঁটিকয়েক মানুষের মানবতা বিবর্জিত কর্মকান্ডের ফলে মানবসভ্যতাকে লজ্জায় ন্যুয়ে যেতে হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ-বিগ্রহ, মৌলবাদ, সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ, দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, নারী-শিশু নির্যাতন প্রভৃতি বিভীষিকাময় চিত্রে মনে হয়-মানুষ সভ্য নয়, বরং দিনদিন অসভ্য বর্বর পশুতে পরিণত হচ্ছে। যদি শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ হয় তবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে শিশুরা যেন সুন্দর ও সমৃদ্ধভাবে বেড়ে উঠতে পারে, সে জন্য সব ধরনের সুযোগ নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে তারা যেন শুধু খাদ্য পেয়েই বড় না হয়। একই সঙ্গে তারা শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার সুযোগও যেন সমানভাবে পায়। সেই পরিবেশ ও উপকরণ তাদের জন্য সুলভ করে দেওয়া আমাদের কর্তব্য। তাই আমাদের শিশুবান্ধব সংস্কৃতির পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দুঃখের বিষয় সব শিশুই কিন্তু সমান অধিকার পেয়ে বড় হয় না। অনেক শিশু শিক্ষার সুযোগ পায় না। সংস্কৃতির চর্চা ও পরিবেশ পায় না। মা-বাবা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিশু ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। অনেক পথশিশু আছে, তাদের জন্যও আমাদের ভাবতে হবে। তারা শিক্ষা ও সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকে, ঠিকমতো খেতেও পায় না। তারা মানসিকভাবে বিকশিত হয় না। এরা কিন্তু সমাজের জন্যও বোঝা হয়ে ওঠে। এটা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এর থেকে কিভাবে বেরিয়ে আসতে হবে, শিশুদের নিয়ে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে পারলে ভালো কিছু সম্ভব হবে। প্রতিটি শিশুর প্রতি আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর আদর, স্নেহ ও ভালোবাসা ছিল। প্রতিটি শিশুকে নিয়ে তার স্বপ্ন ছিল। শিশুদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা, জাতির পিতার মানবীয় গুণাবলির চর্চা ও আদর্শ শিশুদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া, শিশুদের প্রতি জাতির পিতার ভালোবাসা স্মরণের জন্যই মূলত জাতির পিতার জন্মদিনের সঙ্গে জাতীয় শিশু দিবস পালন করার অন্যতম উদ্দেশ্য। তাই বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনটিকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় ১৯৯৬ সালে। ১৯৯৭ সালে জাতির পিতার জন্মদিনটির সঙ্গে জাতীয় শিশু দিবস একসঙ্গে পালিত হয়ে আসলেও ২০০১ সাল থেকে কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর আবার ২০০৯ সাল থেকে নিয়মিতভাবে দিবসটি গুরুত্বসহকারে পালিত হচ্ছে। জাতির পিতা বিশ্বাস করতেন, এই শিশুদের হাতেই জাতির ভবিষ্যৎ। সদ্য স্বাধীন হওয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটাকে গড়ে তোলার পাশাপাশি তিনি শিশুদেরও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব নেন। এরই পথ ধরে ১৯৭৪ সালে জাতীয় শিশু আইন প্রণয়ন করা হয়। তিনি শিশুদের প্রতি অবারিত দুয়ার খুলে রেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শিশুকাল থেকেই ছিলেন অন্যায় ও সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার। বাংলার নদী-মাটি-কাদাজল মাড়িয়ে বেড়ে ওঠা এই দেশপ্রেমিক মানুষটি সর্বদা দেশ ও দেশের মানুষকে নিয়ে ভেবেছেন। শিশুদের জন্য কিছু করার আগ্রহ তিনি প্রবলভাবে অনুভব করতেন। যখনই সময় পেতেন তিনি শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেষ্টা করতেন। বিভিন্ন বই থেকে জানা যায়, তিনি যখন কোনো কাজে গ্রামগঞ্জে যেতেন, কোনো সভা-সমাবেশে যেতেন শিশুদের দেখলেই তাদের সঙ্গে মিশে যেতেন, গল্প করতেন খোঁজ-খবর নিতেন। এমনকি গণভবনেও তিনি শিশুদের সময় দিতেন, বিশেষ দিনগুলো শিশুদের মাঝে কাটাতেন। শিশুরাও জাতির পিতাকে আপন করে নিত। জাতির পিতার বহু মানবীয় গুণের ঘটনা আমাদের জানা। বর্তমানে সারাবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিক্ষা-দীক্ষা, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। রাজনৈতিক নানা কারণে হয়তো কাক্সিক্ষত সুফল জাতি পাচ্ছে না। তবুও শিক্ষাখাতে আমাদের অর্জন ঈর্ষণীয়। একটা সময় ছিল যখন শিক্ষা অর্জনের বিষয়টা অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কালক্রমে মানুষের উপলব্ধি হলো, শিক্ষা এমন একটি বিষয় যা সবার জন্য প্রয়োজন। শিক্ষা ছাড়া মানুষ অন্ধের শামিল। এখন শিক্ষার অনেক দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, সেই সঙ্গে শিক্ষা অর্জন হয়েছে আগের তুলনায় সহজতর। শিক্ষার হার বাড়ছে, সেই সাথে শিক্ষিত লোকের নৈতিক স্খলনও বাড়ছে। প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘স্বশিক্ষিত লোক মাত্রই সুশিক্ষিত’। যে শিক্ষা মানুষকে মানুষের মত মানুষ হওয়া শেখায়, সেটাই সুশিক্ষা। তাই সুশিক্ষাটাই প্রত্যাশিত। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সুশিক্ষার অনুপস্থিতি প্রকটতর। ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষা তথা সুশিক্ষার অভাবের ফলেই আজ শিক্ষকের নিকট ছাত্র-ছাত্রীরা নিরাপদ নয়। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীদের যৌন নিপীড়নের খবরে আমরা শিউরে উঠি। তারচেয়ে মারাত্মক অবস্থা বিরাজ করছে বাচ্চাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে। প্রতিদিন শিশুনির্যাতন, যৌননিপীড়নের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। যা সভ্যতা-ভব্যতার জন্য কলঙ্কজনক। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় বর্তমানে আমাদের দেশেও শিশুনির্যাতনের এ ব্যাধি ভাইরাসের ন্যায় অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পিতা-মাতা, অভিভাবকবৃন্দ সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। চারিদিকে এক অসহনীয় পরিবেশ। বাংলাদেশে অনেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে শিশুদের জন্য কাজ করে চলেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, এনজিও এবং সরকার নানাভাবে শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। শিশুদের জন্য কাজের আওতা আরো বাড়াতে হবে। আমাদের দেশের শিশু একাডেমি শিশুদের সুন্দরভাবে বিকাশের জন্য নানা ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। কবিতা আবৃত্তি, নাচ, গান, ছড়া বলা, ছবি আঁকা, গল্প বলার প্রতিযোগিতা এবং শিশু-কিশোর উপযোগী বিভিন্ন উপকরণের মাধ্যমে তাদের বিকাশে সহায়তা করছে। কেননা শিশুদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করা, আত্মবিশ্বাস তৈরি করা, সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো, খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট করা আমাদেরই দায়িত্ব। প্রতিটি স্কুলে এখন বঙ্গবন্ধু কর্নার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটা খুব ভালো উদ্যোগ। বঙ্গবন্ধু কর্নার গড়ে তোলার ফলে শিশুরা পড়ালেখার পাশাপাশি সঠিক পথের দীক্ষা পাবে। কেননা আজকের শিশু আগামী দিনের পরিণত মানুষ ও দেশ গড়ার কারিগর।
প্রত্যেক শিশুর জীবন নিরাপদ, সৃজনশীল, সুস্থ, সুন্দর ও সমৃদ্ধ হোক-এ প্রত্যাশা ছিল বঙ্গবন্ধুর। জাতির পিতার স্বপ্নের উন্নত সোনার বাংলা এই শিশুরাই গড়বে। যন্ত্র নিয়ে কোমলমতি শিশুরা যেন ব্যস্ত না হয়ে পড়ে এ ব্যাপারে মা-বাবা, শিক্ষক ও প্রত্যেক সচেতন মানুষকে নজর দিতে হবে। প্রত্যেক মা-বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের উচিত শিশুদের আরও বেশি সময় দেওয়া। যদি শিশুরা পরিবার থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করে, তাহলে তারা নীতি-নৈতিকতা বিবর্যিত হবে। আর নীতি-নৈতিকতা না থাকলে বড় হয়ে বিপদগামী হবে। তবে শিশুরা যত বেশি বড়দের স্নেহ-ভালোবাসা পাবে, বড়দের সান্নিধ্যে থাকবে তত সুস্থ ও নিরাপদভাবে বেড়ে উঠবে। শিশুদের প্রতি হিংস্র মনোভাব পরিহার করতে হবে। মনে রাখতে কোন শিশু যেন বয়স্ক কোন লোক দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার না হয়। তাহলে শিশুর বেড়ে উঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে।
তারা মানবিকভাবে ভেঙে পড়বে। শিশুরা তাদের কোমলমতি মনে যে অনুভূতি প্রকাশ করবে বা বাচ্চাসূলভ যে কাজ করবে তাতে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। ভূল হলে চেচামেচি না করে, সংশোধন করতে হবে। তাই মা-বাবা ও শিক্ষকদেরও উচিত শিশুদের আরও বেশি প্রশংসা করা। প্রত্যেক শিশুকে জাতির পিতার আদর্শে জীবন গড়া ও তাঁরই মতো মানবীয় গুণাবলিসম্পন্ন হিসেবে গড়ে তোলার প্রতি আত্মনিয়োগ করতে হবে মা-বাবা ও শিক্ষকদেরই। তাহলে আমরা পাব একটি সুন্দর দেশ ও উন্নত জাতি। যে দেশ ও জাতি আগামী দিনে জাতির পিতার দেখানো পথেই বিশে^র দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, মরমী গবেষক