প্রবাসে প্রথম ঈদ এবং কিছু অভিজ্ঞতা

এস এম মনসুর নাদিম

26

এবার দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে ঈদ হয়েছে ১৫ জুন শুক্রবার। যথারীতি এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান ভারত ও আশেপাশের দেশগুলিতে ঈদুল ফিতর উদযাপন হয়েছে ১৬জুন শনিবার। আজকের লেখায় থাকছে আশির দশকের শেষের দিকের কথা। শীতের পর ধীরে ধীরে গ্রীষ্ম শুরু হয়েছে। এমন কতগুলো গাছ আছে যেগুলো গ্রীষ্মে একেবারে পাতা শূন্য হয়ে যায়। শীতের শেষার্ধে সেরকম কতেক বৃক্ষের গজিয়ে উঠা নতুন কচি পাতাগুলো প্রচন্ড গরমে আর মরুর লু হাওয়ায় কেমন যেন রক্তশূন্য হয়ে ঝরে পড়তে শুরু করেছে। পক্ষকালের মধ্যেই সবুজ পল্লবাবৃত বৃক্ষগুলি গরম আর লু হাওয়ায় উদম হতে শুরু করেছে। এখানে ঈদের নামাজ হয় খুব ভোরে ভোরে ফজরের নামাজের পর সুর্য উঠার অপেক্ষা। অতঃপর সকাল ছয়টা-সাড়ে ছয়টায় নামাজ হয়ে যায়।
অর্থাৎ সুর্যোদয়ের পরপরই ঈদের নামাজ শুরু হয়ে যায় বিভিন্ন মসজিদে ও জাতীয় ঈদগা ময়দানে। এখানে নামাজের ধরনও আলাদা। আমরা নামাজ পড়ি তিন তিন করে ছয় তকবিরে। আর এখানে ছয় ছয় করে বারো তকবিরে নামাজ হয়। বাংলাদেশে হানিফি মাজহাবের অনুসারী বেশি, তাই হানাফি মাজহাব মতে বারো রাকাতে ঈদের নামাজ হয়। দুবাইতে ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি থাকে দুইদিন। যথাক্রমে ঈদের দিন ও পরের দিন। আর ঈদুল আজহার ছুটি থাকে তিনদিন। যথাক্রমে কোরবানির আগের দিন (ইয়াওমুল আরাফা) কোরবানির দিন ও পরেরদিন। দুবাই কারামা এলাকায় বিরাট ঈদগা, যেটাকে সবাই ঈদ মুসাল্লা বলে থাকে। এই ভোরে ভোরে নামাজ হওয়াতে বিলম্বে ঈদের নামাজ পড়ায় অভ্যস্ত অনেক বাঙালি প্রবাসীভাই ঈদের জামাতে শরিক হতে পারেনা। আর নতুন প্রবাসী হলে তো কথাই নেই। জুমাতুল বিদাতে প্রতি মসজিদে ঈদ জামাতের সময় ঘোষণা করা হলেও আরবীতে ঘোষণা হওয়ার ফলে অনেক প্রবাসীদের বোধগম্য হয় না। ফলে নামাজের সঠিক সময় না জানাও ঈদ জামাতে অংশগ্রহণ করতে না পারার অন্যতম কারণ। একদা ফজিরা হতে থাকাবস্থায় ২০০৯ অথবা ২০১০ সনের দিকের ঘটনা। দুবাই থেকে আমার তিনভাই, তিন ভাগিনা ও দুই/তিনজন প্রতিবেশি প্রতিবছর দুই ঈদের ২/৩দিন ছুটিতে আমার নিকট চলে আসতো।
আমার বাসাটা ছিল নিরিবিলি আরবীদের আবাসিক এলাকায়। দুই তিনদিন ছুটি সবাই এখানেই উপভোগ করতো। সকালের ব্রেকফাস্ট, দুপুরের লাঞ্চ, রাতের ডিনার ও বৈকালিক নাস্তা কী কী হবে, কত পদের রান্না হবে সব আগে থেকেই ম্যানু তৈরি করা হয় এবং অধিকাংশ বাজার দুবাই থেকে করে নিয়ে আসা হয়। পরে হিসাব করে প্রতি জনের ভাগে যত টাকা পড়ে তত টাকা পরিশোধ করে দেয়া হয়। বলছিলাম ঈদ জামাতের কথা। ফজিরা হতে একদা আমাদের নামাজে বিলম্ব হয়ে যাওয়ায় গাড়ি নিয়ে মসজিদের দিকে দ্রুত ছুটছি। কিন্তু নামাজ শেষ। আরেক মসজিদে ছুটলাম ওখানেও খোতবা চলছে। আলহিল ঈদ মুসাল্লার দিকে ছুটলাম সেখানেও শেষ। অবশেষে বাসায় ফিরে এসে হাসাহাসি। এভাবে অনেকের ঈদ জামাত মিসড হয়। বাংলাদেশে ঈদের জামাত হয় সকাল আটটা অথবা সাড়ে আটটা। দেখা যায় অনেকে ঈদের জামাতে এসে ফজরের ক্বাযা নামাজ আদায় করেন যা অনেক আলেমদের মতে মাকরুহ (ভুল)। এবার ফিরে আসি আমি আগের কথায়। ঈদের পরদিন এমনই এক লু হাওয়ার মধ্যেই বেরিয়ে পড়ি আমরা দুইভাই। কোম্পানির পিক আপ নিয়ে নিজেই ড্রাইভ করছিলেন বড়ভাই। তিনি যেহেতু কোম্পানির ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্ট এর হেড, কোম্পানির যেকোন গাড়ি তিনি ব্যবহার করার অনুমতি রয়েছে। ঐ সময় মোবাইল ফোন ছিলনা। রাস্তার পাশে টেলিফোন বুথ ছিল। কয়েন ঢেলে ঢেলে কথা বলতে হতো। কয়েনে উদরপূর্তি হয়ে গেলে ছোট্ট স্ক্রিনে ভেসে উঠতো ঙটঞ ঙঋ ঙজউঊজ. চলতে চলতে রাস্তার ধারে টেলিফোন কয়েন বুথ গুলির পাশে অনেক লোকের ভিড়। কেউ কেউ লাইনে দাঁড়িয়েছে। ভাইয়ার নিকট জানতে পারলাম ছুটির দিনগুলিতে কল রেট অর্ধেক। এদের ব্যবসার নিয়ম হল লো প্রফিট বিগ সেল । তাই বুথ গুলিতে লোকের এত ভিড়। সব পাকিস্তানী, বাঙালি, ভারতীয়, ফিলিপিনো, ইরানী ও শ্রীলঙ্কার লোক। সবাই স্বদেশে স্বজনদের সাথে কথা বলার জন্য রুমালে, টোঙায় খুচরা পয়সা নিয়ে দাঁড়িয়ে। এখন তো ঘরে বসেই সারাদিন নিজের মোবাইল থেকে যত খুশি কথা বলা যায়। খুচরা পয়সার ঝামেলা নেই, বুথের সামনে লাইন ধরতে নেই। ইচ্ছা করলে ভিডিও কল দিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। ফেসবুকে লাইভে এসে সবকিছু আরও কাছাকাছি করে নিচ্ছে।
আশির দশকে এই সুযোগ ছিলনা। একটা ঈদ কার্ড পাঠাতাম, সেটা প্রাপকের হাতে পৌঁছতে পৌঁছতে ঈদের আনন্দের সুর্য অস্ত যেত। প্রবাসীদের ঈদ মানে অশ্রু আর ঘুম এবং ভি সি আরে (তখন স্যাটেলাইট ডিস ছিলনা)হিন্দি ছবি দেখে সময় কাটানো। অনেকের যাওয়ার কোন জায়গা থাকেনা তারা সারাদিন মন খারাপ করে থাকে। কোমল চিত্তের কেউ কেউ কম্বলের ভেতর মুখ গুঁজিয়ে ফোঁ ফোঁ করে কাঁদতে থাকে। দুপুরে খেয়ে লম্বা ঘুম দেয়। বিকেলের দিকে ঘুরতে চলে যায় কোন পার্কে বা বাঙালিদের মিলনমেলা নামের সেই প্রসিদ্ধ জায়গাগুলিতে। আবুধাবীতে আগে ছিল আল মোল্লা বিল্ডিং এখন খেজুরতলা। দুবাইতে ডেরা বাংলাবাজার, সারজাতে বিএম ডবিøও রোড ও রোলা। এভাবে রাস আল খাইমা, ফজিরাহ, ওম্মল কোয়েন, আজমান ও আল আইনে বাঙালিদের নির্দিষ্ট জমায়েত স্থান আছে। যেখানে গেলে কোন বন্ধু বা আত্মীয়ের দেখা মেলে। খবরাখবর আদান-প্রদান হয়। গাল-গল্পে সময় কেটে যায়।
সত্যের খাতিরে অনস্বীকার্য যে সমগ্র আমিরাতের উন্নয়নের মূলে রয়েছে বিভিন্ন দেশ সমূহের প্রবাসী শ্রমিকদের শ্রমের অবদান। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত শ্রমিকেরা হাড় ভাঙা পরিশ্রম করে বিস্তির্ণ মরুভূমিতে লাল গোলাপ, জুঁই টগর বেলি ফুটিয়েছে। নির্মাণ করেছে শিল্প খচিত তোরণ। নির্মাণ করেছে অত্যাধুনিক ব্যয় বহুল অট্টালিকা। পীচ ঢালা সুপ্রশস্ত সড়ক, সবুজ পার্ক। যেখানে বালি আর পাথর ছাড়া কিছু ছিলনা। সেখানে প্রবাসী শ্রমিকেরা সবুজের সমারোহ এনেছে। বাগান করেছে। রক্তজবা, রজনী গন্ধা, সুর্যমুখি ইত্যাদি ফুল ফোটায়ে সমগ্র আমিরাতকে মাধুরী তিলোত্তমায় রুপান্তরিত করেছে।
রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাথরের প্রদীপ, বাজ, টিয়া, মাছ ও ঘোড়া ইত্যাদির ভাস্কার্য নির্মাণ করেছে। অথচ আজ সেই আমিরাতে দুঃখ জনক হলেও বাঙালিদের ভিসা বন্ধ প্রায় ৬/৭ বছর। এই বিষয়ে আরেকদিন লিখবো। ফজিরায় প্রথম এসেছিলাম বেড়াতে। ঈদের পরদিন ছিল। রাস্তা-ঘাট ফাঁকা ফাঁকা। ফজিরার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। এখন ফজিরাহ অনেক উন্নত হয়েছে। আগে ফজিরাহ ছিল আবুধাবির অধীনে। বর্তমানে ফজিরার শেখ হামাদ বিন মোহাম্মদ আল সারকির ছেলে ফজিরার যুবরাজ দুবাই’র রোলার শেখ মোহাম্মদের জামাতা বনায় ফজিরাহ দুবাইর অধীনে ফিরিয়ে দিয়েছেন আবুধাবির শাসক সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ খলিফা বিন জায়েদ। উল্লেখ্য শেখ খলিফা বিন জায়েদ এর বোনের মেয়েকেই ফজিরার যুবরাজ বিয়ে করেছেন। সেহেতু ফজিরাহ এখন দুবাইর অধীনে এবং খুব দ্রæত ফজিরার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত আল ফজিরাহ। শাসক শেখ হামাদ বিন মোহাম্মদ আল সারকি। ফজিরার সবচেয়ে উর্বর জায়গা আল বাতিনা।
ব্যবসা বাণিজ্য ব্যতীত কৃষি এবং মৎস্য জাত ইন্ডাষ্ট্রি এর অন্যতম আয়ের উৎস। উল্লেখ্য আল বাতিনা খুবই উর্বর বলে অধিকাংশ উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ড সেখানেই চলছে। সরকারি পক্ষ থেকে জেলে ও কৃষকদের প্রচুর সাহায্য সহযোগিতা করা হয়ে থাকে। ফজিরাহতে অবস্থানকালে ফজিরার দ্রুত উন্নয়ন চোখে পড়েছে। ফজিরাহ, সারজাহ ও আবুধাবির দুরাঞ্চল গুলিতে যেমন মিরফাহ, গিয়াছি, হাবসান, বিদা জায়েদ ও লিবাতে (দওয়া) দেখেছি স্থানীয় আরবী বেদুঈনদের বসবাস। আমরা ঈদে কোলাকুলি করি আরবীয়রা পরস্পর গালে চুমো খায়। বয়স্ক ও সম্মানীয় লোকদেরকে কপালে চুমো খায়। মহিলারা পুরুষের সাথে শেকহ্যান্ড (মোসাফাহ) করতে দেখা যায়। আজ এই পর্যন্ত, পূর্বদেশ সংশ্লিষ্ট সকলকে এবং আমার প্রিয় পাঠকদেরকে জানাই ঈদ মোবারক।
লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক