প্রযুক্তির উদ্ভাবনী উৎকর্ষে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব

দিলীপ কুমার বড়ুয়া

34

মানবসভ্যতা প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবনী প্রয়াস নিয়ে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দোর গোড়ায়। ১৭৬০ সালে শিল্পায়নের যাত্রা শুরু হয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে তিনটি শিল্পবিপ্লবে পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত হয়েছে বিশ্বের গতিপথ। ১৭৮৪ সালে প্রথম শিল্পবিপ্লব ঘটেছিল কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনের মাধ্যমে। ১৮৭০ সালে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব ঘটে বিদ্যুৎশক্তি ও প্রযুক্তির উৎকর্ষে আলোকিত বিশ্ব গড়ার। ১৯৬৯ সালে তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের চালিকাশক্তি ছিল পারমাণবিক শক্তি, টেলিযোগাযোগ, ক¤িপউটার ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব শুরু হয়েছে প্রযুক্তির সঙ্গে জৈব অস্তিত্বের সংমিশ্রণে এক নতুন উদ্ভাবনী সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে। ইতোমধ্যে ইন্টারনেট প্রযুক্তি, রোবোটিক্স ও অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাস¤পন্ন রোবট, ন্যানো প্রযুক্তি, মেশিন লার্নিং ইন্টারনেট অব থিংস, বøকচেইন প্রযুক্তি, থ্রি-ডি প্রিন্টিং, কোয়ান্টাম ক¤িপউটিং, উন্নত মানের জিন প্রযুক্তি, নতুন ধরনের শক্তি যে অভাবনীয় পরিবর্তনের সূচনা করেছে, তাতে এই বিপ্লবের ব্যাপ্তি ও প্রভাব আগাম জানান দিচ্ছে মানব সভ্যতার সমৃদ্ধ গন্তব্য ।
পৃথিবীর তাবৎ মানবজাতি এক প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের দিকে অনিবার্য ভাবে ধাবিত হচ্ছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের ভিত্তির ওপর শুরু হওয়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এর ফলে সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে গাণিতিক হারে, যা আগে কখনও হয়নি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিপ্লব। যেখানে মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপনের সাথে একান্ত সঙ্গী হয়ে যাবে প্রযুক্তি। আই ও টি বা ইন্টারনেট অব থিংস এর মাধ্যমে প্রত্যেক বস্তুতে থাকবে ইন্টারনেট। একে ডিজিটাল শিল্প বিপ্লব নামেও অভিহিত করা হচ্ছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি খাতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এর এ পরিবর্তন প্রভাব ফেলছে, যার ফলে পাল্টে যাচ্ছে উৎপাদন প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনা। স্মার্টফোনের মাধ্যমে সারা বিশ্বের তথ্য-প্রযুক্তি খাতের পরিবর্তন, যন্ত্রপাতি পরিচালনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ, রোবটিকস, জৈবপ্রযুক্তি, কোয়ান্টাম ক¤িপউটিংয়ের বহুল ব্যবহার আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে এক নবতর জগতকে।
ডবিøউইএফের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান ক্লাউস শোয়াব ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের আগাম ফসল হিসেবে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের ১০ শতাংশ মানুষের পরিধেয় বস্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে ইন্টারনেট, ১০ শতাংশ মানুষের চশমার সঙ্গেও ইন্টারনেট সংযুক্ত থাকবে, পাওয়া যাবে মানুষের শরীরে স্থাপনযোগ্য মোবাইল ফোন, ৯০ শতাংশ মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করবে, আমেরিকায় ১০ শতাংশ গাড়ি হবে চালকবিহীন, ৩০ শতাংশ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অডিট হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাস¤পন্ন অডিটর দিয়ে, এমনকি কো¤পানির বোর্ডের এক পরিচালক হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাস¤পন্ন রোবট, আমেরিকায় এসে যাবে রোবট ফার্মাসিস্ট। এ ধরনের আরও বহু অবিশ্বাস্য উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের কথা আছে এ তালিকায়।
বিশ্ববাসী চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের আবহে ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্মিত মানব সভ্যতার নতুন একগুচ্ছ ইমার্জিং টেকনোলজি সমন্বিত যান্ত্রিক অনুভ‚তিপ্রবণ সিস্টেমে পদার্পণ করেছে। ফলে মানুষের জীবনধারার পরিবর্তন হচ্ছে ক্রমবর্ধমান গতিতে। আমাদের বহমান জীবনের দৈনন্দিন কাজকর্ম, চিন্তা-চেতনা যেভাবে চলেছে সেটা এখন প্রযুক্তির প্রভাবে বদলে যেতে শুরু করেছে। এখন আমরা এক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্টে বর্তমান ডিজিটাল জগতের কিছু চমকপ্রদ তথ্য আমাদের বিস্মিত করে। যেমন ইউটিউব দেখা হয় দৈনিক ৮৮০ কোটি বার, ই-মেইল পাঠানো হয় ২০ হাজার ৭০০ কোটি, আর গুগল সার্চের সংখ্যা ৪২০ কোটি। এটি বদলে যাওয়া পৃথিবীর জীবনযাপনের চলমান চিত্রমাত্র। এই পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি, সমাজ, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ইত্যাদির ওপর যে বিশাল প্রভাব পড়বে, তার একটা পর্যালোচনা করেছেন ক্লাউস শোয়াব তাঁর দ্য ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন গ্রন্থে। শোয়াব দেখিয়েছেন, প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও উদ্ভাবনে মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে হাতের আঙুলের ¯পর্শে ট্যাক্সি ডাকা কিংবা অনলাইনে সব ধরনের পণ্য ও সেবা পাওয়ার ব্যবস্থার মতো অসংখ্য উদ্ভাবনের ফলে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বেড়েছে।
অধ্যাপক ক্লাউস সোয়াব আরো মন্তব্য করেছেন আমরা এমন একটি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। যা মূলত আমাদের জীবনযাপন, কাজ ও একে অপরের সাথে স¤পর্কিত যে পরিবর্তন ঘটছে। তিনি বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব (ফোর আইআইআর) স¤পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি আধুনিক ও পরিশীলিত প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে রয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ব্যবসায়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, নতুন দক্ষতা এবং কাজের প্রকৃতিতে প্রভাব ফেলবে। প্রযুক্তি ভবিষ্যতে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে। ফোর আইআইআর বিশ্বব্যাপী আয় বাড়িয়ে তুলবে, জীবনের মান উন্নত করবে, নতুন পণ্য ও সেবার উত্থান করবে, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যয় হ্রাস পাবে, বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন কার্যকর হয়ে উঠবে, একটি নতুন বাজার উন্মুক্ত করবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে । প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করছে এবং আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং মানবিক পরিবেশকে পুনঃনির্মাণ করছে তা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের নানা অনুষঙ্গে অনুধাবনযোগ্য ।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব তথা এলগরিদম ও রোবোটিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজ নিজ জনগণকে প্রযুক্তি জ্ঞানে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক উন্নত দেশে শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শুরু হয়ে গেছে প্রোগ্রামিং শিক্ষার প্রসার। আমাদের দেশে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জানার সুযোগ সীমিত শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে। এর অনেকদিন পর কলেজ পর্যায়ের শিক্ষাক্রমে এ বিষয় কিছুটা স্থান পেয়েছে। যার প্রভাব ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রযুক্তিতে দক্ষ-পর্যাপ্ত জনশক্তি তৈরির জন্য প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাব ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি/ল্যাবের অভাবেও এ বিষয়ে জ্ঞার্নাজন বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে সামনে রেখে দেশের স্কুল পর্যায়ের শিশু-কিশোরদের মাঝে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস ও প্রোগ্রামিং বিষয়ের জ্ঞান এখনই ছড়িয়ে দেয়া সময়ের অনিবার্য দাবি। এর জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন দক্ষ প্রশিক্ষক তৈরি করা এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি যন্ত্রের সহজলভ্যতা। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি যন্ত্রের সহজলভ্যতার কথা বলতে হলে মোবাইল ফোনের কথাই বলা যায়। একটা স্মার্টফোনেই এখন প্রায় সব ধরনের প্রযুক্তিগত কাজ করা সম্ভব হয়। একজন শিক্ষার্থীকে একজন দক্ষ প্রযুক্তিবিদ এবং একইসাথে একজন দক্ষ প্রশিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তার মাধ্যমে প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে গড়ে উঠবে আরো শত শত প্রযুক্তিবিদ ও প্রশিক্ষক। আর এভাবেই একদিন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত হয়ে যাবে বাংলাদেশ। আশার বাণী এটাই যে, তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বিভিন্ন বেসরকারি উদ্যোগে এরূপ কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। কোনো ধরনের খরচ ছাড়াই স্কুল পড়–য়া শিক্ষার্থীরা আইটি ট্রেনিং নিচ্ছে, ক¤িপউটার প্রোগ্রামিং শিখছে, রোবোটিক্সের সাথে পরিচিত হচ্ছে এবং দক্ষ প্রযুক্তিবিদের পাশাপাশি দক্ষ প্রশিক্ষক হিসেবে গড়ে উঠছে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মূল ভিত্তি হচ্ছে উদ্ভাবন। ডিজিটাল বিপ্লব সফল করতে দেশের প্রতিভাবান তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাময় উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগানোর বিকল্প নেই। নতুন শিল্পবিপ্লবের রূপকল্প নিয়ে ইতোমধ্যে আমরা গুগল হোম, এ্যামাজনের আলেক্সার কথা শুনেছি যা আপনার ঘরের বাতি, সাউন্ড সিস্টেম, দরজাসহ অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এখন অন্যান্য অনেক কিছুই হয়ে পড়ছে স্মার্ট, মানে ছোট্ট একটি ক¤িপউটার ভরে দেয়া যায় এখন টিভি, ফ্রিজ, গাড়ি, এমনকি দরজার তালাতেও। আর নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এই নতুন স্মার্ট ডিভাইসগুলা ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এসব যন্ত্রপাতি এখন নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে পারবে, আর অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে যোগাযোগ করে স্মার্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। উদাহরণ হিসেবে যেমন – বাজার করতে হবে? ফ্রিজ খোলার দরকার নেই, আপনার ফ্রিজ নিজেই ভিতরে কী আছে তা জেনে আপনাকে জানাবে বা নিজেই সরাসরি অনলাইনে অর্ডার দিয়ে কিনে ফেলতে পারবে। আপনার কাজ কমে গেল। বাড়ির দরজা দিয়ে যখন বেরিয়ে যাবেন আপনাকে দরজা লাগাতে হবে না, আপনি বাড়িতে নেই জেনে দরজাটি আর খুলবে না, আবার আপনি এসে যখন দরজার সামনে দাঁড়াবেন, আপনার চোখ, হাত, পা, শরীর দেখেই আপনাকে চিনে দরজা নিজে নিজেই খুলে যাবে। আপনার চোখের চশমা কিংবা কানের হেডফোনই আপনাকে রাস্তা দেখাবে আর সব তথ্য দিয়ে দেবে। যুক্তরাজ্যে ইতোমধ্যে এই ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে যেখানে তাদের সরকার এনার্জি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানদের স্মার্ট মিটার ব্যবহার করতে বলেছে। অবশ্য আইওটি শুধু ঘরে ব্যবহার উপযোগী যন্ত্রপাতি তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আইওটির মূল লক্ষ্য স্মার্ট সিটি তৈরি করা যেখানে ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে শুরু করে শিল্প এবং কৃষিক্ষেত্রে পণ্যের মান এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিভিন্ন সেন্সর এবং আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করা, স্বাস্থ্যখাতেও আসবে আমূল পরিবর্তন। ইন্টারনেট অব থিংসের ব্যবহার অলরেডি শুরু হয়ে গেছে এবং খুব শীঘ্রই বাজার দখল করে নেবে। ক¤িপউটার সাইন্সের উৎকৃষ্টতম উদাহরণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স যে চারটি কাজ তা হলো- কথা শুনে চিনতে পারা, নতুন জিনিস শেখা, পরিকল্পনা করা, সমস্যার সমাধান করা। মূলত এসব সুবিধাসমুহই যখন বিভিন্ন বস্তুতে যোগ করা হয় তখনই সেটা হয় ইন্টারনেট অব থিংস। এখন প্রায় সকল স্মার্টফোনেই আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্সের ব্যবহার হচ্ছে গ্রাহকের অভ্যাস এবং প্রয়োজনীয়তা মনে রেখে কাস্টমাইজ সেবা দিতে।
প্রযুক্তির মাধ্যমে বদলে যাওয়া এ পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার জন্য অবশ্যই শিক্ষা নিয়ে প্রতিনিয়ত ভাবতে হচ্ছে এবং এ ভাবনা অব্যাহত থাকবে। যেদেশ যত দ্রæত চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন আনতে পারে তারাই এগিয়ে যায়। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর এ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো প্রতিনিয়ত রিফর্ম বা ট্রান্সফর্ম-এর মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে প্রযুক্তির দ্রæত উন্নয়ন এবং কলকব্জা ও যন্ত্রপাতির অটোমেশনের পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যত শিক্ষা নিয়ে আমাদের এখনই কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের শিক্ষার পরিবর্তনের জন্য কিছু বিষয় মাথায় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। সুতরাং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় জ্ঞান বিনিময় বা স্থানান্তরের খুব একটা সুযোগ থাকা উচিত নয়। বরং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ট্রেনিং গ্রাউন্ডে পরিণত করা প্রয়োজন। কারণ উন্নত বিশ্ব চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুবিধা ইতোমধ্যেই ভোগ করা শুরু করেছে। ডেনমার্কে রোবোটিক্স উপর কোর্সটি দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে চালু হয়েছিল এবং শিশুরা যখন চতুর্থ শ্রেণিতে অধ্যয়ন করে তখনই তারা প্রতিযোগিতার জন্য তৈরি হয় । কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, কগনিটিভ ক¤িপউটিং, ক্লাউড ক¤িপউটিং, ৫ জি, বায়োটেকনোলজি এবং ন্যানো টেকনোলজি এই ফোর আইআর এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রযুক্তিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রযুক্তির মানুষকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন করে কারিগরি শিক্ষার হার বৃদ্ধি করে সাধারণ শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি মানসম্মত কারিগরি শিক্ষার সর্বপ্রকার প্রসার ঘটাতে হবে। ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এখনই দেশের চাহিদা ও প্রযুক্তিভিত্তিক মানব স¤পদ গড়ে তুলতে দেশের সকল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরিবিষয়ক শিক্ষার কোর্স চালু করতে হবে। এখনই কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমিক পর্যায় থেকে
শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে তথ্য প্রযুক্তিমনস্ক করে গড়ে তুলতে হবে। এমন একটি তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষ প্রজন্ম তৈরি করতে হবে, যাতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাব মোকাবেলা করতে পারে। দক্ষ মানব স¤পদ সৃষ্টি করতে পারলেই প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সকল ক্ষেত্রে আমরা সঠিকভাবে এগুতে পারব। তাহলেই সম্ভব হবে অতিরিক্ত কর্মক্ষম জনমানবকে কাজে লাগানো আর মোকাবেলা করা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ। দক্ষ ও উপযোগী মানব স¤পদ তৈরি করে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এ ব্যাপারে দেশময় কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ ব্যবস্থায় দক্ষ মানুষ ছাড়া অন্য কোন উপায়ে তাল মিলিয়ে চলা সম্ভব নয়। প্রযুক্তি নির্ভরতা ছাড়া আমাদের বহুল আলোচিত স্বপ্ন-ভিশন-২০২১ ও ভিশন-২০৪১ কোনটিই অর্জন সম্ভব নয়।
ব্রডব্যান্ড আর ইন্টারনেটের প্রসারের ফলে আমাদের শিক্ষার্থীরা এখন সহজে যুক্ত হতে পারছে প্রযুক্তি রাজ্যের মহাসড়কে। এর পাশাপাশি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাতে ক্রমান্বয়ে রোবটিকস, বিগ ডাটা অ্যানালিটিকস কিংবা ক্লাউড ক¤িপউটিংয়ের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে সে জন্য বানানো হয়েছে বিশেষায়িত ল্যাব। বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত শিক্ষাক্ষেত্রে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নততর পর্যায়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি এবং উচ্চতর প্রযুক্তির সঙ্গে স¤পর্কিত যেমন ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, ন্যানোটেকনোলজি, এ্যাডভ্যান্স টেকনোলজি, জড়নড়ঃরপং, ওঞ/ওঞঊঝ, ঈষড়ঁফ ঈড়সঢ়ঁঃরহম, ঠখঝও (াবৎু-ষধৎমব-ংপধষ- ওহঃবমৎধঃরড়হ), ই-কমার্স, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, নেটওয়ার্ক এন্ড কমিউনিকেশন ম্যানেজমেন্ট, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা, নেটওয়ার্ক এ্যান্ড কমিউনিকেশন ম্যানেজমেন্ট, সাইবার নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষাদান, গবেষণা ও জ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনের ব্যবস্থা করা জরুরি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অগ্রযাত্রাকে সামনে রেখে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম ন্যাশনাল প্রফেসর ডা. নুরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট অফ ফোরথ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলেশন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। যা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। দেশের শিক্ষার্থীদের, তরুণ উদ্ভাবনী সত্তার উদ্ভাবকদের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দিতে এবং প্রযুক্তির সুদূরপ্রসারী প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী মেধাস¤পন্ন উদ্ভাবক তৈরিতে এ ইনস্টিটিউট অগ্রনী ভ‚মিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
লেখক : কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক