প্রমথ চৌধুরী বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক 

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

20

বা ংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম প্রমথ চৌধুরী। তিনি বাংলা সাহিত্যে চলিত গদ্যরীতির প্রবর্তক। তিনি একজন শক্তিমান লেখক ছিলেন, বাংলা সাহিত্যে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বাংলা সাহিত্যের গতিপথ ঘুরিয়ে দিয়ে নতুনত্ব এনেছিলেন। তার সাহিত্য রচনার সুনিপুণতা, সৃষ্টিশৈলিতা, গাম্ভীর্যতা, যুক্তিনিষ্ঠতা সাহিত্যের ভাÐারকে সমৃদ্ধ করেছে। সাহিত্য অঙ্গনে প্রমথ চৌধুরীর ছদ্মনাম ছিল ‘বীরবল। এ ছদ্মনামে পত্রিকার পাতায় লেখালেখি করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তাই উনাকে বলা হতো বাংলা সাহিত্যের বীরবল। সম্রাট আকবরের দরবারে নবরেতœর একজন ছিলেন বীরবল আর বাংলা সাহিত্যে প্রথম চৌধুরীও তেমনি এক রতœ। প্রমথ চৌধুরীকে বাংলা সাহিত্যে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক হিসেবে অভিহিত করা হয়। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি প্রবন্ধ রচনা ও সাহিত্য সমালোচনার পাশাপাশি কবিতা, গল্প, চুটকি রচনায় খুব পারদর্শী ছিলেন। ব্যঙ্গাত্মক রচনাতেও তার জুড়ি নেই এবং তার কবিতাগুলো ছিল খুবই বাস্তববাদী এবং রূঢ়। প্রমথ চৌধুরীর রচনায় ছোটগল্পগুলো ছিল অসাধারণ। ছোট গল্প লেখার ক্ষেত্রে তিনি বাস্তবতার নিরিখে সুগভীর উপলব্ধি হতে সহজ সাবলীল ভাষায় লিখতেন। যেন সাধারণ পাঠক লেখাটি পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এই ধাঁচটি পরবর্তীতে তার প্রবন্ধগুলোতেও দেখতে পাওয়া যায়। তিনি মূলত সাধারণ পাঠকদের কথা মাথায় রেখে সাহিত্য রচনা করতেন। পাঠকের মনোভাব উপলব্ধি করে তাদের অব্যক্ত কথাগুলো তিনি তার ছোট গল্প ও প্রবন্ধে লিখেছেন। তাই তো তিনি বলেছিলেন, ভাষা মানুষের মুখ থেকে কলমের মুখে আসে, কলমের মুখ থেকে মানুষের মুখে নয়। তিনি রবীন্দ্র যুগে নিজেকে অত্যন্ত সফলতার সাথে স্বতন্ত্র ভাবে উপস্থাপন করেছেন এবং প্রশংসিত হয়েছেন। প্রথম চৌধুরী সেই সময়কার জনপ্রিয় সবুজপত্র পত্রিকার একজন স্বনামধন্য সম্পাদক ছিলেন। সবুজপত্র পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব বেশ সফলভাবে পালন করেন। তার ‘সবুজপত্র’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি নব্য লেখকদের একটি শক্তিশালী সংঘ তৈরি করেছিলেন। এ পত্রিকার মাধ্যমে সাহিত্যের বিকাশে তিনি ব্যাপকভাবে অবদান রাখেন এবং তরুণ প্রজন্মের লেখক ও পাঠকদের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেন।
প্রমথ চৌধুরী ১৮৬৮ সালের ৭ আগস্ট যশোরে তার পৈতৃক নিবাস পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার হরিপুর গ্রামে স্থানীয় জমিদার বংশে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম দুর্গাদাস চৌধুরী এবং মাতার নাম মগ্নময়ী দেবী। প্রমথ চৌধুরী কলকাতার হেয়ার স্কুল থেকে এন্ট্রান্স, কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে দর্শনশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে বি.এ. পাস এবং ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণিতে এম.এ পাশ করেন। তার শিক্ষা জীবন ছিল অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ। ১৮৯৩ সালে ইংল্যান্ড গমন করেন এবং তিনি সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথেই ব্যারিস্টারি পাশ করেন। কর্মজীবনে কিছুকাল তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপনা ছাড়াও সরকারের উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা ইন্দিরা দেবীকে বিয়ে করেন। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই। সুতরাং সে হিসেবে রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী-জামাতা ছিলেন প্রমথ চৌধুরী। লেখালেখি প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে বিখ্যাত সবুজপত্র পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কৃতিত্বের সাথে পালন করেন। বাংলা সাহিত্যকে তিনি নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। বাংলা সাহিত্যের তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন সমালোচক। বর্তমানে সমালোচনার নামে যদিও অনেকে নিন্দা করে, ব্যক্তিকে খাটো করে, তার সৃষ্ট কর্মকে তুলোধুনো করে ব্যক্তি আক্রোশে। প্রমথ চৌধুরী ছিলেন তার উল্টো গ্রোতের যাত্রী। ব্যক্তি আক্রোশ তার সমালোচনায় ছিল না বললেই চলে। তিনি সাহিত্যের গঠনমূলক সমালোচনা করতেন। যা এখনো তাকে প্রথম শ্রেণির সমালোচকের আসনেই অপরিবর্তিত রেখেছে। তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। সুতরাং সে কারণেই তিনি ইউরোপীয় শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। যার প্রভাব পড়েছিল পরবর্তী সাহিত্যে। অনেকেই মত পোষণ করেন যে, পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবের কারণেই তার প্রবন্ধগুলোতে অনেক উদ্ভট বিষয় স্থান পেয়েছে। নিঃসন্দেহে তার লেখার ধাঁচ বাংলা সাহিত্যের জন্য মাইলফলক।
তিনি ছিলেন মননশীল ও প্রচÐ যুক্তিবাদী। তিনি বলেছেন, জ্ঞানের প্রদীপ যেখানেই জ্বালো না কেন, তাহার আলোক চারিদিক ছড়াইয়া পড়িবে। মনোজগতে বাতি জ্বালানোর জন্যে সাহিত্যচর্চার বিশেষ প্রয়োজন। স্বদেশপ্রীতি সম্পর্কে তার অভিমত, আমরা স্বদেশে যাতে বিদেশি না হই, সে বিষয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করতে হবে। তিনি মানসিক যৌবনকেই সমাজে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস করেছেন। কাব্যসাধনা যে কখনও জোর-করা ভাব, আর ধার-করা ভাষায় পরিণত না হয়, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন। পাবনার বিখ্যাত চৌধুরী বংশের সন্তান প্রমথ চৌধুরী কেবল কুলে-মানে অভিজাত ছিলেন তা নয়, মনের দিক থেকেও ছিলেন উদার। কোন কোন সমালোচক মনে করেন, প্রমথ চৌধুরীর লেখা প্যারাডকসে আক্রান্ত অর্থাৎ যে উক্তি আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী মনে হলেও সত্যবর্জিত নয়। কিন্তু সত্য হল তার লেখার ধরণ খুবই বুদ্ধিবৃত্তিক, যুক্তিনিষ্ঠ। পারিবারিক সূত্রে রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী-জামাতা এবং বয়োকনিষ্ঠ্য হয়েও গদ্য রচনারীতিতে রবী ঠাকুরকে প্রভাবিত করেছিলেন প্রমথ চৌধুরী। যা কবিগুরু নিজেই স্বীকার করে ছিলেন। তিনি খুব উদার মানসিকতা থেকে বলেছিলেন, তার গল্প ও সনেট বাংলা সাহিত্যে খুব একটা প্রভাব ফেলেনি কিন্তু প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধ এবং ভাষাভঙ্গি আর ভাবনার ধারা পরবর্তী একটি গোষ্ঠীর উপর বিশেষ ক্রিয়াশীল হয়েছে। বাংলায় কথ্যরীতি তারই হাতে সাহিত্যিক স্বীকৃতি লাভ করে। রবীন্দ্রনাথের জোর সমর্থন এবং ব্যক্তিগত চেষ্টায় সে রীতি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। বস্তুত, প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই এই দুজনের প্রচেষ্টাতে এই কথ্যরীতির পূর্ণতম প্রাণপ্রতিষ্ঠা ঘটে। সবুজপত্র’ পত্রিকার মাধ্যমে প্রমথ চৌধুরী বাংলা গদ্যে নবরীতি প্রবর্তন করেন এবং তার প্রবন্ধাবলীতে প্রমাণ করেন যে, চলিতভাষায় লঘুগুরু সকল প্রকার ভাবভাবনার প্রকাশ সম্ভব। নাগরিক বৈদগ্ধ, মননের তীক্ষ্ণতা, চমক, রোমান্টিক ভাবালুতার বিরুদ্ধতা, বুদ্ধির অতিচর্চা এবং কিঞ্চিৎ ব্যঙ্গ, কিঞ্চিৎ রঙ্গ-ব্যঙ্গের হাসি প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধের ভাষায় বিধৃত। উইট এপিগ্রামের সুপ্রচুর ব্যবহারে তার লেখা প্রবন্ধ গুলো আজও পাঠকদের আকৃষ্ট করে। দর্শন, রাষ্ট্রনীতি, ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ইত্যাদি নানা বিষয়ে তিনি যেসব প্রবন্ধ লিখেছেন সেগুলোর সর্বত্রই তাঁর রচনায় তীক্ষ্ণ মৌলিকতার চিহ্ন রয়েছে। বিষয়ের অভ্যন্তরে বিতর্কের ভঙ্গিতে প্রবেশ করে তার প্রাণকেন্দ্রটিকে আলোকপাত করতে প্রমথ চৌধুরীর জুড়ি নেই। সাহিত্য সমালোচক হিসেবেও তিনি সেইভাবে খ্যাত। তাঁকে এককথায় সৃষ্টিশীল এবং রূপবাদী আখ্যা দেওয়া যেতে পারে।
প্রমথ চৌধুরীর মতে, সাহিত্যের উপাদান হচ্ছে মানবজীবন ও প্রকৃতি। মানব জীবনের সাথে যার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ নেই তা সাহিত্য নয়। তবে সাহিত্য মানব জীবনের বস্তুগত রূপ নয়, আবার প্রকৃতির হুবহু অনুকরণও নয়। মানবজীবন ও প্রকৃতি থেকে গ্রহণ বর্জনের মাধ্যমে উপযুক্ত উপাদান নির্বাচন করে শিল্পী মনের রূপ-রস, সুখ-দুখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা মিলিয়েই সৃষ্টি হয় প্রকৃত সাহিত্য। আমরা তাঁর রচনার প্রত্যেক পরতে পরতে দেখতে পাই মানবজীবন ও প্রকৃতির উপাদানের নির্যাসের পরিপূর্ণ অবয়বের চিত্র। মূলত সাহিত্যের দুটি দিক রয়েছে। যথা-বিষয় ও সৌন্দর্য। প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যে বিষয় ও সৌন্দর্যকে সমমূল্যে বিচার করেছেন। প্রমথ চৌধুরী জীবনে একটি উপন্যাসও লেখেন নি। বৃহদাকৃতি রচনার প্রতি তার বিন্দুমাত্র আকর্ষণ ছিল না। তিনি ছোট লেখার প্রতি তিনি অধিক আগ্রহ অনুভব করতেন। অল্প কথায় মূল বিষয়টি উপস্থাপন করতে পারার মাঝেই সাহিত্য রচনায় স্বার্থকতা বলে বিশ্বাস করতেন। বাংলা সাহিত্যে প্রমথ চৌধুরী বাংলায় ফারসি ছোটগল্পের আঙ্গিকরীতিকে তিনিই প্রথম পরিচিত করিয়েছিলেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে ইতালীয় সনেটের প্রবর্তক হিসেবে খ্যাত। বাংলা সাহিত্যে নিজস্ব ধারায় সনেট রচনাও করেছেন। বাংলা সাহিত্যে চুটকি সাহিত্যের প্রচার, প্রসার, বাকবৈদগ্ধতা ও সুনিপুণ বিন্যাসে, চুটকির নতুনত্বে প্রমথ চৌধুরীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। সাহিত্যে সত্য অন্বেষণ ও চর্চা ছিল যেন তার জীবনের ব্রত। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, প্রমথ চৌধুরীর ভাষাদর্শের সাথে সাহিত্যাদর্শের দ্ব›দ্ব ছিল। ভাষাদর্শে তিনি বিপ্লবী ও অগ্রবর্তী কিন্তু সাহিত্যাদর্শে তিনি অতীতচারী গ্রিক, রোমান ও সংস্কৃত সাহিত্যাদর্শের উত্তরাধিকারী। তবে সাহিত্যাদর্শে তিনি প্রাণের, তারুণ্যের, যৌবনের উপাসক, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপের উপাসক, সামাজিক মিথ্যার শত্রু, সৌন্দর্যের ভক্ত, সাহিত্যে স্বতন্ত্র মর্যাদার সমর্থক এবং সবধরনের নীতি শাস্ত্রের বিরোধী। বস্তুত বাংলা সাহিত্যে তিনি মানসিক যৌবনের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যে প্রাণের প্রতিষ্ঠা হোক, যে প্রাণ সকল বাসনা মুক্ত, যে প্রাণ নিজের পথ সৃষ্টি করে নেয়।
প্রথম চৌধুরী তিনি ছিলেন একজন ভাষা শিল্পী। ভাষা নিয়ে সাহিত্য সাধনা তার কাছে জীবন সাধনার নামান্তর। তিনি মনে করেন মানব মনে দুটি আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান। একটি জীবন ধারণের আকাঙ্ক্ষা, অন্যটি আত্মধারণের (আত্মবিস্মৃতির)। এ দুটির সমন্বয়েই সৃষ্টিশীল সাহিত্য সৃষ্টি হয়। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, মানবজীবনে যৌবনই সৃজনশীল। ব্যক্তিগত জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও জাতির সমষ্টিগত জীবনপ্রবাহে নিজেকে সংযুক্ত রাখতে পারলে মানসিক জীবন বিনাশের আশঙ্কা থাকে না। তিনি তার প্রায় রচনাতেই উল্লেখ করতেন, আমাদের প্রধান চেষ্টার বিষয় হওয়া উচিৎ কথায় ও কাজে ঐক্য করা, ঐক্য নষ্ট করা নয়। তার সবগুলো রচনা বিশ্লেষণ করলে আমরা তার কথা ও কর্মের সঙ্গতি স্পষ্ট দেখতে পাই।
প্রথম চৌধুরী গ্রন্থ সমূহ হচ্ছে- কাব্যগ্রন্থ: সনেট পঞ্চাশৎ (১৯১৯), পদচারণ (১৯২০)। গল্পগ্রন্থ: চার ইয়ারি কথা (১৯১৬), আহুতি (১৯১৯), ঘোষালের ত্রিকথা (১৯৩৭), নীল লোহিত (১৯৩৯), অনুকথা সপ্তক (১৯৩৯), সেকালের গল্প (১৯৩৯), ট্রাজেডির সূত্রপাত (১৯৪০), গল্পসংগ্রহ (১৯৪১), নীল লোহিতের আদি প্রেম (১৯৪৪), দুই বা এক (১৯৪০)। প্রবন্ধগ্রন্থ: তেল-নুন-লাকড়ি (১৯০৬), নানাকথা (১৯১১), বীরবলের হালখাতা (১৯১৭), আমাদের শিক্ষা (১৯২০), দুই ইয়ারির কথা (১৯২১), বীরবলের টিপ্পনী (১৯২৪), রায়তের কথা (১৯২৬), নানাচর্চা (১৯৩২), ঘরে বাইরে (১৯৩৬), প্রাচীন হিন্দুস্থান (১৯৪০), বঙ্গ সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত পরিচয় (১৯৪০), প্রবন্ধ সংগ্রহ (১ম ও ২য় খÐ) (১৯৫২-১৯৫৩)।
তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে যে অবদান রেখে গেছেন, তা সত্যিই অতুলনীয়। তিনি রবীন্দ্র যুগে আবির্ভূত হলেও তার সাহিত্য আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। বাংলা সাহিত্যের এই বিখ্যাত দিকপাল, মননশীল, যুক্তিবাদী, সৃষ্টিশীল ভাষাবিদ, কবি, সুপ্রাবন্ধিক, গল্পকার ও সম্পাদক ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৬ সালে শান্তিনিকেতনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষার প্রবর্তক ও বিদ্রপাত্মক প্রাবন্ধিক হিসেবে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।বা ংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম প্রমথ চৌধুরী। তিনি বাংলা সাহিত্যে চলিত গদ্যরীতির প্রবর্তক। তিনি একজন শক্তিমান লেখক ছিলেন, বাংলা সাহিত্যে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বাংলা সাহিত্যের গতিপথ ঘুরিয়ে দিয়ে নতুনত্ব এনেছিলেন। তার সাহিত্য রচনার সুনিপুণতা, সৃষ্টিশৈলিতা, গাম্ভীর্যতা, যুক্তিনিষ্ঠতা সাহিত্যের ভাÐারকে সমৃদ্ধ করেছে। সাহিত্য অঙ্গনে প্রমথ চৌধুরীর ছদ্মনাম ছিল ‘বীরবল। এ ছদ্মনামে পত্রিকার পাতায় লেখালেখি করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তাই উনাকে বলা হতো বাংলা সাহিত্যের বীরবল। সম্রাট আকবরের দরবারে নবরেতœর একজন ছিলেন বীরবল আর বাংলা সাহিত্যে প্রথম চৌধুরীও তেমনি এক রতœ। প্রমথ চৌধুরীকে বাংলা সাহিত্যে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক হিসেবে অভিহিত করা হয়। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি প্রবন্ধ রচনা ও সাহিত্য সমালোচনার পাশাপাশি কবিতা, গল্প, চুটকি রচনায় খুব পারদর্শী ছিলেন। ব্যঙ্গাত্মক রচনাতেও তার জুড়ি নেই এবং তার কবিতাগুলো ছিল খুবই বাস্তববাদী এবং রূঢ়। প্রমথ চৌধুরীর রচনায় ছোটগল্পগুলো ছিল অসাধারণ। ছোট গল্প লেখার ক্ষেত্রে তিনি বাস্তবতার নিরিখে সুগভীর উপলব্ধি হতে সহজ সাবলীল ভাষায় লিখতেন। যেন সাধারণ পাঠক লেখাটি পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এই ধাঁচটি পরবর্তীতে তার প্রবন্ধগুলোতেও দেখতে পাওয়া যায়। তিনি মূলত সাধারণ পাঠকদের কথা মাথায় রেখে সাহিত্য রচনা করতেন। পাঠকের মনোভাব উপলব্ধি করে তাদের অব্যক্ত কথাগুলো তিনি তার ছোট গল্প ও প্রবন্ধে লিখেছেন। তাই তো তিনি বলেছিলেন, ভাষা মানুষের মুখ থেকে কলমের মুখে আসে, কলমের মুখ থেকে মানুষের মুখে নয়। তিনি রবীন্দ্র যুগে নিজেকে অত্যন্ত সফলতার সাথে স্বতন্ত্র ভাবে উপস্থাপন করেছেন এবং প্রশংসিত হয়েছেন। প্রথম চৌধুরী সেই সময়কার জনপ্রিয় সবুজপত্র পত্রিকার একজন স্বনামধন্য সম্পাদক ছিলেন। সবুজপত্র পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব বেশ সফলভাবে পালন করেন। তার ‘সবুজপত্র’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি নব্য লেখকদের একটি শক্তিশালী সংঘ তৈরি করেছিলেন। এ পত্রিকার মাধ্যমে সাহিত্যের বিকাশে তিনি ব্যাপকভাবে অবদান রাখেন এবং তরুণ প্রজন্মের লেখক ও পাঠকদের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেন।
প্রমথ চৌধুরী ১৮৬৮ সালের ৭ আগস্ট যশোরে তার পৈতৃক নিবাস পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার হরিপুর গ্রামে স্থানীয় জমিদার বংশে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম দুর্গাদাস চৌধুরী এবং মাতার নাম মগ্নময়ী দেবী। প্রমথ চৌধুরী কলকাতার হেয়ার স্কুল থেকে এন্ট্রান্স, কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে দর্শনশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে বি.এ. পাস এবং ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণিতে এম.এ পাশ করেন। তার শিক্ষা জীবন ছিল অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ। ১৮৯৩ সালে ইংল্যান্ড গমন করেন এবং তিনি সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথেই ব্যারিস্টারি পাশ করেন। কর্মজীবনে কিছুকাল তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপনা ছাড়াও সরকারের উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা ইন্দিরা দেবীকে বিয়ে করেন। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই। সুতরাং সে হিসেবে রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী-জামাতা ছিলেন প্রমথ চৌধুরী। লেখালেখি প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে বিখ্যাত সবুজপত্র পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কৃতিত্বের সাথে পালন করেন। বাংলা সাহিত্যকে তিনি নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। বাংলা সাহিত্যের তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন সমালোচক। বর্তমানে সমালোচনার নামে যদিও অনেকে নিন্দা করে, ব্যক্তিকে খাটো করে, তার সৃষ্ট কর্মকে তুলোধুনো করে ব্যক্তি আক্রোশে। প্রমথ চৌধুরী ছিলেন তার উল্টো গ্রোতের যাত্রী। ব্যক্তি আক্রোশ তার সমালোচনায় ছিল না বললেই চলে। তিনি সাহিত্যের গঠনমূলক সমালোচনা করতেন। যা এখনো তাকে প্রথম শ্রেণির সমালোচকের আসনেই অপরিবর্তিত রেখেছে। তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। সুতরাং সে কারণেই তিনি ইউরোপীয় শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। যার প্রভাব পড়েছিল পরবর্তী সাহিত্যে। অনেকেই মত পোষণ করেন যে, পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবের কারণেই তার প্রবন্ধগুলোতে অনেক উদ্ভট বিষয় স্থান পেয়েছে। নিঃসন্দেহে তার লেখার ধাঁচ বাংলা সাহিত্যের জন্য মাইলফলক।
তিনি ছিলেন মননশীল ও প্রচÐ যুক্তিবাদী। তিনি বলেছেন, জ্ঞানের প্রদীপ যেখানেই জ্বালো না কেন, তাহার আলোক চারিদিক ছড়াইয়া পড়িবে। মনোজগতে বাতি জ্বালানোর জন্যে সাহিত্যচর্চার বিশেষ প্রয়োজন। স্বদেশপ্রীতি সম্পর্কে তার অভিমত, আমরা স্বদেশে যাতে বিদেশি না হই, সে বিষয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করতে হবে। তিনি মানসিক যৌবনকেই সমাজে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস করেছেন। কাব্যসাধনা যে কখনও জোর-করা ভাব, আর ধার-করা ভাষায় পরিণত না হয়, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন। পাবনার বিখ্যাত চৌধুরী বংশের সন্তান প্রমথ চৌধুরী কেবল কুলে-মানে অভিজাত ছিলেন তা নয়, মনের দিক থেকেও ছিলেন উদার। কোন কোন সমালোচক মনে করেন, প্রমথ চৌধুরীর লেখা প্যারাডকসে আক্রান্ত অর্থাৎ যে উক্তি আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী মনে হলেও সত্যবর্জিত নয়। কিন্তু সত্য হল তার লেখার ধরণ খুবই বুদ্ধিবৃত্তিক, যুক্তিনিষ্ঠ। পারিবারিক সূত্রে রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী-জামাতা এবং বয়োকনিষ্ঠ্য হয়েও গদ্য রচনারীতিতে রবী ঠাকুরকে প্রভাবিত করেছিলেন প্রমথ চৌধুরী। যা কবিগুরু নিজেই স্বীকার করে ছিলেন। তিনি খুব উদার মানসিকতা থেকে বলেছিলেন, তার গল্প ও সনেট বাংলা সাহিত্যে খুব একটা প্রভাব ফেলেনি কিন্তু প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধ এবং ভাষাভঙ্গি আর ভাবনার ধারা পরবর্তী একটি গোষ্ঠীর উপর বিশেষ ক্রিয়াশীল হয়েছে। বাংলায় কথ্যরীতি তারই হাতে সাহিত্যিক স্বীকৃতি লাভ করে। রবীন্দ্রনাথের জোর সমর্থন এবং ব্যক্তিগত চেষ্টায় সে রীতি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। বস্তুত, প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই এই দুজনের প্রচেষ্টাতে এই কথ্যরীতির পূর্ণতম প্রাণপ্রতিষ্ঠা ঘটে। সবুজপত্র’ পত্রিকার মাধ্যমে প্রমথ চৌধুরী বাংলা গদ্যে নবরীতি প্রবর্তন করেন এবং তার প্রবন্ধাবলীতে প্রমাণ করেন যে, চলিতভাষায় লঘুগুরু সকল প্রকার ভাবভাবনার প্রকাশ সম্ভব। নাগরিক বৈদগ্ধ, মননের তীক্ষ্ণতা, চমক, রোমান্টিক ভাবালুতার বিরুদ্ধতা, বুদ্ধির অতিচর্চা এবং কিঞ্চিৎ ব্যঙ্গ, কিঞ্চিৎ রঙ্গ-ব্যঙ্গের হাসি প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধের ভাষায় বিধৃত। উইট এপিগ্রামের সুপ্রচুর ব্যবহারে তার লেখা প্রবন্ধ গুলো আজও পাঠকদের আকৃষ্ট করে। দর্শন, রাষ্ট্রনীতি, ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ইত্যাদি নানা বিষয়ে তিনি যেসব প্রবন্ধ লিখেছেন সেগুলোর সর্বত্রই তাঁর রচনায় তীক্ষ্ণ মৌলিকতার চিহ্ন রয়েছে। বিষয়ের অভ্যন্তরে বিতর্কের ভঙ্গিতে প্রবেশ করে তার প্রাণকেন্দ্রটিকে আলোকপাত করতে প্রমথ চৌধুরীর জুড়ি নেই। সাহিত্য সমালোচক হিসেবেও তিনি সেইভাবে খ্যাত। তাঁকে এককথায় সৃষ্টিশীল এবং রূপবাদী আখ্যা দেওয়া যেতে পারে।
প্রমথ চৌধুরীর মতে, সাহিত্যের উপাদান হচ্ছে মানবজীবন ও প্রকৃতি। মানব জীবনের সাথে যার ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ নেই তা সাহিত্য নয়। তবে সাহিত্য মানব জীবনের বস্তুগত রূপ নয়, আবার প্রকৃতির হুবহু অনুকরণও নয়। মানবজীবন ও প্রকৃতি থেকে গ্রহণ বর্জনের মাধ্যমে উপযুক্ত উপাদান নির্বাচন করে শিল্পী মনের রূপ-রস, সুখ-দুখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা মিলিয়েই সৃষ্টি হয় প্রকৃত সাহিত্য। আমরা তাঁর রচনার প্রত্যেক পরতে পরতে দেখতে পাই মানবজীবন ও প্রকৃতির উপাদানের নির্যাসের পরিপূর্ণ অবয়বের চিত্র। মূলত সাহিত্যের দুটি দিক রয়েছে। যথা-বিষয় ও সৌন্দর্য। প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যে বিষয় ও সৌন্দর্যকে সমমূল্যে বিচার করেছেন। প্রমথ চৌধুরী জীবনে একটি উপন্যাসও লেখেন নি। বৃহদাকৃতি রচনার প্রতি তার বিন্দুমাত্র আকর্ষণ ছিল না। তিনি ছোট লেখার প্রতি তিনি অধিক আগ্রহ অনুভব করতেন। অল্প কথায় মূল বিষয়টি উপস্থাপন করতে পারার মাঝেই সাহিত্য রচনায় স্বার্থকতা বলে বিশ্বাস করতেন। বাংলা সাহিত্যে প্রমথ চৌধুরী বাংলায় ফারসি ছোটগল্পের আঙ্গিকরীতিকে তিনিই প্রথম পরিচিত করিয়েছিলেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে ইতালীয় সনেটের প্রবর্তক হিসেবে খ্যাত। বাংলা সাহিত্যে নিজস্ব ধারায় সনেট রচনাও করেছেন। বাংলা সাহিত্যে চুটকি সাহিত্যের প্রচার, প্রসার, বাকবৈদগ্ধতা ও সুনিপুণ বিন্যাসে, চুটকির নতুনত্বে প্রমথ চৌধুরীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। সাহিত্যে সত্য অন্বেষণ ও চর্চা ছিল যেন তার জীবনের ব্রত। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, প্রমথ চৌধুরীর ভাষাদর্শের সাথে সাহিত্যাদর্শের দ্ব›দ্ব ছিল। ভাষাদর্শে তিনি বিপ্লবী ও অগ্রবর্তী কিন্তু সাহিত্যাদর্শে তিনি অতীতচারী গ্রিক, রোমান ও সংস্কৃত সাহিত্যাদর্শের উত্তরাধিকারী। তবে সাহিত্যাদর্শে তিনি প্রাণের, তারুণ্যের, যৌবনের উপাসক, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপের উপাসক, সামাজিক মিথ্যার শত্রু, সৌন্দর্যের ভক্ত, সাহিত্যে স্বতন্ত্র মর্যাদার সমর্থক এবং সবধরনের নীতি শাস্ত্রের বিরোধী। বস্তুত বাংলা সাহিত্যে তিনি মানসিক যৌবনের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যে প্রাণের প্রতিষ্ঠা হোক, যে প্রাণ সকল বাসনা মুক্ত, যে প্রাণ নিজের পথ সৃষ্টি করে নেয়।
প্রথম চৌধুরী তিনি ছিলেন একজন ভাষা শিল্পী। ভাষা নিয়ে সাহিত্য সাধনা তার কাছে জীবন সাধনার নামান্তর। তিনি মনে করেন মানব মনে দুটি আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান। একটি জীবন ধারণের আকাঙ্ক্ষা, অন্যটি আত্মধারণের (আত্মবিস্মৃতির)। এ দুটির সমন্বয়েই সৃষ্টিশীল সাহিত্য সৃষ্টি হয়। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, মানবজীবনে যৌবনই সৃজনশীল। ব্যক্তিগত জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও জাতির সমষ্টিগত জীবনপ্রবাহে নিজেকে সংযুক্ত রাখতে পারলে মানসিক জীবন বিনাশের আশঙ্কা থাকে না। তিনি তার প্রায় রচনাতেই উল্লেখ করতেন, আমাদের প্রধান চেষ্টার বিষয় হওয়া উচিৎ কথায় ও কাজে ঐক্য করা, ঐক্য নষ্ট করা নয়। তার সবগুলো রচনা বিশ্লেষণ করলে আমরা তার কথা ও কর্মের সঙ্গতি স্পষ্ট দেখতে পাই।
প্রথম চৌধুরী গ্রন্থ সমূহ হচ্ছে- কাব্যগ্রন্থ: সনেট পঞ্চাশৎ (১৯১৯), পদচারণ (১৯২০)। গল্পগ্রন্থ: চার ইয়ারি কথা (১৯১৬), আহুতি (১৯১৯), ঘোষালের ত্রিকথা (১৯৩৭), নীল লোহিত (১৯৩৯), অনুকথা সপ্তক (১৯৩৯), সেকালের গল্প (১৯৩৯), ট্রাজেডির সূত্রপাত (১৯৪০), গল্পসংগ্রহ (১৯৪১), নীল লোহিতের আদি প্রেম (১৯৪৪), দুই বা এক (১৯৪০)। প্রবন্ধগ্রন্থ: তেল-নুন-লাকড়ি (১৯০৬), নানাকথা (১৯১১), বীরবলের হালখাতা (১৯১৭), আমাদের শিক্ষা (১৯২০), দুই ইয়ারির কথা (১৯২১), বীরবলের টিপ্পনী (১৯২৪), রায়তের কথা (১৯২৬), নানাচর্চা (১৯৩২), ঘরে বাইরে (১৯৩৬), প্রাচীন হিন্দুস্থান (১৯৪০), বঙ্গ সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত পরিচয় (১৯৪০), প্রবন্ধ সংগ্রহ (১ম ও ২য় খÐ) (১৯৫২-১৯৫৩)।
তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে যে অবদান রেখে গেছেন, তা সত্যিই অতুলনীয়। তিনি রবীন্দ্র যুগে আবির্ভূত হলেও তার সাহিত্য আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। বাংলা সাহিত্যের এই বিখ্যাত দিকপাল, মননশীল, যুক্তিবাদী, সৃষ্টিশীল ভাষাবিদ, কবি, সুপ্রাবন্ধিক, গল্পকার ও সম্পাদক ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৬ সালে শান্তিনিকেতনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষার প্রবর্তক ও বিদ্রপাত্মক প্রাবন্ধিক হিসেবে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।