প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হতে পারে : বিশ্বব্যাংক

পূর্বদেশ ডেস্ক

29

চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশের অর্থনীতির হালহকিকত নিয়ে প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এই প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রপ্তানি ও রেমিটেন্সের ইতিবাচক ধারা এই ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে অবদান রাখবে বলে প্রতিবেদনে ধারণা দেওয়া হয়েছে। খবর বিডিনিউজের
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসে এই প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বাংলাদেশে বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। আগামীতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আমরা মনে করছি। তবে এজন্য আর্থিক খাতে বেশ কিছু সংস্কার করতে হবে’। এর মধ্যে ব্যাংক খাতের বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং মেগা প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার কথা বলেন তিনি।সরকার চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই হার ছিল ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরের শেষে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ এবার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেতে পারে।
জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ উন্নয়ন করছে; মধ্যম আয়ের দেশের মহাসড়কে রয়েছে। উন্নয়নের এই ধারা ধরে রাখতে ব্যাপক সংস্কার করতে হবে। বিশেষ করে আর্থিক খাতের সংস্কারের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে বিশাল অংকের খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে আর দেরি না দ্রæত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে এই ঋণ বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। মনে রাখতে হবে- মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে চাপ প্রয়োগ করে বা নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো যাবে না। সত্যিকার অর্থে ঋণের সুদের হার কমাতে হলে খেলাপি ঋণ কমাতে হবে’।
বিশ্ব ব্যাংক বলছে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার ১০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। মোট খেলাপি ঋণের ৪৮ শতাংশই পুঞ্জিভূত হয়েছে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ছয় ব্যাংকের হাতে। ৪০ টি বেসরকারি ব্যাংকের কাছে আছে ৪৪ শতাংশ খেলাপি ঋণ। জাহিদ হোসেন বলেন, রপ্তানি ও রেমিটেন্সে প্রবৃদ্ধি যেন কমে না যায়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। সেজন্য শিক্ষা, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়নে মনোযোগী হতে হবে। মেগা প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ বা ৬ শতাংশ বড় কথা নয়, আমাদের গ্রোথ ধরে রাখতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিম্নগামী, এটা ধরে রাখতে হবে। প্রবৃদ্ধিকে সংখ্যা দিয়ে না বিচার না করে দেখতে হবে এর সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে কি না’।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চার ধরনের চাপ আছে। সেগুলো হলো বিভিন্ন দেশের মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফন, বিদেশি অর্থায়নের ঘাটতি, তারল্য সঙ্কেট এবং বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি। সরকারের গৃহীত বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টের গুণগত মান ও খরচ নিয়েও প্রশ্ন আছে বলে মনে করছে বিশ্ব ব্যাংক।
ভবিষ্যতে এসব প্রকল্প থেকে কি ধরনের অর্থনৈতিক সুফল আসবে, তা নিয়ে চূড়ান্ত কোনো হিসাব এখনও করা হয়নি বলে জানান বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ খাতে জোর দিতে হবে। ২০১১-২০১৭ সাল পর্যন্ত নতুন ৪৭ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। এ সময়ের মধ্যে বিদ্যুতের উৎপাদন বেড়েছে ৮০ শতাংশ। ২০৩০ সালে বিদ্যুতের যে চাহিদা দাঁড়াবে, তা পূরণে এখন থেকেই উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে।
জাহিদ হোসেন বলেন, বেসরকারি খাতে বিপুল বিনিয়োগ দরকার। বড় অবকাঠামোতে আরও সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ করতে হবে। প্রবাসী আয় ও রপ্তানিতে আয় বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধিতে নতুন ভ্যাট আইনটি বাস্তবায়ন করা জরুরি।
জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না- এ প্রশ্নে ঢাকায় বিশ্ব ব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি চিমিয়াও ফান বলেন, সব দেশই নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি খুবই ভালো। কিন্তু এটি সংখ্যা দিয়ে বিবেচনা না করে, মান দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, সরকারি হিসাবে গত অর্থবছরে ৮ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। কিন্তু অনেক দুর্বলতা আছে। এই প্রবৃদ্ধি টেকসই করা কঠিন। বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। আগে রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি ছিল। এখন অভ্যন্তরীণ চাহিদানির্ভর প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। প্রবৃদ্ধির বিতর্ককে সংখ্যার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। বিতর্ক হওয়া উচিত গুণগত মানসম্পন্ন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কিনা না-সেটা নিয়ে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে।
এছাড়া অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রমে রাজনৈতিক সুশাসনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার পরামর্শ দেন এই অর্থনীতির গবেষক। তিনি বলেন, বিশ্ব ব্যাংক বলছে, আগামীতে রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্স বাড়বে। কিন্তু আমি আশাবাদী নই। গত ৩-৪ বছর ধরে রেমিটেন্স ১৪-১৫ বিলিয়ন ডলারে আটকে আছে। গত অর্থবছরে ১৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও ১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়নি। রপ্তানি আয়ও খুব বেশি বাড়বে বলে মনে হয় না’।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, প্রবৃদ্ধিতে দু’টি বড় বিষয় নিয়ে ভাবার আছে। একটি হলো- এই প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে কি না। অন্যটি হলো- প্রবৃদ্ধির সুবিধা সবাই পাচ্ছে কিনা। অর্থনীতিতে রূপান্তর আনা দরকার, কেননা বাংলাদেশে এখনো ৩ কোটি ৯০ লাখ লোক দরিদ্র। তাদের মধ্যে ১ কোটি ৯০ লাখ অতি দরিদ্র। প্রবৃদ্ধির সুফল যাতে এই গরীব মানুষগুলো পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।