প্রশাসনিক পদক্ষেপে ফিরছে সুদিন

তুষার দেব

40

দক্ষিণ এশিয়ার কার্প জাতীয় মাছের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদায় ‘সুদিন’ ফিরছে। হালদা নদীর হাটহাজারী ও রাউজান অংশে থাকা প্রজনন ক্ষেত্রে এবার মা মাছের ছাড়া ডিমের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। সংগৃহীত ডিমের হিসাব-নিকাশ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতভিন্নতা থাকলেও পরিমাণ বাড়ার প্রশ্নে কেউ দ্বিমত প্রকাশ করেননি।
ডিম সংগ্রহকারী হালদা পাড়ের জেলে ও স্থানীয়রা বলছেন, গত বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার পর থেকে হালদায় মা মাছ ডিম ছাড়তে শুরু করে। তার আগের দিন বুধবার হালদায় নমুনা ডিম ছাড়ে কার্প জাতীয় মাছ। গত চার-পাঁচ বছরের মধ্যে এবার সর্বোচ্চ পরিমাণ ডিম ছেড়েছে মা মাছ। তাই সংগ্রহের পরিমাণও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। দূষণসহ পরিবেশবিধ্বংসী নানা কর্মকান্ডে বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা সত্বেও হালদায় মা মাছের ডিম ছাড়ার পরিমাণ বাড়ায় জেলেরাও এবার বেজায় খুশি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, গত মৌসুমে ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল এক হাজার ছয়শ’ ৮০ কেজি। প্রাথমিকভাবে আমার হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী এবার ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে ২২ হাজার ছয়শ’ ৮০ কেজি। সর্বমোট চারশ’ পাঁচটি নৌকা নিয়ে জেলেরা নদীতে ডিম সংগ্রহ করেছে। সব নৌকা এখনও নদী থেকে কূলে আসেনি। তাই চূড়ান্ত হিসাবে পরিমাণ কমবেশি হতে পারে। নদী সুরক্ষায় কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের কারণে হালদায় এবার মা মাছের আনাগোনা যেমন বেড়েছে, তেমনি প্রাকৃতিক পরিবেশও অনুকূলে রয়েছে। তাই এবার আগের চেয়ে ভালো ফল পাওয়া গেছে।’
মি. কিবরিয়া বলেন, ‘হালদায় ডলফিন ও মাছসহ প্রজনন ক্ষেত্র সুরক্ষায় খনকযন্ত্র চলাচল এবং তা দিয়ে বালি উত্তোলন বন্ধ করা,পিকেএসএফ ও আইডিএফের তত্ত¡াবধানে স্পিডবোটের মাধ্যমে নিয়মিত পাহারা, স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি বৃদ্ধি, নদীর ভূজপুর অংশে নির্মিত রাবার ড্যাম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পানির উপযুক্ত প্রবাাহ নিশ্চিত করা এবং চোরা শিকারীদের মা মাছ শিকার বন্ধ হওয়ার কারণেই এবার মা মাছ অবাধে প্রজনন ক্ষেত্রে আসতে পেরেছে। তাই ডিমও বেশি পাওয়া গেছে।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামাল উদ্দিন পূর্বদেশকে বলেন, ‘আমরা সংগৃহীত ডিমের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও পাইনি। তাছাড়া, রেণু উৎপাদনের পরই আসলে সঠিক হিসাব দেয়া সম্ভব হবে। এ কারণে আরও অন্তত দশদিন সময় লাগবে। তবে, এবার ডিম সংগ্রহের পরিমাণ অনেক বেশি হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে আমরা খবর পাচ্ছি।’
মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত ২০১২ সালে হালদায় সংগৃহীত ডিম থেকে এক হাজার ছয়শ’ কেজির মত রেণু পাওয়া গিয়েছিল। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৩ সালে তা কমে ছয়শ’ ২৪ কেজি এবং তার পরের বছর ২০১৪ সালে সংগৃহীত ডিম থেকে রেণু উৎপাদন আরও কমে গিয়ে মাত্র পাঁচশ কেজিতে এসে ঠেকে। এর পর ২০১৫ সালে ছয় হাজার তিনশ’ ৬০ কেজি এবং ২০১৬ সালে সাত হাজার একশ’ ৬৫ কেজি রেণু উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে মৌসুমের শুরুতে প্রত্যাশা অনুযায়ী বজ্রসহ ভারি বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ডিম ছাড়ার পরিমাণ কমে যায় বলে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান।
তবে, গবেষকদের দাবি, বিগত ২০১২ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত হালদায় কার্প জাতীয় মা মাছের ডিম ছাড়ার পরিমাণ আশংকাজনক হারে কমেছে। ওই চার বছরে এ নদী থেকে পাওয়া মাছের ডিম থেকে রেণু উৎপাদনের পরিমাণ অন্তত দশ গুণ কমেছে। আর গত এক দশকের হিসাবে তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। সর্বশেষ তিনবছর অর্থাৎ বিগত ২০১৪ সালে সংগৃহীত ডিম থেকে রেণু উৎপাদন করা গেছে ১৬ হাজার পাঁচশ’ কেজি ২০১৫ সালে ২ হাজার আটশ’ কেজি এবং ২০১৬ সালে সাতশ ২০ কেজি ডিম সংগ্রহ করে জেলেরা। ১৯৪৫ সালে হালদা থেকে যেখানে চার হাজার কেজি রেণু উৎপাদন হত, সেখানে ২০১৬ সালে এসে খুবই কম পরিমাণ ডিম সংগ্রহ করতে পেরেছে জেলেরা। ওই বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ডিম ছাড়ার প্রতিটি তিথিতে অপেক্ষা করে তিন দফায় শুধু নমুনা ডিম পেয়েছেন তারা। স্মরণকালে হালদার এমন বন্ধ্যাত্ব আর দেখা যায়নি।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বদনাতলি পাহাড় থেকে নেমে আসা হালদা নদী ফটিকছড়ি, রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলার বুক চিরে কালুরঘাটের কাছেএসে কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ৯৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ নদীর ২৯ কিলোমিটার অংশ সারা বছর বড় নৌকা চলাচলের উপযোগী থাকে। প্রতিবছর হালদা নদীতে কালবৈশাখীর বজ্রপাতসহ ভারি বৃষ্টিতে অমাবস্যা তিথির বিশেষ মুহূর্তে কার্প জাতীয় মা মাছেরা ডিম ছাড়ে। দশ বছর আগেও এ নদী থেকে আহরণকারীরা এক থেকে দেড় টনেরও বেশি ডিম সংগ্রহ করতেন। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবেই কমে আসছে ডিম আহরণের পরিমাণ। কার্প জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রটি মানবসৃষ্ট কারণে ধ্বংসের মুখে পড়ায় রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউশের মাতৃমাছের উৎস হারিয়ে যাওয়ার শংকা দেখা দিয়েছে। কেননা, হালদার পোনা থেকেই হয় মা-মাছ। এর ওপর নির্ভর করে চলে সারাদেশের হ্যাচারি। হালদা নদীই দেশে কার্প-জাতীয় মাছের আসল জাত রক্ষা করে চলেছে। বর্ষা মৌসুমের শুরুতে পূর্ণিমা-অমাবস্যা তিথিতে পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে বজ্রসহ প্রবল বর্ষণ এবং নদীর পানির তাপমাত্রা অনুকূলে থাকলেই মা মাছ ডিম ছাড়ে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্প জাতীয় মাছের এ প্রজনন ক্ষেত্র ইতিমধ্যেই হারিয়েছে তার অধিকাংশ বৈশিষ্ট্য। দখল-দূষণসহ, উজানে বাঁকবদল-র‌্যাবার ড্যাম স্থাপনসহ মনুষ্যসৃষ্ট বিবিধ কারণে এখন এ নদীর টিকে থাকাই প্রশ্নের মুখে। চারদিকেই চলছে ধ্বংসের তৎপরতা। অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালুও উত্তোলন করা হচ্ছে ড্রেজার (খননযন্ত্র) দিয়ে। হালদার বহুমুখী ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সমন্বিত কোনো জরিপ ও উদ্যোগ আজ পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি। যা হয়েছে তার বেশির ভাগই খÐিত ও আংশিক। রাবার ড্যাম দু’টোর একটি হালদা নদীতে আর অন্যটি শাখা নদীতে স্থাপন করা হয়েছে। যার কারণে পানিপ্রবাহ আটকে গেছে। এ কারণে মাছ বা অন্যান্য জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। রাবার ড্যাম স্থাপনের আগে নদীর উজান-ভাটিতে পানির চাহিদার যে সম্পর্ক তা আগে নির্ণয় করা উচিত বলে মনে করেন নদী-বিশেষজ্ঞরা। রাবার ড্যাম নির্মাণের আগে এর উচ্চতা কতটুকু হবে, কতটা পানি উপচে যাবে, যেতে পারে নাকি একদম যাবেই না, সে বিষয়গুলো ড্যাম বসানোর আগেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত হলেও হালদার ক্ষেত্রে সেসব উপেক্ষিতই থেকেছে। তবে, গত কয়েকবছর ধরে হালদার প্রজনন ক্ষেত্র সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি নানা পর্যায়ে পদক্ষেপ নেয়া অব্যাহত রয়েছে।