বিলুপ্তির পথে ঈদকার্ড

প্রযুক্তিতে বন্দী ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়

ওয়াসিম আহমেদ

84

নিকট অতীতে বন্ধু-সুহৃদদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের অন্যতম মাধ্যম ছিল ঈদকার্ড। তখন মনের সাতরং মিশানো লেখা শুভেচ্ছা হয়ে কাগুজে কার্ডে পৌঁছে যেত প্রিয়জনের কাছে। হাতে হাতে মুঠোফোন পৌঁছে যাওয়ায় সেই রেওয়াজ অনেকটাই ¤øান হতে শুরু করে গত এক দশক ধরে। আর গেল কয়েক বছরে ফেসবুক, টুইটারের মতো ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক মাধ্যমের ব্যাপক উত্থানে কার্ডবিনিময় প্রথা বিলুপ্তপ্রায় এখন। ফলে কাগুজে কার্ডের বিনিময়ে শুভেচ্ছাবার্তা বন্দি হয়েছে ম্যাসেঞ্জারে। বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও করপোরেট অফিসে আবেগ অনুভূতিহীন ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ে নামমাত্র বেঁচে আছে ঈদকার্ড।
একসময় ঈদকে সামনে রেখে নগরীর আন্দরকিল্লায় জমে উঠত কার্ডের ব্যবসা। নগরীর বিভিন্ন অলিগলিতেকার্ডের দোকান বসত। আর গ্রামাঞ্চলে ঈদের আগেই পৌঁছে যেত সেই কার্ডগুলো। কারিগরের সৃষ্টিশীল চিন্তায় আকর্ষণীয় রূপ নিত কার্ডগুলো। এমনকি বহুতল বিশিষ্ট কার্ডগুলো প্রাচীন অট্টালিকা সদৃশ হয়ে উঠত। সেখানে মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা হত শুভেচ্ছাবার্তা। কখনো তা কবিতার অংশ বা ছন্দের তালে সাজানো হয় নিজের মনের বাসনাগুলো। শুধু আন্দরকিল্লা নয়, রেয়াজউদ্দিন বাজার, তামাকুমন্ডি লেন, চকবাজার, মিমি সুপার মার্কেট, আফমি প্লাজা, সানমার ওশান সিটি, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন অভিজাত মার্কেট ঘুরে ঈদকার্ড নিয়ে আগের মতো উন্মাদনার লেশটুকুও দেখা যায়নি। বছরদুয়েক আগেও নগরীর এই মার্কেটগুলো ঈদকার্ড নিয়ে থাকতো বিশেষ আয়োজন। কিন্তু বর্তমানে তেমন কোনো চিত্র দেখা দেখা যায়নি।
আন্দরকিল্লার বিভিন্ন কার্ড তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানে খবর নিয়ে জানা যায়, বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা, প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট অফিসের কিছু অর্ডার থাকে ঈদকার্ড নিয়ে। অর্ডার ছাড়া আর আগের মত কোনো ঈদকার্ড তৈরি করে না।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম প্রেস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এম আয়ুব পূর্বদেশকে বলেন, আগে ঈদ মৌসুমে প্রতিদিনই পুরো আন্দরকিল্লায় পাইকারি কার্ডের দোকানে ক্রেতার ভিড় জমত। প্রতিটি দোকানেই চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত কার্ড বিক্রি হতো। কিন্তু এখন আর সে অবস্থা নেই। যে কারণে অনেকে ঈদকার্ডের ব্যবসা পরিবর্তন করে কাপড় বিক্রি, টেইলার্সসহ বিভিন্ন ব্যবসায় চলে গেছেন। ফলে কার্ডের জন্য স্পেশাল দোকানগুলো নেই বললে চলে। কেউ অর্ডার করলে তাই করে দেন তারা।
আন্দরকিল্লার চিটাগাং প্রিন্টিং প্রেসের স্বত্বাধিকারী মো. করিম বলেন, ‘এক সময় অনেক পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাও গ্রাম-গঞ্জ থেকে কার্ড কিনতে ছুটে আসতেন। বিশেষ করে ঈদের এক সপ্তাহ আগে দোকানে ভিড় কয়েকগুণ বেড়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে সে অবস্থা আর নেই। আগে প্রতিদিন গড়ে যেখানে ৫ থেকে ১০ হাজার পিস কার্ড বিক্রি হতো, সেখানে কার্ড বিক্রি নেই বললে চলে। মাঝে মাঝে বিভিন্ন কোম্পানির কার্ডের অর্ডার থাকলে সেটা তৈরি করে দিই।’
বর্তমানের কার্ডগুলো আগের মতো কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রশ্নই আসে না। আগে আমরা রমজানের শুরুতেই বিভিন্ন সৃষ্টিশীয় চিন্তা দিয়ে কার্ড ডিজাইন করতাম। এখন তো নামমাত্র কার্ডগুলো তৈরি হচ্ছে।’
রেয়াজউদ্দিন বাজারের এক সময়কার পাইকারি কার্ড বিক্রেতা ইমন চৌধুরী পূর্বদেশকে বলেন, ‘আগে ঈদে বাড়তি বিক্রির আশায় ব্যবসায়ীরা তিন থেকে পাঁচশ ডিজাইনের কার্ড আনতেন। কিন্তু বর্তমানে বিক্রি নেই বলে এসবের তেমন কিছুই নেই। কার্ড ব্যবসার দুর্দিনের কারণে বাজারের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী এরই মধ্যে এ ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। কয়েকজন আবার পরিবর্তন করেছেন ব্যবসায়ও।’
তিনি আরো বলেন, ‘দোকানের ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ইত্যাদি খরচ পোষাতে না পেরে কার্ডের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি। যে কারণে বর্তমানে কাপড়ের ব্যবসা করছি।’
তরুণ প্রজন্মের কাছে যেখানে ঈদকার্ড শব্দটি অপরিচিত, সেখানে ঈদকার্ড দিয়ে তরুণদের ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর উদ্যোগ নিয়েছেন নগর ছাত্রলীগের সহ সম্পাদক মো. আবু ছালেহ নূর চৌধুরী (রিমন)। তিনি পূর্বদেশকে বলেন, ‘আমরা তরুণ প্রজন্ম। আগামীতে আমাদেরকে দেশের নেতৃত্বের ভার নিতে হবে। আমরাই যদি আমাদের ঐতিহ্য ইতিহাসকে ভুলতে শুরু করি, তাহলে তো একটি পরাধীন সংস্কৃতির প্রজন্মে পরিণত হব। পৃথিবীর সাথে আমরা তাল মিলিয়ে প্রযুক্তি ব্যবহার করবো, প্রযুক্তি আবিষ্কার করবো। তবে স্বকীয়তার মাঝে থেকে।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রজন্মের কাছে ঈদকার্ডের ঐতিহ্যকে পৌঁছে দিতে আমি এবারে উদ্যোগটা নিয়েছি। ৫ হাজার ঈদকার্ড করেছি নগরীর ছাত্র সমাজের মাঝে ঈদের শুভেচ্ছা হিসেবে বিনিময় করতে।’
ঈদকার্ডের স্মৃতি নিয়ে জানতে চাইলে ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী বলেন, ‘বাঙালির চিরায়ত রূপ ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে সবার একসঙ্গে কাজ করা উচিত। যতই ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগুক না কেন, অতীতের নিয়ম-কানুন ঠিক থাকা উচিত। তবে আমাদের পরিবর্তনকে মেনে নিতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশের শহরকে পেপারলেস সিটি ঘোষণা করা হচ্ছে। পুরো পৃথিবী থেকে কাগুজে মাধ্যম উঠে যাচ্ছে। সে জায়গটি দখল করে রেখেছে ডিজিটাল যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমগুলো। তবে ঈদকার্ড শুধুমাত্র আমাদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যম ছিল না, ছিল আবেগ অনুভূতি মিশ্রিত একটি সংস্কৃতির নাম। একটি জাতি যখন তাদের সংস্কৃতি ভুলতে বসে, তখন সেটা জাতির জন্য কখনো শুভকর হতে পারে না।’